ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

DSC06080_3_2

আজ বাংলা নববর্ষ ১৪২৩। সারা বাংলাদেশে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পান্তাভাতের আধুনিক সংস্করণ ‘পান্তা-ইলিশ’ খাওয়ার মহোৎসব চলছে। মিডিয়ার বদৌলতে জানা যাচ্ছে পান্তা খাওয়ার জন্য কেউ কেউ বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা জোড়া দামেরও ইলিশ কিনেছেন? কালের বিবর্তনে সব কিছুর সাথে আজ নববর্ষ পালনে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি পরিবর্তন এসেছে পান্তাভাতের সংজ্ঞায়। আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনপদে পান্তাভাত ছিল দরিদ্র কিষাণের প্রধাণ নাস্তা, প্রকৃতপক্ষে এক বেলার আহার। রাতের খাবার রান্নার সময় কিষাণী হাঁড়িতে দু’মুঠো চাল বেশি দিতেন যাতে রাতে খাওয়ার পরে আরো কিছুটা অতিরিক্ত ভাত থেকে যায়। অতিরিক্ত ভাতটিতে তিনি জল দিয়ে রেখে দিতেন, সেই জল দেয়া ভাতকেই পান্তাভাত বলা হত। পরের দিন সকালে কিষাণ সম্ভব হলে দুটো কাঁচা মরিচ আর সাদা লবণ দিয়ে দুটো পান্তাভাত খেয়ে মাঠে হাল নিয়ে যেতেন। আর সম্ভব না হলে, কিছুটা বেলা হলে পরে কিষাণী নিজেই অথবা ছেলেমেয়েদের দিয়ে সেই পান্তাভাত মাঠে পাঠিয়ে দিতেন। আর মরশুম বুঝে সেই পান্তাভাতের সাথে আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শুটকি ভর্তা বা মাছ ভর্তা ইত্যাদি থাকত। ইলিশ যে একেবারেই থাকত না তা কিন্তু নয়। হাটের দিনে কেনা ইলিশ মাছ যদি রাতে খেয়ে কিছু বাড়তি থাকত তাহলেই কেবল পান্তার ভাগ্যে সেই ইলিশ জুটত, নচেৎ নয়।

আশির দশকের গোড়ার দিকে, ছেলেবেলার কথা পড়ে, তখন সংস্কারাচ্ছন্ন (!) বাংলার গ্রামীণ জনপদে চৈত্র সংক্রান্তির রাতকে আমাদের রংপুরের ভাষায় (হিন্দু বাড়িতে) বলা হতো ‘বিষমা’র রাত। অর্থ্যাৎ ঐ রাতে রান্না করা খাবার রেখে দিলে তা বিষাক্ত হয়ে যাবে তাই সেটা পরের দিন খাওয়া যাবে না, পান্তা খাওয়া তো দুরের কথা? আর তাই ঐ রাতে সাধারণতঃ কম করে রান্না করা হতো, সম্ভব হলে তিতা জাতীয় কিছু রান্না করা হতো। কারণও ছিল, টানাটানির সংসারে সারা বছর কৃষকেরা প্রায়শই পান্তাটান্তা খেয়ে দিন গুজরান করতেন। আর তাই বছরের কয়েকটা পরবের দিনের আশায় থাকতেন সেদিন কিছু ভালমন্দ খাবারের আয়োজন করার, তাও যদি সামর্থ্যে কুলায়। এসব পরবের মধ্যে বাংলা নববর্ষের দিনটি অন্যতম। এই দিনটিতে বাংলার গ্রামীণ জনপদের মানুষেরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করত কিছুটা মাংসের ব্যবস্থা করতে, না হলে অন্য কিছু। তার কারণ তাদের বিশ্বাস, বছরের প্রথম দিন, তাই যদি সেদিন তারা কিছু ভালমন্দ খেতে পারে তাহলে বছরের বাকী সময়টা তাদের ভাল কাটবে। ফলে সেদিন পাড়ায় পাড়ায় গরু, খাসি, পাঁঠা জবাই করার হিড়িক পড়ে যেত, এবং মানুষ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী একেকটা অংশ কিনে নিতেন। অন্যদিকে গ্রামের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার পুরাতন হিসাবনিকেশ চুকিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খোলার জন্য আনন্দমুখর পরিবেশে হালখাতার আয়োজন করতেন। মন্ডা-মিঠাই আর মাইকের আওয়াজে ভরে যেতে বাংলার পথপ্রান্তর। এখন সময়ের সাথে অনেক কিছু পাল্টে গেছে, পান্তাভাত এখন কৃষকের পর্ণকুঠির ছেড়ে আধুনিকতার জৌলুসময় ফ্যাশান দুনিয়ায় পা রেখেছে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত মহাসমারোহে ‘পান্তা-ইলিশ’ এর আয়োজন করা হচ্ছে। প্রায় বিনে পয়সার কাঁচা লঙ্কা ও লবণের পরিবর্তে পান্তার ভাগ্যে জুটছে হাজার হাজার টাকা দামের ইলিশ মাছ? সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমরাও এই সংস্কৃতিকেই মেনে নিয়েছি। তবে সেই উৎসব কতটা দেশের সংস্কৃতিকে ধারণ করার জন্য বা কতটা মানুষের দারিদ্রতাকে পরিহাস করার জন্য নিন্দুকেরা সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারে।

যাই হোক, আমার লেখার উদ্দেশ্য ‘পান্তা-ইলিশ’ উৎসবের সমালোচনা করা নয়। আমি আজ জানতে চেষ্টা করেছি কেমন আছে তারা? যে শিশুরা তাদের মা-বাবার সান্নিধ্য বঞ্চিত, যারা তাদের আত্মীয়-স্বজন থেকে অনেক দূরে, যাদের জীবনের শিক্ষা-দীক্ষার পাট শুরুতেই চুকে গেছে, যারা হাতের খাতা-কলম ছেড়ে জীবিকান্বেষণে ব্যস্ত, কেউ হয়ত নিজের শিকড়ের ঠিকানাই জানে না । খোলা আকাশের নীচে বা রেলষ্টেশনের প্লাটফর্মে বা ফুটপাতে বা ফুট ওভারব্রীজে অথবা আকাশচুম্বী অট্টালিকার পাদদেশে রাতে আশ্রয় গ্রহণকারী সেই সব ছিন্নমূল শিশু যাদের এককথায় আমরা বলি ‘টোকাই’ বা একটু মার্জিত ভাবে বলি ‘পথশিশু’।

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় বাংলাদেশে প্রায় ছয় লক্ষ পথশিশু আছে যাদের অর্ধেকেরও বেশি ঢাকা শহরে বসবাস করে। ঢাকার বিভিন্ন রেলষ্টেশন, কাঁচামালের আড়ত, বাস ও নৌ টার্মিনাল, পাইকারী বাজার, পার্ক এসব পথশিশুদের প্রধান আবাস স্থল। তাছাড়াও সারা ঢাকা শহরেই বিভিন্ন স্থানে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ময়লা আবর্জনা থেকে বিভিন্ন বস্তু সংগ্রহ করা, রাস্তায় পড়ে থাকা প্লাষ্টিক বোতল ও কাগজ কুড়ানো, চা-পান-বিড়ি-সিগারেট ফেরি করে বিক্রি করা, রেলষ্টেশনে ব্যাগেজ টানা, সব্জি টোকানো বা খালাশির কাজ ইত্যাদি তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। তাহলে চলুন দেখি তাদের জগৎটা একটু ঘুরে আসা যাক।

কমলাপুর রেলষ্টেশনে প্রথমে দেখা হলো তের-চৌদ্দ বছর বয়সী একটা ছেলের সাথে। প্লাটফর্মের একটা পিলারের গোড়ায় বসে ঝিমচ্ছিল।গায়ে বোতাম ছাড়া একটি ময়লা শার্ট, পড়নে ময়লা প্যান্টের এক পায়ের অর্ধেক ছেঁড়া। খালি পা। দেখেই মনে হচ্ছে মাথায় তেল সাবান পড়েনি বেশ কিছুদিন। এ্যাই পিচ্চি বলে ডাক দিতেই আধো খোলা চোখ তুলে তাকাল। দেখে বুঝতে আর বাকী রইল না সে নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। জড়ানো কন্ঠে বলল, “জী মামা, কিছু কইবেন?” কেমন আছে প্রশ্ন করতেই বলল,

“মামা প্লাটফর্মে জীবন কাটাই, বোজা-মোজা টাইন্না খাই, মানে গাট্টি আরকি। আমগরে মামা পুলিশে বাইরায়, এ বাইরায়, হে বাইরায়, আমরা আর কেমন থাকমু কন? কয় দিন পরে গিয়া যাওন লাগব বাইত মামা”।

ঢাকায় কিভাবে এসেছে জিজ্ঞাসা করলে জানাল, “একদিন মনে করেন হারায়ে গেছিলাম। এক টেইনে ৭ জন এক লগে আইতেছিলাম। আইতে আইতে লাকসামে যহন আইলাম দেহি সবাই হাওয়া? কিছু চিনি না, পরে মনে করেন আর একটা টেইনে উঠছি, হেরা ঢাকায় আইন্না হালায় গ্যাছে”।

মা-বাবা কথা জিজ্ঞাসা করলে জানায়, “মা মামা-নানার বাড়িত থাকে আর কি। বাপে তো হালায় মনে করেন অন্য জাগায় থাকে। সেখানে আর একটা বিয়া করছে”।

লেখাপড়া করেছ? “হালকা-পাতলা করছিলাম। টু পর্যন্ত করছিলাম। ভাল্লাগেনা ছাইরা দিছি। বাপে আছিল আঠারো জাউরা, আর আমি অইলাম তের জাউরা”। মানে? “আরে এডা আমার দাদারা কইত! কয় তোর মতো তোর বাপে আছিল আঠারো জাউরা, আর তুই হইলি তের জাউরা”।

নেশাটেশা কিছু কর? “হ, নেশা মানে গানজা খাই। জ্বি না, এহন খাই নাই। আরো আধ ঘন্টা আগে খাইছি। গানজা বেশি দিন ধইর‍্যা খাই না মামা। গানজা খাওন ভালা না। হালকা-পাতলা খাই। আমি ভালো আছিলাম, বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পইরা জীবনডা শ্যাষ হয়া গ্যাছে। আমারে যে হালায় গানজা ধরাইছে ওই হালায় অহন জেলখানায়। চৌদ্দ বছরের জেল খাটতাছে”। “আমি যাই মামা ঐ টেইন আয়া পড়ছে”।

ঘুরতে ঘুরতে আর একটি পিলারের গোঁড়ায় বসে থাকা আর একটি ছেলের দেখা মিলল। তারও বয়স তের কি চৌদ্দ বছর হবে। গায়ে একটা মলিন গেঞ্জি। পড়নে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট মাঝে মাঝে ছেঁড়া। পাশে একটা পোটলা মত হয়ত আর এক সেট প্যান্ট-গেঞ্জি বাঁধা আছে। পায়ের কাছে একটা বস্তায় কয়েকটা টোকানো প্লাষ্টিক বোতল।

থাক কোথায়? “সব সময় এইখানেই থাকি। অহন আজানডা দিলে গোসল-টোসল কইরা ভাত খাইয়া আবার বাইর হয়া যামু”। কোথায়? “টঙ্গি। ঐহানে পান-সিগারেট বেছি। এই ৪-৫ বাজে আমার বস্তা ভরা অইলেই আমি যামুগা। মনে করেন একটা বাজে ভরা হয়া যাইবগা। পরে লোকাল গাড়ী পাইলে টঙ্গি যামুগা। গিয়া পান-সিগারেট লয়া আমু। পান-সিগারেটে লাভ বেশি। টেইন দিয়া যাই, আবার আয়া পড়ি”। ট্রেনে ভাড়া নাই? “আমরা তো ছাঁদে উইট্টা যাই”।

বাড়ি কোথায়? “মহাখালি, ঐহানে মা-বাপে থাকে। আমি ঐ জাগায় থাকি না, বাপে মারে ধইর‍্যা”। রাতে থাক কোথায়? “মা-বাপের সাথে থাকি না। থাকি আমগোর ঐহানে সেন্টার আছে একটা, ঐপারে, শেখ রাসেল সেন্টার। ঐহানে অনেকদিন ধইর‍্যা থাকি। যে সময় বাসা থাইকা আইছি ঐহানে আইসা উডছি”।

এখানে তোমাদের কি ধরণের সমস্যা হয়? “মাঝে মাঝে পুলিশ দাবড়ানি দেয়, কুলিরা দাবড়ানি দেয়, দোকানদার-মোকানদার দাবড়ানি দেয়। পুলিশে ধইর‍্যা আটকায়ে রাখে। আবার কাম করায়। মাটি কাটায়, ইট কাটায়। ধইর‍্যা প্রথমে মিরপুর-১ এ লয়া যায়। ঐহানতে পাচার করে লইয়া যায় ভবখানায়। ঐহানতে ট্রাকে পুইরা লয়া যায় ময়মনসিং। আমারে লয়া গেছিল। দুই মাস থাকছি অইলো মিরপুর-১ এ। আর ভবখানায় আছিলাম ৩ মাস। জেলে ছিলাম ৫ মাস। এইভাবে ৮-৯ মাস আছিলাম”। পুলিশ ধরেছিল কেন? “বিনা অপরাধে। আমরা কিছু করি না। ষ্টেশনে থাকি সেজন্য। কাম করি, বোঝা টানি। চুরি করে একজনে। নাম পরে আমগোর। হেরা কিভাবে লেখে না কি কইরা দিয়া দেয়, আমরা তো জানি না। এমনি এমনি আমগোরে তো সিভিল ড্রেসে বা যেমনেই হোক ধইরা লয়া যায় থানাত। পরে গাড়ি কইরা লইয়া যায় মিরপুরে”।

এতো গেল কমলাপুর রেলষ্টেশনের পথশিশুদের জীবনের কিছু খন্ডচিত্র। এবার জেনে নেয়া যাক কাওরানবাজারের শিশুদের কথা। পসরা সাজিয়ে ঔষধ বিক্রেতার পসরার জটলার কাছে দেখা হল একটি ছেলের সাথে। আর কয়েকজন সঙ্গীর সাথে মনোযোগ দিয়ে পসরা দেখছিল। ইশারায় ডাক দিতে কাছে এল। বয়স বার কি তের হবে। মাথায় তেল চুকচুক করছে। গায়ে একটা লাল সবুজের গেঞ্জি। পড়নে হাফ প্যান্ট, কিছুটা পরিচ্ছন্ন। কথা বলতে চাইলে রাজি হলো, তারপর কিছুটা নিরিবিলি জায়গায় তার সাথে অনেক কথা হয়। এখানে কিভাবে এসেছে, এখন কি করে ইত্যাদি কথা প্রসঙ্গে যা বলল, শুনুন তার নিজের কথাতেই,

“আমি লেখাপড়া করতাম দ্যাশে। টু পর্যন্ত পড়ছিলাম। আমার বাবায় কইছে, চল ঢাকায় যাইগা। ঢাকায় বাসা নিবো, বাসায় থাকবি, বাসায় খাবি। হেরপর আমি দ্যাশেত্তে আইছি টেইনে কইরা। হেরপর আমার বাপে আমারে একটা মুরগির দোকানে কাজে দিছিল। হেরপর আমি ওইখানে কাজ করছিলাম অনেক দিন। হেরপর আমার আর মুরগির দোকানের কাজ ভালা লাগে না। খালি চুরি করতে মন ধরে। পোলাপানে কেবল মুরগির ডিম চুরি করে, আবার মুরগি চুরি করে। পরে ঐটাই আমার অভ্যাস হইয়া গেছেগা। হেরপর আমি ঐডাই করছি। করতে করতে আবার ময়লা টোকাইছি। হেরপর আবার বাপে সিদ্দ ডিম লইয়া আমারে কাওরানবাজারে পাঠাইছে। প্রথম প্রথম ডিম বেচতে পারতাম না। শুদু হাঁসের ডিম বেচতাম। পনের টেকা পিচ, আবার দশ টেকা পিচ বেচতাম। বেচতে বেচতে আবার কয়েকদিন বাসায় যাইতাম না। তখন হেরা আমারে ঘরে জাগা দিত না। আমারে মারতো অনেক আবার ঘরে জাগা দিত না। একটা কিছু হইলেই তখন আমার মায় আমারে ঘরে জাগা দিত না। আমি বাইরাইয়া যাইতাম। গিয়া অনেক রাত। আমার মা’রে দেখতে আমার মন চায়। আমি আমার মা’রে ছাইরা যাইতে পারি না। এমনে এমনে আবার কারনবাজার আইছি। আয়া পোলাপানগোর লগে দেখা। হেরপর ওগোর লগে চলছি। অহন আর ওগোর পিচ আমি ছাড়তে পারি নাই। হেরা দেহি কপি লয়, চুরি করে। কপি লইয়া দৌড় দেয়। আমি খালি চুরি করতে পারি না। হেরপর আস্তে আস্তে আমিও খারাপ হইয়া গেছি ওগো মতন। হেরপর খারাপ হইতে হইতে আর আমি আমার মা’র বাসায় যাই না। অহন আমি আর আমার মা’রে চিনি না। মা যে কই? হেরপর আবার দ্যাশে গেছি। ওরা আমারে আর রাখে না, কয় এহানতে যাগা, তুই যেহানে আছিলি এহানতে যাগা। হেরপর আমি আবার আয়া পড়ছি। হেরপর একদিন বাপেরে পাইছি ঐ মহাখালিতে, ভ্যান চালায়। পাওয়ার পরে বাসায় গেছি দেহি সৎ মা। আমার মা যে কই এহন আমি জানি না”।

তারপর? “যহন বাসা পাইতাম না আমি তেজগাঁও ষ্টেশনে ঘুমাইতাম, বৃষ্টি পড়ত পলিথিন আছিল, ওই বৃষ্টির মইধ্যেই পলিথিন গায়ে দিয়া থাকতাম। বৃষ্টির মধ্যেই আমি ঘুমাইতাম। আবার বৃষ্টি যাইতগা আমার শীত ধরত। আবার ভ্যানগাড়ির বাইয়া আছে ঐগুলাতে ঘুমাইতাম। সকাল হইত কলা টোকায়া টোকায়া হাতে লয়া বেচতাম। দশ টেকা বা পনের টেকা বেচতাম। বেইচ্ছা খিচুরী খাইতাম। ভাত খাইতাম, খায়া আবার কাম করতাম। আমি যা কাম করছি, সব টেকা মা-বাপরে দিছি। এক বছর, পুরা এক বছর কাম করছি তিন হাজার টেকা বেতন। একটা টেকাও আমি নেই নাই। বেতনের একটা টেকাও আমি নেই নাই। সব টেকা মা-বাপ নিছে। হেরা আমারে কয় আরো কাম করতে!”

এই যে চুরি কর পুলিশে ধরে নাই? “পুলিশের হাতে অনেকবার ধরা খাইছি। মনে হয় চার-পাঁচবারের মতোন ধরা খাইছি। জেলে আছিলাম অনেকবার। পুলিশ ধরলে প্রথমে জেলে পাঠায়। পাঠায়া ওহানে রাহে। রাইক্কা খাওন দেয়। কিয়ের খাওন, এডি ভাল লাগে না। তারপর আমারে কোটে চালান করে। আমি কয়েকবার কোটে চালান খাইছি, হেরপরে কোটে উডাইলে আমারে মায়া কইর‍্যা ছাইরা দিছে। অনেকবারই আমারে মায়া কইর‍্যা ছাইরা দিছে”।

নেশা কর? “গানজা, বাবা (হেরোইন) খাই নাই। সিগারেট খাইছি, এহন খাই না। গানজা, বাবা এগুলি খায় আমগোর বড় ভাইরা। গানজা আমগোরে দিয়া আনায়, আবার বাবা আনায়, ফেন্সিডিল আনায়। বাবা একটা ছোট মাল, বড় মাল দুইটাই আছে। আমরা মনে করেন যে, গানজা, বাবা, ফেন্সিডিল এগুলা চিনতাম না। এইগুলা চিনাইছে আমগোর বড় ভাইরা। কয় লাইনে উইট্টা খালি একটা কথা কবি, তাইলেই দিবো। কবি একটা বড় দাও, তাইলে বড় দিবো, আর যদি কও ছোট দাও তাইলে ছোট দিবো। প্রথমে বুঝতাম না, আমগোরে বুঝাইছে এমনে এমনে কয়া। আমি আর জানি না তো যে, এডি এইডি? পুলিশে ধরলে লয়া যায় এইডা জানতাম। একদিনকা মনে করেন আমগোরে পুলিশ ধইর‍্যা লইয়া গেছে। পরে আমি কইছি স্যার আমি তো এইগুলা চিনি না। আমারে এক বড়ভাই মাইরা-মুইরা পাঠাইছে।

তোমার স্বপ্ন কি? “মনে করেন একটা কাজ খুজতাছি, যদি পাই তাইলে কাজে ঢুইক্কা যামু। এই কাজে আর থাকমু না। এই চুরি-চামারি আর করমু না। চুরি-চাট্টা করলে মনে করেন পিডা-টিডা খাইতে হয়। আমি যদি এই রকম চুরি করি আর মাইর খাই। মাইরডা কিল্লাইগা খাই?”

এই হলো আমাদের পথশিশুদের ঘটনাবহুল জীবনের কিছু খন্ডচিত্র। বছরের প্রথম দিন, মাঝের দিন বা শেষের দিন বলে তাদের মধ্যে কোন কিছুর বালাই নাই। প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। আর সেই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। দেশে কয়েক লাখ পথশিশু অনাদর-অবহেলা, শোষণ-বৈষম্য, নির্যাতিত-নিপীড়নের সাথে লড়াই করে বেচে থাকার চেষ্টা করছে। এখানে আমি তাদের প্রতি নিপীড়ন-নির্যাতনের খুব সামান্য অংশ তুলে ধরলাম। এর বাইরের আরও অনেক শোষণ-বঞ্চনা, বিশেষতঃ যৌন নির্যাতনের ঘটনা আছে যেগুলো আরও অনেক মারাত্মক। সে বিষয় নিয়ে পড়ে আলোচনা করব।

দেশের মানুষের দারিদ্রতা ও অপরিকল্পিত শহরায়নের ফলে পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে মা-বাবাদের অজ্ঞতা ও অনাদর। যখন কোন শিশু যখন কোনভাবে বাড়ির বাইরে চলে আসে সুস্থ ও সঠিক ভাবে তাদের মুল ঠিকানায় পৌঁছে দেয়ার মত সঠিক কোন কার্যক্রম আমাদের দেশে নেই। এ কারণেও আমাদের পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের সমাজের সার্বিক মঙ্গলের জন্য পথশিশুদের সঠিক পুনর্বাসন অতি জরুরী। তা না হলে আজকের পথশিশু আগামীকালের মাদকসেবী ও কথিত সমাজ বিরোধীতে পরিণত হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বিঃদ্রঃ পথশিশুরা সরাসরি কথাগুলো আমাকে বলেছে এবং আমি তাদের নিজেদের কথা নিজেরদের ভাষাতেই তুলে ধরেছি।