ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

একটি রাত ও একটি দিন পুনাখাতে কাটিয়ে দোচূ লা পাস হয়ে রাজধানী থিম্পুতে এসে পৌঁছলাম পরদিন বিকেলে। শহরের একদম শিরস্ত্রাণে স্থাপিত বিশাল আকারের বুদ্ধমূর্তি। বুদ্ধ দোরদেনমা (Dordenma) মূর্তি। পদ্মাসনে আসীন প্রায় ১৬০ ফুট দীর্ঘ শাক্যমুনি বুদ্ধ থিম্পু শহর তথা ভূটানকে তাঁর আশীর্বাদে স্নাত করছেন।

 

পদ্মাসনে আসীন বুদ্ধ দোরদেনমা

থিম্পু মারাত্মক শীতল। এখানে-ওখানে বরফ হয়ে আছে চুইয়ে পড়া জল। দোরদেনমা মূর্তির পাদদেশে সারাক্ষণ জোর বাতাস বইছে। বিশাল ক্রিকেট মঠের মতো খোলা উঠোন। কমপ্লেক্স জুড়ে কয়েক ডজন অপূর্ব নারী মূর্তি স্থাপিত। মূল মন্দিরে ঢুকে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল! শত শত বুদ্ধমূর্তি সাজানো সারে সারে। আছে পূজোর আয়োজন। আর আছে ঈশ্বর কেনার আয়োজন! সকল উপাসনালয়েই ঈশ্বর কেনার নির্লজ্জ ব্যবস্থা রাখা হয়। যেই ঈশ্বর সবকিছুর মালিক তাকেই দান করার স্পর্ধা করে ধার্মিক মানুষ। বুদ্ধের মূর্তির হাতে হাতে গুঁজে দেয়া আছে ভক্তদের দানের টাকা। দানবাক্স ভরে উঠেছে দানের অর্থে। ঈশ্বর বেশ বড়লোক হয়ে উঠছেন বৈকি!

 

কমপ্লেক্স জুড়ে রয়েছে কয়েক ডজন অপূর্ব নারী মূর্তি

বিকালের আলো মিলিয়ে যাবার আগেই কাঁপতে কাঁপতে নিচে নেমে এলাম। ক্লক টাওয়ারের উল্টো দিকে একটা হোটেলে রাত কাটানোর ব্যবস্থা হলো। হোটেলের নাম ৮৯। মোটামুটি মানের হোটেল। ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলাম কিছু স্যুভেনির কেনার জন্য। হোটেলের পিছনের দিকে অর্থাৎ ক্লক টাওয়ারের পাশের পথের ধারে সারি সারি স্যুভেনির শপ। দোকান ভেদে একই জিনিসের বিভিন্ন রকম দাম। একটু দামাদামি করাটা ভালো। থিম্পু অন্য টাউনের চেয়ে অনেক বড়। মানুষও চোখে পড়ে বেশ। তবে আমার মনে হলো পথ-ঘাটের অর্ধেক মানুষই টুরিস্ট। বিশাল পাহাড়ের গায়ে খাঁজ কেটে কেটে অট্টালিকা, পথ-ঘাট করা হয়েছে। ধাপে ধাপে মানুষের বসতি। ক্লক টাওয়ারের পাশেই একটা রেস্তোরাঁ কাম বারে রাতের খাবার খেলাম। তেলে ভাঁজা পরাটা ও মুরগির মাংস ছিলো আমার জন্য সবচেয়ে ভালো উপকরণ। দেশি বন্ধুরাও একই খাবার পছন্দ করেছে। খাবারের ফাঁকে রেস্তোরাঁয় কিছু ভুটানিজ তরুণ-তরুণীর সাথে আলাপ হলো। বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা আছে এদের। রেস্তোরাঁর ওয়েট্রেসদের ইঙ্গিত করে দুই তরুণ জানালো যে, এতো ‘হট চিক’ এই রেস্তোরাঁয় আছে তাদের জানা ছিলো না। এখন থেকে নিয়মিত আসবে তারা।

