ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

১৪৫৪ বঙ্গাব্দ। দিন অনেক বদলেছে। বদলেছে প্রকৃতি,সেই সাথে জীবন যাত্রা ও সংস্কৃতি। দিন বদলের এমন দিনে বাঙলা সন-তারিখের হিসাব কেউ রাখে না। তবে হরিচরণ বাবু বেশ ভালোভাবেই তা রাখেন।

হেমন্ত কাল। হাল্কা কুয়াশার পরশে নবান্নের উৎসব আর নেই। দিন বদলের এমন সময়ে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি কোন এক দিনে উদাস ভঙ্গিতে একটি বইয়ের প্রচ্ছদে তাকিয়ে আছেন হরিচরণ দাস। ছ’সাত বছরের একটি বালক বৃষ্টিতে ভিজছে। খুবই মায়া ভরা সে দৃশ্য। ছবিটি দেখলে যে কারোরই ইচ্ছে হবে ছেলেটির পাশে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে। কভার পেজ উল্টাতেই লেখা-“ছয়-সাত বছরের একটি বালক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে বৃষ্টি দেখছে। সিলেটের বিখ্যাত বৃষ্টি। ফিনফিনে ইলশেগুঁড়ি না,ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টি এক নাগাড়ে সাতদিন পর্যন্ত চলতে পারে। ছেলেটি বৃষ্টি দেখছে তবে তার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নেই,বিস্ময়বোধ নেই,আছে দুঃখবোধ এবং হতাশা। তাকে আজ সারা দিনের জন্য আটকে রাখা হয়েছে। আজ সে ঘর হতে বের হতে পারবেনা।” বইটির নাম ‘কিছু শৈশব’। হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের স্মৃতি নিয়ে লেখা। বইটির দিকে তাকিয়ে হরিচরণের মন খারাপ হয়ে যায়। ছেলেটির মতোই দুঃখবোধ আর হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠে তার মন। ছেলেটি এক সময় ঘর থেকে ছাড়া পায়। “সে ছুটে বের হয়ে গেল। প্রথম কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে লাফালাফি করল। তারপর দৌড়ে রাস্তা পার হলো। রাস্তার ওপাশেই মাঠ। মাঠে কিছু নিচু জায়গা আছে,সেখানে পানি জমেছে। পানির উপর ঝাপাঝাপি করা যায়। মাথার উপর ঝুম বৃষ্টি। পায়ের নীচে পানি-কী আনন্দ!” হরিচরণ ভাবে ছেলেটিতো মুক্তি পেয়েছিল,কিন্তু সে? তার ভবিষ্যত প্রজন্ম? তারা কি পুরোপুরি বন্দি হয়ে গেল সারা জীবনের জন্য?

