ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

তৃতীয় পর্ব…

জোংখা ভাষায় ভূটানের নাম দ্রুক। দ্রুকের অর্থ ড্রাগন। ভূটানের সংস্কৃতিতে ড্রাগনের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। যাইহোক, পারোর চেয়ে পুনাখা খানিক উষ্ণতর। ঠাণ্ডার কামড়ের তীব্রতা কিছুটা কম অনুভূত হয় পুনাখা ভ্যালিতে। সমুদ্র সমতল থেকে ১২০০ মিটার উচ্চে পুনাখার অবস্থান। ১৯৫৫ সালের আগ পর্যন্ত তিলোত্তমা ভূটানের রাজধানী ছিলো পুনাখা। ভূটানের বিখ্যাত দুই নদী ফো চূ (বাবা) ও মো চূ (মা) দুই দিক থেকে পরিভ্রমণ শেষে অপার ভালোবাসায় একে অন্যের সাথে বিলীন হয়ে গেছে পুনাখার বুকের উপর দিয়ে। বিখ্যাত ও অপূর্ব স্থাপত্য পুনাখা জং এই দুই নদীর মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।

 

বিখ্যাত ও অপূর্ব স্থাপত্য পুনাখা জং

 

ফো চূ (বাবা) ও মো চূ (মা) নদীর পাড়ে ছবির মতো ঘর-বাড়ি

বিস্তীর্ণ ভ্যালি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত যাংতো পেরলি (Zangto Pelri) হোটেলে উঠেছিলাম। বিকাল থেকে অস্ত্রধারী কয়েকজনের ইতস্তত ঘুরাঘোরি দেখে খটকা লাগছিলো। পরে শুনলাম হোটেল সংলগ্ন দুটো বাংলোতে ভূটানের দু-জন রাজকুমারী উঠেছেন। অস্ত্রধারীরা তাদের দেহরক্ষী। প্রিন্সেসদের একজন আবার যাংতো পেরলি হোটেলের মালিক। শুনে ভালো লাগলো। রাজকুমারীর হোটেলে স্বয়ং তার উপস্থিতিতে থাকা একটু হলেও সৌভাগ্যের ব্যাপার। হোটেলের সামনের ঢালো চত্বরে দাঁড়ালে সামনে দৃষ্টি জুড়ে বিছিয়ে থাকে বিশাল ভ্যালি। থরে থরে সাজানো ফসলোউন্মুখ তৈরি চিলতে চিলতে জমি। ধানের চাষ হবে ভ্যালি জুড়ে। সবুজে সবুজে ভরে উঠবে পাথুরে পুনাখা। পাথরের বুক চিরে জীবনের উচ্ছ্বাস ভেসে বেড়াবে ভ্যালির উদ্দাম বুকে।

 

থরে থরে সাজানো ফসলোউন্মুখ তৈরি চিলতে চিলতে জমি

 

বিস্তীর্ণ ভ্যালি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের চূড়োয় অবস্থিত যাংতো পেরলি (Zangto Pelri) হোটেল

পুনাখার প্রকৃতি অন্য এলাকাগুলো থেকে একটু ভিন্ন। এখানে পাথুরে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল ক্যাকটাস। রঙিন ফল ধরে আছে ক্যাকটাসের গায়ে। বিশাল ভ্যালিতে কৃষিকাজ হয় হরদম। ছবির মতো গাঁয়ের ইতস্তত বাড়িগুলো পাথর ও মাটির তৈরি। সবুজে সবুজে ছাওয়া পাহাড়ের কোল। আর ললনার যত্নে আঁচড়ানো কুঞ্চিত চুলের সিঁথির মতো দু-পাশে উপচানো ভ্যালি রেখে রিমঝিম করে বয়ে যাচ্ছে ফু চূ ও মো চূ’র মিলিত ধারা।

 

পাথুরে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল ক্যাকটাস

.

অগভীর নদীর স্রোতে পর্যটকেরা র‍্যাফটিং করছে

একটু উষ্ণ এলাকা বলেই হয়তো নদীতে পরিযায়ী পাখিদের দেখা মেলে। বুনো হাঁস, বালি হাঁস ডুব সাঁতারে মেতে আছে জলে। অগভীর নদীর স্রোতে পর্যটকেরা র‍্যাফটিং করছে চোখে পড়ে। পুনাখা জং থেকে নদীর ধার ঘেঁষে উজানের দিকে ২০ মিনিট ড্রাইভ করে এগিয়ে গেলে মিলবে র‍্যাফটিং পয়েন্ট। ১০-১২ জন আরোহী জনপ্রতি হাজার টাকায় র‍্যাফট ভাড়া করে গাইডসহ ভেসে পড়লেই হলো। গ্রীবা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের উদোম গাঁয়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাটির টানে দেড় ঘণ্টা পর পুনাখা জং পেরিয়ে শেষ হয় র‍্যাফটিং। পায়ের নিচে বরফ-গলা জলের ঠাণ্ডা আর ছলকে উঠা জল ভিজিয়ে দেবে কাপড়-চোপড়। ঠাণ্ডার বোধের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মন আর মগজে শান্তির তুলি চালিয়ে ছবি একে যাবে এই র‍্যাফটিং। পয়সা উশুল হবে নিশ্চিত।

 

লিঙ্গ হোটেলে মিললো শাদা ভাত, আলু ভাজি, মুরগীর মাংস আর কাঁচা লঙ্কা

ফোচূ-মোচূ নদীর পাড়ে লিঙ্গ হোটেলে মিললো সাদা ভাত, আলু ভাজি, মুরগির মাংস আর কাঁচা লঙ্কা। জিভে সামান্য বাঙালি স্বাদ পাওয়া গেলো। আগের রাতে যাংতো পেরলি হোটেলে খাবার নিয়ে একটু বেহাল দশা হয়েছিলো। স্যুপ নুডুলস অর্ডার করেছিলাম। সামনে পেয়েছি পাতলা ভাতের মারের মতো একটু স্যুপ আর তলানিতে এক চিমটি নুডুলস। জিভ পেট টেরও পেলো না কি খেলাম। তাই চিকেন মোমো অর্ডার করেছিলাম। চল্লিশ মিনিট পর মোমো সার্ভ করার পর পেটের ভিতর খাবারের উপস্থিতি টের পাওয়া গেলো। রাতেই অবশ্য সকালের নাস্তার অর্ডার দিয়ে দিয়েছিলাম- আলু পরোটা, ডিম ভাজি আর কচি বাঁশের পিকল। ভালোই ছিলো সকালের খাবারটা, যদিও বাঁশের পিকলে একটু বাঁশ বাঁশ গন্ধ ছিলো।

 

চলবে ………………