ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

সেদিন সকালে ডেইরি গেইট দিয়ে বের হয়েছি মিটফোর্ড যাবো বলে, বের হয়েছি সকাল সাতটায়। আমার সাথে ছিলো হলের ছোটভাই তপু, আমাদের দশটার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। তপু আমার বাবাকে রক্ত দিতে যাচ্ছিলো, সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের সান্নিধ্য পাওয়া কঠিন, দুপুর দুইটার পরে এই নাক উঁচা সম্প্রদায়ের দেখা আর পাওয়া যায় না। আমার মা চেয়েছিলেন দুটোর মধ্যেই যেন রক্ত দেয়ার কাজ সম্পন্ন হয়, সরকারী হাসপাতালে আবার অমুক রুমে ডাক্তার তমুক রুমে টেস্ট আরেক রুমে টাকা জমা দেয়া ইত্যাদি জটিলতা আছে।

বিগত দশ বছর আমার বাবা এভাবে বেঁচে আছেন, লিভারে জটিলতায় তার নিজের শরীর রক্ত তৈরি করতে পারে না। রক্ত নেবার সময়েও হঠাৎ হঠাৎ জ্বর, খিচুনি ইত্যাদি জটিলতায় আক্রান্ত হোন, এমন সময়ে ডাক্তারের দেখা না পেলে অসহায় লাগে। এই দেশের নিদারুণ দুর্ভাগ্য এখানে দুটো সবচে গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক খাত শিক্ষা ও চিকিৎসা দুটোর অবস্থাই হাড় জিরজিরে বুড়োর মতো, প্রতিরাতে যার প্রার্থনা থাকে এই শীতটা কোনোক্রমে যেনো টিকে যেতে পারে। উন্নয়নের চাপে বুড়োটা শীতগুলো কাটিয়েই দিচ্ছেন, এই সরল পৃথিবীতে এ এক বিরাট রহস্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সাথে আছেন পুলিশ, শত শত পুলিশ। রাস্তায় দাঁড়ালেই পুলিশ দেখি আজকাল, মিছিল করলে পুলিশ পেটাতে আসে, অবস্থান নিলে হাতকড়া পরাতে আসে, কোথাও যেতে গেলে রাস্তা আটকে দাঁড়ায়। দেশে যে এত এত পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিগত কয়েক বছরে তাদের দিয়ে কিছু একটা তো করাতে হবে, পুলিশ দিয়ে তো আর ঘাস কাটানো যায় না। এবার পুলিশ রাস্তা আটকে রেখেছে কেননা ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আসবেন, তিনি স্মৃতিসৌধে ফুল দান করে এদেশকে ধন্য করবেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র নিয়মিত বাইরে যাতায়াত করেন, মানে দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নামের ছলনায় যে অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আবাসন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের আমি বিভিন্নসময়ে বলতে শুনেছি এই স্মৃতিসৌধ ব্যাপারটাকে কোনোভাবে সরিয়ে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া যায় কিনা। এই শুদ্রের দেশে ব্রাহ্মণেরা যেভাবে রাস্তা বন্ধ করে যুদ্ধে নিহত শুদ্রদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যান তাতে জীবিত নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে যায়। মানে সাধারণ মধ্যবিত্ত, হাসপাতালের পেয়িং বেডের রোগী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আমি শুদ্র বলছি, গার্মেন্টস শ্রমিক রিক্সাওয়ালা ও অন্যান্য নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র সম্প্রদায়ের লোকেরা হচ্ছে অচ্ছুৎ, আনটাচেবলস, এই যুদ্ধজয়ী আর্য জাতির সাম্রাজ্যে তারা অনার্য, তারা বানর ও রাক্ষস। তাদের কথা বলার দরকার নেই, এসব কথায় কারো কিছুই আসে যায় না।

পূর্বে আমরা দেখেছি ধর্মের মতো একটা পবিত্র বিষয়কে নিয়ে কী ভয়ানক নোংরা রাজনীতি হয়েছে, আমরা বলেছি অতিভক্তি চোরের লক্ষণ, আমরা অভিজ্ঞতার নির্মমতায় বলীয়ান হয়ে দাবি করেছি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এদেশে নিষিদ্ধ হোক।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে নাই, নিজেরাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামে নতুন ধর্ম চালু করেছে। এই ধর্মানুসারে কোটাপদ্ধতির নামে মেধাবীদের বঞ্চিত করা যায়, রাস্তায় মানুষকে জিম্মি করে প্রমোদভ্রমণ করা যায় ধর্মের স্তম্ভসমূহে শ্রদ্ধা নিবেদনের নামে, গাছের বুক ফুটো করে নিজের বিরাট বিরাট ছবি টাঙিয়ে ধর্মবীরদের শ্রদ্ধা জানানো যায়, মানে প্রচলিত ধর্মসমূহ যেভাবে জনসাধারণকে নিপীড়ন করে তার প্রায় প্রতিটি নমুনা এই ধর্মেও উপস্থিত আছে, একইসাথে ধর্মগুরুরা মূলত ভণ্ড।

