ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি হায়নাদের দোসর আলবদর-আলশামস ও রাজাকার বাহিনী তথা জমায়েতে ইসলামীর সকল অপকর্মের সহযোগী ছাত্রসংগঠনের নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ। পরে ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের হত্যার পর জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা চলাকালীন জমায়েতের পুনর্বাসন সময়ে তাদের ছাত্র সংঘঠন হিসাবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির নামে ১৯৭৭ সালে এই সংগঠনটি পুরুজ্জিবিত হয়। তবে ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইসলামী ছাত্র সংঘ নামে সংগঠনটি বাঙ্গালী নিরীহ মা-বোনদের ধর্ষণ, সংখ্যালঘু তথা মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের মা-বাবা, ভাইবোন সহ যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযুদ্ধাদের হত্যা, লুটপাট, ঘরবাড়ি জ্বালানো এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের ঠিকানা ও নানা তথ্য দেয়া ও নানা স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলো এবং ৭১’এ বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞেও তৎকালীন এই ছাত্র সংঘঠনটির সক্রিয় অংশগ্রহন ছিলো অসামান্য। ১৯৭১ সালের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে ১৯৭৭’এ নতুন নামে অর্থাৎ “ নতুন বোতলে পুরোন মদ” এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মাঠে নামে নতুন উদ্দমে “ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির ”।

শিবিরের প্রাথমিক লক্ষ্য হল মাদ্রাসা এবং স্কুলের কোমলমতি শিশুদের মাঝে ইসলামের ভয়-ভিতি এবং স্বল্প মুল্যের উপঢৌকন (পোস্টার, স্টিকার,ক্যালেন্ডার,গল্পের বই ইত্যাদি) দিয়ে আকৃষ্ট করে ধীরে ধীরে শিবিরের মূলমন্ত্রের দিকে ধাবিত করে একজন দক্ষ শিবির কর্মীতে রুপান্তরিত করা। একজন পূর্নাঙ্গ শিবির কর্মী হতে হলে একটি ছাত্রকে পার করতে হয় চারটি ধাপ (সমর্থক, কর্মী, সাথী ও সদস্য)। এর মাঝে প্রথম ধাপ অর্থাৎ সমর্থক হওয়া থেকে কর্মী করাকালীন সময়টিতে অভিজ্ঞ শিবির কর্মীরা ঐ ছাত্রটিকে রাখেন কড়া নজরদারিতে। এই ধাপটি সফল ভাবে পার করতে পারলে রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে স্বাবলম্বিতা ও নানা সাফল্যের স্বপ্নীল প্রলোভনে মোহিত ঐ ছাত্রটিকে সামনে এগিয়ে সদস্য করা পর্যন্ত আর পিছনে ফিরে খুব একটা বেগ পেতে হয়না। আর এরই মাঝে ছাত্রটির মগজ ধোলাই যা হবার তা হয়ে গেছে এবং এতদিনে সে একজন কট্টর ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য হিসাবে গর্ব বোধ করতে থাকে। কিন্তু একটি ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রকে যখন প্রাথমিক সমর্থক হওয়ার আহ্বান করা হয় এবং স্বল্প মুল্যের উপহার সামগ্রীর প্রলোভনে প্রলোভিত করে পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হল কি/না,নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লেখাপড়া করা হল কি/না, সংগঠনের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হল কি/না এই সবের রুটিন মাফিক তদারকি করা হয় তখন তাদের মা/বাবার পক্ষ হতে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কোন বাধা আসে না। কারন অভিভাবকরা মনে করেন আমার ছেলেকে তারা নামাজী করে তুলছেন এবং লেখা পড়া সঠিক ভাবে করার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে এতে তার মঙ্গল বৈ ক্ষতি নেই। কিন্তু ছাত্রটি সত্যিকার অর্থে পাচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়েও রুটিন খাতায় মিথ্যে করে লিখে রাখে এমনকি একটি ছাত্র নিয়মিত স্কুলের ক্লাস করার পর খেলাধুলা করে নির্দিষ্ট সময় বাড়িতে লেখাপড়া করতে পারে না এই ক্ষেত্রে উপহার সামগ্রী আর বাহবা পাওয়ার আশায় মিথ্যার আশ্রয় নেয় আর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে পাকা মিথ্যাবাদী। আর যে ছাত্রটি সংঘঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে মিথ্যার ট্রেনিং দেওয়া হয় তার কাছে পরবর্তী সকল মিথ্য বলা এবং গ্রহন করা সহজ হয়ে ওঠে। আর এরই ধারাবাহিকতায় সত্যকে আড়াল করে সিনিয়র বড়ভাইরা ইসলামের দেহাই দিয়ে নানা মিথ্যা কল্পকাহিনী শুনিয়ে তাদেরকে করে তুলে তাদের বিরোধী সংগঠনের প্রতি ক্ষিপ্ত আর হিংস্র।

