ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

রাজন-রাকিব-রবিউল-রাজা … নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিতের সারি দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। মানুষ ক্রমেই শিশু-কিশোরদের উপর বন্য হয়ে উঠছে। দারিদ্র পীড়িত খেটে খাওয়া শিশু-কিশোরদের সামান্য ছুতোয় নির্যাতন – হত্যা একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। বই-খাতা-কলম হাতে নিয়ে যাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, আর দশটা শিশুর মতো উদ্দাম আনন্দে মেতে থাকার কথা, দারিদ্রের নির্মম কষাঘাত তাদের জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। নিজেকে বাচিয়ে রাখা, পরিবারকে বাচিয়ে রাখার তাগিদে শিশুরা সুন্দর জীবনের স্বপ্নকে জ্বলাঞ্জলী দিয়ে পথে নামতে বাধ্য হয়েছে। রাস্তা থেকে কাগজ কুড়ানো, প্লাস্টিক বোতল কুড়ানো, কুলিগিরি, অন্যের ফাই-ফরমায়েশ খাটা, কখনও নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিভিন্ন দোকান খামারের কাজ, কখনও বা শুধু খাবারের বিনিময়ে গৃহস্থালী ভৃত্য হয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হচ্ছে। তাদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সমাজের কিছু মানুষ নিয়মিত শিশুদের নির্যাতন – শোষণ করে চলেছে। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মারাত্মকভাবে জখম হওয়া তো নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, সেটা কখনও কখনও ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিনের খবরের মাধ্যমগুলো খুললেই নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার বিভৎস সব ঘটনার খবর দেখতে পাওয়া যায়। ঘটনার সংখ্যা ও নির্যাতনের নারকীয়তা দিন দিন যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে মনে হয় মানুষ যেন তার মনুষ্যত্ববোধের জায়গা থেকে সরে গিয়ে পশুর রূপ ধারণ করেছে এবং ভিন্নমাত্রিক লালসা ও নির্মমতা সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।

শিশু রাজনকে নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে হত্যাকারিদের যৌন লালসার একটি ঈঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সমাজে ছেলে শিশুদের উপর যৌন সহিংসতার বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। আমার সেই লেখায় কর্মজীবী ও পথশিশু (বিশেষতঃ ছেলেশিশু) দের উপর যৌন সহিংসতার কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজকের লেখায় এই বিষয়ে আরো গভীরভাবে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

don

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, গত সাড়ে তিন বছরে দেশে প্রায় হাজার খানেক শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এইসব হত্যাকান্ডের অনেকগুলোতেই যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের আলামত সুস্পষ্ট। তবে আমার এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য যেহেতু কর্মজীবি ও পথশিশুদের উপর যৌন সহিংসতার বিষয়ক আলোচনা তাই সে প্রসঙ্গে পরবর্তী কোন নিবন্ধে আলোচনা করতে পারব বলে আশা রাখি।

রাজনও রাকিবের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে যদি একটু গভীরভাবে খতিয়ে দেখি, তাহলে দেখা যাবে সব ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। সবগুলো ঘটনার সাথে প্রকট ও প্রচ্ছন্ন ভাবে হত্যাকারীদের বিকৃত যৌন লালসার চিত্র ফুটে উঠেছে। রাজনের হত্যাকারীরা রাজনের উপর ‘ঐ কাম’ করতে চেয়েছিল, খুলনার শিশু রাকিবের পায়ুপথে টায়ারে হাওয়া দেওয়ার নল ঢুকিয়ে হাওয়া দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মানুষের এই ধরণের নির্যাতন প্রবণতাও একধরণের বিকৃত যৌন লিপ্সা থেকেই সৃষ্টি হয়। এই দুটি ঘটনা স্বাভাবিকভাবে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, আমাদের সমাজে কর্মজীবি ও পথে বসবাসকারী ছেলেশিশুরা প্রতি মূহুর্তে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কিন্তু ছেলেশিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের বিষয়টি এখনো আমাদের সমাজ তথা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই একটি ট্যাবু হিসাবে কাজ করে এবং তাই উপেক্ষা করে চলা হয়। বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও মানুষ সেটাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে। আক্ষরিক অর্থে ছেলেদের উপর যৌন নির্যাতন তার পরবর্তী জীবনে বিশেষতঃ বিয়ের ক্ষেত্রে তেমন কোন প্রভাব ফেলে না বলে এই অনাচারকে নির্যাতন হিসাবে গণ্য করা হয় না এবং এর কোন আইনগত সুরক্ষাও নেই। অন্যদিকে সমাজে ছেলেশিশুরা মেয়েশিশুদের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে এবং মনে করা হয় তারা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম যে কারণে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে পরিবার থেকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে খুবই অল্প বয়সে ছেলে শিশুদের কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যেতে হয় এবং সেখানে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। যার ফলে দেখা যায় মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলে শিশুরা অনেক বেশি নিরাপত্তা হীনতার মধ্যে বাস করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ বছর পর্যন্ত ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকল শিশুই যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সমানভাবে ঝুকিপূর্ণ, যদিও এর পরে মেয়ে বা নারীরা ঝুকিপুর্ণ থাকলেও ছেলেদের উপর প্রভাব কিছুটা কমে আসে, তারপরেও দেখা গেছে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ছেলেরা পুরুষের যৌন ভোগের বস্তু হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে বিশেষতঃ যারা ভৃত্য হিসাবে কাজ করে তাদের উপর এই প্রবণতা অনেক দিন ধরেই চলে। ধারণা করা হয় যে, প্রতি ছয়জনের একজন ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে এবং সেই হার ক্ষেত্র বিশেষে অনেক বেশি। ইউনিসেফ তাদের একটি গবেষণায় দেখিয়েছে, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু, দরিদ্র পরিবারের শিশু, রাস্তায় বসবাসকারী ও রাস্তায় জীবিকা নির্বাহকারী শিশু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিশু, বস্তিতে বসবাসকারী শিশু, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও প্রাকৃতিক দূর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশু, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর শিশু (ethnic minority), যৌনকর্মীদের শিশুরা সব থেকে বেশি যৌন সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে।

পথশিশুরাহারিয়ে যাওয়া শৈশব, চুরি হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ, ফিকে হয়ে যাওয়া বড় হওয়ার স্বপ্ন আর ডাকাতি হয়ে যাওয়া অধিকারের বিমূর্ত প্রতীক। রাস্তাই তাদের বাসস্থান, রাস্তাই তাদের কর্মস্থল, রাস্তাই তাদের বিনোদনের জগৎ, রাস্তাই তাদের রাতের স্বপ্নের শয্যা। সভ্য মানুষ তাদের ‘রাস্তার পোলা’, ‘বেজন্মা’, ‘কাঙ্গাল’, ‘ফকির’, ‘ছোট লোক’ বা আরো একটু আদর করে ‘টোকাই’ বলে ডাকে। মানুষের কাছে হাত পেয়ে দয়া দাক্ষিণ্য নেওয়া, বিপদজ্জনক কাজে নিয়োজিত হয়ে অমানসিক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করাই তাদের জীবন, তারপরেও পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয় অত্যাচার নির্যাতন। তারা আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতো জীবনযাপন কোন দিনই করতে পারে না। বাঁচার জন্য যে কোন উপায়ে তাদের উপার্জন করতেই হবে। তাদের এই টিকে থাকার লড়াইয়ে তাদের সমস্ত অধিকারগুলোই ঝুঁকির মুখে। প্রতি মূহুর্তে শোষণ-নির্যাতনের শিকার হলেও কোন ধরণের প্রতিকার, ন্যায় বিচার তারা কখনই পায় না। তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি নির্বিঘ্নে যৌন নির্যাতন ও শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে।

শিশু অধিকার রক্ষায় প্রবর্তিত বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও সনদে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,

১। দেশের প্রচলিত আইনের যারা অপ্রাপ্ত বয়স্ক তথা যৌন কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার বয়স হয় নি, তাদের সাথে যৌন কর্মযৌন নির্যাতন বলে গণ্য হবে। বল প্রয়োগ বা হুমকি প্রদর্শন করে শিশুর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, শিশু বা তার পরিবারের উপর বিশ্বাস, কর্তৃত্ব ও প্রভাবের সুযোগ নিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, শিশুদের অসহায়ত্ব ও নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন যৌন নির্যাতন বলে গণ্য হবে। বাংলাদেশে যৌন কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার ন্যুনতম বয়স ধার্য করা হয়েছে ১৪ বছর (কিন্ত ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত যেহেতু একজন মানুষ আইনতঃ প্রাপ্ত বয়ষ্ক হয় না, সেহেতু ১৮ বছর বয়সের পূর্বে কারো সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া অপরাধ হিসাবেই গণ্য হওয়া উচিৎ)

কর্মজীবি ও পথশিশুরা সাধারণতঃ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যেমন, চায়ের দোকান, হোটেল, গ্যারেজ, ঝালাইয়ের দোকান, বিড়ি-সিগারেটের কারখানা, আড়তের কুলি, বাস-ট্যাম্প-ট্রাকের হেলপার, গৃহস্থালী ভৃত্য ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকে। এসব কর্মক্ষেত্রে শিশুদের দেখাশোনা করার বা নিরাপত্তা দেওয়ার মত কেউ থাকে না, সেখানে চাকুরীদাতাই তাদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে চাকুরীদাতা, সহকর্মী, পুলিশ, শ্রমিক কর্মকর্তা ও খদ্দেররাই বেশীর ভাগে ক্ষেত্রে কর্মজীবি শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন করে থাকে। এ সকল কর্মক্ষেত্র প্রচলিত আইন দিয়ে খুব একটা নিয়ন্ত্রিত হতে দেখা যায় না, তাই শিশু সুরক্ষা আইন বা শ্রম আইনের প্রয়োগও এখানে কখনও দেখা যায় না, ফলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নির্যাতনের প্রবণতাও এখানে বেশি থাকে। দ্বন্দ-সংঘাত পূর্ণ অঞ্চল যেখানে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে সেখানে শিশুদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়। এ সকল এলাকায় পুরুষ ও ছেলে শিশুরা জীবনের ভয়ে সামরিক বাহিনীতে যেতে বাধ্য থাকে এবং এসব ক্ষেত্রে ছেলেশিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

রক্ষণশীল সামাজিক ব্যবস্থার কারণে পুরুষে পুরুষে যৌনকর্মের বিষয়টিকে ট্যাবু হিসাবে দেখা হয় বলে এই বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। সারা বিশ্বে নির্যাতন ও হয়রানীর বিষয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার এনজিও কাজ করলেও ছেলে শিশুদের উপর নির্যাতনের বিষয়ে ৩ শতাংশেরও কম এনজিও এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত আছে। এ কারণে ছেলেশিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের বিষয়টিকে অনুধাবন করতে হলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী, প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, সামাজিক প্রথা ও বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্তের উপর ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। গবেষণায় ছেলে কর্মজীবি ও পথশিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের যে সকল ঝুঁকিপুর্ণ ক্ষেত্র ও বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে সেগুলো হলো –

১। কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন
২। রাস্তায় বসবাসকারী শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন
৩। প্রথাগত যৌন নির্যাতন
৪। শিশু পর্ণগ্রাফি
৫। যৌন ব্যবসা (ছেলে যৌনকর্মী)
৬। ভ্রমণ ও পর্যটন ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন

শিশুরা যখন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা পরিবারের দারিদ্রতার কারণে জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নেমে আসে তখন তারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। যৌন সহিংসতা ও শোষণ এসব নির্যাতনের মধ্যে অন্যতম। নারী ও শিশুদের (বিশেষতঃ মেয়েশিশু) উপর যৌন সহিংসতা ও নির্যাতন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও পুনর্বাসন প্রকল্প থাকলেও, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও মন-মানসিকতার কারণে পুরুষ তথা ছেলেশিশুদের উপর যৌন সহিংসতার বিষয়টিকে বরাবরই উপেক্ষা করা হয়েছে। যার ফলে এ বিষয়ে খুব বেশি গবেষণা ও পুনর্বাসন প্রকল্প দেখা যায় না। যে কারণে ঘটনার যথেষ্ট প্রাদুর্ভাব থাকা সত্ত্বেও ছেলে শিশুদের উপর যৌন সহিংসতা ও শোষণের অনেক বেশি তথ্য পাওয়া যায় না।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পথশিশু ও কর্মজীবি শিশুদের উপর যৌন সহিংসতা ও শোষণের বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে যে সকল গবেষণা হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে আমাদের দেশের পথশিশু ও কর্মজীবি শিশুদের অবস্থা ব্যাখা করার চেষ্টা করব। প্রায় সকল গবেষণাতেই ধর্ষণ, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত যৌনকর্ম, মাদকের ব্যবহার, পর্ণগ্রাফির মতো প্রভৃতি যৌন নির্যাতন বিষয়গুলোকে পাওয়া গেছে।

নেপালের কাঠমান্ডু শহরের পথশিশুদের উপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ১০০ জনের মধ্যে ৬৩ জন উত্তরদাতাই বলেছে তারা তাদের বন্ধুদের যৌন নির্যাতনের কথা জানে। (বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে গবেষক পরোক্ষভাবে জানার চেষ্টা করেছেন, এখানে উওরদাতাগণ বন্ধুদের কথা বললেও আসলে তারা নিজেদেরই কথা বলেছে বলে গবেষক অভিমত ব্যক্ত করেছেন)। সাধারণভাবে স্বমেহন, ওরাল ও অ্যানাল সেক্সের কথা তাদের উওরে উঠে এসেছে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ভ্রমণকারী (৬৭%) ও পথশিশুদের নেতারাই (২৪%) যৌন নির্যাতনকারী হিসাবে পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে সাধারণত বিদেশী ভ্রমণকারীরাই শিশুদের পর্ণ ফিল্ম দেখিয়েছে বা নগ্ন ছবি তুলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৭ শতাংশ শিশু বলেছে তারা এক বা একাধিক বার যৌন নির্যাতন ও শোষণের শিকার হয়েছে। যে সকল শিশু যত বেশি দিন ধরে রাস্তায় আছে তাদের নির্যাতিত হওয়ার হার তত বেশি। ছেলে শিশুরা সাধারণত ‘পেডোফিল’ (শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষিত ব্যক্তি বিশেষ) দ্বারা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ১০ জন উওর দাতা বলছে তারা ‘মহিলা পেডোফিল’ দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। উত্তরদাতারা বলেছে তারা মহিলা ভ্রমণকারীর পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করার সময় যৌন কর্মে লিপ্ত হয়েছে এবং বেশি পারিশ্রমিক/বকশিস পেয়েছে। নির্যাতনকারীরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের অর্থের প্রলোভনে দেখিয়ে প্রথমে যৌন নির্যাতনের করে থাকে, অন্ততঃ ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে কোন না কোন ধরণের বল প্রয়োগের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের গড় বয়স ছিল ১১ বছর।

মানুষের যৌন লিপ্সার আর একটি নির্মম দৃষ্টান্ত হলো আফগানিস্তানের ‘বাছা বাজি’ প্রথা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই প্রথায় দরিদ্র পরিবারের ছেলেশিশুরা প্রভাবশালীদের প্রমোদ ও লালসার পণ্য হিসাবে গণ্য হয়ে আসছে। ‘বাছা বাজি’ প্রথায় প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া ছেলেশিশুদের নাচ শেখানো হয় এবং মেয়েদের মতো পোশাক পরিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান, পার্টি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে নাচানো হয়। তারা তাদের মনিবের যৌনসঙ্গী ও সম্পত্তিরূপে গণ্য হয়ে থাকে। সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে মেয়েদের নিয়ে ভ্রমণ করা এখানে কষ্টসাধ্য, তাই ‘ছেলে সঙ্গীনি’র চাহিদা অনেক বেশি। উপজাতি অধ্যুষিত পাকিস্তানের কিছু কিছু অংশেও এই প্রথা বিদ্যমান। যুদ্ধরত অনেক সামরিক কমান্ডারদের একাধিক ছেলে ‘সঙ্গিনী’ থাকার খবর আছে। প্রায় সবক্ষেত্রেই ছেলেশিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।

সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে পাকিস্তানে ছেলেশিশুরা যৌন নির্যাতন ও শোষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কারণ চিরাচরিত সামাজিক প্রথা নারীদের ‘সতীত্ব’ রক্ষায় অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে সেখানে বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্ককে অত্যন্ত কঠোরভাবে ‘প্রতিহত’ করা হয়। কিন্তু পুরুষের সাথে ছেলেদের যৌন সম্পর্ক একটি স্বাভাবিক ঘটনা যা ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (অধুনা খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ) প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপর পরিচালিত জরীপে দেখা যায়, ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা ছেলেশিশুদের সাথে যৌন সম্পর্ককে গর্বের বিষয় হিসাবে দেখে, ১১ শতাংশ তাদের আভিজাত্যের প্রতীক মনে করে, ১১ শতাংশ এই কাজকে খারাপ মনে করে না। অবিবাহিত ছেলেরা সেখানকার পুরুষদের কাছে লোভনীয় ‘সুদর্শন যুবা’ হিসাবে পরিগণিত। লাহোরে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে পথশিশু ছেলেদের ৮০ শতাংশরই দেহ ব্যবসা বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে যৌন কর্মের অভিজ্ঞতা রয়েছে। করাচীতে পরিচালিত একটি সমীক্ষা বলছে সেখানে ৬৩ শতাংশ পথশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার যাদের এক-তৃতীয়াংশ আবার গণধর্ষণেরও শিকার হয়েছে। পাকিস্তানের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলেশিশুদের ৬ জনের মধ্যে ১ জন কর্মজীবি এবং তারা তাদের খাদ্য, আশ্রয় ও আয়ের জন্য চাকুরীদাতার উপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত পরিশ্রম বা নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে তাদেরকে মালিকের সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য হতে হয়। আরও দেখা গেছে ট্রাক ড্রাইভারের খালাসী হিসাবে যারা কাজ করে ‘ওস্তাদ’ কে যৌন তৃপ্তিদান তাদের চাকুরীর একটি দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়।   সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানে যৌন ব্যবসায় নিয়োজিত ছেলেদের অধিকাংশই পূর্বে যৌন নির্যাতনের শিকার এবং অপরাপর অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তাদের পরিবার ছেড়ে পথে চলে আসতে বাধ্য করেছে এবং জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে দেহব্যবসা শুরু করেছে। পাকিস্তানে ছেলেদের যৌন ব্যবসা বাসস্ট্যান্ড ও টার্মিনাল (৫২ শতাংশ) এবং হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট (২৩ শতাংশ) এবং অবশিষ্ট সিনেমা হল, ভিডিও দোকান ও পার্কে হয়ে থাকে। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ধর্মীয় ভাবে পুরুষের মধ্যে সমকামীতা নিষিদ্ধ হলেও সামাজিক ভাবে অবৈধ নয় এবং ছেলে যৌনব্যবসায়ীরা খদ্দেরদের কাছে সহজলভ্য মহিলা যৌনকর্মীর চেয়ে সস্তা বলে বিবেচিত হয়। ছেলেরা গর্ভবতী হয় না এবং তাদের অন্যান্য শারীরিক উপসর্গের সম্ভাবনা কম বলে ছেলেদের প্রতি আকর্ষণ আরো বেশি।

ভারতের বৈচিত্র্যপূর্ণ আর্থ-সামাজিক ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে ছেলেশিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা পরিলক্ষিত হয়। ভিন্ন ভিন্ন সমাজ বা গোত্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের মধ্যে অর্থনৈতিক পার্থক্য সেখানে ছেলেদের মধ্যে ব্যাপক অভিবাসন প্রবণতা তৈরী করেছে। এই অভিবাসনের কারণে শিশুরা সেদেশের বিভিন্ন বড় বড় শহর যেমন- মুম্বাই, দিল্লী, কলকাতা, চেন্নাই, হায়দারাবাদ, ব্যাঙ্গালোর প্রভৃতি শহরের বস্তি ও রাস্তাতে আশ্রয় নেয়। ভারতে সর্বাধিক সংখ্যায় ক্ষুদ্রজাতি সত্ত্বা (আদিবাসী), দলিত শ্রেণী ও তপশীলি জাতি-উপজাতি মানুষের বসবাস। তবে এ সকল শ্রেণীর মেয়ে ও নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতা ও পাচারের ঘটনা সর্বজনবিদিত হলেও ছেলেশিশুদের পাচারের হওয়ার তথ্য তেমন পাওয়া যায় না। কিন্তু দারিদ্রতা ও জাত বিভেদের কারণে এই শ্রেণীর ছেলেরা সাধারণতঃ নিম্নমানের কাজের সাথে জড়িত তাই ছেলেদের উপর যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। অন্যদিকে বর্ণ প্রথা ও দারিদ্রতার কারণে বিপুল সংখ্যক ঋণ দাসত্ব (Bonded Labour) প্রথা বিদ্যমান। সমীক্ষা থেকে জানা যায় ১৫ মিলিয়নের অধিক শিশু এখানে ঋণ দাসত্বের বোঝা বয়ে চলেছে। যদিও ভারতের এসব ঋণ দাস ছেলেদের উপর যৌন সহিংসতার তেমন উপাত্ত পাওয়া যায় না, তবে অন্যান্য দেশের চিত্রের সাথে তুলনা করলে যৌন সহিংসতার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব। হায়দারাবাদ শহরের ছেলে যৌনকর্মীদের উপর পরিচালিত একটি জরীপে দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরে এসে নিচু মানের কাজ যেমন – কাগজ কুড়ানো, দিনমজুর, হোটেলের কাজ, চা ফেরি শুরু করে এবং সে সময়ই তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় যা তাদেরকে যৌনকর্মী হওয়ার পথে ঠেলে দেয়। সেই সমীক্ষা থেকে জানা যায়, যারা মহিলা খদ্দেরদের জন্য যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করে তারা সঙ্গীদের চাপে পড়ে অথবা মহিলাদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে এই কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে পুরুষদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে এবং নিজের জীবিকার তাগিদে ও পরিবারকে সাহায্য করার জন্যও যৌনকর্মীর পেশা বেছে নিয়েছে।

হায়দারাবাদের গবেষণা থেকে দেখা যায়, পথশিশুদের উপর সংঘটিত যৌন নির্যাতনের ৭০ ভাগ পুলিশ, হিজড়া, বেশি বয়সী বালক এবং কমিউনিটির পুরুষ করেছে। এই সব বালকদের ৭৫ শতাংশ শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য কাজ করে থাকে। গবেষণা থেকে আরও দেখা যায়, বিবাহিত ও অবিবাহিত উভয় শ্রেণীর মহিলাই যৌনকর্মী বালকদের যৌন শোষণ করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনা রাস্তা ও পার্কে ঘটে থাকে।ভারতে প্রথাগত যৌন নির্যাতন ও শোষণের আর একটি মাধ্যম হলো, ‘লন্ডা ড্যান্সার’ প্রথা। বিয়ে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছেলেদের মেয়ের পোষাক পরিয়ে নাচানো হয়। মূলত হিজড়ারা এই কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকলেও অন্যান্য গরীব পরিবারের ছেলেরাও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সমীক্ষা থেকে দেখা যায় ৬০ ভাগ লন্ডা ড্যান্সার যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করার সময় গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। বেকার মওসুমে এই লন্ডা ড্যান্সাররা আফগানিস্তানের বাছা বাজিদের মতো প্রভাবশালীদের ‘মিসট্রেস’ হয়ে থাকে যা তাদের ঐসব প্রভাবশালীদের যৌন সঙ্গী হতে বাধ্য করে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বিভিন্ন কারণে ছেলেশিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরে এসে প্রথমে অতি সামান্য রুজির কাজ শুরু করে যেমন – রাস্তার কাগজ বা আবর্জনা কুড়ানো, মজদুরী, চা-বিড়ি বিক্রি, হোটেল কর্মী, পরিবহন খাত বা গ্যারেজের কাজ ইত্যাদি। এসব কাজ করার সময়ই তারা বিভিন্নভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এবং পরবর্তিতে যৌনকর্মীর পেশা বেছে নেয়।

দক্ষিন এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কর্মজীবি ও পথশিশুদের উপর যৌন সহিংসতার প্রকট উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।ইউনিসেফ ২০০৬ সালে প্রকাশিত তাদের এক গবেষণায় জানিয়েছে, বাংলাদেশে সে সময় ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সের প্রায় ৪.৯ মিলিয়ন শিশু (ঐ বয়সী মোট শিশুর ১৩ শতাংশ) বিভিন্ন প্রকার শ্রমের সাথে জড়িত। দেশের শহুরে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার (৫.৬ শতাংশ) বিবেচনা করলে সেই সংখ্যা এখন প্রায় ৬.২ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। এই সব কর্মজীবি শিশুর একটা বড় অংশ হলো ছিন্নমূল পথশিশু। এই সকল শিশুরাই সব থেকে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো যেহেতু প্রকাশ্যে আসে না বা সমাজ এটাকে যৌন নির্যাতন বলে মনে করে না, তাই ছেলেশিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান পাওয়া খুবই কষ্ট সাধ্য। তবুও যতটুকু গবেষণায় পাওয়া গেছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গৃহকর্মী ছেলেশিশুদের ২০%, বিড়ি ও সিগারেট কারখানা যেখানে সাধারণতঃ ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলেশিশুরাই বেশি কাজ করে তারা সবাই চাকুরীদাতা বা সহকর্মী দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে চায়ের দোকান, হোটেল ও পরিবহন খাতে কর্মরত ৪৩ শতাংশ ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। এই পরিসংখ্যান থেকে আশংকা করা যেতে পারে যে, দেশে প্রায় ২৭ লক্ষ কর্মজীবি ছেলেশিশু প্রতিনিয়ত যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইউনিসেফ তাদের আর একটি রিপোর্টে বলেছে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে এগারো লক্ষ। এই পথশিশুদের প্রায় ৯৭ শতাংশই ছেলেশিশু। এই শিশুদের ৭৯ শতাংশই বিভিন্ন প্রকার যৌন সহিংসতা ও শোষণের শিকার হয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রায় ৯ লক্ষ ছেলে পথশিশু প্রতিনিয়ত মানুষের লালসার শিকার হচ্ছে।

ইউনিসেফ তাদের গবেষণায় বাংলাদেশের কর্মজীবি ও পথশিশুদের অসহায়ত্বের কয়েকটি ধাপ চিহ্নিত করেছে। প্রথম ধাপে শিশুরা বাড়িতে বা কমিউনিটিতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, এরপর নিরাপত্তাহীন রাস্তায় আশ্রয় নেয়া ও সঙ্গীহীন শিশুশ্রমের জগৎ তাদের নির্যাতনের দ্বিতীয় ধাপে/স্তরে প্রবেশ করায়, এবং এর ফলে তারা যৌন নির্যাতন ও শোষণের চরম স্তরে পৌঁছে যায়। গবেষণায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সকে শিশুদেরকে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়স হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যা ছেলেমেয়ে উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। খাদ্য, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের জন্য শিশুরা যৌনতা বিক্রি ও বিনিময় করতে বাধ্য হয়।

দারিদ্রতা মানুষের শহরমুখী অভিবাসনের মুল নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, দরিদ্র মানুষের শহরমুখী প্রবণতা তাদের সন্তান বিশেষতঃ ছেলেশিশুদের অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাছাড়াও পরিবারের অশান্তি ছেলেশিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি প্রধান কারণ। এই অশান্তির একটি মুল কারণ হলো একাধিক বিবাহ। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের বাবা দ্বিতীয় স্ত্রীকে পরিবারে নিয়ে আসার কারণে প্রথম স্ত্রীর সাথে দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরী হয় এবং প্রথম স্ত্রী ও তার সন্তানদের ভরণ-পোষণ বন্ধ করে দেয়, ফলে শিশুরা পরিবার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে বাধ্য হয়। এই শিশুরা (বিশেষতঃ ছেলেশিশু) বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একাই শহরে পাড়ি জমায় অথবা শহরের বস্তিতে পরিবারের সাথে বসবাস করলেও রাস্তায় অথবা অন্যান্য ঝুকিপূর্ণ পরিবেশে কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু লেখাপড়া করে নি, ৩৮ শতাংশ শিশু বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের সাথে জড়িত।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক ভাবে পরিবারের মধ্যেই যৌন নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়া, পরবর্তীতে রাস্তায় ও কর্মস্থলে ক্রমাগত যৌন নির্যাতন ও হয়রানী ছেলেশিশুদের যৌন ব্যবসায় নামতে বাধ্য করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যৌন ব্যবসায় নিয়োজিত ছেলেদের ৩৬ শতাংশরই পূর্বে মারাত্মক যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই সকল শিশুর ৯০ শতাংশই ৭ থেকে ১০ বছর বয়সে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দেখা গেছে, মোটামুটি তিন প্রকৃতির মানুষের কারণে ছেলেশিশুরা যৌন ব্যবসায় নামে। ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতাই বলেছে ‘খদ্দের’ দের কারণেই তারা এই কাজে নেমেছে। প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতাকে খদ্দেররা প্রথমে ধর্ষণ করে ও টাকা দেয় এবং পরে তাদের বন্ধুদেরও সাথে নিয়ে আসে এবং অন্যান্য খদ্দেরের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। এক-চতুর্থাংশ তাদের খদ্দেরের ভুয়া কাজের প্রলোভনে পড়ে এই কাজে নেমেছে এবং ১৫ শতাংশ হুমকির মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দালালরা শিশুদের উপর প্রভাব খাটিয়ে এবং তাদেরকে ঋণ দিয়ে একধরণের অর্থনৈতিক নির্ভশীলতা তৈরী করে এবং তাদের পুলিশি হয়রানী ইত্যাদির ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেকে তাদের ত্রাতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে তাদের যৌন ব্যবসায় নামতে বাধ্য করে। অনেক সময় দালালরাও শিশুদের ধর্ষণ করে। এই শিশুদের সহসাথীরাও প্রায় দালালদের অনুরূপ প্রক্রিয়ায় শিশুদের যৌন ব্যবসায় নামতে প্ররোচিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাস্তানরা শিশুদের ধর্ষণ করে এবং তাদের আয় থেকে ‘ট্যাক্স’ হিসাবে তোলা আদায় করে থাকে। গবেষণায় বলা হয়েছে, পুলিশরাও নিয়মিত শিশুদের ভয়ভীতি দেখানো, শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজি করে থাকে। এছাড়াও বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে ঘুমানোর জন্য নিয়মিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে তোলা দেওয়া ও যৌন কর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য হতে হয়েছে। এক সমীক্ষার ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে টাকা না দেওয়ার কারণে তাদের ধর্ষণ শিকার হতে হয়েছে।

মানুষের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার একটি বড় মাধ্যম হলো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নির্যাতন করা। নারী ও শিশুরা অনেক বেশি এই ধরণের নির্যাতনের শিকার হলেও বয়স্ক পুরুষরাও শিকার হতে পারে। বিশেষতঃ যুদ্ধ-বিগ্রহকালীন সময়ে বিবদমান প্রতিপক্ষের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় কোন কোন দেশের পুলিশ বা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ধরণের নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তার প্রতিপক্ষের নারী ও শিশুদের পাশাপাশি তথ্য আদায়ের জন্য বন্দীদের উপর এই ধরণের নির্যাতন করে থাকে।

শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতার সংস্কৃতি শুধু বাংলাদেশে ছিল বললে ভুল হবে। এই সংস্কৃতি সারা বিশ্বেই ছিল এবং এখনো আছে, বিশেষতঃ উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং যুদ্ধবিগ্রহ প্রবণ দেশগুলোতে এই প্রবণতা অনেক বেশি। কর্মক্ষেত্রে প্রায় সকল শিশুই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। অধিকাংশ কর্মজীবি শিশুই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পথশিশুদের প্রায় সকলেই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই শিশুরা প্রায় সবাই ছেলে শিশুবলে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রকাশ পেলেও যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসে না। কর্মজীবি ও পথশিশুদের বাইরে অন্যান্য শিশুরাও বাড়িতে, স্কুলে বা পথেঘাটে কমবেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। উন্নত দেশে অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চিত্রটা প্রায়ই একই রকম। তবে একথা ঠিক যে, মিডিয়ার কল্যাণে প্রকাশিত ঘটনাগুলো নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অনাদিকাল থেকে শিশুদের উপর বহুমাত্রিক নির্যাতনের যে স্টিমরোলার চলে আসছে তার কোন সুরাহা হচ্ছে না।

