ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

বাংলাদেশে ক্রিকেটের ইতিহাস অনেক পুরাতন। এখানে ফুটবলের মত ক্রিকেটের ও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। মূলত ইংরেজ শাসকদের হাত ধরেই এদেশে ফুটবল, ক্রিকেট সহ অন্যান্য পশ্চিমা খেলার চল শুরু হয়। তখনকার বৃহত্তর বাংলার কলকাতাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়, যেগুলো দক্ষিন এশিয়ার সবচেয়ে পুরানো ক্লাব। কালক্রমে ফুটবল পুর্ববাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও ক্রিকেট জনপ্রিয় হতে অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক দিন। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে উপমহাদেশের প্রথম সিভিল ক্লাবটি গঠিত হয়েছিল সম্ভবত পূর্ববাংলার বাঙ্গালীদের হাতে। কয়েকদিন আগে দৈনিক প্রথম আলোয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হয়, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায়ের পিতামহ সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী ১৮৭০ সালে মাত্র আট বিছর বয়সে তাঁর চার ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে প্রথম ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। এখন জানা যাচ্ছে, তিনিই বাংলায় ক্রিকেট খেলার জনক, উপমহাদেশেও অগ্রদূত। তাঁর জন্ম কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মশুয়া গ্রামে, বিখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারে। এক হাতে বই, আরেকটায় ব্যাট। সারদারঞ্জন রায়চৌধুরীর পরিচিত ব্যক্তিরা এভাবেই তাঁর পরিচয় দিতেন। কবে যে কার কাছে ক্রিকেট শিখেছিলেন, তা এখন অজানা। তবে বাংলায় ক্রিকেট খেলার প্রচলন তিনিই করেছিলেন। সাদা দাড়ি ও মারকুটে ব্যাটিংয়ের কারণে তাঁকে বলা হতো বাঙালি ডব্লিউজি গ্রেস (কিংবদন্তি ব্রিটিশ ক্রিকেটার)।

সেসময় কলকাতায় ক্রিকেট খেলার প্রচলন থাকলেও তা খেলতান মূলত ইংরেজরা। সারদারঞ্জন লিখেছেন, ‘ঢাকার কলেজের সাহেব প্রফেসরগণ এ বিষয়ে (ক্রিকেট) খুব উৎসাহী হইয়া ছেলেদের শিক্ষা দিতেন। এখনো বাঙ্গালী ছেলেদের মধ্যে যাঁহারা এ খেলার প্রশংসা লাভ করিয়াছেন, তাহাদের অধিকাংশ ঢাকার। ১১ বছর হইল পূর্ববঙ্গের ছেলেরাই প্রথম কলিকাতা শহরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ক্লাব খুলিয়া খেলা আরম্ভ করেন।’

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের মতে, ঢাকায় ক্রিকেট জোরদার হয় ‘ঢাকা কলেজ ক্লাব’ গড়ে ওঠার পর। ছাত্র-শিক্ষকেরা মিলে এটি গঠন করেন আনুমানিক ১৮৮০-এর দশকে। অখণ্ড বঙ্গের প্রথম ক্রিকেট ক্লাব হিসেবে সেটি খ্যাতি অর্জন করে। ১৮৮৪ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ক্যালকাটা প্রেসিডেন্সি ক্লাবের সঙ্গে এক খেলায় ঢাকা কলেজ জয়লাভ করে। নেতৃত্বে ছিলেন সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী। (সুত্রঃ প্র.আ)