 

এই রেস্তোরাঁর খাবার জুতসই ছিলো

 

যাইহোক, রাতের খাবার শেষ করে আরো দু-তিন ধাপ নেমে একটা বারে এলাম ভুটানিজ বন্ধু রিগ্যালের সাথে। উচ্ছল তরুণ-তরুণীর আড্ডা জমেছে পুরো বার জুড়ে। মৃদু গানের সাথে চলছে পান। এক জুটিকে দেখলাম ঠোঁটে ঠোঁট রেখে প্রেম সুধা ভাগাভাগি করতে। আমার অনভ্যস্ত চোখ চুরি করে দেখছিলো এই রোমান্টিক দৃশ্য। অন্যরা যার যার মতো কথায় আর পানে ব্যস্ত। রাত বারোটার পর বের হয়ে এলাম আমি। ঘুম পাচ্ছিলো খুব। অন্য বন্ধুরা ক্লাবে যাবে ঠিক করলো। রিগ্যাল আমাকে হোটেলে এগিয়ে দিয়ে গেলো। পথে দেখলাম মৃদু মাতাল হওয়ায় তরুণ-তরুণীরা এলোমেলো পায়ে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরছে।

কল্পনায় ভেসে উঠলো আমার শহর ঢাকা। এ দৃশ্য এতো রাতে ঢাকায় চিন্তা করা যায় না। এখানে রাস্তায়, গলিতে, আঁধারে ঘাপটি মেরে থাকে দাঁতাল শুয়োরের দল। সন্ধ্যার পর এখানে অঘোষিত কার্ফিও জারি হয় মেয়েদের জন্য। সন্ধ্যার পর মেয়েরা হয়ে উঠে অবরোধবাসিনী। ঘুমিয়ে পড়া শহর এদের কখনোই দেখা হয় না। রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে খিল খিল করে হাসা হয় না। আরো কত ‘হয় না’ কে জীবনের অংশ করে নিয়েছে আমার বাংলার মেয়েরা।

হোটেলে ফিরে ঈয়েশীকে নক দিলাম ফেসবুকে। জেগে ছিলো ও। জানালাম কাল ফিরছি ওর টাউনে। ঈয়েশী জানালো, সেও অপেক্ষা করে আছে। থার্টি ফার্স্ট নাইটে দেখা হচ্ছে আমাদের। ফোনে ট্যাক্সটিং করতে করতে কখন জানি ঘুমিয়ে গেছি।

সকালে সেই রাতের রেস্তোরাঁয় খেতে গেলাম। সেই একই মেন্যু পছন্দ করলাম। ভুটানিজ বন্ধু রিগ্যাল খেলো ভাত আর এমা দাছি (মিঠা শুকনো মরিচ আর চিজ দিয়ে তৈরি তরকারি)। সুজা ভুটানিদের পছন্দের পানীয়। বাটারের সাথে চা-নুনের মিশ্রণে তৈরি হয় সুজা। আমার রুচি হয়নি চেখে দেখতে। আমি রং চা নিলাম। খাবারের দাম আমাদের শহরের রেস্তোরাঁর মতোই। কিছু ক্ষেত্রে আরো বেশি স্বাস্থ্যকর ও সস্তা মনে হলো। যাইহোক, খাওয়ার পর থিম্পুকে বিদায় জানাতে হলো। পারোর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো। একটা ট্যাক্সি ভাড়া করলাম ৬০০ রুপিতে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বিছানো পথ ধরে ট্যাক্সি চলছে। ট্যাক্সি চালক টুকটাক কথা বলছে। একবার দাঁড়িয়ে দোমা (পান সুপারি) কিনে মুখে পুড়লো। আস্কারা দিতেই সিগারেটও ধরালো। যদিও প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু চলন্ত গাড়িতে নির্জন পথে কে আসছে দণ্ডের খাড়া নিয়ে। বেশ ফুরফুরে মেজাজে দোমা আর সিগারেট টানতে টানতে গাড়ি চালাচ্ছে।

