ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১.
ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। অগনিত মানুষের আত্মত্যাগের ফলে পাওয়া যে স্বাধীনতা, সেই সব মহাপ্রাণদের ক’ জনের খবরই বা আমরা রাখি! কত জনই তো হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। তেমনি একজন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এম.আবদুল আলী।

এম. আবদুল আলী ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার মকসেদপুর থানার বালিয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ( ই পি সি এস) এ যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি যোগদান করেন সাব-ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) তথা মহকুমা প্রশাসক হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গামাটি মহকুমায়। তিনি মহকুমার প্রধান হাকিমও ছিলেন।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর পরই রাঙ্গামাটিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। গড়ে উঠে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ নিয়মিত জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম ও মহাকুমা মাজিস্ট্রেট আবদুল আলীর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। আবদুল আলী এখানকার মুক্তিকামী ও সংগ্রামী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের জন্য যুদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। জেলা সদরের পুলিশ লাইন ও স্টেশন ক্লাবে ছাত্র, যুবক ও আপামর জনসাধারণের জন্য যুদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া তিনি রাঙ্গামাটিতে স্থাপিত উপ-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন। তার কাজ ছিল চট্টগ্রাম ও অগ্রবর্তী ঘাঁটির সাথে যোগাযোগ ( ইমাম ২০১২, পৃষ্ঠা-২৬১)।

এম আবদুল আলী যুদ্ধের পূর্বাভাস পেয়েই রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের দায়িত্বরত অবাঙ্গালী ইপিআর সদস্যদের ক্লোজ করেন। আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর,ইপিআর এর বাঙ্গালী সদস্যদের নিজেই লঞ্চে করে রাঙ্গামাটি নিয়ে আসেন। ২৫ মার্চের পর জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমাম,অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ আব্দুস সামাদ, পুলিশ সুপার বজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ মুজিবনগরের উদ্দেশে ভারত চলে যান। এ সময় আবদুল আলী রাঙ্গামাটিতে অবস্থান করে এদের সঙ্গে নানা ভাবে যোগাযোগ রাখছিলেন। ১৪ এপ্রিল মহালছড়িতে অবস্থানরত মেজর জিয়া, মেজর মীর শওকত আলি,ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন অলি আহম্মদের সাথে দেখা করে তাদের ভারত যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। অতঃপর তিনি অস্ত্র-সস্ত্র সহ মহালছড়ি থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশে রওনা দেন। “রাঙ্গামাটি মহকুমা সদরের এসডিও আবদুল আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দুটি স্পিডবোটে করে মহালছড়ি থেকে রাঙ্গামাটি আসেন।স্পিডবোটে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এস এম কালাম, আবদুল শুক্কুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, সামসুল হক মাস্টার এবং রাঙ্গামাটি হাইস্কুলের তদানীন্তন হেডমাস্টার রহমান আলীর ছেলে ইফতেখার” (চাকমা ২০০৬, পৃষ্ঠা- ২৬)।

অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ১৬ এপ্রিল রাঙ্গামাটি ডিসি বাংলো ঘাটে এসে ভিরতেই পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তিনি তার বড় ছেলে ইউসুফ হারুন সহ গ্রেফতার হন। বন্দি করার পর পাকিস্তানী সৈন্যরা জেলা প্রশাসক এইচ টি ইমামসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু আবদুল আলী সে বিষয়ে কোন তথ্য প্রকাশ করেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ, গোলাবারুদ কোথা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে, কোথায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কারা কারা আছেন সে সব তথ্য জানার জন্য বার বার চাপ দিতে থাকে পাকিস্তানী সৈন্যরা। কিন্তু কোন তথ্যই দিতে চাইছিলেন না আবদুল আলী। বার বার চেষ্টা করেও যখন কোন প্রকার তথ্যই বের করতে পারছিলেন না তখন তার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। “পাকিস্তানী সেনারা অমানুষিক অত্যাচার করে আলীর উপর, আমার গতিবিধি এবং কার্যকলাপ জানার জন্য। শহীদ আবদুল আলী নিজের প্রাণ দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করেছেন” ( ইমাম ২০১২, পৃষ্ঠা-২৫৬)।

ইয়াসিন রানা সোহেল তার বইতে লেখেন-
“প্রথমে তাকে ইট ভাঙ্গার কাজ দেন পাকিস্তানী সৈন্যরা। এরপর তাকে দিয়ে কুলির কাজ করাতে থাকে। শ্রমিকদের মতই খাটাতো তাকে। ১২ দিনের বন্ধী অবস্থায় তার প্রায় পুরো শরীরই ক্ষত- বিক্ষত করে ফেলা হয়েছিলো। পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচারের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ইট দিয়ে তার দাঁত গুলো ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিলো। তার হাতের নখগুলো উপরে ফেলা হয়েছিলো। এক পর্যায়ে পাকিস্তানী হায়েনারা আবদুল আলীর হাতের আঙ্গুলগুলো পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল ( সোহেল ২০১৫, পৃষ্ঠা-১০)।

এই অমানুষিক নির্যাতনের আরও বর্ণনা আছে শরদিন্দু শেখর চাকমার বইতে-
“এর মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য আবদুল আলীকে রাঙ্গামাটিতে পুলিশ লাইনের এক ব্যারাকে আটক করে রেখে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্লেড দিয়ে আঁচড়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর সেসব জায়গায় লবণ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাকে একটি জিপের পেছনে বেঁধে টেনে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছিল” (চাকমা ২০০৬,পৃ-২৭)।

১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল আবদুল আলীর মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে কেটে বস্তায় ভরে কাপ্তাই লেকে ফেলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে এই দেশপ্রেমিক মহাপ্রাণের স্মৃতি অম্লান করে রাখার উদ্দেশে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে রাঙ্গামাটি শহরে অবস্থিত কায়েদে আজম মেমোরিয়াল একাডেমীর নাম পরিবর্তন করে শহীদ আবদুল আলী একাডেমী নামকরণ করা হয়।

১৯৭২ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশ সরকার গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আবদুল আলীর এই অবদানের স্বীকৃতি দেয়। সচিব এম. এম. জামান সাক্ষরিত গেজেটে তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। গেজেটে লেখা হয়- “The government of bangladesh announce with profound regret the sad news of the death of Mr. M.Abdul Ali, former Sub-divisional Officer, Sadar, Chittagong Hill Tracts, on the 27th April 1971”( বাংলাদেশ গেজেট, ১৯৭২)।
২.
মুক্তিযুদ্ধে এদেশের প্রশাসনের রয়েছে অসামান্য অবদান। অগণিত প্রশাসক নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। কেউ অংশ নিয়েছেন সম্মুখ যুদ্ধে, কেউ সংগঠিত করেছেন, কেউ প্রশিক্ষণ দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের, কেউ উদ্বুদ্ধ করেছেন সাধারণ মানুষকে। দেশমাতৃকার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, এমন প্রশাসকের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এদের বেশীর ভাগই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। এর জন্য আমাদের অবহেলা এবং সমরকেন্দ্রিক ইতিহাসের বর্ণনা অনেকাংশে দায়ী। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এই একমাত্রিক ন্যারেশনের জন্য নতুন প্রজন্ম এদের সম্পর্কে জানতে পেরেছে সামান্যই। আমরা সামান্যই জানি কুমিল্লার জেলা প্রশাসক শামছুল হকের কথা। যিনি ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। আমরা ভুলে গেছি শহীদ এ কে শামসুদ্দিন কে, যিনি ১৯৭১ সালে ছিলেন সিরাজগঞ্জ মহকুমার এস ডি ও। যিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের অপরাধে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এমনি আরেকজন বিস্মৃত দেশমাতৃকার সন্তান সাইফ মিজান, যিনি ১৯৭১ সালে ছিলেন পিরোজপুর মহকুমার ১ম শ্রেণীর মাজিস্ট্রেট। এমনি নাম না জানা আরও অনেকেই আছেন। নতুন প্রজন্মের নিকট যাদের সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে সামান্যই।
৩.
২০১৪ সালে কাজী আজিজুল ইসলামকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করে সরকার। তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন বরিশাল জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৩ সালে, উক্ত শহীদকে স্বাধীনতা পদক প্রদানের আবেদন জানিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরিত পত্রে জেলা প্রশাসক বরিশাল লেখেন-

“১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন বরিশাল জেলার কাজী আজিজুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বরিশালে কর্মরত ছিলেন। জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণকে ব্যবহারের জন্য তিনি নিজের দাপ্তরিক গাড়ীটি প্রদান করেন এবং নিজে বাই সাইকেলে চলাফেরা করতেন। তার দেশপ্রেম, সাহসিকতা এবং সরকারি চাকুরীতে থেকেই মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার কারণে বর্বর পাক সেনারা তাকে ধরে এনে বধ্যভূমিতে (শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের সামনে ত্রিশ গোডাউনের অভ্যন্তরে) নৃশংসভাবে হত্যা করে। ওই বধ্যভূমিতেই ছবিতে প্রদর্শিত কবরে তিনি চির নিদ্রায় নিদ্রিত আছেন। “

সরকার ২০১৪ সালে মহান স্বাধীনতার এই শহীদের প্রতি স্বাধীনতা পদক প্রদান করে মোচন করেন ইতিহাসের প্রতি আমাদের জাতীয় দায়।

৪.
৪৪ বছর কেটে গেছে আবদুল আলী দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন।। রাষ্ট্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে এম. আবদুল আলীর স্মৃতি রক্ষা করতে কোন উদ্যোগ আর গ্রহণ করা হয়নি। মেলেনি কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। কেবল স্মৃতি আর হাহাকার বুকে লালন করে বেঁচে আছেন তার পরিবারের জীবিত সদস্যরা। তবু তারা স্বপ্ন দেখেন একদিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আলীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হবে। দেশবাসী শোধ করবে দেশমাতৃকার এই সন্তানের প্রতি ইতিহাসের রক্ত ঋণ।

তত্থসুত্রঃ
১. ইমাম; এইচ. টি.২০১২, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
২. সোহেল, ইয়াছিন রানা. ২০১৫, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় বীর শহীদ এম আবদুল আলী।
৩. চাকমা, শরদিন্দু শেখর. ২০০৬, মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঙ্কুর প্রকাশনী।
৪. বাংলাদেশ গেজেট নং-১৫৬/৭২-৬৪১- ৬ মার্চ ১৯৭২।
৫. জেলা প্রশাসক বরিশাল কর্তৃক নভেম্বর ২০১৩ এ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাবর প্রেরিত পত্রাংশ উদ্ধৃতি।