ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন চলছে তা নিয়ে অনেকের মনেই ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। প্রথমেই মনে রাখা দরকার – এই আন্দোলন কোটাপ্রথা পুরোপুরি বন্ধের জন্য চলছে না, এটি মূলত যে অযৌক্তিক কোটা ব্যবস্থা বাংলাদেশে প্রচলিত আছে তা সংস্কারের জন্য চলছে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রযোজ্য হয়। বাকি ৪৪ শতাংশ থাকে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য। ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে রয়েছে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা,  ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৫ শতাংশ উপজাতি কোটা  এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা।

চাকরিপ্রার্থীদের একটি ক্ষুদ্র অংশের জন্য কোটার পরিমাণ অবশ্যই বিশাল এবং অযৌক্তিক। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে – চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী কোটা ব্যাবস্থায় ভারসম্য আনয়ন করা।

“বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ” এর ব্যানারে যে পাঁচটি বিষয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে সেগুলো হল –

  • কোটার পরিমাণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে ৩০ শতাংশই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ। এটিকেও একটি সহনীয় মাত্রায় আনতে হবে।
  • কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া।
  • সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরীর বয়সসীমা ৩২ কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০, এক্ষেত্রেও ভারসাম্য আনা।
  • কোটায় কোনও ধরণের বিশেষ নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকরির জন্য আবেদনই করতে পারেন না, কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় কোটাধারীদের জন্যই এ বিশেষ সুবিধা।
  • চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।

উপর্যুক্ত পাঁচটি বিষয় লক্ষ্য করুন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই চরম মুহূর্তেও যারা মুখে মুখে, গণমাধ্যমে, সোশ্যাল মিডিয়ায় নানাভাবে বিরুদ্ধাচরণ করছেন তারা ভেবে দেখুন – সত্যিকারভাবে দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্দোলনের দাবীগুলো বিরুদ্ধপক্ষে যায় কিনা!

দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য যোগ্য এবং মেধাবী কর্মকর্তাদের প্রয়োজন। বিশেষ সুবিধায় কাউকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল করলে দেশের কতটুকু কাজে লাগবে তা হর্তাকর্তারা ভেবে দেখেন – এটা বিশ্বাস করা বেশ দুরূহ।

দুই লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য চালু আছে ৩০ শতাংশ কোটা। এই কোটা ব্যাবস্থায় নিয়োগ হলে কীভাবে আশা করা যায় যে দেশ শুধু দক্ষ এবং মেধাবীদেরই পাবে? একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারীদের সকলে মেধাবী হবে এমনটি আশা করা বোকামি। কিন্তু সকলেই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে আসলে সেখানে মেধাবীদের বিচরণ করার ক্ষমতা থাকে বেশি। কোটা ব্যবস্থা যদি দেশের সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে রাখতেই হয়, সেটাও রাখা দরকার সহনীয় মাত্রায় আর তা অবশ্যই ১০ শতাংশের বেশি নয়।

চাকরির বৃহদাংশ কোটার দখলে যাওয়ার পরও আরো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় রয়েছে যেগুলো সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের হতাশা আর ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। এর মধ্যে রয়েছে – মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরীর বয়সসীমা ৩২ বহাল রাখা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পাশাপাশি নাতিনাতনিদের কোটার অন্তর্ভুক্ত করা এবং শুধু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা করা।

একটি স্বাধীন দেশের জনগণ হিসেবে সকলের সমঅধিকার পাওয়ার কথা, কিন্তু কোটা ব্যাবস্থা দেখলে জনগণের অধিকারের সমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অতি নগণ্য সংখ্যক মানুষ কয়েকগুণ বেশি সুবিধা পাচ্ছে চাকরির ক্ষেত্রে। বিশেষ নিয়োগ তো সাধারণদের পুরোপুরি বঞ্চিত করে করা হয়ে থাকে। বিসিএস-এর পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ব্যংকেও এ ধরনের নিয়োগ হয়ে থাকে। প্রশ্ন উঠতেই পারে – মুক্তিযোদ্ধাদের এতো এতো মেধাবী সন্তান? যাদের কোটা দিয়ে, আবেদনের বয়সসীমা বাড়িয়ে, নাতিনাতনিদের কোটার অন্তর্ভুক্ত করে এবং বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা করে হলেও নিয়োগ দিতেই হবে?