আর এই হিংস্রতার জ্বলন্ত কাহিনী ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়লেই জ্বলন্ত আগুনের স্ফুলিঙ্গের ন্যায় কলংকময় আরশিতে প্রতিচ্ছবি হয়ে ভেসে ওঠে। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৮১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে শুধুমাত্র শিবিরের নৃশংসতায়। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মাথায় চট্টগ্রাম সিটি কলেজের নির্বাচিত এজিএস ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেনকে খুন করার মধ্যদিয়ে শুরু হয় দেশকে মেধাশুন্য করার এক নতুন ষড়যন্ত্র। এরপর থেকে শিবিরের হত্যাযজ্ঞ যেন নিয়মিত ব্যাপারে পরিনত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হলের ১৫ নম্বর কক্ষে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হোসেনকে জবাই করে হত্যা করে। হত্যা ছাড়াও শিবিরের অন্য পথ রয়েছে রগ কাটা অথবা কবজি কেটে ফেলে দেয়া। তার প্রথম উদাহরন ১৯৮৬ সালে জাতীয় ছাত্রসমাজের নেতা আবদুল হামিদের হাতের কবজি কেটে ফেলে তা বর্ষার ফলায় গেঁথে তারা উল্লাস প্রকাশ। তারপর বেশ কিছুদিন শিবিরীয় বর্বরতা থেমে থাকলেও ১৯৮৮ সালে তারা যেন হিংস্র হায়নার মত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে রক্তপিপাসা নিয়ে। ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালাল হত্যা, সিলেটে মুনীর, জুয়েল ও তপন হত্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ ইউনুসের বাসভবনে বোমা হামলা ১৯৮৮ সালে শিবিরের নৃশংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। প্রথম থেকেই শিবির যেন প্রগতিশীলদের দেশ থেকে নির্মূল করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে তারা নির্মম ভাবে জবাই করে হত্যা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমৈত্রীর সহ সভাপতি ফাকরুজ্জামানকে।

শিবিরের নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি এদেশের মেয়েরাও। ইসলামী ছাত্রী সংস্থা নামে একটি সংস্থা শিবিরের নারী শাখা হিসেবে পরিচিত। দেশের মেয়েদের রক্ষনশীলতাকে কাজে লাগাতেও তারা পিছপা হয়নি কোন ভাবেই। সহজ সরল মেয়েদের মগজ ধোলাই করে ইসলামিক পর্দার মাধ্যম বোরকার আড়ালে তারা ঢুকিয়ে দিয়েছে বোমা অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য ব্যাবহার করেছে মেধাবী ছাত্রীদেরকেও। ১৯৯২ সালে নিজের শরীরে বোমা বহন করার সময় বিস্ফোরণে মারা যায় ইসলামী ছাত্রী সংস্থা রাজশাহী কলেজ শাখার নেত্রী মুনীরা ও তার সহযাত্রী-সহকর্মী আপন খালা।

শিবিরের নৃশংসতার যেন শেষ নেই। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে শিবিরের হামলায় গুরুতর আহত হন জাসদ নেতা মুকিম, পাঁচদিন পর তিনি মারা যান। এরপর ১৯৯৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত শিবিরের নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ১৭ জন তার মধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে হত্যা করে ম্যানহোলের মধ্যে ফেলা-

রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ে শিবিরের বলি ফারুক..

২০০০ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ৮জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা এবং ১৯৯৮’এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সঞ্জয় তলাপত্র হত্যা অন্যতম। এ সময়ে শিবিরের রগ কাটার শিকার হয় আরো অর্ধশতাধিক নিরীহ ছাত্র। এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে শিবির কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা প্রদুৎ রুদ্র চৈতীর হাতের কব্জি কেটে নেয়া, ১৯৯৫ সালে ২৫ জন ছাত্রদল নেতা-কর্মীর হাত পায়ের রগ কেটে নেয়ার ঘটনা অন্যতম। শিবিরের হাত থেকে রেহাই পায়নি নিরীহ ছাত্রীরাও। নৃশংসভাবে হামলা করে রক্তাক্ত করেছে অসংখ্য ছাত্রীকে। ২০০১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে শিবির কমীরা কমান্ডো হামলা চালায় এবং ছাত্রীদেরকে লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত করে। ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে শিবির ক্যাডাররা প্রায় অর্ধ শতাধিক ছাত্রীকে রক্তাক্ত করে।

বর্তমান সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদানে নানা নৈরাজ্য চালিয়ে আসছে শিবির,আর এদের চোরাগোপ্তা আবার কথনও প্রকাশ্য হামলা থেকে সাধারণ জনতা, প্রগতিশীল ধারার ছাত্র,নেতা,কর্মী এমনকি পুলিশও র্হোই পাচ্ছেনা। ইতিমধ্যে বেশ কিছু ছাত্র নেতা এবং নিরীহ বিরোধী সংগঠনের ছাত্ররা রগকাটার শিকার হয়েছে। শিবিরের এই কর্মকান্ড ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকলে দেশ শুধু মেধাশূন্য নয় সাথে দেশে তালেবানদের মত জঙ্গি রাষ্ট্রের মেরুকরণ করে অতীত ভবিষ্যতে দেশে গৃহযুদ্ধ তৈরি করার তাদের মুল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে।

সুত্রঃ বাংলারিপোর্ট ডট কম
কৃতজ্ঞতা: আনিস রায়হান
ছবিঃ ইন্টারনেট