ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুদক বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। দুর্নীতির দায়ে তারা একে একে গ্রেফতার করে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে। আওয়ামী লীগ তখন হাততালি দিয়েছিল। আবার বর্তমান সময়ে যদি দুদক দুর্নীতিবাজদের ধরতে চায় তাহলে গণহারে ধরতে পারবে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাকে। আর হাততালি দেবে বিএনপি। মধ্য থেকে দুর্নীতির চূড়ায় যে চড়ে বসেছিল তা থেকে খুব একটা নামেনি আমাদের দেশ। নামানোর চেষ্টাও করে কোন সরকার। আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে আমাদের দেশকে মানুষ চেনে না বলে মন খারাপ হত। কিন্তু এখন অনেক মানুষ বাংলাদেশকে চেনে। তবে ১০ বছর ধরেই দুর্নীতির শীর্ষ পর্যায়ে থাকার কারণে যে মানুষ চিনছে বাংলাদেশকে তাতে প্রবাসে ঘাম ঝড়িয়ে অর্থ কামানো শ্রমিকের মাথা আরো নিছু হয়ে যাচ্ছে ক্রমশই। কারণ আওয়ামী লীগ বিএনপিকে বিএনপি আওয়ামী লীগকে দোষী করেই যাচ্ছে, দুর্নীতি কমছে না একটুও। দুর্র্নীতি কমানোর আগ্রহও দেখা যায় না কারো মধ্যেই। তাহলে কি আমরা এভাবেই…?

সেদিন ঘুম আসছিল না। ভেড়া না গুণে দুর্নীতির জন্য দায়ী কারা তাদের খুঁজতে লাগলাম। অবাক হয়ে দেখি তাতে আমারও নাম! অথচ আমি ঘুষ খাই না, দুর্নীতি করি না। কারণ আমার ঘুষ খাওয়ার জায়গা নেই, দুর্নীতি করার সুযোগ নেই। তারপরও কেন আমার নাম। কেন?

ভেড়া গোণাই তো ভাল ছিল। এখন যে পড়বো দুদকের ফাঁদে। কিন্তু কারণটা কী? অনেক ভাবার পর দেখলাম হিসাব ভুল নয়। এই দুর্র্নীতিবাজরা তো দূর দেশের বা ভিন দেশের কেউ নয়। হয় আমাদের বাবা, ভাই, স্বামী, বোন, মা অথবা নিকটেরই কেউ। দুর্নীতি করলে এরাই করে। আমরাও জানি সেটা। তারপরও না জানার ভান করে বসে থাকি। যেমন ধরুন আমার বাবা বেতন পায় ১৫ হাজার টাকা। অন্য ইনকাম সোর্স নেই। সব মিলিয়ে আমার হাত খরচের জন্য তার বাজেট কোনভাবেই পাঁচশ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, সর্বোচ্চ না হয় টেনেটুনে ১ হাজার হলেও হতে পারে। কিন্তু প্রতিমাসে আমি নির্বিকার তার কাছ থেকে দুই-তিন-চার হাজার টাকা হাতখরচ নিই। কোনদিন জিজ্ঞাসাও করি না কোথা থেকে দাও এত টাকা? আমার বড় ভাই চাকরি করে ২০ হাজার টাকার। উনিও দেন ভালো অঙ্কই। তিন-পাঁচ যখন যেমন চাই। তাকেও থ্যাঙ্ক-য়্যু বলে সরে যাই। এত টাকার কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি তাকেও। ঘরে সব মিলিয়ে বোনাস ২৫ হাজার আসে তো খরচ দ্বিগুণ-তিনগুণের ওপরে।

এ হিসাব শুধু আমার নয়। বাংলাদেশের কতগুলো মানুষ শুধু ঈদের সময় তাদের তিন-চার সন্তানের প্রত্যেকের জন্য পঞ্চাশ হাজার-এক লাখ করে রাজেট করতে পারেন? টাকার অঙ্কে হয়তো এটা একটু বেশিই দেখা যায়। কিন্তু নামীদামী বিপনীবিতান থেকে দুই-তিনটি জামা, কিছু অর্নামেন্ট, হাতখরচসহ অঙ্কটা কিন্তু অনেকেরই তাতে গিয়ে ঠেকে। কিন্তু কেউ কি কোনদিন তার বাবা, ভাইয়া বা আদরের দুলাভাইকে জিজ্ঞাসা করেছি, কোথা থেকে আসে এসব টাকা? বরং দিন পেরোনোর সাথে সাথে আবদার আরো বাড়ে আমাদের। অঙ্কটা আরো বাড়িয়ে দিতে বলি। এর অর্থ কি এটাই হয় না যে, দুর্নীতিটাও আরেকটু বেশি করে কর।

এই টাকা দিয়ে ফ্যাশন করে, এই টাকায় ফাস্টফুড বা চাইনিজ খেয়ে যখন আমরা দুর্নীতি বিরোধী আওয়াজ তুলি তখন সত্যই কি এটা কারো কানে গিয়ে পৌঁছায়? কারো কানে গিয়ে পৌঁছার কথা? তাই লাভও হয় না।
এ প্রশ্নটাও এখানে অবধারিতভাবেই আসবে যে, আমি না হয় দুর্নীতি বন্ধ করলাম বা করালাম, কিন্তু অন্যের দুর্নীতিতে তো আমাকে পড়তে হচ্ছেই। হাঁ, মানতে সবাই বাধ্য যে, এটা একটা চেইন কম্বিনেশন। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো এটা শুরু করতেই হবে।

তাই আসুন না, আমরা ঘর থেকে না হয় শুরু করি এ আন্দোলন। ব্লগের মাধ্যমে পুরো বিশ্বে হয়ে যাচ্ছে উলট-পালট। আমরা না হয় এই বিপ্লবটাই করি। নিজের ঘরের মানুষের দুর্নীতিই না হয় প্রথমে বন্ধ করি। তাহলে আমরা বড় গলায় অন্যদের দুর্নীতি বন্ধ করার কথা বলতে পারবো।

হয় যদি হয়েই যাক না এ বিপ্লব
তাতে হয়তো পকেট চুপসে যাবে
হাল ফ্যাশন উঠবে না গায়ে
তবু নুয়ে যাওয়া মাথাতো উঁচু হবে
তাহলে হয়েই যাক না এ বিপ্লব।