সরকারের ইচ্ছে যদি হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা, তাহলে তো তা অন্যভাবেও করা যায়। প্রশাসনকে মেধাশুন্য করে তো করার দরকার নেই। যদি চাকরিতে তাঁদের নিয়োগের ব্যাবস্থা করা তাঁদেরকে সম্মানিত করার একটি উপায় হয়ে থাকে, তাহলে তাদের জন্য নির্ধারিত কোটার পরিমাণ কমিয়ে আনাও জরুরী। বর্তমান অবস্থায় কোটার পরিমাণ বহাল রাখা মানে জাতির বৃহদাংশকে অবমূল্যায়ন করা। যে অবমূল্যায়ন দেশের সূর্যসন্তানরাও কখনো চাইতে পারেন না।

কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের মধ্যেও আলোচনা চলছে এবং পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা আসছে। তবে লক্ষ্য করা যায় বেশিরভাগ দেশপ্রেমী, যুক্তিযুক্ত মানুষ কোটা সংস্কারের পক্ষেই রয়েছেন। নানা পরিসংখ্যানে, এমনকি সাধারণ জনগনের চোখেও এটাই স্পষ্ট যে – মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল রেখে প্রকৃত মেধাবীদের সরকার এবং প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করা অবশ্যই কঠিন। যৌক্তিক প্রতিযোগিতার ব্যাবস্থা না থাকলে দেশের জন্য মেধাবীদের কাজে লাগানোও যাবে না।

৮ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ এর ব্যানারে আয়োজিত পদযাত্রা এবং এর পরবর্তী কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিলো। মাইকে ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিলো – যেন কোনভাবেই এটি সহিংস রূপ না পায়। মিডিয়াতে এটাও দেখা গেছে যে, পুলিশ বাঁধা দিতে আসলে আন্দোলনরতরা তাদের দিকে ফুল ছুঁড়িয়ে দিয়েছে। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত সামগ্রিক চিত্র ছিল শান্তিপূর্ণ, কিন্তু এরপরেই চিত্র পাল্টাতে থাকে।

শুরু হয় সংঘর্ষ এবং তা প্রায় সারারাতব্যাপী দফায় দফায় চলতে থাকে। এ সংঘর্ষ শুধু আন্দোলনরত এবং পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না, বিভিন্ন পত্রিকায় কিছু দলীয় ছাত্র সংগঠনের নামও এসেছে। আমাদের দেশে যেরকমটি অতীতেও হয়েছে, একে অন্যকে দোষ দিয়ে বৃহত্তর স্বার্থকে আড়াল করে রাখা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর হয়েছে যা কখনোই কাম্য নয়, এর অবশ্যই তদন্ত প্রয়োজন। এ ধরণের ঘটনা মূল উদ্দেশ্য থেকে আন্দোলনকে দূরে সরিয়ে রাখে। সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান আসলো মধ্যরাতে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আরো আগেই যদি আলোচনা করা যেত, তাহলে ৮ এপ্রিল রাতের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতো না।

দেশ অগ্রসর হচ্ছে, চারদিকে উন্নয়নের নানাচিত্র পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু দেশের তরুণ সমাজকে বঞ্চিত রেখে সেই উন্নয়ন কতটুকু স্থায়ী হবে তা ভেবে দেখার বিষয়। মনে রাখতে হবে – কোটার অন্তর্ভূক্ত তরুণেরা মোট জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। শুধু তাদের সন্তুষ্টি, সমর্থন এবং মেধার প্রয়োগ দেশকে গতিশীল করতে পারে না। কোটা সংস্কারের মাধ্যমেই দেশের উন্নয়নে সকলের সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব আর তখনই দেশ টেঁকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে।