ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

‘যাদের সাথে পরিচয়, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব আছে সবাই যে যার মতো করে আমার কাছ থেকে যতটুকু পেরেছে আদায় করে নিয়েছে শুধু একজন ছাড়া’ …সেলিম আল দ্বীনের মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি যাকে উদ্দেশ্য করে এই উক্তিটি করেছেন, তিনি হলেন বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা। ডাকনাম পারুল। মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার তাল্লুকনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়, তিনিই প্রয়াত নাট্যকার সেলিম-আল-দ্বীনের একান্ত সহধর্মিনী। বাবা মোকসেদ আলী খান, করোটিয়া সায়াদাত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ। বাবার বাঙ্গালী সংস্কৃতির শ্রদ্ধাভক্তিই বাঙ্গালিয়ানার প্রভাব ফেলে তার জীবনে। করোটিয়া আবেদা খানম গার্লস স্কুলের ১ম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে এস,এস,সি শেষ করার পরে করোটিয়া কলেজ থেকে এইচ,এস,সি ও বাংলাতে অনার্স করেন। তখন করোটিয়া কলেজ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আল দ্বীনও একই কলেজে বাংলায় অনার্স করেন। তখন থেকেই তার সাথে পরিচয় এবং শেষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কর্মজীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা ছিলেন। বাঙ্গালী সংস্কৃতি ধারণ ও বিকাশ এবং বিশ্ব দরবারে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে বাঙ্গালী সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে তার রয়েছে নিরব ভূমিকা। তার স্বপ্ন ছিল সেলিম আল দ্বীন বাঙ্গালীকে রবীন্দ্রনাথ এর মতো বিশ্ব দরবারে পরিচিতি ঘটাবেন যা তার সাথে কথা বলে জানা যায়। ‘আমি সেলিম-আল-দ্বীনকে নিয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসী ছিলাম যে, সে অনেক বড়ো মাপের একজন ব্যক্তিত্ব আমার স্বপ্ন ছিল সে রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্ব দরবারে বাঙ্গালীর সম্মান কুড়িয়ে আনবে তাই আমি আমার স্বপ্নের কথা সেলিম-আল-দ্বীনকে সর্বদা বলতাম ও তাকে লিখতে উৎসাহিত করতাম।

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ৬ পেপার শেষ হওয়ার সময়ে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ তার স্মৃতিতে আজো জাগরুক। ‘স্টপ জেনোসাইড’ দেখলে মনে হয় যেন সেখানে আমি ই আমার প্রতিচ্ছবি দেখছি। স্বপ্ন ছিল মুক্তিযোদ্ধরা দেশ স্বাধীন করবে মানুষকে মুক্তি দিবে। কিন্তু যখন দেখি আসল মুক্তিযোদ্ধা খুজে পাওয়া ঢের! নকল মুক্তিযোদ্ধার ভীড়ে, তখন ভাবি এই স্বাধীনতা তো চাইনি চাটুকারদের ভীড়ে আসল খুজে পাওয়াই আজ বড় সংকট।

করোটিয়া বাজারের ঝাড়–দার সুকানি পাগলার কথা আজো মনে পরে, সুকানি শুনলো পাকিস্তানি মিলিটেরিরা বাজারে আগুন দিবে সব শেষ করে দিবে সুকানি না পালিয়ে হাতে লাঠি নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পরে বলল দেখি আমার বাপ দাদার বাজারে কোন শালারা আগুন দিবে, আমি বেচে থাকতে বাপ দাদার ভিটে মাটি কিছুতেই ছাড়ব না। সেদিন সেই সুকানি পাগলা তার জীবন দিয়েছেন এ দেশের জন্য, তার জীবনের লালন করা সংস্কৃতির জন্য।

মুক্তিযুদ্ধের পরে নারীরা পেশাগত ভাবে হয়ত নিজেদের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে নারীদের উন্নয়ন এখনো পর্যন্ত ঘটেনি বলে মনে করেন তিনি। ফ্যাশনের নামে নতুন প্রজন্ম ভূলে গিয়াছে তাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতির কথা জিন্সের প্যান্ট, আর দোপাট্টা এটা আধুনিকতা না। চিন্তা চেতনায় আধুনিকতাই আসল আধুনিকতা যা এখনো বাঙ্গালী নারীদের মধ্যে অনুপস্থিত বললেন মেহেরুন্নেসা। বাঙ্গালী নারীদের পোষাকের আগের বর্ণনা ছিল ‘কুজ্ব বরণ কন্যা যে তার মেঘবরণ কেশ’ এখন মেয়েদের লম্বা চুল ও খুজে পাওয়া যায়না চুল কালো ও থাকেনা মেকাপের নামে তার আসল সৌন্দর্য ও খুজে পাওয়া কষ্টকর।

স্বাপ্নিক বাংলাদেশ নিয়ে তার অভিব্যক্তি বাংলাদেশ তার স্বকীয়তা বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হোক ভিনদেশী সংস্কৃতি যেন তার সংস্কৃতিকে গ্রাস না করে। আমরা অন্যদের সংস্কৃতি গ্রহন করবো যেটা ভালো, কিন্তু যারা আমাদের সংস্কৃতির চর্চা করেনা তাদের সংস্কৃতির চর্চা কেন আমরা করব?। এটাই ছিল প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দ্বীনের দৃষ্টিভঙ্গি। যে ভাষার জন্য আমরা রক্ত দিলাম সেখানে যেন অন্য কোন ভাষা আমাদের ভাষাকে স্তদ্ধ না করে সেটাও দেখতে হবে।

তরুনদের নিয়েও তার আকাঙ্খা অনেক যদিও তার ক্ষোভ বিদেশী ফ্লিমের প্রভাবে নষ্ট হচ্ছে তরুনরা। হারিয়ে গেছে গ্রাম বাঙলার চিরচেনা সামাজিক বিচার ব্যবস্থা, ফলে যত্রতত্র ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছে নারীরা।

নারীদের মুক্তির কথা শুধূ মুখে মুখে নয় সবার বাস্তব জীবনে ও থাকতে হবে। পরিবার প্রথা ভেঙ্গে দিয়ে নারী মুক্তি সম্ভব নয় তাই পরিবারের মধ্য থেকেই নারীকে মুক্তি দিতে হবে।
তরুন প্রজন্মের প্রতি তার পরামর্শ ভিনদেশী সংস্কৃতির অনুকরণ প্রীতি থেকে বেরিয়ে নিজস্ব স্বকীয়তার চিন্তার উৎকর্ষতার মাধ্যমে জনগনের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। দলকে ভালো না বেশে দেশের জনগনকে ভালবাসলেই সোনার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।

গাছের সাথেও রয়েছে তার নিবিড় সম্পর্ক। তাই ছাদেই রয়েছে বাগান। শত ব্যস্ততায় ও বাগান পরিচর্যা করতে ভুল করেন না, একদিন বাগানের কাছে না গেলে মনে হয় কতদিন যেন আমি ওদের পরিচর্যা করিনি এটাই তার অভিমত।

সেলিম-আল-দ্বীনের স্বপ্নকে সত্যি করতে তিনি সদাই তৎপর এখনো কোথাও সেলিম-আল-দ্বীনের লেখার কোন টুকরা কাগজ পেলে তা যত্নের সাথে সংরক্ষণ করেন। যাতে বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিকাশ ও স্বকীয়তায় এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে গৌরবের সাথে বেচে থাকা যে স্বপ্ন সেলিম-আল-দ্বীন দেখতেন তা যেন সত্যি হয়।

#…………….