ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পৃথিবীতে নানা নামে নানা দেশ রয়েছে। এর মধ্যে কোনটা মোনার্কি বা রাজতন্ত্র, কোনটা রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র। রিপাবলিকগুলো আবার নানা পদের। ইসলামিক রিপাবলিক। যেমন: পাকিস্তান, ইরান। সোস্যালিস্ট রিপাবলিক।যেমন: কিউবা। আবার কিছু দেশ কেবলি রিপাবলিক। যেমন : রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া। কিছু দেশ আবার নামের সাথে কিংডোম বা রিপাবলিক কিছুই ব্যবহার করেনি। যেমন: ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা, স্টেট অব ইসরাইল ইত্যাদি। ইসরাইলের দাপ্তরিক নাম হিব্রুতে ‘মেদিনাত ইসরাইল'(Medinat Israel)। এই শব্দটি আর আরবী মদিনা একই শব্দ। মদিনাতুন নবী মানে নবীর শহর, City of Prophet। যদিও ওহাবি ভাবধারার সৌদি সরকার দাপ্তরিকভাবে মদিনাতুন নবী নামটি ব্যবহার করে না।তার বদলে বলে মদিনা আল-মুনাওয়ারা বা অনন্য শহর। ভ্যাটিকান সিটি স্টেট আবার ‘হোলি সি’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের দাপ্তরিক নাম পিপল’স রিপাবলিক অব বাংলাদেশ বা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। যদিও ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকারের সময়ে বাংলায় লেখা হতো ‘গনপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ’। ইংরেজির আদলে এ রকম লেখা হতো। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ লেখা শুরু হয়। পৃথিবীতে এ নামে আর একটি মাত্র দেশ রয়েছে, সেটি গণচীন। চীনের নামের অনুসরণেই বাংলাদেশের নামকরণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের এক নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র যাহা “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নামে পরিচিত হইবে।‘

রাষ্ট্র যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, তার শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে খোজখবর রাখা নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। কেননা নাগরিক সম্প্রদায় যতবেশী সচেতন হয়, সে শাসন ততবেশী ফলপ্রসু হয়। প্রতিটি রাষ্ট্ররই কম-বেশী তিনটি অর্গ্যান রয়েছে। নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন সভা। এদের কাজ আলাদা। নির্বাহী বিভাগে আছে পলিসি মেকার বা নির্বাচিত ব্যক্তি, ডিসিশন মেকার বা আমলা আর পেশাদার বিশেষজ্ঞ।এদের প্রত্যেকের ভূমিকা আবার ভিন্ন। আইন বিভাগের কাজ আইন প্রণয়ন করা। অর্থাৎ আমরা যাদের নির্বাচিত করে মহান সংসদে পাঠাই, তাদের কাজ নাগরিকের প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু রাষ্ট্রতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবহেতু আমরা ভাবী মাননীয় সংসদসদস্যগণ আমাদের জন্য ব্রিজ বানাবেন, রাস্তা তৈরি করবেন। কলেজ সরকারীকরণ করবেন। যদি ও রাষ্ট্র কাঠামোয় তা আইন বিভাগের কাজ নয়।

রাষ্ট্রযন্ত্রের ধমনীতে রক্তধারা কিভাবে প্রবাহিত হয়, তার খোজখবর রাখার সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে দেশের সংবিধান সম্পর্কে জানা। দু একটা ব্যতিক্রম ছাড়া পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশের নিজস্ব সংবিধান রয়েছে। আর এই সংবিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্ঞানের প্রবাহমানতা। অর্থাৎ একটা সংবিধানে সম্মীলন ঘটেছে আরও নানা সভ্যতার হাজার বছরের অর্জন।তাই আমরা যদি বাংলাদেশের সংবিধানকে বিবেচনা করি, এতে আছে আমেরিকা, ভারত আরও নানা দেশের সংবিধানের প্রভাব। আরো গভীরে যেয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান, চার্টার অব লিবার্টিস ১১০০ খ্রিঃ, ম্যাগনা কার্টা ১২১৫ খ্রিঃ, পিটিশন অব রাইটস ১৬২৮ খ্রিঃ, বিল অব রাইটস ১৬৮৯ প্রভতি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার জন্যই আব্রাহাম লিঙ্কনের ১৮৬৩ সালের গেটিসবারগ স্পিচের শেষ লাইন, যা গণতন্ত্রের ক্লাসিক্যাল সংজ্ঞায় পরিণত হয়েছে, সেই ‘That government of the people, by the people, for the people’ কে চীনের সংবিধানের অংশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে নাগরিক অধিকারের মত বিষয় কিছুটা ঘোলাটে। আর নাগরিকের সচেতনতার জাহাজটিও যখন অত্যন্ত ধীর গতিতে ভাসে, সেখানে নাগরিককে সচেতন করে গড়ে তুলতে তাই রাষ্ট্রকেই বিদ্যালয় খুলতে হয়। অর্থাৎ সচেতন করে গড়ে তুলতে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশের সংবিধান পৃথিবীর অন্যতম ভাল সংবিধানগুলোর একটি। নাগরিকের অধিকার প্রাপ্তি বর্ণনা ও নির্দেশনায় এ সংবিধানের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু ভয়ের কথা এই যে এ দেশের শিক্ষিত, নিরক্ষর, সচেতন, অসচেতন সকলশ্রেনীর নাগরিকের মধ্যেই সংবিধান জ্ঞানের প্রকট অভাব রয়েছে। অথচ এ জ্ঞান ব্যতিত নাগরিকের সু-নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠা অসম্ভব।
বর্তমানে দেশে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সংবিধান সম্পর্কে যতটুকু পড়ানো হয় তা অপ্রতুল। এখানে কেবল সংবিধান কাকে বলে, কত প্রকার, বৈশিষ্ট, দুষ্পরিবর্তনীয় নাকি পরিবর্তন করা সহজ, এসব পড়ানো হয়।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, মাধ্যমিক পর্যায়ে কোন শ্রেনীতে সংবিধান, বিশেষত এর রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকার অংশ অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত।
মুখস্ত করা দরকার নেই। তারা পড়ে বুঝতে পারলেই হবে।