ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

আজব শহর ঢাকা, সব কিছুই তার বাঁকা, এখানে সব কিছুই চলে উলটোপথে। সহজপথে পথে চলাটাই যেন এখানে অনিয়ম। এই ধরুন ঢাকার ট্রাফিক (ট্রাফিক বলতে কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ নয়, যা কিছু রাস্তায় চলাচল করে তাই ট্রাফিক), এ এক আজব মাল! বিবর্তনের পথে হাটতে হাটতে ঢাকার ট্রাফিক কোথায় এসে দাড়িয়েছে তা নিয়ে আমার কল্পকাহিনী ‘বেরসিক মেট্রো’ (জুরাসিক সিরিজের কাট-কপি-পেস্ট ভার্সন) এর একটা চিত্রনাট্য দাঁড় করিয়েছি, শুনুন সেই কাহিনীর বিভিন্ন কল্পিত চরিত্রের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ

১। মফিজঃ ‘পথচারী’ নামক প্রাণীটির বিবর্তিত রূপ। বিবর্তনের খাতায় নতুন আমদানী, বুদ্ধি-সুদ্ধি কম। যখন যেদিকে মন চায় সেদিকেই হাটা দিয়ে দেয়। কোন দিক দিয়ে কি আসল – কি গেল সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে ট্রাক চাপায়, গাড়ী চাপায় সটান উপরে।

২। উল্লুকঃ ‘রিক্সা’ নামক প্রাণিটির বিবর্তিত রূপ। নিরীহ গোবেচারা জাতের প্রাণী, চোখে দেখতে পায় না। রাস্তাকে ফুটবল খেলার মাঠ ভেবে যখন যেদিকে মন চায়, সেদিকে প্যাডেল চালিয়ে দেয়, কোন কিছুকেই পরোয়া করে না। মুখের ভাষা বোঝা কঠিন (হায়ারোগ্লফিক্স হতে পারে)। কারো সঙ্গে ঠোকাঠুকি বাঁধলে রাস্তার মাঝে দাড়িয়েই ঝগড়া করতে থাকে, পিছনের গাড়ীর বেল-হর্ণ কিছুই কানে যায় না, মানা করলে উৎসাহ দিগুণ বেড়ে যায়। রাস্তার ‘রং সাইড’ এ চলতে ভালবাসে। মাঝে মাঝে যাত্রী সমেত রাস্তায় চিৎপটাং হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সমগোত্রীয় – ঠ্যালা, রিক্সাভ্যান ইত্যাদি।

৩। বান্দরঃ ‘মোটর সাইকেল’ নামক প্রাণীটির বিবর্তিত রূপ। ‘ডারউইন বলেছিল মানুষ বানর ছিল’ – ডারউইনের এই তত্ত্বকে উল্টাদিক থেকে প্রমাণ করেছে। রাস্তার উলটা সাইড-ফুটপাত-ডিভাইডার-নর্দমা-অলি-গলি সব কিছুর উপর দিয়ে দিব্যি খেমটা তালে দুলকি চালে লাফাইতে লাফাইতে চলে যায়। যেখানেই একটু ফাঁক পাবে অমনি মাথা গুঁজে দিবে। রাস্তার ‘রং সাইড’ এ চলায় জুড়ি মেলা ভার। এই মালটির পিঠে চড়ে কেরামতি দেখাতে গিয়ে  ঢাকা শহরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সার্কাস বালক অক্কা পেয়ে থাকে।  সমগোত্রীয় – বাই সাইকেল।

৪। ছাগলঃ ‘সিএনজি অটো’ নামক একটি প্রাণীটির বিবর্তিত রূপ। নিরীহ জাতের প্রাণী হলেও সাইকোলজি বোঝা দুস্কর। কখন কোন দিকে টার্ন নিবে বলা কঠিন। রাস্তার ‘রং সাইড’ কেই ‘রাইট সাইড’ মনে করে চলে থাকে। একটু বৃষ্টি হলে কুপোকাত – রাস্তার মাঝেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে থাকবে। মুখের ভাষায় রিক্সার সমগোত্রীয়। বেশির ভাগ সময় ট্রাকের তলে ঠাঁই নেয়। কথিত আছে, বাংলাদেশের মহাসড়ক গুলোতে নাকি এই মালটির জন্যই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সমগোত্রীয় – অটো, টেম্পু, করিমন-নছিমন ইত্যাদি জাতীয় যত ‘মন’ আছে।

৫। রামছাগলঃ ‘কার’ নামক প্রাণীটির বিবর্তিত রূপ, ছাগলের সাথে অতিরিক্ত একটি মাত্রা যুক্ত আছে বলে আচরণও অনেকটা তাই। দামে দামী হলেও কামে অতি নিকৃষ্ট। রাস্তাকে বাপের সম্পত্তি মনে করে উদাম তালে পশ্চাদ দেশের সঙ্গীত বাজাতে বাজাতে ইচ্ছামত চলে। ‘রং সাইড – রাইট সাইড’ কোনদিকেই ভ্রুক্ষেপ নাই। রাস্তায় নিজে নিজে চিৎপটাং হতে বিশেষ পারদর্শী। যখন তখন যার-তার পাছায় ধাক্কা মেরে বনেট ভচকায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাস্তায় একটু জল জমলেই কেল্লাফতে, ভ্যাঁ ভ্যাঁ শব্দে কান রাখা দুস্কর। সমগোত্রীয় – মাইক্রোবাস, জীপ ইত্যাদি।