সারসংক্ষেপে এই হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আদি ইতিহাস। বাঙ্গালিরা উপমহাদেশে ফুটবল ও ক্রিকেটের অগ্রপথিক হলেও পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলা ও বাঙ্গালির একমাত্র অভয়ারণ্য বাংলাদেশেরকে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছতে অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক বছর। মুলত ফুটবলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ক্রিকেটকে ছায়া হয়ে থাকতে বাধ্য করেছিল। তথাপি এদেশে ক্রিকেটের প্রসারের যথেষ্ট সুযোগ ছিল, কিন্তু ১৯৪৭ এর পর ক্রিকেটে পশ্চিল পাকিস্তানিদের ব্যাপক প্রভাব, পাকিস্তান আমলের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে উত্তাল আন্দোলন সংগ্রাম অবশেষে মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি কারনে সে সময় ক্রিকেট সেভাবে বিকশিত হয়নি, তারপরও ১৯৭১ এ তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় দলে রকিবুল হাসানের অন্তর্ভুক্তি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে, বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর আমাদেরকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি, এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে চলা। যদিও এই পথ চলা মসৃণ ছিল না, তথাপি জাতীয় পর্যায়ে অনেক ব্যর্থতা ও হতাশার মধ্যেও ক্রিকেট পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, আশার আলো দেখিয়েছে, অনুপ্রানিত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর আয়োজন করা হয় দেশের প্রথম টি টোয়েন্টি আসর বিপিএল। প্রথম আসরে অনেক বিতর্কিত বিষয় থাকলেও দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও দেশী-বিদেশী ক্রিকেটারদের ভাল পারফরম্যান্স এই টুর্নামেন্টকে একটি কার্যকর ও সফল আয়োজনে পরিনত করে। বিপিএল এর এই ঈর্ষনীয় সাফল্যে দেখে অনেকে একে আইপিলের প্রতিদ্বন্দী আসর হিসেবে মনে করেন যদিও আইপিএল এ টাকার ছড়াছড়ি অনেক বেশী। অন্যদিকে দর্শক না আসার কারনে শ্রীলঙ্কার এসএলপিএল ততটা সমাদৃত হয়নি। অন্যদিকে বিপিএল এর মত একটি প্রতিদ্বন্দিতাপুর্ন আসরের পর আমাদের ক্রিকেটাররা এশিয়া কাপে নজর কাড়া প্যারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হয়। কিন্তু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিস্বার্থের বলি হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট ও বিপিএল এ একটি সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। তিনি আর কেঊ নন সরকার দলীয় এমপি, শেয়ারবাজার কেলেংকারীর অন্যতম মহানায়ক মোস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল। যাকে সরকারের তরফ থেকে বিসিবির বোর্ড প্রেসিডেন্ট মনোনিত করা হয়। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তিনি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ ক্রিকেটে। শেয়ার বাজার ধসিয়ে আসার পর জনাব লোটাস কামালের সাধ জাগে তিনি আরো বড় হতে চান। তাই তিনি আইসিসির সহ সভাপতি হওয়ার খায়েশ পোষণ করেন। হয়ত নেত্রীরও এ ব্যাপারে গ্রীন সিগনাল ছিল। কিন্তু এটা তো শেয়ার বাজার নয় যে চাইলেই যা খুশি পাওয়া যায়, বা এটা ছেলের হাতের মোয়াও নয়। শেষ পর্যন্ত সংকটাপন্ন পাক বোর্ডকে তিনি কাগজে কলমে পাকা কথা দিয়ে তারপর তাদের সমর্থন নিয়ে আরাধ্য সহ সভাপতির পদটি বাগাতে সক্ষম হন। এখানে বলা বাহুল্য যে সব বোর্ডই তাদের নজ নজ স্বার্থটাকেই বড় করে দ্যাখে। ভারত যদি বাংলাদেশ কে আমন্ত্রন করে তবে সেটা কখনই বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতির জন্য চিন্তা করে করবে না, বরং বাংলাদেশ আসলে স্পন্সরশিপ এবং দর্শকসমাগম সবমিলিয়ে বোর্ডের কি পরিমান আয় হবে সেটা হিসাব নিকাশ করেই তারা আমন্ত্রন জানাবে এবং বাংলাদেশ ও একই কাজ করবে, কেউই লোকসান দিয়ে একটি সিরিজ করতে চাইবে না। অন্যদিকে স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষের খড়কুটী আঁকড়ে ধরার মত পাক বোর্ডও যেকোন মুল্যে বাংলাদেশ কে শ্বাপদসংকুল পাকিস্তানে নিয়ে আসার জন্য মরিয়া ছিল। কারন পাকিস্তানে ক্রিকেট চিরনির্বাসনে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে স্বার্থপর কামাল বোর্ডের মেম্বারদের অমতে পাক বোর্ডকে লিখিত দিয়ে আসেন এই মর্মে যে বাংলাদেশ দল সহসাই সেখানে যাচ্ছে, বিনিময়ে তিনি পেয়ে যান একটি পদ। কিন্তু পাকিস্তানে সামগ্রিক অবস্থার কোনো উন্নতিতো হয়ইনি বরং দিন দিন ক্রমশ অবনতিশীল। এই পরিস্থিতিতে জনগনের চাপের মুখে বিসিবি বাংলাদেশ দলকে পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। আর বাংলাদেশ দল পাকিস্তান না যাওয়ায় পিসিবি কোনো পাকিস্তানি খেলোয়াড়কে বিপিএল এ আসার অনুমতি দেয়নি, যার ফলে বিপিএল এর আকর্ষন কিছুটা হলেও কমে গেছে।

খেলাকে যদি আমরা রাজনীতির বাইরে রাখি তাহলে দেখবো যে টি-টোয়েন্টি মূলত বিনোদনমুলক ক্রিকেট, আর বিদেশি খেলোয়ারদেরকে এখানে আনা হয় মূলত দলগুলোর শক্তি বৃদ্ধির জন্য, এছাড়া স্পন্সরশিপ ও খেলোয়ারদের তারকাখ্যাতির উপর অনেকটাই নির্ভর করে। কিন্তু দর্শকরা এসব চিন্তা করে মাঠে আসেননা, বরং বিদেশী খেলোয়ারদের অংশগ্রহনে যে বৈচিত্র সৃষ্টি হয়, তার আকর্ষনেই সবাই মাঠে খেলা দেখতে ছুটে যান, আর প্রিয় তারকার খেলা মাঠে থেকে দেখার আনন্দ তো আছেই। যদি বিদেশী তারকাদের উপস্থিতি ঘটানো না যায় সেক্ষেত্রে জাতীয় লীগের সাথে বিপিএলের কোন তফাত থাকে না। নানা কারনে পাকিস্তান বিশ্বব্যাপি ঘৃণিত এবং নিন্দনিয় এটি জাতি তথাপি তাদের ক্রিকেট সাফল্যমন্ডিত এবং তারকা সমৃদ্ধ। এমনকি কয়েক বছর আগে বেশ কিছু পাকিস্তানি জাতীয় দলের খেলোয়ারের স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমানিত এবং বহিষ্কৃত হওয়ার পরও তাদের সাফল্য থেমে থাকেনি। যদিও আলোচনা সমালোচনা কখনই তাদের পিছু ছাড়েনি। তাই অনেকে এই পুরো দায়ভার পিসিবির ওপর চাপাতে চাচ্ছেন, কিন্তু আমার প্রশ্ন পিসিবি কি অন্যায় কিছু করেছিল? লোটাস কামালের তাদের সমর্থন অবশই লাগতো তা ছাড়া তিনি ওই পদটি পেতেন না। সুতরাং এটা পুরোপুরি তার নিজের বিচার বিবেচনার উপর ছিল যে তিনি কি চান, পদ নাকি খেলোয়াড়দের লাশ, প্রথমটাই বেছে নিলেন, কেউ তাকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আইসিসির সভাপতি করেনি। বরং এতদিন আইসিসির উচ্চপদে কোন বাংলাদেশী না থাকা সত্বেয় আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে গেছে কোন সমস্যা হয়নি, আজ উনি আইসিসির সহ সভাপতি হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কোন উপকার তো করেনই নি বরং আমাদের ক্রিকেটকে একটি গভীর সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। বিশেষকরে বিপিএল এ কিছু ফ্র্যাঞ্চাইজি মারাত্নক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কিছু কিছু দল খেলোয়ার না পেয়ে দূর্বল দল নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে। মাঠে দর্শক সমাগম আগের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছে। যেহেতু ভারত তাদের প্লেয়ার দেয় না, ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার ব্যাস্ত সূচীর কারনে তাদের খেলোয়ারদের ও পাওয়া দুষ্কর, এছাড়া অন্য দল গুলো ও ব্যাস্ত থাকায় এবার পাকিস্তানের খেলোয়ারদেরকেই বেছে নিয়েছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। আর আমাদের এখানে পাকিস্তানের খেলোয়ারদের তারকাখ্যাতি ও পরিচিতি অন্যান্য দেশের দলের চেয়ে অনেক বেশী একথা হয়ত পাকিস্তানের কট্টর সমালোচকও স্বীকার করবেন । কিন্তু তারা না আসতে পারাতে এবারের বিপিএল অনেকটাই তারকাশুন্য হয়ে পড়েছে, আর এর পুরো দায় দায়িত্ব্ব লোটাস কামাল অস্বীকার করতে পারবেন না। যেহেতু তিনি এর মূল হোতা ওনার উচিত ছিল, পিসিবির কাছে ব্যাক্তিগতভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে এবারের বিপিএল এ পাকিস্তানী খেলোয়ারদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা এবং তা আমাদের ক্রিকেটের স্বার্থেই, কিন্তু এদেশের ক্রিকেটকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন । এই লোটাস কামালদের মত লুটেরাদের কারনে আজো আমরা জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিনা। তাই একদিন লোটাস কামালকে অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।