ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

মনে পড়ে, আমি যখন স্কুলে পড়ি নবম-দশম শ্রেণীতে মাত্র দুই থেকে তিন দিন স্কুলে নেম প্রেজেন্ট করেছিলাম। পাঠ্যবইয়ের ভিতর আমার তেমন আগ্রহ ছিলো না। তাই বলে বই পড়িনি বিষয়টা এমন না। হোমার, প্লেটো, শেক্সপিয়ার, এরিস্টটল, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, আর্থার কোনান ডয়েল, হোর্হে লুইস বোর্হেস… আরো অনেক জ্ঞানী মানুষের লেখা আমি পড়েছি। তাছাড়া স্কুলের পড়ায় মনোযোগ কম থাকা কিংবা স্কুল পালানো কোনো অপরাধের তালিকায় পড়লে আমি অনেক আগেই জেলে থাকতাম, আমারও আগে জেলে থাকতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখন কথা হচ্ছে আমার ছোট ভাইবোন যারা এখনকার দিনে স্কুল পালানোর চিন্তা মাথায় ঘুরছে প্রতিনিয়ত। কেমন কাটছে তাদের স্কুল পালানো? ওরা কি স্কুল পালিয়ে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস পড়ছে? না কি অন্যকিছু… না কি একেবারেই ভিন্ন কিছু?

school boy&girl

 

স্কুল পালিয়ে ষষ্ঠ সপ্তম কিংবা নবম দশম শ্রেণীর আমার ছোটভাই-বোনেরা মেতেছে ঘুরাঘুরিতে। ওদের মনে ঘুরাঘুরি মানে জ্ঞানের ভ্রমণ নয়, ওরা ঘুরে ক্রাশের সাথে। ক্রাশ মানে কী? ক্রাশের সাথে ঘুরলে ক্ষতি কী?

আসলে কাহিনী হচ্ছে, ক্রাশ কিছুটা ভালোবাসা রিলেটেড। মানে; ভালোবাসাকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে কারো সাথে শারিরীক ও মানসিক সম্পর্ক স্থাপনের তীব্র ইচ্ছা… যাকে ওরা বলে ক্রাশ খাওয়া। স্কুল পালিয়ে ওরা যায় ক্রাশের সাথে ঘুরতে এবং ক্রাশ খেতে। মাথার পোকা এতোটাই নড়ে উঠেছে যে স্কুলড্রেস পড়া ছেলেমেয়ের যন্ত্রনায় পার্কে যাওয়া যায় না। এবং পার্ক এখন আর পরিবেশ দূষণে ক্লান্ত নাগরিকের নিকোটিন পোড়া বুক ভরে সবুজ সজীব নিশ্বাস নিয়ে রিফ্রেশ হওয়ার জায়গা নয়। পার্ক এখন নিজেই দুষিত। শুধুই কি পার্ক দূষিত? আমাদের দেশটাই দূষিত হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি তো সারা পৃথিবীতেই হুমকির মুখে রয়েছে, তবে তারচেয়েও ভয়ঙ্কর মানুষের মনের ভিতরের পরিবেশ যখন দূষিত হয়। আরো অনেক বেশি ভয় তখন হয়, যখন দেখি স্কুল পড়ুয়া কোমলমতিদের মনে দুষণ! যেখানে কথা ছিলো থাকবে ফুলের বাগান।এখন সেখানে ফুলের বাগানের সাইনবোর্ড সরিয়ে ক্রাশের বাগান লেখা!

ক্রাশের কাহিনীটা বলি। স্কুল পালিয়ে কোমলমতীরা ক্রাশের সাথে পাবলিক পার্কে ঘুরতে গেলে যতোটা শারিরীক মানসিক দূষণ ঘটে তার চেয়ে অনেক বেশি দূষণ ঘটছে ক্যাফেগুলোতে। আমাদের দেশের ক্যাফেগুলো এখন এমন হয়ে গেছে, যেখানে ঘরের ভিতরেও গোপন অনেকগুলো ঘর আছে! ঠিক ঘর নয়, কিছুটা মুরগির ঘরের মতো, ছোট ছোট খোপ। এগুলো হচ্ছে ক্রাশদের মনের মতো থাই স্যুপ অর্ডার করে ঘন্টার পর ঘন্টা চামচ চেটে কাটানোর জায়গা! এই একেকটা খোপ হচ্ছে একেকটা ইতিহাস। যেখান থেকে জল গড়িয়ে অনেকদূর যায়। এখন কথা হল ষষ্ঠ শ্রেণীর একটা মেয়ের বয়স কতই বা হয়েছে? এতো কম বয়সে ওদের মনের ভিতর এতো কিসের আলোড়ন? কেনইবা আলোড়ন?

পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম শ্রেণীর কিংবা তারচেয়েও নিচের ক্লাসের ছেলেমেয়ে স্মার্টফোন ব্যাবহার করে। এখানে বিশেষকরে এই ছোট্ট মেয়েদের স্মার্টফোনের কাহিনী শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই মেয়েদের বেশীরভাগ বাড়ি থেকে মোবাইল কিনে দেয়নি, এবং এই মেয়েগুলোর পরিবার চায় না ওরা এতো কম বয়সে মোবাইল ব্যাবহার করুক। তবুও ওরা স্মার্টফোন পায় কোথায়? উত্তর হল বয়ফ্রেন্ড কিংবা ক্রাশ। মেয়েটা তার কথিত ক্রাশের থেকে কিনে নেয় স্মার্ট ফোন, কোনো কোনো মালদার পার্টি যখন কোনো মেয়ের ক্রাশ হয় তখন তো না চাইতেই আইফোন পাওয়া যায়। প্রথমে ধূর্ত প্রেমিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্মার্টফোন উপহার দেয় স্কুলে পড়া ছোট্ট মেয়েটাকে। তারপর হয় যোগাযোগ, অনেক বেশী যোগ এবং আরো বেশী যোগে হতে থাকে দূষণ প্রতিনিয়ত। মেয়েটার বাড়িতে জানতেও পারে না কোলের ছোট্ট মেয়েটা শিখে গেছে অনেক বেশী কিছু। পরিবার জানে তখন, যখন মেয়েটাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না আর। পরিবার জানে তখন, যখন মেয়েটার রক্ত বমী হয়। পরিবার জানে তখন, যখন মেয়েটার গায়ে ভীষন জ্বর। পরিবার জানে তখন, যখন মেয়েটা আত্মহত্যা করতে যায়। পরিবার জানে তখন, যখন দরজা লাগানো ছোট্ট মেয়েটার ঘর থেকে ভেসে আসে লাশের গন্ধ।

তারপর আরেকটা কাহিনী হল কোচিং। যেখানে পড়ার নামে সন্ধ্যাকালীন ব্যাচ হয়। আর যে ছেলেমেয়ে ঝলমলে আলোর দুপুরে ইস্কুল পালিয়ে ক্যাফের ভিতরের গোপন ঘরে যায়, তারা সন্ধ্যার হাল্কা অন্ধকারে কতটুকু কোচিং করবে তা বোঝাই যায়।

কাহিনীর শেষ নেই… প্রতিদিনই অঘটন ঘটছে। ঘরের ভিতরেও যখন ঘর! আর সেই ঘরের ভিতরের সব খবর কি মানুষ জানে! তবুও ড্রইরুমের টেবিলে এতোগুলো খবরের কাগজ পড়ে আছে বুক ভরা কিছু ছোট্ট ছেলেমেয়ে’র নিরুদ্দেশ হওয়ার গল্প নিয়ে।

বাবা-মাদের বলি, আপনারা ছেলেমেয়ের খবর রাখেন? বার্ষিক পরীক্ষায় টোটাল কতো নম্বর পেয়েছে, রোল কতো হয়েছে সে হিসেব জানতে চাইনি। একটু জানুন ওদের মনের খবর। মানুষ হয়েই ওরা জন্মেছে এবং ওরা মানুষই হবে। ওরাই তো হবে আগামির আনিসুল হক। ওরা হবে আগামির মাশরাফি বিন মর্তুজা, জয়নুল আবেদীন! ওদের ভিতর থেকেই কেউ হবে কার্ডিয়াক সার্জন ড. লুৎফর রহমান, ওরা হবে আলোকিত মানুষ। খোকাই তো একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হবে। খুকিই তো একদিন মাদার অফ হিউম্যানিটি হবে। ওরা তো এখন বীজ কিংবা চারা গাছ, কালকে ওরা বৃক্ষ হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পরিচর্যায় প্রতিটি বীজ, চারাগাছ একদিন বিশাল বৃক্ষ হয় এবং হবে। শুধু সামান্য একটু পরিচর্যার প্রয়োজন। কারণ পরিচর্যার অভাবেই তো সাজানো বাগান হয়ে যায় জঙ্গল। বিষয়টা আমাদের বুঝতে হবে।

ক্রাশমুক্ত, অশ্লীলতামুক্ত, লাশের গন্ধমুক্ত, ঘরের ভিতরের ঘরে শিশু-কিশোর মুক্ত দেশ চাই। চাই আলোর মানুষ। চাই আলোকিত বাংলাদেশ।