ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

গত কয়েক বছর ধরে ঢাকায় এক পশলা বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যেতে দেখা যায়। পানি সরতে প্রচুর সময় নেয়। জমে থাকা পানিতে বিকল হয়ে পথ রোধ করে পড়ে থাকে যানবাহন। ঢাকায় বৃষ্টি হওয়া মানেই অবধারিতভাবে ভয়ংকর ও দুঃসহ জ্যাম লেগে যাওয়া।

বৃষ্টির পর নাগরিকগণ সরকার, রাজনীতিক, মেয়রকে একচোট দেখে নেন। বর্ষার আগে কেন নালা পরিষ্কার করা হয় না? বর্ষায় কেন পথে-ঘাটে খোঁড়াখুঁড়ি? এসব প্রশ্নে মনের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করেন অনেকেই। কিন্তু  এতে জলাবদ্ধতা কমে না। বরং নাগরিকদের পলিশ করা জুতো, ইস্ত্রি করা প্যান্ট-পাজামা ভিজেই যায়।

অলিগলির নালাগুলোর চেহারা ঠিক এমন

নগরপ্রধান নয়, নাগরিকদের কাছেই আমার বিনীত প্রশ্ন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য নালাগুলো ময়লায় ভর্তি কেন? বোতল, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, বিস্কুট-চানাচুরের প্যাকেট, চকলেট-চুইংগামের খোসা, তরকারির উচ্ছিষ্ট, ন্যাকড়া, বাচ্চার মলসহ ডায়াপার, জন্ম নিরোধকের খোসা ইত্যাদি বর্জ্য ফেলে কারা নালাগুলো ভরিয়ে তুলেছে- সরকার, মেয়র, নাকি রাজনীতিকেরা?


উল্টো করে বেঁধে রাখা ডাস্টবিন, ময়লা ফেলা থেকে বিরত রাখতে কি চমৎকার চেষ্টা!

রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণের মেয়রগণ পুরো রাজধানী জুড়ে ছোট ছোট ডাস্টবিন স্থাপন করেছিলেন। চমৎকার এই উদ্যোগকে আমরা  সুসভ্য নাগরিকেরা কী করেছি? সেগুলো উল্টে বেঁধে রেখেছি, যাতে কেউ ময়লা ফেলতে না পারে। ‘রাতজাগা সম্মানিতগণ’ কিছু ডাস্টবিন গোড়া থেকে কেটে নিয়ে গেছেন। কিছু এলাকায় ফুটপাথ পুনর্গঠন করতে গিয়ে ডাস্টবিনগুলো উধাও হয়ে গেছে।

আমার চলাচলের রাস্তা ইত্তেফাকের মোড় থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দু-দিকের ফুটপাথে একটি মাত্র ডাস্টবিন আছে অবশিষ্ট। সেটাও মতিঝিলের ফলের দোকানের অংশ হয়ে গেছে। মতিঝিল থেকে কাকরাইল যেতে শুধু নটরডেম কলেজের সামনে দুটো ডাস্টবিন আছে, একটু এগিয়ে গেলে উল্টানো একটার অস্তিত্ব আছে। লাগোয়া পানের দোকানি উল্টে বেঁধে দিয়েছেন।

এরপর কাকরাইল মোড় পর্যন্ত পথের দু-ধারে কোনো ডাস্টবিনের অস্তিত্ব নেই। উধাও। যত্রতত্র ময়লা ফেলে ফেলে নালাগুলো ভর্তি করে ফেলছি আমরাই। নাগরিকদের কি কোনো দায় নেই? পানি চলাচলের রাস্তাগুলো ভরাট করে বৃষ্টির পর আমরাই খিস্তি শুরু করে দেই। এভাবেই চলছে। এভাবেই চলবে হয়তো।

মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ডাস্টবিনটির ফ্রেমখানা আছে, ঝুড়ি উধাও

খুব লজ্জা লাগে বিদেশের মাটিতে গেলে। কেউ কোথাও এক টুকরো ময়লা ফেলে না। নিজেরদের ভালো-মন্দ নিজেরা বোঝে ওরা। ঢাকার প্রতিটা বিল্ডিংয়ের চারপাশ দিয়ে ঘুরে আসলে বুঝতে পারবেন কতটা সচেতন মানুষ এই অট্টালিকাগুলোয় বসবাস করেন। জানালা দিয়ে প্রতিনিয়ত ময়লা ফেলে বিল্ডিংয়ের চারপাশ উঁচু করে ফেলেছেন।

হাজার হাজার ডাস্টবিন বসিয়ে নগরপ্রধানরা ব্যর্থ হয়েছেন নাগরিক অসচেতনায়।  আমার আকুল আবেদন, স্কুল-কলেজ থেকে বাচ্চাদেরকে ময়লা -আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলার উপর জোর দিন। ওদেরকে বুঝতে দিন যে নিজেরা সচেতন না হলে এই তিলোত্তমা ছেড়ে একদিন পালাতে হবে। আশা করা যায়, এই প্রশিক্ষিত প্রজন্ম থেকেই এই শিক্ষার সুফল পাওয়া যাবে।

আমি যেই বাড়িতে থাকি তার অধিবাসীরা সারাদিন জানালা দিয়ে আবর্জনা ফেলতেই থাকেন

গত বইমেলায় এক প্রান্তে দুটো খাবারের দোকান বসেছিলো। আমি এবং আমার এক কলিগ কফি নিয়ে চুমুক দিতে দিতে গল্প করছিলাম। পাশে আরো ছোট ছোট দলে আড্ডা দিচ্ছিলো অনেকে। সবার হাতেই কফির ওয়ান টাইম কাপ। ওখানে একটা ডাস্টবিন থাকলেও কফি শেষ করে বলতে গেলে সকলেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কফির কাপ ফেলছিলেন। আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই আমার কলিগ নিজে গিয়ে সব কাপ কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেললো। একটু পর দেখলাম দুয়েকজন ডাস্টবিনেই কাপ ফেলছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলে আমাদের চলে না। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাই’- এভাবেই হয়তো কিছুটা পরিবর্তন আসবে।

সঠিক স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে শহরের নালাগুলো পরিষ্কার থাকবে, পথ-ঘাট পরিষ্কার থাকবে। তুমুল বৃষ্টি হলেও ঢাকা নগরী ডুবে যাবে না নিশ্চিত।