ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমাদের মাননীয় মালবাবু নিতান্তই মাল সংকটে পড়িয়াছেন বলিয়া মনে হইতেছে। আর তাই মালের যোগান ঠিক রাখিতে তিনি যেখানেই কিছু মালের সরবরাহ দেখিতে পাইতেছেন সেখানেই ভ্যাট নামক বস্তুটিকে বসাইয়া দিতেছেন। গুটিকতক পণ্যের উপর চালু হওয়া ভ্যাট ছত্রাকের মতো তাহার পরিধি বাড়াইতে বাড়াইতে আজিকে শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত আসিয়া ঠেকিয়াছে। স্বভাবতই আশংকা করা হইতেছে ইহার পরিধি অচিরেই পেয়িং পাবলিক টয়লেটে গিয়া পৌঁছাইবে। এই স্বেচ্ছাচারকে প্রতিরোধ করিতে কিছু কোমলমতি (?) প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষার্থী রঙ-বেরঙের ফেস্টুন-প্লাকার্ডে কথিত শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় কিছু শ্লোগান লিখিয়া রাস্তায় নামিয়াছে, ইহাতে আখেরে তাহাদিগের কি লাভ হইবে জানি না, তবে আমাদিগের মৃতপ্রায় চলচ্চিত্র শিল্প ঢালিউডের যথেষ্ঠ লাভ হইয়াছে!

মাননীয় পাঠক, হয়ত ইতিমধ্যেই আন্দাজ করেছেন আমি কি বলতে চাইছি? সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত কাঠামোগুলোকে সচল রাখতে, দেশের সেবাখাত সমূহের ব্যয় মেটাতে, দেশের নিরাপত্তা ও আইন-শৃংখলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যয় কর ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছ থেকেই আদায় করবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এক্ষেত্রে সরকারের নীতি নির্ধারকগণ ভালো করে জানেন কোন কোন খাতগুলোতে কর বসানো সমীচিন, কোন কোন খাতগুলোতে সমীচিন নয়। তবে সাধারণভাবেই কোন কল্যাণমুখী রাষ্ট্র তাদের সেবাখাতে কখনও কর ধার্য করে না। শিক্ষা আজকের বিশ্বে একটি অন্যতম সেবাখাত এবং শিক্ষাকে মানুষের মৌলিক অধিকার বলে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে শিক্ষাখাতে কর বসানো সমীচিন কিনা?

সরকারি সম্পদের অপ্রতুলতা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে শিক্ষাখাতকে অনেক আগের থেকেই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তবে এই বেসরকারি খাত বলতে আধা সরকারি খাত হিসাবে দেশে অনেক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে গুলো মূলতঃ সরকারের বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় সেসব স্কুল ও কলেজের ব্যয়ের একটা বড় অংশ সরকার বহন করে বলে সরকারের নির্ধারিত কাঠামোর মধ্য থেকেই এই সব স্কুল-কলেজের ফি ও আনুসঙ্গিক খরচ নির্ধারিত হয়। কিন্তু ব্যত্যয় ঘটল যখন সরকার দেশের উচ্চ শিক্ষাকে বেসরকারিকরণ তথা বাণিজ্যিক খাতে ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের অনুমতি প্রদান করল। বাণিজ্যিক খাত এই জন্য বলছি যে, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলতঃ উদোক্তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিহীন টিউশন ফি, চিরাচরিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা পালটে দিয়ে একটি বাণিজ্যিক ভবনেই দুইটি-তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, এদো-কাঁদার গলির ঘুপচিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাস বিহীন এসি যুক্ত বদ্ধ ঘরে শ্রেণীকক্ষ সব মিলিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যিক পরিবেশ দান করেছে। বাণিজ্যিক এই জন্যই বলছি যে, এখানে মুনাফা না থাকলে মাত্র দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে একটি ছোট্ট দেশে ৮৩ টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতো না। বাণিজ্যিক এই কারণে বলছি যে, এখানে নির্দিষ্ট অর্থবিত্তের মানুষের সন্তান ছাড়া আপামর জনসাধারণের সন্তানেরা পড়াশুনা করতে পারে না। কোন দাতব্য খাত থেকে নয় শুধু শিক্ষার্থীর টিউশন ফি’র উপর ভিত্তি করেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে। বাণিজ্যিক স্বার্থ যেখানে জড়িত স্বাভাবিক ভাবেই করের বিষয় সেখানে আসবেই!

এখন প্রশ্ন হলো এই ভ্যাট নামক কর কে বহন করবে? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নাকি শিক্ষার্থীর অভিভাবক? ভ্যালু এডেড ট্যাক্স বা সংক্ষেপে ভ্যাট বিষয়টি এমনভাবে সংজ্ঞায়িত যে, যেভাবেই এই কর আদায় করা হোক না কেন তা শেষমেশ গিয়ে ভোক্তার উপরই বর্তায়। কাজেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি’র উপর অর্পিত ভ্যাট প্রদান সম্পর্কে সরকার যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছে তা শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া কিছুই নয়। এই সেমিস্টারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজে প্রদান করলেও পরের সেমেস্টারে ফি বাড়িয়ে ঠিকই আদায় করে নেবে। আর যেহেতু এই সকল প্রতিষ্ঠানের ফি নির্ধারণে সরকারের কোন একক নীতিমালা নেই কাজেই কোন নিয়ন্ত্রণও থাকবে না। বরং উলটা ফল হবে, লিটার প্রতি এক টাকা জ্বালানীর দাম বাড়ালে যেমন বাস মালিকরা ভাড়া দ্বিগুণ করে, সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাটের অছিলায় কত শতাংশ সেমিস্টার ফি বাড়ে এখন সেটাই দেখার বিষয়।

লেখার শুরুতে ব্যঙ্গ ছলে বলেছিলাম ভ্যাট তার পরিধি বাড়াতে বাড়াতে পাবলিক টয়লেট পর্যন্ত চলে না যায়! সরকার যেভাবে ভ্যাটের পরিধি বাড়াচ্ছে সেভাবে কি ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে পেরেছে? ভ্যাট খাতে যে লাগামহীন দুর্নীতি চলছে সেটা কমিয়ে আনার জন্য কোন পদক্ষেপ নিতে পেরেছে? আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, দেশের সাধারণ ব্যবসায়ীরা ভ্যাট কর্মকর্তা-কর্মচারীর হয়রানীর ভয়ে ভ্যাট রেজিষ্ট্রেশন করাতে চায় না। কারণ তাদের ব্যবসা হোক আর না হোক, টাকা সরকারের খাতে জমা হোক আর না হোক রেজিষ্ট্রেশন করালে ভ্যাটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট হারে মাসোহারা দিতেই হবে। কাজেই সরকার যদি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি বন্ধ করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনতে পারে তাহলে আমার মনে হয় বিদ্যমান ভ্যাটের ক্ষেত্রগুলোর আওতায় অনেক বেশি ভ্যাট আদায় সম্ভব।  সেক্ষেত্রে অনায়াসেই শিক্ষাখাতকে রেহাই দেয়া যেতে পারে!

অন্য প্রসঙ্গে আসি। শিক্ষার্থীরা যে সকল শ্লোগান ব্যবহার করে রাস্তায় নেমেছে সেগুলো আক্ষরিক অর্থে খুবই অগ্রহণযোগ্য। সাধারণতঃ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিছিল মিটিংয়ে এরকম শ্লোগান ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একসময় শুনতাম, “… অমুক তমুক গদী ছাড়, গদী কি তোর বাপ-দাদার” ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরণের তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত শব্দ নতুন কিছু নয় এবং মানুষ সেটাতে অভ্যস্ত। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আন্দোলনে নামে নাই বা তাদের উপর কোন রাজনৈতিক দলের সরাসরি কোন সমর্থনও নেই, সেক্ষেত্রে এইরূপ শব্দের ব্যবহার তাদের আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাকেই শুধু নষ্ট করে নাই, গতিও কমিয়ে দিয়েছে। “দেহ পাবি, মন পাবি, মাগার VAT পাবি না” এটি বাংলা সিনেমায় বহুল ব্যবহৃত একটি সংলাপের অপভ্রংশ, আক্ষরিক অর্থে এই সংলাপকে মানুষ অশ্লীল হিসাবে জানে, এবং সিনেমাতেও মানুষকে যৌন সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্যই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে মানুষ এটাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারে নি। পরিস্থিতি বুঝে আন্দোলনকারীদের একজন যদিও সংলাপটির একধরণের ‘Inner Meaning’ খোঁজার চেষ্টা করেছে তবুও মনে হয় না মানুষ তাতে খুব একটা সন্তুষ্টু।