দুপুর নাগাদ পারো পৌঁছে গেলাম। বেশি সময় লাগেনি মোটেই। উজ্জ্বল রোদে ঝকঝক করছে হিমালয় কন্যা। ভ্যালির সমতলে সুনসান পারো টাৗউনে হোটেল বুক করা ছিলো আগে থেকেই। আমাদের আগের দিনের ট্যাক্সি চালকই আমাদের জন্য থিম্পু এবং পারোতে হোটেল বুক করে দিয়েছিলো। খুবই বন্ধুবৎসল মানুষ। আমি ডলার ভাঙিয়ে নিয়েছিলামও তার কাছ থেকে। এবং বেশ ভালো দাম দিয়েছিলো ডলারের।

পারো টাউনের সামদেন নোরজিন হোটেলে উঠলাম। ব্যাগট্যাগ রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে বের হলাম টাউনের দোকান গুলোয় ঢু মারতে। মাঝে ঈয়েশীর সাথে কথা হলো। জানালাম তার অমরাবতীতে এসে গেছি। অপ্সরা যখন ইচ্ছে আবির্ভূত হতে পারে। বিকেলের সোনা সোনা আলোয় ঝকমক করছে পারো টাউন। বছরের শেষ দিন। তরুণ-তরুণীরা টাউনে বের হয়েছে হাত ধরাধরি করে। পারো চূ নদীর উপর ব্রিজে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুলছিলাম। সেখানেই টিনেজার এক জুটির সাথে আলাপ হলো। মেয়েটিকে দেখিয়ে ছেলেটাকে ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করলাম ‘কি হয় সে তোমার?’ সপ্রতিভ ছেলেটি গর্বের সাথে মেয়েটিকে কন্ঠলগ্ন করে বলল, ‘মাই গার্ল’। এক উষ্ণ মমতামাখা ভালোলাগায় বিদ্ধ হচ্ছিলাম আমি। কি জড়ানো প্রেম, কি মমতার প্রস্রবণ চোখে মুখে নতুন প্রেমের বান ডাকা কিশোর-কিশোরীদের!

 

টিনেজার এক জুটির সাথে আলাপ

 

টাউনের একপ্রান্ত থেকে স্যুভেনির শপগুলো দেখতে লাগলাম। প্ল্যানটা হলো একপ্রান্ত শেষ করে উল্টোদিকে গিয়ে অপর প্রান্তের দোকানগুলো দেখবো। তাহলে কোনোটা বাদ পড়বে না। টুকটাক এটা-ওটা কেনা, দোকানির সাথে গল্প করা, নতুন নতুন জিনিস দেখে সময় বেশ কাটছিলো। এক দোকানে দোকানি তরুণী অনেক প্রশ্ন করলো। কি নাম, কি করি, কোথা থেকে এলাম, ক-দিন আছি, কেমন লাগছে ইত্তকার প্রশ্ন তার। তরুণীর চেহারা মঙ্গোলিয়ান নয়। একথা বলতেই সে জানালো সে নেপালি বংশোদ্ভূত ভুটানিজ। সাদা চামড়ার কাপল দোকানে প্রবেশ করতেই তরুণী ওদের সাথে কথা বলতে একটু এগোলো। এই ফাঁকে আমি ছাঁৎ করে দোকান থেকে বের হয়ে এলাম। আরেক দোকানে পুতুলের মতো এক ভুটানিজ বাচ্চাকে দেখলাম আমার দিকে টুলটুল করে তাকিয়েই আছে। হাত বাড়ালাম। সে মায়ের কোল থেকে ঝাঁপ দিলো আমার কাছে। ওকে কোলে নিয়ে পুরো দোকান ঘুরলাম। বের হওয়ার সময় ওর মায়ের কাছে ফেরত দিতে গেলাম। কিন্তু ও ওর মায়ের কাছে যেতে নারাজ।

ভুটানি মেয়েরা হাসাহাসি করলো ওদের ভাষায় কি যেনো বলে। আমি আমার নতুন ফ্যানকে কোলে নিয়েই পাশের দোকানে গেলাম। এভাবে আরো তিন চার দোকান ও আমার কোলেই থাকলো। ওর মা আমার সাথে সাথে হাঁটলো। তারপর খানিকটা জোর করেই ওকে ওর মা নিয়ে গেলো। বাচ্চাটার প্রতি কেমন জানি মায়া জন্মে গিয়েছিলো ক্ষণিকের এই সম্পর্কে। ওর গায়ের উষ্ণতা আমার গায়ে মিলিয়েছে। আমার গায়ের উষ্ণতা মিলিয়ে গেছে ওর ছোট্ট দেহে।

মাঝে দেখা হয়ে গেলো ভ্রমণসঙ্গী তানভীর আর তারেকের সাথে। ওদের সাথে ছিলো দু-দিন আগে পরিচিত হওয়া আরো তিন ভুটানি তরুণী। ওদের নাম তেনজি সামায়া, তেনজি চোদেন দ্রুকপা ও শেরিং (Tshering)। একটা রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা জমানো গেলো। ওদের পাঁচজনের নামের আদ্যাক্ষর T কিন্তু আমার নাম N শুরু দিয়ে। আমি ঘোষণা দিলাম ‘আজ থেকে আমার নাম Tnaba’ । তেনজি চোদেন বললো, “তোমাকে একটা ভূটানিজ নাম দেয়া যায় যেটায় T আছে।” আমি সানন্দে মেনে নিলাম। তেনজি চোদেন আমার নাম দিলো তোবগে। সন্ধ্যাটাকে আরো গাঢ় করে দিয়ে আমাদের আড্ডার সমাপ্তি ঘটলো। খুব খোলা মনের মানুষ এঁরা। ঠান্ডায় হাত-পায়ে ব্যাথা করছিলো। দ্রুত হোটেলে ফিরতে হলো। ঈয়েশী আসবে একটু পর। লবিতে বসে রইলাম ওর জন্য।

ঈয়েশীকে খুব সুন্দর লাগছিলো। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে জেসমিনের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পাশে এসে বসলো অপ্সরা। ওর নরোম ফর্সা হাতটা আমার হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছো?’। জবাবে আরো একটু স্ফিত হলো হাসি। কি কি গল্প হয়েছিলো, কতক্ষণ বসে ছিলাম কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে ঈয়েশীর পেলব হাত বুক মার্কারের মতো অনড় হয়ে পড়েছিলো আমার দু-হাতের ভাঁজে। আর মনে পড়ে জেসমিনের ঘ্রাণ। রাত বারোটায় ও আমায় বললো, “হ্যাপি নিউ ইয়ার”। আমিও শুভেচ্ছা জানালাম। ওর যাবার সময় হলো। উঠে দাঁড়ালো ঈয়েশী। আমি ওকে কাছে টেনে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। ঈয়েশী আমার চোখে চোখ রেখে একটু হাসলো। তারপর আমার ঠোঁটে ঠোঁট নামিয়ে নিয়ে এলো। আমি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম ঈয়েশীকে। মুহূর্তে মনে হলো কোথাও কিছু নেই, কেউ নেই। পারো টাউন নেই। নেই উঁচু পাহাড়-পর্বত। নেই হিমেল বাতাস। নৈশব্দ মোড়ানো কোনো ভিন গ্রহে থমকে থাকা সময়ে আমরা দুটি মানব-মানবী ছাড়া আর কিছু নেই। সব মিথ্যে। শুধু সত্য আমাদের অস্তিত্ব। বিদ্যুতের প্রখর শকে অনড় করে রেখে ঈয়েশী চলে গেলো। আমার পা নড়ছিলো না। জেসমিনের ঘ্রাণ মিলিয়ে গেলো ক্রমশ। ঈয়েশীকে স্বপ্নের ভিতর স্বপ্নে ঢুকিয়ে রেখে ঘুমোতে গেলাম। শেষরাতে আবার উড়াল দিতে হবে। বাংলাদেশ ডাকছে।

 

চলবে……………