৬। মহাছাগলঃ ‘মিনিবাস’ নামক একটি প্রাণীর বিবর্তিত রূপ, এই মালটিও বিবর্তনের খাতায় নতুন সংযোজিত। রং চটা জিন্সের প্যান্টের মতো লক্কর-ঝক্কর চেহারা, দেখে মনে হয় বাপের জন্মেও গায়ে তেল-সাবান লাগায় না। মালটির আচরণ দেখে মনে হয়, ‘গাধা-ঘোড়া’র সংকর জাত প্রাণীটির জাতভাই। প্রাণীটির বেশিরভাগ সদস্যই পশ্চাদদেশ দিয়ে বিদঘুটে ‘কালো বায়ু’ ছাড়ে। ‘বিরতিহীন’ সাইন বোর্ডের দৌলতে রাস্তার মাঝখানে বিরতিহীন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। পাঁঠার ঐ জিনিসটির মতো হেলেদুলে রাস্তা চলে। পথচারী-রিক্সা-সিএনজি অটো-কারকে চাপা দিতে বিশেষ পারদর্শী। সমগোত্রীয় – মিনিট্রাক, পিক-আপ ভ্যান ইত্যাদি। বলা হয়ে থেকে ঢাকা শহরে যানবাহনের ধাক্কায় যত মানুষ অক্কা পায়, সেখানে এই মালটির কৃতিত্ব সব থেকে বেশি।

৭। গন্ডারঃ ‘ট্রাক-হেভি বাস-কন্টেইনার ট্রলি’ জাতীয় প্রাণীগুলি এই জাতের বিবর্তিত রূপ। স্বাস্থ্যের বদৌলতে ঘোৎ ঘোৎ করতে করতে রাস্তা চলে আর সামনে যা পায় তাই মাড়িয়ে দিয়ে চলে যায়। পশ্চাদদেশ দিয়ে বিচ্ছিরি-বিদঘুটে ‘কালো বায়ু’ ছাড়তে এর জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ ইমডেননিটি প্রাপ্ত, মানুষ – প্রাণী মারলেও তার কিছু যায়-আসে না। রাজনৈতিক ‘গড ব্রাদার’ এর বদৌলতে যখন-তখন স্ট্রাইক ডাকলে দেশ অচল! কথিত আছে দেশে প্রতি বছর সড়কে যত মানুষের অপমৃত্যু ঘটে তার নাকি ৭১ শতাংশই এই মালগুলির চাকায় পিষ্ট হয়ে মরে!

৮। দুর্নীতিবাজঃ ‘জাতীয় পতাকাবাহী গাড়ী’ এই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। বিবর্তনের পথে সর্বাধুনিক সংযোজন। ভগবান এই মালটারে যে কেন সৃষ্টি করল কে জানে। পুলিশ প্রোটেকশন নিয়ে, সাইরেন বাজিয়ে সব সময় ‘রং সাইড’য়েই চলবে। তবে শুধু এই মালটিই নয়, দেশে যত সাইনবোর্ডধারী গাড়ী আছে, সবগুলোই একই চিজ। যেমন-কথিত সাংবাদিকের মোটর সাইকেল / গাড়ী, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা টিভি চ্যানেলের গাড়ী, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবাহী গাড়ী এবং আরো যত লালবাতি ওয়ালা গাড়ী আছে সবাই একই গোয়ালের গরু। লাইসেন্স করা অস্ত্রের জোরে, মস্তানি করে উলটা সাইডে রাস্তা বের করবেই, তাতে রাস্তায় যতই জ্যাম লাগুক না কেন। মুখে নীতির ফুলঝরি ঝরলেও কাজের বেলায় ঠনঠন। রাস্তায় নামলে মফিজ পাবলিক আর মহাজ্ঞানী-মহাজনে কোন পার্থক্য থাকে না। অন্যকে ল্যাং মেরে নিজে আগে যেতেই হবে!

রাস্তায় এতসব বিচিত্র প্রাণীর কান্ডকীর্তি দেখে ‘ট্রাফিক পুলিশ’ ব্যাটার তো ভিরমি খাওয়ার জোগার। কাউকেই যখন সামলাতে পারে না, তখন সিগন্যালের এককোণায় বসে ‘বিরহী প্রেমিক’ এর মতো “চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে – আমার বলার কিছু ছিল না’ গাইতে থাকে আর বুড়ো আঙ্গুল চোষে। তবে কাওরানবাজারের মাছের আড়তের সিগন্যালের কাছে রিক্সা ও রিক্সা ভ্যানওয়ালার কাছ থেকে বাম হাতে ‘প্রেম পত্তর’ নিতে কখনই ভোলে না।

(সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ সব চরিত্রই কাল্পনিক, ভুলেও কেউ নিজের সাথে তুলনা করবেন না।)