ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে এখন দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা। যদিও অনেক সাধারণ মানুষই জানেন না, কী এবং কেন এই বাঁধ? সীমান্তের একশ কিলোমিটার উজানে ভারতের বরাক নদীর ওপর নির্মিতব্য একটি প্রকল্প এটি। মনিপুর রাজ্যের টিপাইমুখ নামে একটি গ্রামে বরাক ও টুইভার নদীর মিলনস্থলে বাঁধটি দেওয়া হচ্ছে। এর উচ্চতা হবে পাঁচশ ফুট। দৈর্ঘ্য এক হাজার ছয়শ ফুট। লক্ষ্য এক হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ। অভিন্ন নদীর উজানে এই বাঁধ শুধু বাংলাদেশই নয় ভারতেরও বিস্তৃর্ণ এলাকার পরিবেশ ও অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়ে আসছেন দুই দেশেরই বিশেষজ্ঞরা। এরপরও কেন এই প্রকল্প?

মানচিত্র টিপাইমুখ বাঁধ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সৌজন্যে

বাংলাদেশের চাপের মুখে মাঝখানে এ বাঁধ নিয়ে তেমন কোনো কথা শোনা যায়নি। বলতে গেলে হঠাৎই ভারত বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়া দ্রুততর করেছে। লক্ষ্যনীয়, সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সফরে দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বদলে গরম হয়েছে। কারণটি সবারই জানা, তিস্তা চুক্তি শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেছে, অন্যদিকে ভারতের বহুল প্রত্যাশিত ট্রানজিট প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পিছুটান নিয়েছে। বাংলাদেশের এমন অবস্থান সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারত সহজভাবে নিয়েছে, এমনটি না ভাবাই সঙ্গত। টিপাইমুখ বাঁধের সঙ্গে ট্রানজিটের যোগসূত্র থাকা অমূলক নয়। এই বাঁধের প্রক্রিয়া এগিয়ে ভারত ট্রানজিট প্রসঙ্গে চোখ রাঙানি দিল কিনা, তা ভেবে দেখার বিষয়। কারণ বাংলাদেশকে শায়েস্তা করার জন্য এর থেকে বড় অস্ত্র এই মুহুর্তে আর কিছুই হতে পারে না।

যদি সত্যিই এই বাঁধ নির্মাণ করতে ভারত সক্ষম হয়, তাহলে কী ঘটবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ! কিন্তু ‘ভয়াবহ’ শব্দ দিয়ে এই বাঁধের ভয়াবহতা পরিমাপ করা যাবে কি?

পাঠক খেয়াল করুন, বরাক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী মেঘনার সঙ্গে যুক্ত। সুরমা, কুশিয়ারা, কালনী ও মেঘনা নামে এটি বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। সুরমা বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদীও (৩৯৯ কিলোমিটার)। তাই বরাক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উজান থেকে আসা পানির মোট সাত-আট ভাগ আসে বরাক থেকে। মৎস্য সম্পদ আহরণ ও চাষাবাদের জন্য বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ বরাক নদীর পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাঁধ নির্মিাত হলে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় প্লাবনভূমির পরিমাণ ষাট ভাগ ও ভরা মৌসুমে অন্তত বাইশ ভাগ কমে যাবে। বিস্তৃর্ণ অববাহিকার ২৭৫.৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয় নেমে আসবে। ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, প্রাণীবৈচিত্র সবকিছুর উপর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী কুফল দেখা দেবে। বাঁধ পরিচালনার আগে যখন রিজারভারটি পূর্ণ করা হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভাটিতে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হবে। যা এই অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করবে। মৎস্য প্রজননে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের অন্তত চারটি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এগুলো হচ্ছে, আপার সুরমা-কুশিয়ারা রিভার প্রজেক্ট, সুরমা রাইট ব্যাংক প্রজেক্ট, সুরমা-কুশিয়ারা-বাউলাই বেসিন প্রজেক্ট এবং কুশিয়ারা বিঝনা ইন্টারবেসিন প্রজেক্ট। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পাঁচ কোটি মানুষ টিপাইমুখ বাঁধের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. জহির উদ্দীন চৌধুরী ২০০৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ড্যাম তৈরি হলে প্রথম বছরের ক্ষতিটা আমাদের জন্য বেশ মারত্মক হবে। কারণ প্রথম দিকে পানি ধরে রাখতে হবে। তখন বাংলাদেশে পানিপ্রবাহ একেবারেই কমে যেতে পারে। বাঁধ নির্মাণের পর প্রথম বছরই যদি ভারত পুরো পানির রিজার্ভ গড়ে তুলতে চায়, তাহলে পুরো পানিপ্রবাহ আটকে দিতে হবে। আর প্রথম বছর যদি এ ধরনের কিছু হয়, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটাও মারাত্মক হবে।’

