ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি জাপানে নির্মিত, হিন্দি ডাবিং করা শিশুদের জনপ্রিয় কার্টুন ডোরেমন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রথমেই আমি সেই সাংসদ যিনি ব্যপারটিকে মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন তাঁকে এবং সরকারকে বিশেষ ধন্যবাদ দিতে চাই এই সিদ্ধান্তটির জন্য। ডোরেমন আমাদের নিস্পাপ শিশুদের মনে কি রকম প্রভাব ফেলে, তা খুব বেশী জন না হলেও সীমিত কিছু ব্যক্তি পত্র-পত্রিকায় আর অনলাইন মাধ্যমে আলোচনা করেছেন। তাও বলছি, ডোরেমনের ভয়ংকর দুটি দিক ছিল এর হিন্দি ভাষা আর শিশুকে মিথ্যাবাদী আর ফাঁকিবাজ করে তোলার নানা কায়দা-কানুন। ডোরেমনের কল্যাণে অনেক শিশুই বাংলা ভুলে হিন্দিতে কথা বলা শুরু করে। এটা অভিভাবকদের অনেকেই গ্রাহ্য না করলেও আমাদের শিশুদের বেড়ে উঠায় নিঃসন্দেহে একটি নেতিবাচক দিক। ভাষা শেখা ভাল, তবে হিন্দি এমন কোন ভাষা নয় যেটা শিখলে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ উজ্জল হবে। সর্বগ্রাসী হিন্দি সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাবের জন্য এই ভাষাটিকে যতখানি পরিত্যাগ করা যায় ততই ভাল। আর তা না হলে আমার এক সহকর্মীর সন্তানের করা উক্তির মত অনেক কিছুই ভবিষ্যতে শুনতে হবে। টুথপেস্ট কিনতে যেয়ে বাচ্চাটি তার মাকে বলেছিল, “এইটা না, আমি ইন্ডিয়ান কোলগেট নিব”। আর একটা ব্যপার। শিশুতোষ অনুষ্ঠানে শিশুতোষ বিষয়গুলি থাকাই যুক্তিযুক্ত। ডোরেমনে বাবা-মা’র সাথে মিথ্যা কথা বলা, স্কুল ফাঁকি দেবার নানা কৌশল, মানুষকে বোকা বানানো কিংবা ধোঁকা দেবার নানা ফন্দি-ফিকির “শেখানো” হত। সন্তান পালনে উদাসীন বাবা-মা’র কাছে এগুলো কোন ব্যপারই না। কিন্তু একজন দায়িত্ববান অভিভাবক ও একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সবারই উচিত ভেবে দেখা আমরা কি কি আবর্জনা আমাদের সন্তানদের “খাওয়াচ্ছি”।

ডোরেমন প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের এই লেখাটি ভাল লেগেছে।

এবার আজ ভাষা আন্দোলনের মহান এই দিনে, ডোরেমন প্রসঙ্গের সুযোগে অন্য কিছু কথা বলি।

বলতে দ্বিধা নেই যে, টেলিভিশন আমাদের জীবনের অনেকখানিই কেড়ে নিয়েছে। আমাদের শৈশবে মাত্র একটি চ্যানেল আর তার নির্দিষ্ট সম্প্রচার সময়সীমার কারণে টেলিভিশন ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত বিনোদন। আর এই চ্যানেলটিতে প্রচার করা হত সুস্থ ও রুচিশীল অনুষ্ঠানমালা। সময় পাল্টেছে, সেই সাথে পরিবর্তিত হয়েছে আমাদের রুচি, চাহিদা, প্রয়োজন ইত্যাদি অনেক কিছুর। এখন আমাদের দেশেরই প্রায় দুই ডজন টেলিভিশন চ্যানেল আছে আর আছে বিদেশী শতাধিক চ্যানেল। এগুলো দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা নানারকম অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। দারুন আপত্তিকর নানা বিষয় থাকলেও, আমাদের দেশে ভারতীয় চ্যানেল মহাসমারোহে প্রচার করা হয়। এ যেন আমাদের একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা! ভারতীয় হিন্দি চ্যানেলগুলিতে প্রচারিত সিরিয়ালগুলোর বিষয়বস্তু কি থাকে আমরা সবাই জানি। এখানে থাকে হিংসা, বিদ্বেষ, পরকীয়া প্রেম, অনৈতিক দৈহিক-মানসিক সম্পর্ক নিয়ে ‘আকর্ষণীয়’ কিছু কাহিনী। প্রচণ্ডভাবে কৃত্রিম সাজসজ্জা আর সংলাপে ভরা এই সিরিয়ালগুলোর মাঝ থেকে ভাল কিছু শেখা বা নেয়া অসম্ভব। আমরা জানি আমাদের নাট্যশিল্প ভারতের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ। তাহলে কেন আমরা, বাংলাদেশীরা হিন্দি সিরিয়ালে প্রায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। “সকল নিষিদ্ধ, অসুস্থ বিষয়মাত্রই তীব্রভাবে আকর্ষণীয়” – কারণটা কি তাই? যৌনতা আর অশ্লীলতার রগরগে কোন কাহিনীর বিপরীতে আমাদের দেশীয় (ইদানিং হিন্দি সিরিয়াল স্টাইলের কিছু চ্যানেল ছাড়া) চ্যানেলগুলোর মোটামুটি সাদামাটা সামাজিক বিষয় আর নির্দোষ কৌতুক উপস্থাপন করাই কি এর মূল কারণ? এ ব্যপারটা ভাবার সময় এসেছে। যে ব্যপারটা আমাকে আরও শংকিত করে তা হল, আমাদের অভিভাবকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যকলাপ। আমি অনেক পরিবারেই দেখেছি হিন্দি সিরিয়ালের প্রতি মা-মেয়ের দুর্বার আকর্ষণ। অনেক শিক্ষিত মা’রা বুঝতেও পারেন না সামাজিক অসঙ্গতিপূর্ণ এসব সিরিয়াল একসাথে বসে দেখার কারণে অপরিণতবয়স্ক সন্তানদের মনে সুস্থ সামাজিক আচার আর রীতির বিরুদ্ধে কি রকম বিরূপ মনোভাব তৈরি হচ্ছে। আমার মতে মনন ও মনস্তত্ত বিকাশে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হচ্ছে আমাদের কন্যা সন্তানদের, যারা তাদের মায়ের সাথে এই সিরিয়ালগুলো দেখে দেখে আসক্ত হচ্ছে।

হিন্দি সিরিয়াল দেখানো চ্যানেলগুলোর আরেকটি বাজে দিক হল বিজ্ঞাপনে যৌনতার ছড়াছড়ি। এটা আসলে সব হিন্দি চ্যানেল সম্পর্কেই নির্দ্বিধায় বলা যায়। এই চ্যানেলগুলোতে পারফিউম, চকলেট, আইসক্রিম, আন্ডারগার্মেন্টস, কনডম ইত্যাদির বিজ্ঞাপনচিত্রগুলো এতটাই যৌনতার ইঙ্গিতপূর্ণ যে, সুস্থ মানসিকতার অভিভাবকদেরকে তাদের সন্তানদের সাথে একটি সাধারন গানের অনুষ্ঠান দেখার মাঝে বিজ্ঞাপন বিরতিতে রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে পড়তে হয়। তবে এটাও ঠিক যে, এ ব্যপারগুলো অনেক ‘আধুনিক’, ‘প্রগতিশীল’ অভিভাবকদের মনে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি তৈরি করতেও ব্যর্থ হয়।

হিন্দি সিরিয়ালের কল্যাণে আমাদের প্রাপ্তিগুলোকে তালিকাবদ্ধ করলে দেখা যাবে আমরা কি কি পাচ্ছিঃ

– বিচিত্র কিছু ভারতীয় আচার/রীতি যা বাঙালী সংস্কৃতিতে কখনই ছিল না। আজকালকার বিয়ের অনুষ্ঠানে এসব রীতি প্রায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথেই স্থান পাচ্ছে।

– আগে থেকেই থাকা ভারতীয় পণ্যের প্রতি আমাদের ‘নিখাদ’ ভালবাসার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি আর সে সাথে দেশীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা।

– আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উপাদান, যেমন, সংগীত, কিছু নাটক, সিনেমা ইত্যাদিতে হিন্দি/ভারতীয় প্রভাবের কলুষ।

– বাচ্চাদের মাঝে বাংলা বা ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দি বলার অসুস্থ প্রবণতা। এটা জাতীয়তার দাবীতে বাংলা আর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইংরেজি বলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বলছি।

– অসুস্থ আর অশ্লীল নানা বিষয়ে আমাদের উৎসাহ, উদ্দীপনা আর আকর্ষণ তৈরি করা।

– আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, পারিবারিক আচার শৃঙ্খলা আর সম্পর্কের মত সুস্থ, সুন্দর কিছু সামাজিক বিষয়ে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ তৈরি করা।

আরও অনেক কিছু লেখা যেত – আমাদের কাণ্ডজ্ঞানহীনতার কথা চিন্তায় আসায় রুচি হচ্ছে না।

তবে এটুকু বলব যে, উপরে আলোচিত এসব ব্যপারে যদি আমরা সচেতন না হই তাহলে একদিকে যেমন আমরা আমাদের পারিবারিক দায়িত্ব পালনে দারুনভাবে ব্যর্থ হয়ে সময়ের আবর্তে ‘ওল্ড হোম’ টাইপের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হব (তাও সন্তান নয় রাষ্ট্রের সেবা মাধ্যমের কল্যাণে-সন্তানের লাথি খেলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই – সিরিয়ালে তো দেখায়!), তেমনি নাগরিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে আমাদের নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসে ঘৃণিত হয়ে থাকব।

বিচারক যেমন সবকিছু দেখেও বিচারের রায় দেয়ার সময় স্বেচ্ছায় কাল কাপড় পেচিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেন – তেমনি রাষ্ট্র আর সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে, রাষ্ট্রের অভিভাবক সরকারকেও কিছু ক্ষেত্রে অন্ধ হয়ে রায় দিতে হয়। সরকার ইতিমধ্যেই রায় দিয়েছেন ইউটিউব, সোনার বাংলা, ধর্মকারী সাইট সহ কিছু চ্যানেল বন্ধের।

আশায় বেঁচে থাকব কখন আমাদের রাষ্ট্র তার নিজস্ব ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য আরও সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেবে।