ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সাহসিনী মালালা ইউসুফজাই

শেষ পর্যন্ত তার আশংকাই সত্যি হেোল তবে আরও নির্মমভাবে- তালিবানরা তার মুখ এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে দেয়নি বা অপহরণ করেনি এবারে পৃথিবী থেকেই মুছে দিতে চেয়েছে। তার মাথায় ও ঘাড়ে গুলি করে তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। মালালা এখন আশংকাজনক অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

মালালা ইউসুফ জাই, বিস্ময়কর মেধাবী, প্রতিভাশালী, অতি দুরদর্শী অসম সাহসী ১৪ বৎসরের এক ফুটফুটে কিশোরী পাকিস্তানের তালিবান অধ্যুষিত সোয়াত অঞ্চলের বাসিন্দা। চার বৎসর আগে তালিবানরা সোয়াত দখলের পর সেখানে মেয়েদের লেখাপড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তালিবানদের এ অন্যায় নিয়ম মেনে নিতে পারিননি মালালা। তাই তালিবানদের রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সে। নিয়মিত বন্ধুদের নিয়ে স্কুলে যেত, যাতে তালিবানরা টের না পায় সেজন্য চাদরের নিচে বই ও স্কুলের ইউনিফর্ম লুকিয়ে নিয়ে যেত। এখানেই সে থেমে থাকেনি, বিবিসির উর্দুবিভাগে মেয়েদের অধিকারের বিষয়ে, তালিবানী অন্যায় শাসনের বিরূদ্ধে গুল মাকাই ছদ্মনামে লেখা শুরু করছিল। সে বলেছিল “পড়াশোনা করলে তালিবান জঙ্গিরা হয়তো মুখে অ্যাসিড ছুড়বে। অপহরণও করতে পারে। এই ভয়টাই তাড়া করে আমাদের।” সোয়াতের প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষা ও শান্তির প্রচারে অসম্ভব সাহসিকতার পরিচয় দেওয়ায় কিশোরী মালালা ইউসুফ জাই গত বছর ডিসেম্বরে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির কাছ থেকে পেয়েছিল জাতীয় শান্তি পুরস্কার। আর এই মানব হিতৈষী ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণেই তালিবান জঙ্গীদের ‘খতম’ তালিকায় নাম উঠে গিয়েছিল মেয়েটির। তেহরিক-ই-তালিবানের পাক মুখপাত্র ইশান উল্লাহ ইশান ঘটনার দায় স্বীকার করে হুমকি দিয়ে বলেছে, “বয়সে ছোট হলেও সোয়াটে পশ্চিমী সংস্কৃতির প্রচার করছিল মেয়েটি। প্রেসিডেন্ট ওবামা নাকি ওর আদর্শ। তালিবান-বিরোধিতার জন্যই মালালার উপরে হামলা চালানো হয়েছে। যদি এ যাত্রা সে বেঁচেও যায়, ফের তাকে মারার চেষ্টা করা হবে।” ২০০৯ সালের গোড়ার দিকে সোয়াত থেকে তালিবান হটিয়ে দেয় পাক সেনাবাহিনী। তারপর থেকে একটু একটু করে ছন্দে ফিরেছে সোয়াত। আবার পড়াশোনা করা যাবে ভেবে আনন্দের সীমা ছিল না মালালার। কিন্তু এ দিনের হামলার পর সোয়াতের নিরাপত্তা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠছে। বড় হয়ে আইন পড়ে দেশের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন দেখে সাহসিনী মালালা, “এমন একটা দেশের কথা ভাবি যেখানে পড়াশোনায় কেউ বাধা দেবে না।” কিন্তু তার এই স্বপ্ন আজ সম্পূর্ণ আশংকা ও হুমকির মুখে।

আমাদের দেশেও কি মেয়েরা নিরাপদ?এখানে তালিবান নেই, আছে বখাটে। এই বখাটেদের অত্যাচারে এদেশের তৃষা ইয়াসমীনদের মতো কত মেয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, লেখাপড়া বন্ধ করে দিচ্ছে, যৌন হয়রানী ও বাল্য বিবাহের শিকার হচ্ছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ, টিভি ও অন্য মিডিয়ার দিকে তাকালে এরকম অসংখ্য বেদনাদায়ক ঘটনার খবর পাওয়া যায়। তালিবান একটি স্বীকৃত খুনির দল, রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং পরাজিত করছে। কিন্তু সমাজের অন্ধ্রে অন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এই সব বখাটে খুনিরা নির্মূল হবে কি করে? এরা তো রক্তবীজের মতো প্রতি নিয়ত তৈরী হচ্ছে। এদের প্রতিরোধের উপায় কি?

আজকে মালালার এই আত্মত্যাগ আমাদের সেই সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে যে আমাদের এই সব অপশক্তিকে মোকাবেলা করতেই হবে, তা নাহলে তারা আগামীর পৃথিবীটাকে সুস্থ বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন ও প্রগতিশীল মানুষদের বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। ধর্মের নামে, সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে সারা পৃথিবীতে প্রতি দিন অসংখ্য নারীকে অন্যায় আচরণ ও সহিংসতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, পরিবারের তথাকথিত সম্মান রক্ষার্থে প্রাণ দিতে হচ্ছে। যৌন হয়রানী, ধর্ষণ, শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। এত কিছুর পরও স্নেহ মমতার মায়াবী পরশে সেই নারীরাই সৃষ্টিকে লালন করে যাচ্ছে। মালালা আমাদের দেখিয়েছে যতই প্রতিকূলতা আসুক নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, সকল প্রকার বৈষম্য ও অন্যায্যতার অবসানে, নিজেদের জন্য সুন্দর আবাসভুমি গড়ে তুলতে একদিন অসংখ্য মালালার জন্মদেবে এই ধরিত্রী। তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট ও বিভিন্ন মিডিয়া