ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ভস্মীভূত মানবতা

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষকে ভাগ করা হয়েছিল এই এলাকার সংখ্যা গরিষ্ঠ দুটি ধর্মের অনুসারীদের আলাদা আলাদা রাজনৈতিক অস্তিত্ব জাহির করার জন্য। তখন ঐ দুটি ধর্মের অনুসারীগণ নিজেদের এলাকাকে বিধর্মী শুন্য করার মানসে একে অন্যের সাথে মারামারি-কাটাকাটি করেছে, বাড়িঘর-ধর্মস্থান জ্বালিয়েছে, ধ্বংস করেছে, অবাধে খুন করেছে, ধর্ষণ করেছে, এককথায় ভারতবর্ষ এক রক্তাক্ত নরকে পরিণত হয়েছিল। তখনও ঐ দুই সম্প্রদায় ও পাঞ্জাবের শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়া এই এলাকার অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের তেমন একটা ক্ষতি হয় নাই। যদিও পরবর্তি বছরগুলোর বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান) অংশে হিন্দুদের সাথে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরাও দেশ ছেড়েছে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। হিন্দুরা ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপে নীরবে দেশ ছাড়লেও তাদের উপর বড় কোন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা তেমন দেখা যায়নি।

রামু ও উখিয়াতে যা ঘটে গেল তা একেবারে অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। যেন ১৯৪৬-৪৭ এর সেই ভয়াল দিন ফিরে এসেছে। কাল্পনিক এক গুজবের উপর ভিত্তি করে একটি সংখ্যা গরিষ্ঠ ধর্মের হাজার হাজার মানুষ মানুষ রাতের অন্ধকারে ধর্মীয় উন্মাদনায় উন্মত্ত হয়ে নিরীহ, শান্ত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু (?) প্রত্যন্ত গ্রামবাসী মানুষের বাড়িঘর ও ধর্মস্থানের উপর হামলে পড়েছে। ধ্বংস করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে মানুষের বাড়িঘর, ধর্মস্থান, পুড়িয়ে দিয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধমন্দির। এ কেমন আচরণ! এই বর্বরতার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই, এই অমানুষেরা ঘৃণারও অযোগ্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোন এক ছেলে অন্য এক বিধর্মী ছেলের ফেসবুকে তথাকথিত অবমাননাকর কিছু দেখেছে বলে প্রচার করেছে। আর তাই শুনে ঐ এলাকার তথাকথিত ধর্মীয় কান্ডারীগণ মিছিল করল, মিটিং করল এবং ট্রাকে করে রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার লোক (নাকি ধর্মযোদ্ধা?) ভাড়া করে নিয়ে এসে কয়েকটি জনপদ সম্পূর্ন ধ্বংস করল, তাদের আগ্রাসন থেকে ধর্মস্থানও রেহাই পেল না। কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সংগ্রহে অনেক কিছুই থাকতে পারে। যতক্ষণ সেটা প্রকাশ না হচ্ছে, ততক্ষন সে ব্যাপারে কারো কিছু বলার অধিকার আছে কি? সর্বোপরি একজনের অপরাধের শাস্তিস্বরূপ পুরো কয়েকটি জনপদ ও ধর্মস্থান ধ্বংস করে দেওয়া কোন ধরনের ধার্মিকতা? ধর্ম সম্পর্কে আমার ক্ষুদ্র ধারণায় আমি যতটুকু জানি তা হলো সকল ধর্মই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, বিভিন্ন ধার্মিক ব্যক্তিগণ তাদের বিধর্মী বিরুদ্ধবাদীদের কখনই আঘাত করেননি (মুসলমানগণও হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর পথে কাটাঁ বিছানো সেই বুড়ির গল্প খুব গর্বের সাথে প্রচার করে থাকে)। তাহলে মানুষের এই আচরণ ধর্মীয় উন্মত্তা নাকি রাজনীতি?

এই ঘটনা যদি পাকিস্তানে ঘটত তাহলে আফসোসের কিছু ছিল না, কারণ ধর্মীয় বিভক্তিকে পুঁজি করেই দেশটির সৃষ্টি। কিন্তু একটি সাম্প্রদায়িক সহনশীল আবাসভূমির স্বপ্ন নিয়েই তো ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা! তাহলে কেন এই আচরণ? যখন কথিত একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক জোট রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত!

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখা যাচ্ছে, রাতভর হাজার হাজার লোক তান্ডব চালিয়েছে এবং আক্রান্ত মানুষ প্রশাসনের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছে, কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি বা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। সহিংস ঘটনা ঘটার বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি (গতানুগতিক ধারায় মন্ত্রীদের এলাকা পরিদর্শন, নামমাত্র ত্রাণ বিতরণ, বিরোধী রাজনীতির ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোজা, শান্তিমিছিলের আয়োজন ইত্যাদি ছাড়া)। আমরা বিশ্বাস করি প্রশাসন অবশ্যই জানে এই নারকীয়তার পিছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে বা কারা জড়িত ছিল। সরকার যদি ভোটের কথা চিন্তা না করে, সকল মানুষের প্রতি তার সামাজিক দায়িত্ব আছে বলে মনে করে, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তাহলে খুব সহজেই এর একটি সুস্থ সমাধান বের করতে পারবে।

ঘটনা যেই ঘটিয়ে থাকুক না কেন, আমরা এটা নিয়ে কোন রাজনীতি চাই না, আমরা চাই এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক প্রতিরোধ ব্যবস্থা, তা না হলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের যে ফাটল তৈরী হয়েছে তা আর কখন জোড়া লাগবে না।