ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

Picture2

অনেকদিন পরে অনেক সাধ্য সাধনা করে কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েছেন পরিবার পরিজনের সাথে দেখা করতে, তাদের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে, সে আশায় গুঁড়ে বালি। কারণ আপনি প্রাণটা নিয়ে যে বাড়িতে পৌঁছাতে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। যদিও ঈদের আনন্দ নিরাপদে উপভোগ করলেন, ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে যে নিরাপদে ফিরে আসবেন সেই আশা করাটাও যেন দুঃস্বপ্ন। গত কয়েক দিনে দেশের সড়কগুলো যেভাবে মৃত্যুর এক ভয়ংকর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে তাতে এই আশংকা করাটা অমূলক নয়। যে দিকে তাকাই শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু, ঈদের আনন্দটাই যেন মানুষের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঈদের ছুটি শুরুর সাথে সাথে মৃত্যুর এই মহা মিছিল শুরু হয়েছে, এখনো তা অব্যাহত আছে – থামছেই না। প্রতি বছর ঈদের সময় এলে এই মিছিলে মানুষের যোগ দেওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। ঈদ ছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়ও যে সড়কগুলো খুব একটা নিরাপদ থাকে তাও বলা যায় না, কারণ প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা, সেই সাথে প্রাণহানির খবর থাকবেই। অর্থ্যাৎ, বাড়ির বাইরে বের হওয়া মানে প্রাণটা হাতে নিয়ে বের হওয়া, সেই প্রাণ নিয়ে বাড়িতে আবার ফিরবেন কিনা সেই সংশয় সর্বদা থেকেই যায়।

পরিসংখ্যানঃ ঈদের ছুটির ১০ দিনে সারাদেশে প্রায় পৌনে দু’শ দুর্ঘটনা ঘটেছে যার বলি হয়েছে ২৪২ জন মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে, এবারের ঈদ মৌসুমে সব থেকে বেশি সংখ্যক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ঈদের সময় সব চেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছিল ২০০৯ সালে, সেবার ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল (প্রথম আলো, ২৫ জুলাই ২০১৫)। বিআরটিএ এর ওয়েবপেজে প্রদত্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৭৯৮৬৬ টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় ৫৯৬৫২ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন আরো তৎক্ষণাৎ আহত হয়েছে ৫৯৭৬৬ জন। হিসাব করলে দেখা যায় বছরে গড়ে প্রায় ৩৮০৩ টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে যার বলি হয়ে বছরে গড়ে ২৮৪১ জন মানুষ। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০ টি দুর্ঘটনায় ৮ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।এতো গেল পুলিশের দেওয়া তথ্য, বেসরকারী হিসাবে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলেই মনে করা হয়।

দুর্ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা গুলোকে মোটামুটি ৪ ভাগে ভাগ করা যায়, যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারানো, অন্য গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়া ও অন্য কোন বস্তু বা ধাক্কা খাওয়া। একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৯ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৩৪ শতাংশ, পিছন থেকে ধাক্কা জনিত কারণে ১৬ শতাংশ এবং স্পীড ব্রেকার ও অন্যান্য বস্তুতে ধাক্কা খাওয়ার কারণে ৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অন্যদিকে, দুর্ঘটনায় পতিত যানবাহনগুলোর মধ্যে ৪৬ শতাংশ বাস, ২৫ শতাংশ ট্রাক ও ১০ শতাংশ বেবি ট্যাক্সি/ টেম্পু। দেশের জাতীয় সড়ক বা মহাসড়ক গুলোতে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলো সাধারণত মারাত্মক আকারের হয়ে থাকে এবং প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা, দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ২৪ শতাংশই এই সড়কে ঘটে থাকে, এর পরেই আছে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম অংশ – সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া-রংপুর – দিনাজপুরগামী মহাসড়ক (১৩ শতাংশ), ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (৮ শতাংশ) ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-জামালপুর- শেরপুর সড়ক (৭ শতাংশ)। কারণ দেশে দ্রুত হারে জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে যেমন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরিকল্পিত শহরায়ন, তেমনি বাড়ছে পরিবহণের সংখ্যা। কিন্তু সেই তুলনায় তৈরী হচ্ছে না পরিকল্পিত আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। যার ফলে দিন দিন দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলছে।

সড়ক দুর্ঘটনারজন্য নির্দিষ্ট কোন একক কারণকে দায়ি করা যায় না। বিভিন্ন কারণে সড়ক দুর্ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ তাদের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার যে সকল কারণকে চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বা চালকের বেপরোয়া মনোভাব, মাত্রাতিরিক্ত গতি, মাত্রাতিরিক্ত ভার বহন, ত্রুটিপূর্ণ যানহাহন, রাস্তা ব্যবহারকারীদের জ্ঞান ও সচেতনতার অভাব, বিপদজনক সড়ক ও রাস্তার পরিবেশ, অদক্ষ চালক কর্তৃক যানবাহন চালনা বা প্রশিক্ষণ বিহীন চালক কর্তৃক গাড়ী চালনা, যানবাহন ঠিকঠাক ভাবে মেরামত না করা, ট্রাফিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা, মাদক সেবন করে গাড়ী চালনা, উল্টো পথে গাড়ী চালানো, হেলমেট ও সেফটি বেল্ট ব্যবহার না করা, ফুটপাত ছেড়ে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা, জেব্রাক্রসিং ও ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে সরাসরি রাস্তা পার হওয়া, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, বিপদজনক ভাবে ওভারটেকিং ইত্যাদি। তাছাড়াও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, একই রাস্তায় কম গতি ও উচ্চ গতির যানবাহনের চলাচল, মহাসড়কে অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।মারাত্মক দুর্ঘটনা গুলোর জন্য মূলত ভারি যানবাহন গুলো যেমন বাস, ট্রাকই বেশি দায়ি।

পরিণতিঃ সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। একটি সমীক্ষা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে যে সকল মানুষ মারা যায় তার ৭১ শতাংশ মানুষই ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। এই চিত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর প্রধান বলি হচ্ছে পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষেরা। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত পরিবার গুলো একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এবং সেই সাথে দেশ তার উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীকে অকালে হারাচ্ছে। এর সুদূর প্রসারি প্রভাব যেমন সেই পরিবার গুলোর উপর পড়ছে, তেমনি পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে।

প্রতিকারঃ সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা কোন একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। যদিও সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসাবে যানবাহন সমূহের অতিরিক্ত গতিকেই দায়ি করা হয়। তবু বলা যায়, সব দুর্ঘটনাই গতির কারণে হয় না, দুর্ঘটনার জন্য আমাদের মন-মানসিকতাও অনেকখানি দায়ি। দুর্ঘটনাকে একেবারে বন্ধ করা সম্ভবও নয়, কিন্তু সরকার, যানবাহনের চালক, মালিকপক্ষ, এবং আমরা সাধারণ মানুষ বা পথ ব্যবহারকারীরা সবাই যদি নিজেদের দায়িত্ববোধের জায়গায় যত্নশীল থাকি তাহলে দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তাতে করে জানমালের বিপুল ক্ষতি থাকে দেশ ও জাতিকে বাঁচানো যাবে। বিআরটিএ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সড়ক ব্যবহারের কিছু নির্দিষ্ট বিধি-বিধান মেনে চললে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

সরকারের দায়বদ্ধতাঃ দেশের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। এত হাজার হাজার অবাঞ্ছিত মৃত্যুকে রোধ করতে সরকারকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। জনস্বার্থ বিবেচনায় দেশের ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, বিআরটিএ এর সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের সঠিক নিয়মকানুনের প্রয়োগের উপর নজরদারী, ভুয়া লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, লাইসেন্স বিহীন ও ফিটনেস বিহীন গাড়ী চালনা করার উপর কঠোর বিধি-নিষেধ প্রভৃতি কার্যক্রমগুলো নেওয়া খুবই জরুরী। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে যেমন দেশের মহাসড়কগুলোকে সচল রাখা প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সচল রাখাও জরুরি। দু’টি বিষয়কে মাথায় রেখে সরকারের সড়ক ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মহাসড়কগুলোতে অযান্ত্রিক ও কম গতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। শ্যালোমেশিনের ইঞ্জিন ব্যবহার করে তৈরী নছিমন-করিমন জাতীয় যানবাহন তৈরী ও চালনা বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে মহাসড়কের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহণের জন্য রাস্তার ব্যবস্থা করা জরুরী। মহাসড়কের পাশের সকল বাজার নিরাপদ দুরত্বে সরিয়ে নিতে হবে। সম্ভব হলে কমিউনিটি ট্রাফিক পুলিশ ব্যবস্থা/ বেসরকারী খাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করে স্থানীয় পর্যায়ের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

চালক ও মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতাঃ একথা অনস্বীকার্য যে, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকেরই দায়-দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। চালক যদি সতর্কভাবে, নিয়ন্ত্রণ রেখে গাড়ী চালায় তাহলে যে কোন সময় যে কোন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব। তাছাড়া গাড়ি চালনা নিয়মাবলী সম্পর্কে চালকের যথেষ্ট জ্ঞান থাকা এবং সেই সাথে নিয়মাবলী মেনে চলার প্রতি তার সম্মানবোধ থাকা অতি জরুরি। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতাকেও অস্বীকার করা যায় না। গাড়ির মালিকরা যদি যথোপযুক্ত চালকের হাতে গাড়ীর দায়িত্ব দেয়, সঠিক নির্দেশনা মেনে গাড়ির মেরামতের কাজ করে তাহলে গাড়ি দুর্ঘটনার হার অনেক কমে আসবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার শুধু সড়কে চলাচল করার অপরাধে সীমাহীনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হয়তো অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের মুল উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপুরণ দেওয়ার কোন বিধান সরকার বা সংশ্লিষ্ট পরিবহণের মালিকপক্ষ কারোরেই নেই। যদি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলে হয়ত দুর্ঘটনা যেমন কমিয়ে আনা সম্ভব হতো তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির অন্ততঃ কিছুটা পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। মানুষ ভালভাবে বাঁচার আশায় সড়কে নামে, লাশ হয়ে ঘরে ফেরার জন্য নয়। কাজেই সড়কে অবশ্যই নিরাপদ রাখতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. The Daily Prothom Alo, 25 July 2015
  2. BRTA web site
  3. BRTA Report 2008
  4. Major Fatal Road Accidents in Bangladesh: Characteristics, Couses, and Remedial, Prof. Dr. Md. Mazharul Huque et al.
  5. Internet