ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ছাত্র রাজনীতির শুরুটা হয়ত ছিল সাধারণ ছাত্রদের কল্যাণের রাজনীতি। বিজ্ঞজনদের দৃষ্টিতে সেখানে হয়ত আরো অনেক কিছু ছিল, তবে সেখানে যে ছাত্রদের কল্যাণ ছাত্রদের সমস্যা সমাধানই প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সে কথা নিশ্চিত। ছাত্র রাজনীতির সোনালী অতীতের কথা শুনেছি তবে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। হালের ছাত্র রাজনীতিতে যে ছাত্রদের অকল্যাণ ও ছাত্রত্ব ধ্বংসের রাজনীতি বহমান সে কথা দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে পারি। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির মেরুদণ্ড যদি বিশ্ববিদ্যালয় ধরি তা হয়ত অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সাধারণ ছাত্রের কাছে ছাত্র রাজনীতি, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন তাদের কাছে আতঙ্ক বা জমের মত। যাদের কাছে দেশের আপমর জনসাধারনের প্রত্যাশা থাকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক দেশপ্রেমিক মানুষ গড়ার আঙ্গিনা ছাত্র সংগঠন। সেখানে তাদের আচার-আচরন যে কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে তা যারা কাছে থেকে দেখেছেন বা শুনেছেন করেছেন তারাই উপলব্ধি করবেন। তাদের দাপুটে স্বভাবে শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই যে অতীষ্ট তা নয় বরং বাসে ভাড়া না দেওয়া স্বভাবে বাস শ্রমিকরা যেমন অসন্তুষ্ট, ঠিক ততটাই মনোকষ্টে ভোগেন হোটেল মালিকরা। তারা এই তথাকথিত ছাত্রনেতাদের ফাও খাওয়া আর মাসিক চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট কিন্তু নিস্তার লাভ করার কোন উপায় জানা নেই। ভাবতে কষ্ট লাগে! যারা কিছুদিন পরে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে ছড়িয়ে পড়বেন সোনার বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জাতীয় রাজনীতিতে, তাদের রাজনৈতিক জীবনের হাতে খড়ি যদি হয় হোটেলে ফাও খাওয়া, হোটেল থেকে চাঁদা নেওয়া, বাসে ভাড়া না দেওয়া, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহার, ইভটিজিং, রাতের আধারে ছিনতাই ও নিজ দলের বন্ধুদের পদের লোভে মারধর শেষ পর্যন্ত হত্যার উন্মত্ততায় মেতে ওঠা, তাহলে আগামীর বাংলায় যে সেই গোপালের পূর্ববর্তী মাৎসন্যায় বিরাজ করবে না তা কোন দরবেশ নিশ্চয়তা দিবে?

আজকের ছাত্র সংগঠনগুলোর সর্বোচ্চ পদে যে ব্যক্তিটি থাকে, তা বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে তার ছেলে-মেয়ের বয়স ও প্রায় ছাত্রত্ব শেষ হবার উপক্রম। তবুও পদের লোভে বছরের পর বছর পরীক্ষা না দিয়ে বিভিন্ন ছলচাতুরী দিয়ে ছাত্রত্ব বাঁচিয়ে রাখে, ফলে বর্তমানে ছাত্ররাজনীতিতে মেধাবীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। যেখানে ছাত্র রাজনীতির নেতাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি মেধাবী, দক্ষ, যোগ্য ধৈর্যশীল হওয়ার দাবী রাখে সেখানে তার উল্টো চিত্র দৃশ্যমান। নেতা হওয়ার জন্য ছাত্ররাজনীতিতে প্রয়োজন হয় পেশী শক্তি, ধূমপায়ী, আড্ডাবাজ, কর্কশ ভাষা, হিংস্র স্বভাবের,যাতে করে সাধারণ ছাত্ররা তাদের বাঘের থেকেও ভয় করে। এতে করে ক্যাম্পাসের ত্রাস হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করা সহজ হয়। হোটেলে ফাও খাওয়া, হোটেল ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি,আর ত্রাস সৃষ্টি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মিছিল ও কর্মসূচীতে বাধ্য করা সহজ হয়। ফলে নিজের পরিচয়টা ও উর্ধ্বতন থেকে শুরু করে সবার কাছে অল্প সময়ে ফুটে ওঠে। তাই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এটাই অর্জন করার স্বপ্ন থাকে সমকালীন নেতাদের। নেতা হওয়ার জন্য উপরোক্ত গুণাবলী থাকার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ছাত্রনেতারা ভালো ব্যবহার, ধৈর্যশীল হওয়ার কোন প্রয়োজন উপলব্ধি করেন না। ফলে ছাত্রনেতা আর শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্ক যেন ‘রাজা-প্রজার’। ছাত্র রাজনীতির হালের চিত্র সকলের জানা তবুও যদি বর্তমানকালের কথা স্মরণ করি তাহলে দেখব সারা বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মা বাবা যেন নির্ভয়ে থাকতে পারছেন না। কারণ ঢাবির আবুবকর, রাজশাহীর ফারুক, নোমানী হত্যাকাণ্ড, চবির মাসুদ, মুজাহিদ হত্যাকাণ্ড, জাবির নিজ দলের সন্ত্রাসী নামধারী ছাত্রদের দ্বারা জুবায়ের হত্যাকাণ্ড মা-বাবাকে পেরেশান করে তুলছে। মানুষ তৈরীর আঙ্গিনায় যেন আজ মৃত্যুর যম এসে ভর করছে। যার ভয়ে মা-বাবাদের সর্বদা তটস্থ থাকতে হয়, মেধাবী, সৎ, দক্ষ, যোগ্য, সহনশীল মানুষের পরিবর্তে বর্তমান ছাত্ররাজনীতি দুশ্চরিত্র, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, আজ অছাত্রদের উৎসাহিত করছে। তাই দেশ গড়ার, মানুষ গড়ার, ছাত্ররাজনীতির মশাল বহন করছে আজ মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী, অছাত্ররা।

ফলে ঘটনাটি সে রকমই ঘটছে যে, একটি চাকু যদি ডাক্তারের কাছে আর সন্ত্রাসীর কাছে থাকে। তাহলে ডাক্তার যেমন এর মাধ্যমে মানুষকে বাঁচাতে পারে, ঠিক বিপরীতটিই ঘটায় সন্ত্রাসী। তাই হালের ছাত্ররাজনীতির মশাল আজ মাদকাসক্ত, অছাত্র, চাঁদাবাজরা বহন করার কারনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অশান্ত। সেখান থেকে জ্ঞানের সুবাতাস বহমান হওয়ার পরিবর্তে বাতাসে বহে রক্তের গন্ধ, ছাত্রনেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে ছড়ায় বিদ্বেষের বিষবাষ্প। তাই ছাত্রসমাজ আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এখনো যদি ছাত্ররাজনীতি গতিধারা পরিবর্তনের জন্য কোন সঠিক উপায় খুজে বের করা না হয়। তাহলে জাতিকে এর খেসারত দিতে বেশী দেরি হবে বলে মনে হয় না। তাই বর্তমানের ছাত্ররাজনীতি কি থাকবে? যদি থাকে তাহলে ছাত্ররাজনীতিতে যারা দায়িত্বশীল পদে থাকবেন তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করা এখন খুবই জরুরী। আমরা যেমনটা এখনো দেখতে পাই বহির্বিশ্বে। সেখানে দেখতে পাই ছাত্রনেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তারা বই ইন্টারনেট,টিভি,রেডিও নিউজপেপার প্রভৃতির মাধ্যমে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে তুলেন। পৃথিবীকে এখন গ্লোবাল ভিলেজ হিসেবে উপস্থাপনা করা হয়।

একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে আধুনিক বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে হলে ছাত্রনেতাদের অবশ্যই এ কাজ গুলো করতে হবে। কিন্তু ছাত্ররাজনীতির নেতারা যদি পিছনের বেঞ্চে বসেন, লেখা-পড়া না করেন তাহলে তাদের মত আদু ভাইদের দ্বারা দেশ পরিবর্তন তো দূরের কথা, তার পরিবার পরিবর্তন করাও অসম্ভব। তাই ছাত্র সংগঠনের নেতারা রাতে ঘুমানোর আগে তাদের আত্মজিজ্ঞাসা থাকা উচিত আজ কি পড়েছি, কি জেনেছি,কি বুঝেছি এবং কি শিখেছি বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতি অনেকটাই বিদেশিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা অথবা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সুতরাং ছাত্রনেতাদের নিজ দেশের সম্পদ সম্পর্কিত জ্ঞান, বিদেশীদের সাথে ভালোভাবে কমিউনিকেট করতে পারে অবশ্যই দরকার। দলের মধ্যে নিজের মতামত প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় সব অন্তর্দ্বন্দের উপরে উঠে ঐক্যবদ্ধ থাকা ষোল কোটি মানুষের দাবী। এখন সময় এসেছে মেধাবী যোগ্য দক্ষ ছাত্রদের ছাত্ররাজনীতিতে আসার এবং ছাত্র সংগঠন গুলোর সেই পরিবেশ তৈরী করার। তাহলেই কেবল আমরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য থেকে মুক্তি দিয়ে দেশের আপাম জনসাধারনের কাঙ্খিত নেতা পেতে পারি। জাবির ইংরেজী বিভাগের জুবায়েরের শোক স্মৃতি শরণার্থে তার নিহত হওয়ার একমাস পূর্বের ছোট্ট সংলাপ তুলে ধরতে চাই তার কথাটি ছিল ভাই নাসির সাংবাদিকতা করে ভালো করেছ। আমি ছাত্ররাজনীতি করে আজ ক্যাম্পাসে আসতে পারিনা, হলে থাকতে পারিনা সেই জুবায়েরকে সংঘাতময় ছাত্ররাজনীতি তার উপলদ্ধিকে শুধরাতে দিল না, তার মায়ের কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ করার পূর্বেই তার অতি পরিচিত বন্ধুত্বের আড়ালে সন্ত্রাসে উন্মত্ত সন্ত্রাসীরা মায়ের কাছে লাশের কাঁপন পরিয়েই ফেরৎ পাঠাল। আর চাইনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন লাশের কফিন বহন করতে। চাইনা কোন মা তার ছেলেকে শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে লাশ নিয়ে ঘরে ফিরে যাক। তাই এখনই সময় অছাত্র, আদু ভাই, সন্ত্রাস, মাদকাসক্ত মুক্ত ছাত্র রাজনীতি গড়ার প্রত্যয় নেয়ার।

#………….

৯.৫.২০১২