শুধু ভাটির বাংলাদেশই নয়। খোদ ভারতেও ২৭,২৪২ হেক্টর বনভূমি নষ্ট হবে। আসাম, মণিপুর ও মিজোরামের ৩১১ বর্গকিলোমিটার ভূমি প্লাবিত হবে। আদিবাসী অধ্যুষিত ওই এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হবেন। হামর আর নাগা আদিবাসীদের ৬৭টি গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানিয়েছেন, এ বাঁধ নির্মিত হলে সাত মাত্রার ভূমিকম্পে দুইশ বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।

এখন আন্তর্জাতিক আইন কী বলে? টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণে ভারতের বৈধতা আছে কি? আইন বলছে, কোনো দেশ অভিন্ন নদীর উজানে কাঠামো নির্মাণ করতে চাইলে অবশ্যই এর ভাটিতে বসবাসকারী জনপদের ওপর বিরূপ প্রভাবের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। দুঃখের বিষয়, দীর্ঘ দিনেও এ বাঁধ নির্মাণের ফলে সম্ভাব্য প্রভাবের চিত্র কোনো গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে আসেনি।

ফিরে দেখা যাক আরও আগে। বরাক নদীতে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবটি কার্যত ১৯৫৫ সালের। বহু প্রক্রিয়ার পর নির্মাণ শুরুর প্রস্তাবটি আসে ১৯৯৩ সালের দিকে। কিন্তু ভারতের কিছু অঞ্চলসহ বাংলাদেশের নদী-প্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাবের কথা আলোচিত হওয়ায় প্রস্তাবটির গতি কিছুটা স্তিমিত হয়।
এক কালে বাংলাদেশে নদনদীর সংখ্যা ছিল হাজারেরও বেশি। কমতে কমতে তা এখন শাখা-প্রশাখাসহ দুই শো ত্রিশটিতে এসে দাড়িয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী চুয়ান্নটি। ভয়াবহ পানি শূন্যতার ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে। পলি জমে পচানব্বইটি বিলুপ্তির পথে। আরও বেয়াল্লিশটি পলি সঞ্চয়ের দরুন চরের চাপে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। একদিকে উজানে পানি প্রত্যাহার, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে দখলবাজি, ভরাট এবং অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মাণের কারণে অধিকাংশ নদীবক্ষ প্রথমে নাব্যতাহীন, অতঃপর পানিশূন্য হয়ে বালুচরে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থায় টিপাইমুখে বাঁধ আমাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের নিস্ক্রিয়তা নিচু স্তরের নিবুর্দ্ধিতার মধ্যেও ফেলা যাবে না। মুর্খতার প্রধান নমুন হলো, ভারত যা বলছে, সরকারের পক্ষ থেকেও তা-ই বলা হচ্ছে। ‘বাংলাদেশের ক্ষতি হয়’ এমন কিছুই করবে না ভারত! বেকুব বানানোর জন্য এর থেকে মোক্ষম আশ্বাস আর কিছুই হতে পারে না। কেন? দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে যখন, সীমান্ত হত্যার আলোচনা চলছে, তখনই সীমান্তে দুই জনকে পাখির মতো শিকার করলো বিএসএফ। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে আশ্বাস দেওয়া হলো সীমান্তে হত্যা করা হবে না। কিন্তু ওই বৈঠকের দিনেই সীমান্তে মানুষ মরল। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কথা উঠলো; পিটিয়ে, পাথরা ছুড়ে হত্যা শুরু হলো। আরও আগে ফিরে যাওয়া যাক। সেই আরেকটি মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৭৪ সালে বলা হলো, বাঁধটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হচ্ছে। কিন্তু এর ভয়াবহতার কথা ‘ইতিহাসে’ পরিণত হয়েছে।

