ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

গুলিস্তান থেকে বাসে যাচ্ছিলাম সদরঘাট। যথারীতি কয়েকজন ছাত্রও উঠল। অবশ্য আগের জমানার মতো বই-খাতা, ব্যাগ টেনে নেওয়া যেহেতু ব্যাকডেটেড ব্যাপার, তাই ওসবের কোনো বালাই নেই। মানে না, তাই অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো নির্ধারিত ইউনিফর্মের কোনো চিহ্নই। তবে হাবভাব দেখলে ঠিকই বুঝা যায় তারা ছাত্র। তাই যথাযথ সমীহ করেই চলে বাসস্টাফরাও। গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের ভাড়া ৫ টাকা। ছাত্রদের হাফ। তিন টাকা। চার ছাত্র উঠেছে। তাদের ছাড়কৃত বিশেষ ভাড়া আসছে ১২ টাকা। তারা দশ টাকা দিয়েই আর দেবে না। দুই টাকা চাওয়ায় ধমকি। কিন্তু কেন জানি নাছোড়বান্দা মাঝবয়সী কন্ডাক্টর ওই দুই টাকার জন্য জোরাজুরি করছিলই। যথারীতি ছাত্রদের কাছে তা বেয়াদবী বলে গণ্য হলো। ফলাফল দুই টাকা তো পেলই না, বরং উল্টো জুটলো গায়ে হাত। অন্য কোনো যাত্রীও কিছু বললো না। আমিও কিছু বললাম না। কেন, সে জবাব জানতে বোধ হয় ছাত্র হবার দরকার নেই কারোই।

বাসটা যখন সদরঘাটে এসে থামল, বীরদর্পে নেমে গেলেন ছাত্ররা। তারপরই বোধ হয় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল কন্ডাক্টরের। ধরধর করে নেমে এলো জলের ধারা। কাঁদো কাঁদো গলায় কয়েকটি প্রশ্ন রাখলো সে।
১. ছাত্ররা তো আর কোথাও ছাড় পায় না, এমনকি তাদের স্কুল-কলেজেও না তাহলে কেন আমাদের কাছেই তাদের এই ছাড়?
২. ছাত্ররা কি অন্য কোথাও টাকা খরচ করে না? তাদের তো স্টাইল, ফোনালাপ কোনো কিছুরই কমতি নেই। তাহলে আমাদের কাছে কেন এই ছাড়?
৩. তাদেরকে আমরা যে ছাড় দেই, তার বিনিময়ে আমরা কী পাই? কোনো অভিভাবক, শিক্ষক, ছাত্র, সরকার কারো পক্ষ থেকেই তো আমরা কিছু পাই না। তাহলে কেন?
৪. আমাদের মালিকরা কি আমাদের দৈনিক জমা থেকে ছাত্রদের কারণে কিছু কম রাখেন?
৫. আমরা বাসস্টাফরা আমাদের কোনো ভাইবোন বা ছেলে মেয়ে ভর্তি করতে গেলে কি কোনো স্কুলে কোনো ছাড় পাই?
৬. এই ছাত্ররা কোনোদিনও কি আমাদের এই অবদান স্বীকার করে? কোনো একটি জায়গাতেও?

কন্ডাক্টরের গায়ে ছাত্রদের হাত যখন উঠেছিল তখন আমরা কোনো কথা বলতে পারিনি। কিন্তু যখন বাসের কন্ডাক্টর উদাস নয়নে এসব কথা বললো তখনো কেউ জবাব দিতে পারিনি আমরা। সবাই মাথা নিচু করে নেমে গেলাম। প্রশ্নগুলো ভাসতেই থাকলো বাতাসে। আর আমাকে ঠোকরাতে থাকলো অবিরত।