প্রায়ই একটা প্রচারণা শোনা যায়, বাংলাদেশের সিনেমাগুলো এখন শুধুমাত্র নিম্নবিত্ত মানুষরাই দেখে, মধ্য বা উচ্চবিত্তরা ওদিকে পা মাড়ায় না, কারণ সিনেমার মান ভালো নয়। যার ফলে সিনেমা বাণিজ্য এখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে, দেশের অধিকাংশ সিনেমা হলই বন্ধ হয়ে গেছে। আগেই বলেছি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একটা নির্দিষ্ট অর্থবিত্তের মানুষের সন্তানেরাই শুধু ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, সিনেমা যদি তারা নাই দেখে তাহলে এই ডায়ালগ পেল কোত্থেকে? বিষয়টাকে আমি ইতিবাচক ভাবেই দেখি। আমার মনে হয় বাংলা সিনেমা সম্পর্কে যে প্রচার প্রপাগান্ডা ছিল তা আসলে ভুল ছিল। ডাইরেক্টলী হোক আর ইনডাইরেক্টলীই হোক সিনেমা মানুষ দেখে এবং তা হৃদয়ে ধারণ করে। তা না হলো এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে সেই সিনেমার সংলাপ ব্যবহার করে?  তার মানে, আমাদের উদ্যোক্তাগণ একটা ভালো সুযোগ হাত ছাড়া করেছে। কিছু উদ্যোক্তা যদি শত কোটি টাকা ব্যয় করে একটি সার্টিফিকেট বিক্রির বিশ্ববিদ্যালয় (?) প্রতিষ্ঠা না করে তা দিয়ে কিছু ভাল সিনেমা নির্মাণ করত তাহলেও অনেক ছেলেমেয়ে সুস্থ বিনোদনের শিক্ষা পেত। আর তাতে বিদেশী সিনেমা ও টিভি চ্যানেল আমদানীর হার অনেক কমে যেত এবং হয়ত প্লাকার্ডে এইরূপ শ্লোগানও দেখা যেত না। সরকারের ভ্যাট আদায়ও অনেক বাড়ত।

একটি মিডিয়ার খবরে দেখলাম দেশে প্রতিষ্ঠিত ৮৩ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ১০ টি ‘ভালো’ মানের ২৬ টি কোন রকম আর বাকি গুলো বুঝতেই পারছেন? এর এই বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেই প্রায় দেশের উচ্চ শিক্ষার ৬৩ শতাংশ ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে। মানহীন  এই সব প্রতিষ্ঠানের অধ্যয়নরত প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকেই যায়। আর দেশের বাজার বিবেচনায় এত বিপুল সংখ্যক মানুষের উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন আছে কিনা সেটাও একটা বড় প্রশ্ন? অন্যদিকে যে ভ্যাট আরোপ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি সরকারও জানে না আসলে কি পরিমাণ ভ্যাট এখান থেকে পাওয়া সম্ভব। পত্রিকান্তরে প্রকাশ মাত্র আড়াই শ থেকে তিনশ কোটি টাকা আসতে পারে এইখাত থেকে। দেশের শিক্ষাখাতে বাজেট প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা যার সিংহ ভাগই খরচ হবে সরকারি ও আধা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সরকার চাইলে পৌনে দুই লক্ষ কোটি টাকার মোট বাজেট থেকে এই সামান্য পরিমাণ টাকা এমনিতেই সংস্থান করতে পারে। শুধুমাত্র ভ্যাট খাতে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরলেও এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে! অহেতুক ছাত্র চটিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন গরম করার কোন মানে হয় না।

পরিশেষে পাঠকদের শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দের স্থুল মানে না খুঁজে ‘Inner Meaning’ খোঁজার অনুরোধ করছি।

যোগাযোগঃ https://www.facebook.com/narayan8747