ভারতের আশ্বাস এখন যুগ সেরা প্রতারণা। তাদের ‘কূট’ নীতির সাম্প্রতিক আরও একটি নমুনা তিস্তা চুক্তি। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা আমাদের মুর্খতার স্বরূপ উম্মোচন করেছে। দিদি ভারতেরই নেত্রী। তাই তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, তার দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করে তিস্তায় পানি থাকলে বাংলাদেশ পানি পাবে। অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে কারও একার স্বার্থ নিশ্চিতের পর পানি বণ্টন বৈধ কি? বাংলাদেশ তেমন কিছুই বললো না। শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে গিয়ে ‘সুপার মডেলের’ মতো ফটোসেশন করে এলেন। প্রশ্ন জাগে, মমতা যখন বলছেন, তিস্তায় পানি নেই। তখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কী বললেন? তিস্তায় পানি আছে কি নেই এ কথা মমতার কাছ থেকে বিশ্বাস করতে হবে কেন? কেন আমাদের সমীক্ষা থাকবে না? মমতার মুখের ওপর কেন আমরা বলতে পারলাম না, তিস্তায় এই পরিমাণ পানি আছে। যার এত পরিমাণ বাংলাদেশ আইনত পাবে।

টিপাইমুখ বাঁধের মতো ফারাক্কা নিয়েও আমাদের চরম মুর্খতা ও উদাসীনতা ছিল। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার প্রধানরা এক যৌথ ঘোষণা দেন। সেখানে তারা বলেন, ‘গঙ্গায় কম পানি প্রবাহেরকালে সঠিক পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তি করা হবে। ওই বছরই এক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, দুই দেশ একটি চুক্তিতে আসার আগে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে না। ভারত কথা রাখেনি। পানি প্রত্যাহার শুরু করে। ১৯৭৫ সালে দশ (২১ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে ২১ মে ১৯৭৫) দিনের জন্য ভারতকে গঙ্গা থেকে ৩১০-৪৫০ কিউসেক পানি অপসারণের অনুমতি দেয় বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত ১১৩০ কিউসেক পানি অপসারণ করে পশ্চিমবঙ্গের ভাগরথি-হুগলি নদীতে সরবরাহ করে। একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যেগ নেওয়া হয় ১৯৭৬ সালে। ভারতকে পানি অপসারণে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। সাধারণ পরিষদ ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহার পরামর্শ দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। বেশ কয়েকবার বৈঠকের পর ১৯৭৭ সালের ২৬ নভেম্বর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।’

টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ভারত অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশের চুপ করে বসে থাকা হবে, টাইমবোমা সেট করে বিস্ফোরণের অপেক্ষা করার মতোই। এ নিয়ে বাংলাদেশকে শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, সামগ্রিকভাবে তৎপর হতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে সুরাহা করা যায় কিনা তা-ও ভাবার সময় এসেছে। কারণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকে এখন প্রতিবেশি নয়, বরং কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ মনে হয়। ভৌগলিক অবস্থানের ‘দুর্বলতার’ বিষয়টি মাথায় রেখেও বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। বাঁধ সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথার বাইরে গিয়ে মনমোহনকে চিঠি দিয়েছেন। সরকারকে সহযোগিতার কথাও বলেছেন। তার এই ‘উদ্যোগ ও উদ্বেগ’ কতখানি রাজনৈতিক কৌশলগত, সেই বিতর্কে না গিয়ে বরং ইতিবাচকভাবেই নেওয়া হোক। প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দূত পাঠানোর কথা বলেছেন। মোটকথা দলমত নির্বিশেষে এই বাঁধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আশার বিষয়, ভারতেও ক্ষতির মুখে পড়া বিপুল জনগোষ্ঠী এ বাঁধের বিরুদ্ধে। উত্তর-পূর্ব ভারত এরই মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মণিপুর, আসাম ও মিজোরাম রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নিজেদের মধ্যে বুধবার বৈঠক করেছে। সেখানকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের একাত্ম হয়ে এই বাঁধ ঠেকাতে হবে। ভারতের সচেতন ও বিশিষ্ট নাগরিকদেরও তার সরকারের ভুল সিদ্ধাদ্ধ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে হবে। আহব্বান জানাতে হবে প্রতিবাদ করার।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট।