ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
black-planet-surface-1920
গুলশান কাণ্ড – রচিত হলো আর একটি রক্তাক্ত প্রান্তর।  এশার আজান হয়ে গেছে। পবিত্র রমজান মাসে ধর্মপ্রাণ মানুষ যখন সারাদিনের সিয়াম সাধনার পরে ইফতার ও খাওয়া-দাওয়া করে তারাবীর নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনি ঘটে গেল এই নারকীয় ঘটনা। কিছু দুষ্কৃতি সন্ত্রাসী মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেল দখল করে শুরু করে নারকীয় তাণ্ডব। গ্রেনেড, গুলি ও দেশীয় ধারালো অস্ত্রের ঝনঝনানিতে উত্তাল হয়ে উঠল দেশের নিরাপদতম স্থান রাজধানীর গুলশানের ডিপ্লোম্যাটিক জোন। কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী আগ্নেয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গত ১ জুলাই ২০১৬ সন্ধ্যা পৌনে ন’টার দিকে রাজধানীর গুলশানের ডিপ্লোম্যাটিক জোনের একটি অভিজাত রেস্তোরা হলি আর্টিসান বেকারিতে  হামলা করে সেখানে উপস্থিত দেশি-বিদেশি নাগরিক ও হোটেল কর্মচারীদের জিম্মি করে। সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড বিস্ফোরণের কারণে তৎক্ষণাৎ দুজন পুলিশ কর্মকর্তা সহ নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্য আহত হয়। হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণ পরে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম ও বনানী থানার ওসি মোঃ সালাউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনী কৌসুলি অবস্থান নিয়ে দিনের আলো ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এবং গতকাল (২ জুলাই)  সকাল সাতটায় চল্লিশ মিনিটে সেনাবাহিনী-নৌবাহিনী-বিমান বাহিনী- বিজিবি-পুলিশ-র‍্যাবের সমন্বয়ে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ড’ পরিচালনা করে। মাত্র ১৩ মিনিটের অপারেশনে শেষ হয় ১২ ঘণ্টার উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও টানটান উত্তেজনার। সেনাবাহিনীর ভাষায় মাত্র তের মিনিটের অপারেশনে ছয়জন জঙ্গী সন্ত্রাসীকে হত্যা করে তিন জন বিদেশী নাগরিক সহ দশ জন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করে। জিম্মি নাটক চলাকালে জঙ্গীরা বিশজন বিদেশী নাগরিককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বলে আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে। বিশ জন নিরীহ দেশী-বিদেশী নাগরিক ও দুজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তার জীবনের বিনিময়ে একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
এবারের রমজান মাস ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত রমজান মাস হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। পবিত্র ঈদকে কেন্দ্র করে টানা নয় দিনের ছুটিতে মানুষ যখন ফুরফুরে মেজাজে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেই সময়েই ঘটে গেল দেশের ইতিহাসের এক নজিরবিহীন নারকীয় হত্যাকাণ্ড। মানুষের মনে ঈদ উদযাপনে ভীতির সঞ্চার হয়ে গেল। এখন মানুষ কোন কাজেই স্বস্তি পাবে না।
ঢাকা, গুলশান ও হলি আর্টিসান বেকারি হঠাৎ করেই দেশ বিদেশে শিরোনাম হয়ে উঠল। গুলশান দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত একটি জায়গা। সে জায়গায় যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে দেশের অন্যত্র কি রকম নিরাপত্তা আছে তা ভাবলেই গা শিউড়ে ওঠে। এ কারণেই দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও মন্দিরের পুরোহিতদের হত্যা করা হচ্ছে বা হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হচ্ছে। পুরোহিত বা ব্লগারদের হত্যাকারীর কোন কিনারাই নিরাপত্তা বাহিনী করতে পারছে না।
প্রশ্ন উঠেছে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে। গতকাল ঘটনার প্রাক্কালে মিডিয়া যে ভাবে অতি উৎসাহী ভূমিকা নিয়েছিল তা আসলেই বিপদজ্জনক ও নিন্দনীয়। এর আগে বিডিআর বিদ্রোহের সময় মিডিয়ার প্রোপাগান্ডার কারণে সারা দেশে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতের মুম্বাই হামলার সময় মিডিয়াতে দেখেই ঘটনার চাঁইরা বিদেশে বসে সেই হামলার নির্দেশনা দিচ্ছিল বলে ভারত সরকার সে সময় মিডিয়ার লাইভ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। অপরপক্ষে মিডিয়া গুলোর অতি পাণ্ডিত্য মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বস্তুনিষ্ট খবর প্রচার ছেড়ে তারা পান্ডিত্যসুলভ অপ্রয়োজনীয় উপদেশ প্রচারে বেশি মনোযোগী ছিল। মনে হয়েছে সরকার টিভি সাংবাদিকদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ করলে অনেক ভাল ফল পেত। গতকাল র‍্যাবে মহাপরিচালকের মিডিয়ার প্রতি সময়োচিত ও ভদ্রোচিত নির্দেশনার কারণের আরও বেশি ক্ষতিই শুধু এড়ানো যায় নি জঙ্গীদের পালানোর পথকেও বন্ধ করা গেছে।
বারবার সবাই বলে আসছে, সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই। কিন্তু সন্ত্রাসীদেরও পক্ষেও অনেক মানুষের সমর্থন স্যোসাল মিডিয়ায় দেখা যায়। দেখা যায়, কোন হিন্দু পুরোহিত হত্যাকাণ্ডের খবরের অনলাইন মিডিয়ার আপডেটে অনেককেই শুকরিয়া আদায় করতে।  গুলশান কাণ্ডেও দেখা যাচ্ছে অনেকেই এই অপতৎপরতার সমর্থক এবং নিহত ছয় জঙ্গীর জন্য সেকি আহাজারি? প্রতিক্রিয়াশীল মানুষেরা স্যোসাল মিডিয়াকে উস্কানি দেয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করছে।  অথচ মিডিয়াগুলো এসব প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্য কখনই প্রত্যাহার করে না। ফেসবুকে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা জঙ্গি কর্মকান্ডকে উৎসাহ দিয়ে প্রতিনিয়ত উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার করে যাচ্ছে।
মিডিয়ার এই অনাচারের কথা বিবেচনা করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়াকে বন্ধ করার হুমকি সমর্থনযোগ্য না হলেও দেশের সার্বিক কল্যাণে যথোপযুক্ত বলেই মনে হয়। টিভি ও অনলাইন মিডিয়াসহ সকলকেই এরকম ক্রান্তিকালে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে।
যদিও এখন পর্যন্ত জঙ্গীরা হিন্দু ও খ্রিস্টান তথা তাদের বিধর্মীদের হত্যা করার মধ্যেই তাদের কর্মকান্ড সীমিত রেখেছে (গুলশানের ঘটনাতেও তারা বেছে বেছে বিধর্মী বিদেশীদের হত্যা করেছে, যদিও কয়েকজন বাংলাদেশীকেও হত্যা করেছে, তবে তারা হয়ত তাদের পাশবিক লালসা চরিতার্থের শিকার অথবা কিছুটা প্রতিরোধ করতে গিয়ে অথবা দুর্ঘটনাক্রমে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে থাকতে পারে), তবে এই অবস্থা কতদিন বজায় থাকবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্যদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল এখানকার হিন্দুদের হত্যা করার জন্য, কিন্তু তারা যখন এসে দেখে এখানে হিন্দু নেই, সব পালিয়ে গেছে তখন দেদারছে মুসলমানদেরই মারতে শুরু করে। পাগলা কুত্তা জাত বিচার করে কামড়ায় না, যাকে সামনে পায় তাকেই কামড়ায়।
