ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যে এসে প্রচন্ড হুরুম হারুম ধামাকা মারামারির পর মিলন দৃশ্য দেখে চোখের জল আটকে রাখতে পারা বাঙ্গালী বৌ-ঝিয়ের সংখ্যা হতে গোনা। অবশ্য অনকে ক্ষেত্রে চোখের জল আড়াল করতে পাশের স্বামীটির চোখ ফাকি দিতে গিয়েও ধরা পরে লজ্জা রাঙ্গা মুখ লোকানোর দৃশ্য দেখে বুঝা যায় আমার দেশের বাঙ্গালী রমনীদের হৃদয় কতটা কোমল। বর্তমান সময়ের সমিকরন এককে জনের কাছে একেক রকম হলেও আজ থেকে ৪০ বছর আগের যুবক-যুবতীর প্রেমের কথা ভাবলে বর্তমান সময়ের তরুন তরুনীদের কিছুটা হোচট খেতে হবে বৈকি।

আজ আপনাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ৪০ বছর আগের এক করুন প্রেমের গল্প শোনাবো। গল্পটি সুন্দর করে গুছানোর সার্থে কিছুটা ভাষাগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি তবে গল্পের মুল তথ্য বিকৃত করা হয়নি এবং ঘটনাটি পুরোপুরি সত্য। ঘটনাটি আমার এক আত্মীয় মুক্তিযোদ্ধা চাচার মুখ থেকে শুনেছিলাম বছর দুই আগে। শোনার পর ডাইরিতে পয়েন্ট গুলি টুকে রেখেছিলাম আজ এই বিজয়ের মাসে একটু সময় করে আপনাদের সামনে উপাস্থাপন করলাম।

৭১’র জুলাই-আগষ্ট মাসের সময়টাতে আমার সেই মুক্তি যোদ্ধা চাচা ফজর আলী ব্রাম্মনবাড়ীয়ার কসবা এলাকার এক অস্থায়ী পাকিস্থানি সেনা ক্যম্পে বাজার করা এবং ফুট ফরমাসের উছিলায় তাদের কাছে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবারহ করতেন। সেই ক্যাম্পের মধ্যে স্থানীয় যুবকদের রাজাকারদের সহায়তায় এনে তথ্য আদায়ের লক্ষে টর্চার এবং পরে হত্যা করা হত। ফজর চাচার দেশের বাড়ী কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হওয়ার সুবাদে এই ক্যম্পের আয়ুব আলী নামে এক পাঞ্জাবী অফিসারের সাথে ভাল পরিচয় ছিল। ঐ পাঞ্জাবী অফিসার যখন তার দল নিয়ে কসবায় আসে তখন ফজর চাচা ভারত থেকে হালকা ট্রেনিং শেষে ফেরার পথে তার সাথে দেখা হয় এবং জানতে চাইলে বলেন কাজের উদ্দেশ্যে বেড় হয়েছেন। কাজের কথা শুনে পাঞ্জাবী আয়ুব আলী আপাতত তার সাথে থাকার কথা বলে । ফজর চাচা কৌশল করে এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের (ভারত থেকে ট্রেনিং শেষে আসা মুক্তিযোদ্ধা দলের ) কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ রেখে চলছিল। যাই হোক পাঞ্জাবীদের সাথে থাকাকালীন সময়ে অনেক মর্মান্তিক ঘটনা নিজ চোখে দেখেও না দেখার ভান করে ছিলেন তিনি। এই ক্যাম্পে মাঝে মাঝে আইয়ুব আলীর চেয়ে সিনিয়র নতুন অফিসার যখন আসতো তখন রাতে তাদের ভাল খাবার দাবারের সাথে প্রধান দাবী থাকতো এলাকার যুবতী বৌ বা সদ্য যৌবনা নারী। একদিন নতুন এক পাঞ্জাবী অফিসার এক পল্টুন ফোর্স সহকারে ক্যাম্পে এসে স্থানীয় রাজাকার আজগর মুন্সীকে ডেকে পাঠালেন এবং মেয়ে সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। কিছু পাকি সেনা সহকারে মেয়ে খোজার জন্য রাজাকার তার সাথের আরো কিছু সাঙ্গ পাঙ্গ মিলে মোট তিনজন মেয়েকে ধরে আনলো। কিন্তু একটি মেয়ে নাম জুলেখা বয়স ১৫-১৬ হবে তাকে ধরার কথা শুনার সাথে সাথে তার প্রেমিক আবুল হোসেন তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি মিনতি করতে থাকলে তাকেও পাঞ্জাবীরা ধরে নিয়ে আসে। পাঞ্জাবী অফিসারের সামনে হোসেন এবং জুলেখাকে হাজির করা হয় এবং এক সৈন্য অফিসারকে জানায় এই ছেলে এই মেয়েকে ভালবাসে আর তাই সে খুব জালাতন করছে। অফিসার তাৎক্ষনিক সৈন্যকে নির্দেশ দিলেন আবুলকে গুলি করে মেরে ফেলার। এই কথা শুনে জুলেখা নিজের ভবিষ্যৎ ভাগ্য আচ করে অফিসারের পায়ে পরে কাদতে কাদতে বলল আমার যা হয় হবে কিন্তু তার প্রেমিক আবুল হোসেনকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। এই আকুতি দেখে পাঞ্জাবী অফিসার এক অন্য ধরনের হিং¯্র খেলার জন্য জুলেখাকে প্রস্তাব দেয় আর তা হল তার প্রেমিকের সামনেই সে পুরো রাত তার সাথে বিনা বাক্য ব্যয়ে কাটাতে হবে তবে আবুলকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এই কথা শুনে উভয়ে কান্নাকাটি এবং অনেক আকুতি মিনতি করেও যখন বুঝতে পারলো আর কোন উপায় নেই তখন জুলেখা বলল আমরা দুজনকে এক সাথে গুলি করে মেরে ফেল তবুও তা সম্ভব নয়।কিন্তু পাকিস্থানি অফিসার তার খেলার আয়োজন করতে শুরু করবে ঠিক ঐ সময় এক সৈন্য জানালো উপর থেকে মেসেজ এসেছে ওয়্যারলেস রুমে যাওয়ার জন্য। তখন তাৎক্ষনিক ভাবে অফিসার তাদের এই রুমে তালাবদ্ধ করে চলে গেলেন। জুলেখা আর আবুল হোসেন নামের সেই প্রেমিক জুটি আর কোন বাচার পথ নেই দেখে অফিসারের গামছা ছিরে লম্বা দড়িরমত বানিয়ে রুমের শিলিংয়ের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করল। কিছুক্ষন পরে অফিসার রুমের দড়জা খুলে তাদের মৃত আবিস্কার করে এবং হতভম্ব হয়ে যায়। পরে লাশ দুটিকে পার্শ্ববর্তী নদীতে ফেলে আসা হয় এবং সেই ফেলে আসায় ফজর চাচাকেও অনিচ্ছা সত্বেও তাদের সহায়তা করতে হয়। ফজর চাচা পরের দিন বাজার করতে গিয়ে জেনেছিলেন,সেই জুলেখা আর আবুল হোসেনের মাঝে দীর্ঘ দিনের প্রেম ছিল। হোসেনের সাথে অল্প দিনের মধ্যেই জুলেখার বিয়ের বিষয়টি পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল তবে দেশে গন্ডগোল শুরু হওয়ায় তা পিছিয়ে যায়।

সেই মুক্তিযুদ্ধে কত রকম নাটকিয় এবং হৃদয় বিদারক ঘটনা যে ঘটেছে এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারবে না। তবে এ রকম হাজারো অজানা কাহীনির একেকটি ইটের গাথুনি দিয়ে গড়া আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জনে কত অজানা আবুল আর জুলেখার আত্মত্যগের করুন কাহিনি হয়ত আমরা কখনও জানতে পারবো না। সেই না জানা অজানা আবুল আর জুলেখাদের আত্মার শান্তির জন্য প্রয়োজন ৭১’র যুদ্ধের সেই সময়ের এই সব মানবতা বিরোধী কাজের সাথে জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি । আসুন আমাদের যারা এই স্বাধীন শ্যমল লাল সবুজের বাংলাদেশ উপহার দিল তাদের জন্য আমরা আমাদের অবশ্য করনিয় গুরু দায়ীত্ব পালনে এই বিজয়ের মাসে নেই দিপ্ত অঙ্গীকার। তারই সাথে শপথ নেই আমারা “রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার”।