সে যাই হোক, দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তায় তিন ঘন্টা। এর মধ্যে বিভিন্ন বাইপাস দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছি, সেগুলোও বন্ধ। দশটার সময়ে বাস পেয়েছি, তাতে দাঁড়ানোর জায়গা মিলেছে খুব কষ্টে, পুরোটা রাস্তা দাঁড়িয়ে গিয়েছি। ভাগ্যিস ডাক্তার না থাকা সত্ত্বেও সেদিন রক্ত ভদ্রভাবে বাবার শরীরে প্রবেশ করেছিলো, উৎপাত করেনি। কিন্তু যদি জটিলতা হতো আমি কাকে দায়ি করতাম? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধের সাভারে অবস্থান, নাকি আমার যে অর্থাভাব আমাকে একটা হেলিকপ্টার কিনতে দেয় না সে দারিদ্র্য, নাকি এই যে মহান পুরুষেরা নিয়মিতভাবে সাধারণকে জিম্মি করে রাস্তা দখল করে ভ্রমণ করেন তাদেরকে?

এদেশের ছাত্রসমাজের রাজনীতি ও গবেষণা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া, আত্মকেন্দ্রিক ও দাস হয়ে উঠার চর্চা, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন বয়ান শুনে শুনে আমার ক্যাম্পাস জীবন কেটেছে। আমার বামপন্থী বন্ধুরা বলেছে মূল সমস্যার নাম ইউজিসির বিশ বছর মেয়াদী শিক্ষানীতি, সমস্যাসংক্রান্ত এত ভারী ভারী শব্দের অর্থ বুঝতে প্রথমদিকে আমার কষ্ট হতো। এখন বুঝেছি, এবং এটাও বুঝেছি মুক্তির পথ খুবই বন্ধুর, এদেশের বাপ-মায়েরাই তো বিক্রি হয়ে গেছেন, কীভাবে আশা করি যে সন্তান দাস না হয়ে মুক্তচিন্তার অধিকারী হবে?

তপু সহজ সরল ছেলে, মার্ক্সবাদ ও বাণিজ্যকায়ণ নিয়ে তপুর তেমন মাথাব্যথা নেই। তপুর মতে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে তিরিশ ভাগ বিশ্বাস করে জাতির পিতা শেখ মুজিব, তিরিশ ভাগ বিশ্বাস করে জাতির পিতা ইব্রাহীম, বাকি চল্লিশ ভাগ কাকে জাতির পিতা বিশ্বাস করে সেটা নির্ধারণ করে তারা কোথায় আছে, সরকারি চাকুরির ভাইবা ও ওয়াজ মাহফিলে দু’জায়গায় তারা দু’জন আলাদা মানুষকে পিতা মানে। এবং এই পিতা সংক্রান্ত সমস্যাই ছাত্রদের মূল সমস্যা, আগে তাদের পিতা নির্ধারিত ও সর্বমান্য হওয়া জরুরী।

আমিও ভেবে দেখেছি, এই পিতা সংক্রান্ত সংকট ইউজিসির শিক্ষানীতির চেয়ে কম ভয়ানক নয়। আর চেতনাধর্মের বিস্তার ও অত্যাচারে জনগণ যদি আদিধর্মে ফিরে যায় তবে এদেশের জাতীয়তাবাদ ভেঙে পড়বে। আমি মনে করি জাতীয়তাবাদ এদেশের শিড়দাঁড়া শক্ত করে দাঁড়ানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, আর মুজিবকে কেন্দ্রে না রাখলে জাতীয়তাবাদ ভেঙে পড়বে, এদেশের শেখ মুজিবকে প্রয়োজন। শেখ মুজিবকে পিতা বানাতে হবে, ধর্মগুরু বানাতে গেলে সবকিছুই ভেঙে পড়বে, আশা করি সর্বশক্তিমান মুজিব পরিবারের সদস্যরা এটা অনুধাবন করতে পারবেন।

গতবছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্রের দুর্ঘটনাবশত মৃত্যুর পর আমরা বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট রাস্তায় স্পিডব্রেকার বসানো, ওভারব্রিজ নির্মাণ ও গতি নিয়ন্ত্রণের দাবীতে আন্দোলন করেছিলাম, পুলিশ আমাদের গুলি ছুড়েছিলো। ভিসির বাসায় যাবার পথে পায়ের সাথে লেগে ফুলের টব ভাঙার পর আমাদের নামে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের হয়েছিলো, আমাদের জেলে নেয়া হয়েছিলো। তখন বঙ্গবন্ধুপন্থী শিক্ষকেরা আমাদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। ঢাকায় এখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বলীয়ান ছাত্ররা নারীদের নিপীড়ন ও আন্দোলনকারী ছাত্রদের পেটাচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বলীয়ান শিক্ষকেরা নিপীড়ক ও পেটুয়াদের সমর্থন দিচ্ছেন। দিনদিন যা কিছু মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিব সেগুলোকে সাধারণের বিপক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যারা এসব করছেন তারা কি বুঝতে পারছেন যে তাদের এই রাজনীতির ভবিষ্যৎ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যতের মতো।

মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবেই জনগণের বিপক্ষে নিয়ে দাঁড় করাবেন না। এই মানুষের জন্যেই মানুষ যুদ্ধ করেছিলো, রাজনীতির ছলাকলা ও পরিবারতন্ত্রের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্যে মানুষ যুদ্ধে যায়নি। এইসব ঠাট্টাতামাশা বন্ধ করেন।