ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

হৃদ (ছদ্মনাম), বগুড়ার স্বনামধন্য বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ছে। অনুকরণপ্রিয় কোমলমতী এই বয়সে সে শিখেছে প্রেমে পড়লে হাত কাটতে হয়। সিগারেটের ভিতর গাজা লাগানোর প্রসেসটাও তার অজানা নয়। বগুড়া শহরের কোথায় অবৈধ ভাবে মাদক বিক্রি করা হয় সে ঠিকানাও তার মুখস্ত। হৃদের হাতে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, কোমল ঠোঁট পুড়ে গেছে নিকোটিনে!

.

এদিকে পাশের বালিকা উচ্চ বিদ্যলয়ের একই ক্লাসের ছাত্রী হৃদি (ছদ্মনাম)। মায়াময়ী চেহারার এই শিশুটির ফেসবুক আছে! এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই এবং এটাকে সবসময় খারাপ বলা যায় না। আজকের শিশুরা তথ্য প্রযুক্তি শিখে জ্ঞানী মানুষ হবে, ওরা জানবে সক্রেটিসের কথা, প্লেটোর কথা, এরিস্টটলের কথা, জর্জ ওয়াশিংটনের কথা, ইন্টারনেটে ক্লিক করে ওরা জানবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। কিন্তু এ কী! হৃদির ফেসবুকে বিরহের স্টেটাস কেন? তাও আবার যেমন তেমন বিরহ নয়! সে লিখেছে “এ জীবন রাখতে চাই না আর”!!

34662-200

.

৬ষ্ঠ শ্রেণীর এই ছোট্ট মেয়েটার মনে এতো বিষাক্ততা কেন, মৃত্যুর গন্ধ কেন? সেখানে তো ফুলের গন্ধ থাকার কথা ছিলো। হয়ত হৃদির মনে বিষাক্ততা ছড়িয়েছে ফেসবুকে পরিচয় হওয়া মাংসাশী সেই ছেলেটি, যে তাকে ডেকেছিল অন্ধকারে। ফুলের মতো এই মেয়েটি সব হারিয়ে এখন যদি মরেও যায়, আমাদের যায় আসবে না কিছুই। এরকম অনেক মৃত্যুর তারিখে ভরে গেছে প্লাস্টার করা দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডার। প্রতিটি দিন মনে হয় হৃদি’র মতো কোনো ফুলের মৃত্যুবাষিকী!

.

এশহরে/এদেশে হৃদ-হৃদি একা নয়, অসংখ্য হৃদ, হৃদি জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে আছে প্রায় ঘরে ঘরে। বাবা-মা শুধু এতটুকু জানেন গত পরীক্ষাতে সে একশ’র ভিতর আড়াই নম্বর কম পেয়েছে। বাবা মা এতটুকু জানেন বিকেলে কোচিং এ পাঠাতে হবে; রাতে হরলিক্স দিয়ে কিছু কাগজ গেলাতে হবে। কে জানে বিষাক্ত শহরের ভয়ঙ্কর প্রোগ্রেসিভ ব্লেড ট্রেডিশন অনুসরণ করে ফুলের মতো শিশুটির মনে কতটুকু বিষ জমল? বাবা মা সে খবর রাখেন? তারা হয়ত জানেনই না তার সন্তানের শরীরে কিছু গভীর ক্ষতচিহ্ন আছে, তার চেয়ে গভীর ক্ষত আছে মনের ভিতর; যা খালি চোখে দেখা যায় না।

.

‘ব্লেড ট্রেডিশন’ নামটা আমিই দিয়েছি। কি করবো! ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া ছোট্ট একটা শিশুর হাতের ক্ষতচিহ্নের কারণ জানতে চাইলে যখন সে আমাকে জানায়, ৫টাকা দিয়ে কেনা নতুন ব্লেডে সে তার শরীরে এঁকেছে বিরহ। কিসের বিরহ? আমি বুঝিনা। এই বয়সে ওরা প্রেম ভালোবাসা বুঝে গেছে! ভালোবাসা তো খারাপ কিছু না, ভালোবাসা তো পবিত্র। তবে এই পবিত্র ভালোবাসায় ধারালো ব্লেড এলো কোথায় থেকে? ভালোবাসায় মাংসের গন্ধ এলো কোথা থেকে?

.

ক্যান্সারের মতো ছড়াচ্ছে হত্যা, বাল্যবিবাহ, অপহরণ, আত্মহত্যা, মাদক, সন্ত্রাস। ঝড়ে পড়ছে ফুলের মতো শিশু কিশোরদের জীবন।

.

এইদেশে নীরবে এই ব্যাধিগুলো ছড়িয়েছে অশ্লীলতায় ভরা কিছু ভিনদেশী টিভি চ্যানেল এবং আমাদের দেশেরও কিছু টিভি চ্যানেল চলছে প্রায় একই পথে। দ্বিতীয়ত ইন্টারনেটের প্রভাব রয়েছে, তবে ইন্টারনেটের সরাসরি দোষ নেই। টিভির প্রোগ্রাম চেঞ্জ করা যায় না, অশ্লীল গানগুলোও বদলানো যায় না, চ্যানেলগুলো আমাদের যা দেখাবে আমাদের তা-ই দেখতে হবে। বিদেশী চ্যানেলগুলো অশ্লীলতা প্রচার করছে এবং সংখ্যায় এই চ্যানেলগুলো এতো বেশী যেগুনে শেষ করা যায় না। ঘরে ঘরে ডিশ টিভি থাকায় অশ্লীলতা প্রচারের মাধ্যমে অনুকরণপ্রিয় শিশু-কিশোরের মনে বিষাক্ততা ছড়াতে ভিনদেশী সংস্কৃতির টিভি চ্যানেলগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ইন্টানেটের দোষ কিছুটা কম বলে আমি মনে করি, কারণ ইন্টারনেট নিজের ইচ্ছায় অশ্লীলতা প্রচার করে না। আমরা যখন ইন্টারনেটে অশ্লীলতা খুঁজতে আদেশ করি তখন ইন্টারনেট অশ্লীলতা প্রচারে বাধ্য। ব্যর্থতা ইন্টানেটের নয়, ব্যর্থতা আমাদের; ব্যর্থতা এই শিশু কিশোরদের বাবা-মার। মধ্যরাতে তার সন্তান মোবাইল/কম্পিউটারে কী করছে সে খবর কে রাখবে? নিশ্চয় বাবা-মা।

.

সচেতন হতে হবে আমাদের সবার। রাতেরবেলা বগুড়া শহরে অল্পবয়সী ছেলে মেয়েদের ঘোরাঘুরি করতে দেখলে চুপ করে থাকার চেয়ে আমি তাদের বুঝিয়ে বলি, “রাত হযেছে, বাড়ি যাও”। ওরা বুঝবে, কারণ ওরা অবাধ্য নয়, ওরা অনুকরণপ্রিয়। আজকের শিশু কিশোর আমাদের দেশের প্রদীপ, ওরা দেশের সম্পদ। কালকে ওরাই আলোকিত করবে বাংলাদেশ। শাসন করে নয়, বুকে জড়িয়ে ওদের বুঝিয়ে বলতে হবে ওরা ভুল পথে হাঁটছে।

.

মাদকমুক্ত, অশ্লীলতামুক্ত, ভয়ঙ্কর প্রোগ্রেসিভ ব্লেড ট্রেডিশন মুক্ত দেশ চাই,

চাই আলোর মানুষ; চাই আলোকিত বাংলাদেশ।

.

নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন, ব্লগার, অনলাইন এক্টিভিস্ট।