গেল বর্ষায় হরিচরণ বাবুর নাতনী বৃষ্টি দেশে এসেছিল। এদেশে তার এই প্রথম আসা। বৃটেন প্রবাসী বৃষ্টির সময় কাটে হরিচরণের সাথে লাইব্রেরি ঘরে। পুরনো বই ঘাটতে গিয়ে বইটি বের করে আনে সে। অনেক পুরনো বই তবুও প্রচ্ছদটি যেন জীবন্ত! বৃষ্টি চিৎকার করে হরিচরণকে ডেকে বলল,দাদু দেখে যাও,কী সুন্দর!
হরিচরণ কাছে আসতেই বইটি দেখিয়ে আবার বলল, দেখ কী অপূর্ব!
হরিচরণ বৃষ্টির মুগ্ধতায় আনন্দিত হলেন। মুচকি হেসে বললেন,সত্যিই অপূর্ব!
বৃষ্টি ভালো করে বাঙলা পড়তে জানে না। বৃষ্টির অনুরোধে হরিচরণ বাবু বৃষ্টিকে পড়ে শোনান। দীর্ঘ চার মাসের ছুটিতে অনেক কিছুই পড়ে শুনিয়েছেন। এরই মাঝে বাংলাটা বেশ ভাল ভাবেই রপ্ত করেছে বৃষ্টি। খুজে খুজে বই বের করে নিজেই পড়ে এখন। পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয় আবার বিস্ময়ও জাগে! ভাবে,বইয়ের পাতায় এত সুন্দর করে এদেশের মানুষ,সংস্কৃতি,জীবনযাত্রা আর প্রকৃতির যে বর্ননা তার অস্তিত্বের চিহ্ন মাত্র নেই। এত সুন্দর যে বৃষ্টির আনন্দ সে বৃষ্টি কোথায়? তার কাছে সব যেন রূপকথা মনে হয়। তবে কি………? নানা প্রশ্ন আর সন্দেহ উঁকি দেয় তার মনে। কবিগুরুকে তো বলেই ফেলল, “এ রকম একটা গানকে তোমরা জাতীয় সঙ্গীত বানালে কেমন করে? বাস্তবের সাথে তো এর কোন মিল নেই। এ লোকটাতো চরম গাঁজাখুরি করে গেছেন।” এ রকম আরও হাজারো কথায় কবিগুরুর মুন্ডুপাত করে ছাড়ল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- “আজি হতে শত বর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসে আমার কবিতা খানি/ কৌতুহল ভরে।” রবীন্দ্রনাথ সংশয়ে ছিলেন কেউ তার রচনা পড়বে কি না।কিন্তু শতবর্ষ পরে তাঁরই উত্তর প্রজন্মের ১৫-১৬ বছরের কোন বালিকা তার রচনাকে গাঁজাখুরি আখ্যা দিয়ে তাঁকে কাঠগড়ায় দাড় করাবে এ কথা হয়তো তিনি ঘূণাক্ষরেও কল্পনা করেন নি।
“দাদু! এদেশের কবি-সাহিত্যিকরা কি অতি মাত্রায় কল্পনা প্রবণ ছিলেন? এরা তো সব রূপকথা লিখে গেছেন!” -বৃষ্টির এমন জিজ্ঞাসার কোন উত্তর খুঁজে পায় না হরিচরণ। পাবে কি করে? ডি.এল রায়, জীবনানন্দ, শরৎ, নজরুল, তারা শঙ্কর, জসিম উদ্দিন, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আনিসুল হক কারো লেখার সাথেই মিলানো যায় না কিছুই। সত্যি উত্তরটা দিতে তার ভয় লাগে। ভয় এ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহিতার। অথচ হরিচরণ এখনো দেখতে পায় তার সেই স্বদেশ- ঘন সবুজ বন, সোনালী ফসলে ছেয়ে থাকা মাঠ, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা নদী, সাদা কাশবন! বর্ষার জল, কদম কেয়ার মনমাতানো গন্ধ, আমের মুকুলে ভ্রোমরার নাচন! শরতের সাদা মেঘ, শীতের শুভ্র শিউলী ফুল, শিশির ভেজা মাঠ, ঘাসের উপর হিরকোজ্জল শিশির কণা! সবই কি রূপকথা! সবই কি কবি-সাহিত্যিকদের কল্পনা প্রসূত বিষয়বস্তু?

পুরনো দিনের ছবি ভেসে উঠে হরিচরণের মনে। পূর্ব পুরুষের ভিটা ছিল সিলেটের জকিগঞ্জে। ওপার থেকে নেমে এসেছে বরাক নদী। তারপর দু’ভাগ হয়ে একপাশে বয়ে গেছে সুরমা নদী অন্যপাশে কুশিয়ারা। নদীর তীর ঘেঁষে ফসলি জমি,ছবির মত সারি সারি সবুজ গ্রাম,একটু দূরে জেলে পাড়া-সবই আজ মরুভূমি-উত্তপ্ত ধূ ধূ বালি। আর পঞ্চাশ বছর পর হয়তো এখানে হারানো সভ্যতার খোঁজে প্রত্নতাত্ত্বিকদের আনাগোনা বাড়বে। প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধে জনশূণ্য বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে অমলশীদ, মানিকপুর, সহিদাবাদ, হাইন্দ্রবন্দ, বিয়ানীবাজারসহ আশেপাশের শত শত গ্রাম। আজ নেই সেই টাঙ্গুয়ার হাওড়, নেই তামাবিল। সুরমা তীরের হাসনরাজা, কালনী তীরের আব্দুল করিম সবই হারিয়ে গেছে এদেশ থেকে। হরিচরণের মত কারো লাইব্রেরিতে স্থান পেলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা রূপকথা!

