ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

১.
গুজব সম্পর্কে সবচেয়ে যে সত্য কথাটি বেশী বলা হয়, তা হচ্ছে ‘গুজবে কান দিবেন না’। যেহেতু গুজবে কান দিতে হয় না, ও জিনিস এমনিতেই কানে চলে আসে, অর্থাৎ গুজব নামক জিনিসটি মানুষের কানেই বাস করে, মগজে নয়, তাই এ সত্য কথাটির কোন প্র্যাকটিকাল ভ্যালু নেই। মানে গুজবের সময় ও নীতিবাক্য কোন কাজেই লাগে না।

কাজে যে লাগে না, সে জিনিস একবার বুঝেছিলাম হাতে-নাতে, সে গল্প পরে বলছি।

একবার বাংলাদেশের এক জেলাতে এক ‘মহাপ্রাণের(!)’ চন্দ্রবদন চাঁদে ভেসে উঠেছিল, সে গুজবে কয়েকগন্ডা মানুষের প্রাণ কঁচুকাটা হয়ে গেল। ফেসবুক ভেসে গেল ‘চাঁদ-মাঝারে তাহার বদনের’ ছবিতে।
এ আমার শোনা গল্প, কাজেই আপনি যদি বিশ্বাস করেই থাকেন যে সত্যই তাহাকে চাঁদে দেখা গিয়েছিল, তাহলে আপনি আপনার বিশ্বাস নিয়েই থাকুন, আমি আপনার সাথে তর্ক করতে পারব না।

আমার এক সহকর্মী সেসময় সেই জেলাতে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার কাছে শুনেছি, চাঁদে তাহার বদনের ছবি যে গুজব, এটা মানুষকে বোঝাতে তাদের নানা কসরৎ করতে হয়েছিল। জেলার সকল মসজিদের ইমামদের ডেকে বোঝাতে হয়েছিল চাঁদের মধ্যে মানুষের মুখ, তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে কঠিন কর্ম নয়। ফটোশপে সবই সম্ভব। তার কাছে শোনা, চাঁদের মধ্যে শাবনুর নাকি সানী লিওনী, কারো মুখ ফটোশপ করে মানুষকে দেখাতে হয়েছিল, তবেই তারা বিশ্বাস করেন।

২.
এবার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। যে অভিজ্ঞতা হাতে-নাতে পেয়েছিলাম।

এ বছরের দশ জানুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ এর শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এই মেডিকেল কলেজ নিয়ে ওখানকার বাঙ্গালী ও চাকমা সস্প্রদায়ের মানুষ মুখোমুখি দাড়িয়ে গেল। রাজনৈতিক দ্বিমত শীঘ্রই সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রুপান্তরিত হলো। স্থানীয় পত্রিকায় শিরোনাম হলো, ‘ গুজবের শহর রাঙ্গামাটি’।

গুজবের আগুনে ঘি ঢালল মোবাইল ফোন আর ফেসবুক।হাওয়াই কিংবা হনুলুলুর দাঙ্গার ছবি রাঙ্গামাটির ছবি বলে চালিয়ে দেওয়া হলো। মানুষও বিশ্বাস করলো দেদারছে। শহর জুড়ে টানটান উত্তেজনা। শহরের এ প্রান্তে দাঙ্গা থামেতো ঐ প্রান্তে শুরু হয়। নানা রকম গুজব ছড়ায়, মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত। মাঠে ছিলাম, দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সাথেই কথা বলেছি, দেখেছি। সমস্যা কিছু না, বড় সমস্যা গুজব।

৩.
‘এমন দিন আসছে যখন আমাদের পবিত্র গির্জা গুলোও আর আমাদের থাকবে না।’
‘তাদের ইজারা দেওয়া হয়েছে ইহুদীদের কাছে। ইহুদীকে আগাম টাকা না দিলে কোন উপসনা হতে পারবে না।’
‘আর ইহুদী কুকুর যদি তার নোংরা হাত দিয়ে আমাদের পবিত্র ইস্টার রুটির উপর ছাপ না দেয়, তাহলে তা উৎসর্গ করা যাবে না।’
শুনুন, শুনুন! আরো আছে:
‘ ক্যাথলিক পুরুতেরা গাড়ি চড়ে সারা ইউক্রেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাড়ি চড়ে বেড়াচ্ছে সেটা বিপদের কথা নয়; বিপদের কথা এই যে তারা গাড়িতে ঘোড়া জুতছে না, জুতছে খাটি খ্রীস্টানদের।'( ইউক্রেনের অর্থোডক্স খ্রীস্টান)।
শুনুন, এখনও শেষ হয়নি।
‘শোনা যাচ্ছে, ইতোমধ্যে ইহুদী মাগিরা আমাদের পুরুতদের পোশাক দিয়ে তাদের স্কার্ট বানাচ্ছে।
ইউক্রেনে এইসব কান্ড কারখানা চলছে মহাশয়রা, আর আপনারা এখানে বসে ফূর্তি চালাচ্ছেন!’
এই রকম যত কথা যেন উড়ে যেতে লাগল একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। নীপার-কসাকরা গর্জে উঠল, অনুভব করল তাদের শক্তি।
‘ ফাঁসিতে ঝোলাও সব ইহুদীদের। জনতা থেকে চিৎকার উঠল।
‘পুরুতের পোশাক থেকে ইহুদী মাগির স্কার্ট করা চলবে না’!
নীপারের জলে ডুবিয়ে মার এই ইতর সব গুলোকে।
জনতা থেকে কোন একজনের কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাগুলো বিদ্যুৎ গতিতে সকলের মাথায় খেলে গেল, জনতা ছুটে চলল শহরের প্রান্তে সব ইহুদীকে কেটে ফেলার উদ্দেশ্যে।

(তারাস বুলবা, নিকোলাই গোগল, ১৮৪২)

৪.
পৃথিবীর সব দেশেই গুজবের এক রুপ।
সম্ভবত, পশ্চাদপদ সমাজে গুজব বেশী শক্তিশালী হয়। যে সমাজে শিক্ষার হার কম, সে সমাজে গুজব বেশী ছড়ায়। এটা আরো ভয়াবহ হয়, যদি এর সাথে জড়িত থাকে জাতিগত বিদ্বেষ বা ধর্মীয় আবেগ।
অতএব, সাবধান।
গুজবে কান দিবেন না।

৫.
আমার এ কথাটাও গুজব হতে পারে!