উপরে আলোচিত উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, কর্মজীবি ও পথশিশুরা একটা নির্মম বাস্তবতার সাথে লড়াই করে তাদের কালাতিপাত করছে। আমরা স্বীকার করি বা না করি তাদের প্রতি যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। যৌন নির্যাতন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক দুই ধরণের ক্ষতিরই কারণ হতে পারে। যৌন নির্যাতনের শিকার বা যৌন ব্যবসার সাথে জড়িত ছেলে শিশুদের এইচআইভি/ এইডস সহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগের ঝুঁকির মুখে থাকে। মানসিক ভাবেও তারা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির স্বীকার হয়ে থাকে। আফগানিস্তানের কোন ছেলের ধর্ষিত হওয়ার খবর কখনো প্রকাশ পেলে সে আর সারা জীবন মাথা উঁচু করে বেড়াতে পারে না। ভারতের মুম্বাই শহরের মেসেজ পার্লারের ও এসকট বালকদের উপর এক জরীপে দেখা গেছে, তারা তাদের কাজের জন্য সব সময় একটা অপরাধবোধের মধ্যে বাস করে, ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছে এই খবর জানাজানি হলে তাদের পরিবারের সম্মানহানি ঘটবে। তাদের মা আত্মহত্যা করতে পারে বলে অনেক আশংকা প্রকাশ করেছে। অনেকে তাদের ‘মেয়ে বন্ধুর’ সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছে কারণ একজন মেয়ে কখনো অন্য পুরুষের শয্যা সঙ্গিনী একজন ‘She Girl’কে বিয়ে করতে চায় না। ছেলেশিশুদের উপর যৌন নির্যাতন তাদের জেন্ডার পরিচয়, আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করে। যৌন অত্যাচার ছেলেদের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি করে এবং তাদের মানসিক বৃদ্ধিতে বাঁধার সৃষ্টি করে। তাদের ভিতর দুশ্চিন্তা, ভয়, অবসাদ, নিঃসঙ্গতা, আত্মহনন প্রবণতা এবং সম্পর্ক স্থাপনে বিরূপ প্রভাব দেখা দেয়।

যৌন হয়রানির অপমান নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার উপরেই সমানভাবে মানসিক প্রভাব তৈরী করে। কিন্তু পার্থক্য হলো নারীর উপর যৌন হয়রানির বিষয় স্বীকার করে নিলেও পুরুষের উপর যৌন হয়রানির বিষয় সমাজ স্বীকার করেই নিতে চায় না। যার কারণে এই অপমানের বোঝা পুরুষকে নিজে নিজেকেই বয়ে বেড়াতে হয়। যৌন সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গ্রোথিত, এই সমস্যার মূলোৎপাটন হয়ত একদিনে সম্ভব নয়, তবে এই আক্রান্তের সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং অপরাধীর সুষ্ঠু বিচারের জন্য সঠিক নীতিমালা জরুরী। কর্মজীবি ও পথশিশুদের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

শিশুদের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে শিশুদের উপর সকল ধরণের বৈষম্য, নির্যাতন নিরসনে অনেকগুলো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। বৈষম্যহীন আচরণ মানবাধিকারের একটি মৌলিক নীতি। শিশু অধিকার সনদে শিশুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির্যাতনে রোধে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, এবং পুনর্বাসন প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। তন্মধ্যে শিশুদের প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ অন্যতম,কিন্তু দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার ছেলেশিশুরা সঠিক আইনী সুবিধা থাকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ এখন অনেক দেশে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ মানেই পুরুষ অপরাধী এবং নারী ‘আক্রান্ত’ হিসাবে পরিগণিত হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

1. John Frederik, Sexual Abuse and Exploitation of Boys in South Asia: A Review of Research Findings, Legislation, Policy and Programme Responses, 2010 UNICEF
2. Md. Abdul Hai, Problem Faced by the Street Children: A Study on some Selected Places in Dhaka City, Bangladesh
3. Protect of Children Living on the Streets, UNICEF
4. Govind Subedi, Trafficking and Sexual Abuse among Street Children in Kathmandu, IPEC Trafficking in Children – South Asia
5. Glenn Miles, Jasmir Thakur, Kiran Khambe, The Exploitation of Boys/Youth in the Massage Trade: A Comparative Study of 79 Masseur and 79 Escort Young Men in Mumbai, India, 2013
6. Glenn Miles, Heather Blanch, What About Boys? An Initial Exploration of Sexually Exploited Boys on Combodia, 2011
7. Internet