১৪২৮ বঙ্গাব্দের ভূমিকম্পে বিলীন হয়েছে সব। সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ পূর্বাঞ্চলের অনেক জেলা ক্ষতিগ্রস্থ। ৫ কোটি লোক সহায়সম্বলহীন বাস্তুহারা হয়ে ছিন্নমূলে পরিণত হয়েছে। ৫০লক্ষাধিক লোক নিখোঁজ। আরও প্রায় কয়েক লক্ষাধিক লোক মারা গেছে দুর্ভিক্ষে। কোন রকমে ক্ষুদ্রপরিসরে টিকে আছে বিধ্বস্ত সিলেট শহর। এ শহরেই বিধ্বস্ত ঐতিহাসিক কীনব্রীজ ,যার নীচে স্রোতস্বিনী সুরমার জলের পরিবর্তে ধূ ধূ প্রান্তর তারই অদূরে ছোট্ট বাড়িতে বসে অতীত দিনের ছবি আঁকছেন হরিচরণ বাবু। আজ সকালে তার নাতনী চলে গেছে লন্ডনে। সাথে নিয়ে গেছে ধুকে ধুকে মরা এক দেশের চিত্র-কঙ্কালসার মানুষগুলোর মতোই কঙ্কালসার একটি দেশ। প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের দয়ায় (!) এখনো মানুষ গুলো বেঁচে আছে। ওই রাষ্ট্র খাদ্য রপ্তানী করে বলেই খাদ্য উৎপাদন না করেও ৪৯ ডিগ্রী তাপমাত্রায় এখনো নিঃশ্বাস নিতে পারছে এখানকার মানুষ। নদীর মাছ, গাছের ফল, ক্ষেতের সব্জি, খাবার পানি এখানকার বাজারে আসে ওপার থেকে। প্রতি লিটার পানির দাম ২৫০ টাকা। ছোট বেলায় আফ্রিকা-সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের ছবি দেখেছে হরিচরণ। জীবন সায়াহ্নে নিজের দেশেই এমনটি দেখবেন তা কোন দিন কল্পনাও করেন নি।বৃষ্টি যাবার সময় বলেছিল, “ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংগ্রামে সমৃদ্ধ একটি জাতিকে তোমরা এভাবে হত্যা করতে পারলে? এখন এখানে আর থেকে কি হবে?চলে এসো দাদু।” কিন্তু হরিচরণ কোন এক অদৃশ্য মায়ায় যেতে পারেনি, যেতে চায় না।

১৪৫৪ বঙ্গাব্দ। ২০৪৭ খ্রিস্টাব্দ। দিন অনেক বদলেছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলসহ ৬০ শতাংশ ভূমি ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধের সুবিধা নিতে গিয়ে পরিণত হয়েছে মরুভূমিতে। বাকি ৪০ শতাংশ টিকে আছে কোন রকমে। এমনি এক সময়ে পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে মহা উৎসবে পালিত হল বৃটিশ শোষণ মুক্তির শতবর্ষ পূর্তি উৎসব। বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ ভূমিতেও পালিত হল সেই দিনটি। মরুভূমির বুকে আতশ বাজির আলোক ছটা আকাশের তাঁরাদেরও হার মানিয়েছে। ১৪৭৮ বঙ্গাব্দ। ২০৭১ সাল। মহান মুক্তিযুদ্ধের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব নাকি প্রত্নতাত্বিকদের গবেষণার বস্তু নাকি…………? ভাবতেই শিরা উপশিরায় রক্তের ছুটোছুটি বেড়ে যায়, রক্ত হয়ে উঠতে চায় বিদ্রোহী। কিন্তু এই পড়ন্ত বেলায় অসহায়ত্ব আর অক্ষমতার কথা চিন্তা করে হরিচরণ বাবু অনুশোচনায় বইটির প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলেন।