ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

রামপুরা টিভি ভবনের গলির মুখে প্রতিদিন সকালে কয়েকজন ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে বসে। তিন-চারজন মহিলা আর দুজন পুরুষ – সবাই কম-বেশি শারীরিক প্রতিবন্ধী। আমার মনে হয় পুরুষ দুটিকে কেন্দ্র করে তাদের আলাদা আলাদা গ্রুপ তৈরি হয়েছে। যাই হোক, প্রায়শই সকাল বেলা হাতিরঝিল থেকে প্রাতঃভ্রমণ সেরে ঐ পথেই বাসায় ফিরে আসি। প্রতিদিনই তাদের দেখি, বেশির ভাগ সময়ই ভিক্ষা দেয়া হয় না। যে দিন পকেটে খুচরো টাকা থাকে সেই সাথে মেজাজমর্জি ভাল থাকলে সেদিন ভিক্ষা দেই, নচেৎ নয়। যে অল্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাদের অতিক্রম করি ঐ টুকু সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের কথা বার্তা শুনতে পাই। সেদিন যখন ঐ পথে আসছিলাম দেখি তখন মাত্র দুজন মহিলা ও একজন পুরুষ ভিক্ষা করতে এসেছে। একজন মহিলার বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে আরেক জনের কিছুটা কম। পুরুষটির বয়স ষাটের বেশি। বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা ও পুরুষটি যতদূর সম্ভব স্বামী-স্ত্রী অথবা তিনজনই স্বামী-স্ত্রী হতে পারে। ষাটোর্ধ মহিলাটি বাকী দুজনের থেকে তিন-চার হাত দুরে বসেছে। পুরুষটি অন্য মহিলাটির কাছে দাড়িয়ে আছে। কাছাকাছি আসলে শুনতে পাই বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাটি নিজের মনে গজগজ করছে, “আমার মা নেই, বাপ নেই, ভাই নেই, আমি কোথায় যাব” (কথাগুলো তার স্থানীয় ভাষায় বলেছে, আমি ভাবার্থ করলাম)। সঙ্গে সঙ্গে পুরুষটি ভেংচি কাটল, “অ্যাঁ নিজের এক পা গেছে কবরে, সে আবার মা-বাপ খোজে!” আমি ততক্ষণে তাদের অতিক্রম করে এসেছি, তাই এর পরে কি কথা হয়েছে সেটা শোনা হয় নি।
মা-বাবার পরম নিরাপদ আশ্রয়ে সন্তান

মা-বাবার পরম নিরাপদ আশ্রয়ে সন্তান

এখানে মহিলাটির কথাগুলো বেশ গুরুত্বপুর্ণ। মানুষ যে বয়সেরই হোক না কেন, দুঃসময়ে তারা তাদের মা-বাবার কাছেই আশ্রয় খোজে। মা-বাবা সন্তানের জন্য একটি বটবৃক্ষ। সন্তানের সুখে-দুখে, আনন্দ-বেদনায়, হতাশা-যন্ত্রণায় মা-বাবাই তাদের পরম নিরাপদ আশ্রয়। (কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনাকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না। ব্যতিক্রম সব সময়ই আলাদা। কাজেই সেটা নিয়ে বিতর্কে যেতে চাই না)। মানুষের মা-বাবা যখন থাকে না তখন অভাবটা আরও প্রকট আকারে দেখা দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, মা-বাবা নিজেকে তার সন্তানের জন্য যতটা নির্ভরশীলতার আধার হিসাবে তৈরি করে সন্তান তার মা-বাবার জন্য তার কিয়দংশও তৈরি করতে পারে কি না সন্দেহ আছে। অপর পক্ষে স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরের জন্য কতটুকু নির্ভরশীলতার আশ্রয় তৈরি করতে পারে তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। আলোচ্য ঘটনার মহিলার কথাই ধরুন তিনি হয়ত তার জীবনের যতটুকু সময় মা-বাবার আশ্রয়ে কাটিয়েছেন তার চেয়ে ঢের বেশি সময় হয়ত ঐ পুরুষটির সাথে কাটিয়েছেন, কিন্তু যখনই কোন সমস্যায় পড়েছেন তখন নির্ভরশীলতার আশ্রয় হিসাবে মা-বাবাকেই খুজছেন। কিন্তু মা-বাবা (যে কোন বয়সেই) যখন কোন টেনশনে পড়ে এবং তার মনোজাগতিক সান্নিধ্যের আশ্রয় খোজেন তখন সেটা কখনো তার সন্তান বা স্বামী বা স্ত্রী হয় না। মানুষের পরম্পরার এভাবেই চলে আসছে।
আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে চিরাচরিত পারিবারিক ব্যবস্থাগুলোও পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে একক পরিবারের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের সন্তান সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সন্তানেরা জীবিকার তাগিদে দেশ-দেশান্তরে পাড়ি জমাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা সবাই কর্মসূত্রে বাইরে থাকছে। এমতাবস্থায় বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবার দেখাশুনা করার মতো তেমন কেউ থাকছে না। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই প্রভাব এখনও কম পরিলক্ষিত হলেও উন্নত দেশের অবস্থা ভয়াবহ। বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্যায়ে আছে। আর তিন-চার দশকের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার গঠনে একটা ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। দেশে একক পরিবারের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে, সেই সাথে বেড়ে যাবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। স্বাভাবিক ভাবেই নিঃসঙ্গ মা-বাবার সংখ্যাও বেড়ে যাবে। বিশেষত মধ্যবিত্ত পরিবারে এই অবস্থাটা ভয়াবহ। কারণ আমাদের মধ্যবিত্ত মা-বাবারা চিরকালই তার সন্তানের প্রতিষ্ঠার পিছনে জীবনের পুরো উপার্জনটাই বিনিয়োগ করে থাকে। সেক্ষেত্রে সন্তান যদি শেষ বয়সে পাশে না থাকে তাহলে তারা পুরোপুরি অসহায়ত্বের মাঝে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
তবে নিম্নবিত্ত বিশেষতঃ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থাটা একটু অন্যরকম। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও শিশুশ্রমের হার বেশি। সাধারণতঃ নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরাই শিশুকাল থেকে উপার্জনের সাথে সংযুক্ত হয়। সে দিক দিয়ে বলা যায় এই শ্রেণীর মা-বাবারা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেমন চুরি করে তেমনি তাদের পরিশ্রমও আত্মাসাৎ করে থাকে। শিশু বয়সে উপার্জনের জন্য কাজে নেমে পড়ায় তাদের উন্নত ভবিষ্যৎ শৈশবেই হারিয়ে যায়। কাজেই অনন্নুত ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা তদের মা-বাবাকে কতটুকু প্রতিদান দিতে পারবে সেটা বলাই বাহুল্য।
পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘বাবা দিবস’ বা ‘মা দিবস’ ইত্যাদি দিবসগুলোর প্রবর্তন হয়েছে মুলতঃ বছরে অন্তত একটা দিনের জন্য হলেও যেন সেখানকার কর্মব্যস্ত সন্তানরা তাদের নিঃসঙ্গ বয়স্ক মা-বাবাকে স্মরণ করে। আমরা অনেকেই হয়ত পশ্চিমা সংস্কৃতির অংশ বলে এসব নিয়ে নাক সিটকাচ্ছি। কিন্তু এটাই বাস্তবতা এবং যান্ত্রিক সভ্যতা ও ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের অমোঘ পরিণতি। কারণ এই দেশও খুব শিগগির শিল্প ও নগর কেন্দ্রিক দেশে পরিণত হবে। একক পরিবার প্রথার আধিক্য বাড়বে, মানুষের গড় আয়ু বাড়বে। ফলে আজকে পশ্চিমা বিশ্ব তথা উন্নত বিশ্বে যা হয়েছে আমাদের অবস্থাও তাই হবে।
যদিও একথা ঠিক যে, জীবজগতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যাদের সন্তানেরা কিছুটা হলেও নিদান বয়সে মা-বাবার যত্ন আত্তি করে। কিন্তু মা-বাবা যে স্বপ্ন নিয়ে, যেরূপ ভালোবাসা দিয়ে তাদের সন্তানকে পালন করে, সন্তানের অভাব অভিযোগ গুলোকে মেটাতে বদ্ধ পরিকর থাকে, এমন সময় কি আসবে যখন সন্তানরাও ঠিক ততটাই দায়িত্ব নিয়ে তাদের মা-বাবার অসহায় দিনগুলোতে পাশে থাকবে? এমন দিন যদি আসে তাহলে অবশ্যই তার নির্ভরতার আশ্রয় হিসাবে সন্তানকেই পাশে চাইবে।
Facebook: Narayan Chakkra