ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ


মির্জাপুরের কাছাকাছি জ্যামে আটকা পড়ে মানুষ বাইরে বেড়িয়ে এসেছে

 

দীর্ঘ ২৭ ঘন্টার বিরতিহীন যাত্রা শেষে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছি। ভাবছেন টেকনাফ-তেঁতুলিয়া ঘুরে এলাম? মোটেই না। মাত্র ৩২২ কিলোমিটার রাস্তা, ঢাকা থেকে রংপুরে আমার বাড়িতে আসতে এই সময় লাগল। যার মধ্যে ২৫ ঘন্টাই ছিলাম বাসে আর বাকি সময়টুকু ঢাকায় বাসা থেকে বাসস্টপে যাওয়া এবং রংপুরে বাসস্টপ থেকে বাড়িতে আসা। সড়ক পথে এতটা দীর্ঘ ভ্রমণ জীবনে কোনো দিন করিনি।

শুক্রবার রাত সাড়ে নটায় বাসে রওয়ানা দিয়ে ১৯ ঘন্টা পরে গতকাল বিকেল তিনটায় প্রথম সত্যিকারের যাত্রা বিরতি পাই গাড়ি যখন বগুড়া শেরপুরের ফুড ভিলেজে চলে আসে। খাবার খেতে খেতে টিভি স্ক্রিনে চোখ পড়লে দেখি উপর মহলের কোনো একজন ব্যক্তি বলছেন, এবারের ঈদে উত্তরে যাত্রা কোনো যানজট নেই তবে যানবাহন ধীরে চলছে। ধন্দে পড়ে গেলাম; যানজট আর যানবাহন ধীরে চলা বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

ঢাকা থেকে মির্জাপুরের কোনো এক জায়গায় আসতে সময় লেগেছে প্রায় আট-নয় ঘন্টা। যমুনা সেতুর পূর্ব পাড়ের মাত্র ১৩ কিলোমিটার পার হতে সময় লেগেছে ৬ ঘন্টা। যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ের অংশটুকু (সেতু এলাকা) অতিক্রম করতে সময় লেগেছে ২ ঘন্টা এবং ফুড ভিলেজ আসতে সময় লেগেছে আরও ৩ ঘন্টা। ফুড ভিলেজ থেকে রংপুর আসতে সময় লেগেছে ৫ ঘন্টা।

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় হয়ত যর্থাথই বলেছেন, রাস্তায় যানজট নেই তবে গাড়ি ধীরে চলেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, ছয় থেকে আট ঘন্টার রাস্তা ২৫ ঘন্টা লাগলেও শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বাড়িতে তো পৌঁছাতে পেরেছি। যানজট থাকলে কি আর বাড়িতে পৌঁছাতে পারতাম? হয়ত মন্ত্রী মহোদয় একেই যানজট না বলে যানবাহনের ধীরে চলা বলে থাকবেন।

রাস্তার বিড়ম্বনার কথা চিন্তা করে গত কয়েক বছর ঈদের সময় ঢাকার বাইরে যাওয়ার কথা ভুলেও চিন্তা করি না। এবার বিশেষ কারণে বাড়িতে আসতেই হলো। স্বাভাবিক উপায়ে বাসের টিকেটের ব্যবস্থা করতে পারিনি। ভাগ্নে তার পরিচিত চ্যানেলে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে টিকেটের ব্যবস্থা করেছে। তাই অনেকটা নির্বিঘ্নে ঢাকা থেকে যাত্রা তো করতে পারি। কিন্তু বিড়ম্বনা শুরু হয় যতদূর সম্ভব মির্জাপুর থেকে।

তখন সকাল হয়ে গেছে।  শম্বুক গতিতে বাস ১০ মিনিট চলে তো দুই-তিন ঘন্টা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। আর প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁশ করা মানুষগুলো নেমে আসে রাস্তায়। হাইওয়েতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের প্রাকৃতিক কর্ম নিয়ে। ছেলেরা যদিও এদিক সেদিক সারতে পারে, বিড়ম্বনায় পড়তে হয় মেয়েদের। তাদের প্রাকৃতিক কর্ম করার যেহেতু কোনো উপায় থাকে না তাই জল থেকে সবকিছুই তাদের খাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। এই দীর্ঘ সময় কোনো প্রাকৃতিক কর্ম করতে না পারা বা প্রচণ্ড গরমেও জল পান করতে না পারার কষ্ট শুধু ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারবে।

ভ্রমণকালে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী সড়কে যে গাড়িগুলো ছিল তার বেশির ভাগটাই ছিল ঢাকার লোকাল বাস এবং এবং ঢাকাতে গবাদি পশু নিয়ে যাওয়া ফিরতি বিভিন্ন সাইজের ট্রাক ও ভ্যান। আমার কাছে রাস্তায় জ্যামের প্রধান কারণ মনে হলো এই গাড়িগুলো। আমরা জানি ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটে বাসগুলো  এবং দেশের ট্রাকগুলো ট্রাফিক আইনের কোনো তোয়াক্কাই করে না। কাজেই তারা মহাসড়কে এসে ভিড় করাতেই স্বাভাবিক ভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। আরো একটা বড় বিষয় হলো ঐ ট্রাকগুলো ফেরার পথে তাদের গাড়ি ভর্তি করে ঘর ফিরতি মানুষকে গরু-ছাগলের মত নিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশের মানুষের একটা বড় সমস্যা হলো তারা ৫০০ টাকার একটা টিকেট কিনে পুরো ৫০ লাখ টাকার বাসটাকে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি বলে মনে করা শুরু করে। গাড়ির ড্রাইভারটি হয়ত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে উল্টাপাল্টা গাড়ি চালাচ্ছিল না। আর সেটা নিয়েই যাত্রীদের মধ্য থেকে অনেকে তার উপর কী রকম বিরক্ত হয়েছিল বা বলে বোঝানো যাবে না।  ‘বলদ’, ‘সিএনজি ড্রাইভার’ ব্যাটা … তুই’ ইত্যাদি অনেক অকথ্য গালিগালাজ তাকে শুনতে হয়। একটা মানুষ, যে ১২-১৪ ঘন্টা ধরে এই গরমের মাঝে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে আছে সে কত সময় আর মানুষের এই কটুক্তির চাপ সহ্য করবে? আমার তো মনে হয় দেশের দুর্ঘটনার একটা বড় কারণ হতে পারে আমাদের দেশের যানবাহনের যাত্রীদের অধৈর্য আর অসহিষ্ণুতা।

ড্রাইভারদের যে দোষ নেই তাও বলছি না। যমুনা সেতুর পর থেকে বগুড়ার সীমানা পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন ৫০০ মিটার পর পর এক জন করে ট্রাফিক সার্জেন্ট নিয়োগ করেছিল গাড়িগুলো যাতে শৃঙ্খলা মেনে চলে। কিন্তু কথায় আছে, স্বভাব মরলেও যায় না। গাড়িগুলো যেই একেক জন ট্রাফিক সার্জেন্টকে ক্রস করে ওমনি আবার উল্টো পথ দিয়ে গাড়ি  চালানো শুরু করে। কত জায়গায় ট্রাফিকরা তাদের লাঠি দিয়ে পেটায় তাও তাদের হুঁশ হয় না।

রাস্তায় যানজটের একটা বড় সুবিধা পায় সে এলাকার হকাররা। তারা জ্যামের সুযোগ নিয়ে এটা ওটা নিয়ে এসে বিক্রি করছে অত্যন্ত চড়া দামে। গতকাল দেখলাম একজন ব্যক্তি স্থানীয় টিউবওয়েলের জল প্রতি গ্লাস বিক্রি করছে ৫ টাকা দরে। দুপুরের কাঠফাটা রোদের সেই ভয়ানক গরমে মানুষ তাই কিনতে বাধ্য হচ্ছে।



কোমল পানীয় বিক্রি করছে এক কিশোর


ট্রাকে করে যাওয়া যাত্রীরা প্রচণ্ড রোদ থেকে বাঁচার চেষ্টায়



দীর্ঘ সময় বাসে বসে থেকে বিরক্ত যাত্রী হাফ ছেড়ে বাঁচতে রাস্তায় বেড়িয়ে এসেছে


রোদ-গরমে হাঁসফাঁশ করা যাত্রী একটু গলা ভিজিয়ে নিচ্ছেন
সরকার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করে না ঠিকই, তবে জ্যাম সৃষ্টি হতে না দিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।  সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা দেশের বৃহত্তম দুটি উৎসবে ঘরমুখী মানুষের চলাচলকে স্বাভাবিক ও ঝামেলামুক্ত করার লক্ষ্যে অনেক বড় বড় কথা বলেন। হয়ত সেই মাফিক পদক্ষেপও গ্রহণ করেন। তবে আমার মনে হয় সেই পদক্ষেপগুলো শুরু হয় সমস্যা যখন চরমে পৌঁছে যায় তখন। তারা আগে থেকেই যদি সঠিক পরিকল্পনা করতেন, রাস্তায় পর্যাপ্ত লোকবল মোতায়েন রাখতেন, ঢাকার লোকাল গাড়িগুলোর বাইরে যাওয়া বন্ধ করতেন এবং গবাদি পশুবাহী ট্রাকগুলোকে যদি অন্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো তাহলে হয়ত রাস্তায় মানুষের এই অসীম ভোগান্তি হতো না।

মন্তব্য ০ পঠিত