প্রশ্ন উঠছে, যৌথবাহিনী রাতেই তাদের অপারেশন পরিচালনা করল না কেন? তাহলে হয়ত এই জীবনহানির সংখ্যা আরো কিছুটা কমিয়ে আনা যেত? যদিও আমার নিরাপত্তার কৌশল সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা নেই, তবুও মনে হয়েছে যৌথবাহিনী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। কারণ রাতের অন্ধকারে অপারেশন পরিচালনা করলে একদিকে জীবনহানির সংখ্যা বেশি হতে পারত, অন্য দিকে রাতের অন্ধকারে জঙ্গীদের পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি হতে পারত।
গুলশান কাণ্ডকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। সন্ত্রাসীরা যদি গুলশানের ডিপ্লোম্যাটিক জোনের সুরক্ষিত দুর্গের নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করতে পারে, সেখানে দেশের অন্য স্থান যে তাদের নখদর্পে সেটা বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন হলো এমন একটি সুরক্ষিত জায়গায় এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র কিভাবে মজুদ করল বা বহন করে নিয়ে গেল? তারা হয়ত গুলশানকে বেছে নিয়েছে বিশ্বব্যাপী নজরকারার জন্য কিন্তু পরবর্তিতে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে দেশের দুর্বল নিরাপত্তার এলাকাগুলোকে বেছে নেবে। ঈদের মৌসুম চলছে, এসময় স্বাভাবিক ভাবে বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, রেল স্টেশন ও বিমানবন্দর গুলোতে উপচে পড়া ভিড় চলছে। গুলশান কাণ্ডের পর এসব স্থানে চলাচলকারী মানুষেরা এখন নিরাপত্তা হীনতার মধ্যে আছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো দেশের মন্দির-গীর্জাগুলো। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও মন্দিরের পুরোহিতের উপর সেই একই কায়দায় হামলার খবর আসছে। ফলে দেশের হিন্দুরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে তাদের দিনাতিপাত করছে।
এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মিডিয়ায় গুলশান কাণ্ডের পাঁচ জঙ্গীর ছবি ও তিন জঙ্গীর পরিচয় মিলেছে। তাদের চেহারা সুরত ও পরিচয় দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ছেলে এবং বেশ মেধাবী। বিষয়টা খুবই উদ্বেগজনক। কয়েকদিন আগে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত জঙ্গী ফাহিমও মেধাবী ছাত্র ছিল। এবং তারা সকলেই দেশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়া করেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তারা কোন হতাশা থেকে ধর্মের নামে খুন-খারাবীতে ঝুঁকে পড়ছে সেটা ভাববার বিষয়।
এখন প্রশ্ন হলো গুলশান কাণ্ড কিসের আলামত বহন করে? এটি কি একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি নাকি একটি দীর্ঘমেয়াদী রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা? সরকার বার বারই বলে আসছিল, দেশে আইএস নেই। কিন্তু সেদিন সাইট ইন্টেলিজেন্স আইএস-এর বরাত দিয়ে যে খবরগুলো প্রচার করেছে তা বাস্তবেও মিলে গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হয় দেশেএখন পর্যন্ত আইএসের শক্তিশালী কর্মকান্ড না থাকলেও তাদের সাথে যে দেশীয় জঙ্গীদের এক ধরণের যোগসাজশ আছে সেটা বলাই বাহুল্য। গুলশান কাণ্ড তাদের জন্য বড় সাফল্য এবং এখন আইএস বাংলাদেশে তাদের কালো থাবা বাড়াতে আরো বেশি উৎসাহ পাবে। কাজেই এখন সময় এসেছে দলমত ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গী মোকাবিলায় সকলকে এগিয়ে আসার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিহতদের স্মরণে দুদিনের শোক পালনের কথা ঘোষণা করেছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। সেই সাথে ধন্যবাদ জানাই নিরাপত্তা বাহিনীকে যথা সময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য!