ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

Curry-houses-on-Brick-Lane

বাঙালি মুসলিম ও বাঙালি হিন্দু একই চালের ভাত, একই রন্ধন প্রক্রিয়ায় খেয়েও দেশভাগের নিয়তি এড়াতে পারেনি।  ইংলিশরা ইউরোপ ছেড়ে যায় নি, তারা আদপেই ইউরোপ ছাড়া। যা কিছু গ্রেট বৃটেনের তা ইংলিশ আর বাদবাকি ইউরোপ কন্টিনেন্টাল। আপনি যদি কোন হোটেলে যান, তবে ব্রেকফাস্টের অর্ডারে আপনাকে বলতে হতে পারে আপনি কি ধরণের ব্রেকফাস্ট চাচ্ছেন। ইংলিশ নাকি কন্টিনেন্টাল? অর্থাৎ গ্রেট বৃটেনবাসী নিজেরা এক ধরণের ব্রেকফাস্ট গ্রহণ করেন, আর সারা ইউরোপ আরেক ধরণের।

মেরিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারিতে কন্টিনেন্টাল শব্দের অর্থ এ রকম দেওয়া আছে: “Continental : of or relating to the countries of Europe except for Great Britain and Ireland.” আরো অনেক কিছুতেই নিখিল ইউরোপ থেকে বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জ আলাদা। এমনকি তাদের মহিলাদের সেলাই প্রক্রিয়া পর্যন্ত। কন্টিনেন্টাল নিটিং ও ইংলিশ নিটিং।

কাবুলের ফরাসি দূতাবাসে আড্ডা চলছে। রুশ, ফরাসি, জার্মান, ভারতীয়, আফগানসহ আরো অনেক ইউরোপীয় আড্ডায় উপস্থিত। আলোচনায় শেষতক বৃটিশ বিষয়বস্তু এসে পড়ল। ফরাসি রাষ্ট্রদূত বললেন, ও ইউরোপের পশ্চিম দিকে চরে যে চরুয়ারা বাস করে তাদের কথা বলছেন? সভায় কোন বৃটিশ ছিল না। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষ্যমতে, বৃটিশদের চরুয়া বলায় সকল ইউরোপিয়ানই বেজায় খুশি!

ইউরোপের তুলনায় বৃটেন ছোট দ্বীপই বটে। তবু তাদের নাকউঁচাঁভাবের কমতি কখনোই ছিল না। পোপের সাথে রেষারেষি করে তারা আলাদা চার্চ গড়লেন। সে চার্চ ঠিক জর্মন লুথারিয়ান বা সুইস ক্যালভিনিয়ান ছাঁচের প্রটেস্ট্যান্ট চার্চ নয়। তাদের নিজস্ব ছাঁচের এ্যাংলিকান চার্চ। ইংলিশদের নিজস্ব চার্চ। চার্চের হেড বৃটেনের রানী। তার অধীনে দুজন আর্চবিশপ। আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবিউরি ও আর্চবিশপ অব ইয়র্ক। সারা ইউরোপ না পারলেও চার্চের মতো বিশাল ধর্মসভার হেড নারী। ওখানেই বৃটিশ হেজেমনি, পুরো ইউরোপ থেকে আলাদা।

গ্রেট বৃটেন কেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ছে? তার নানা কারণ রয়েছে। ইইউতে পূর্ব ইউরোপের দরিদ্র দেশের সদস্যপদ, ব্যাপক হারে পূর্ব ইউরোপের ইমিগ্র্যান্ট শ্রমিক, গ্রীস, স্পেনের অর্থনীতিক মন্দার শঙ্কা নানা কারণ। তবে আমার মনে হয় বড় একটি কারণ হচ্ছে কাজিন জর্মন ইফেক্ট (Cousin German Effect).

কিন্তু কাজিন জর্মন ইফেক্ট আসলে কি? Cousin German শব্দটির মানে হচ্ছে Second Cousin মানে আপনার আপন মামাতো ফোফাতো খালাতো ভাইবোন হচ্ছেন ফার্স্ট কাজিন। কিন্তু আপন মামার সন্তান না হয়ে যদি মামার চাচাতো ভাইয়ের সন্তান হয়, সে আপনার Second Cousin বা Cousin German.

এককভাবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থর্নৈতিক শক্তি জার্মানী। ইইউতে তাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইমিগ্রেশনসহ নানা বিষয়ে জার্মানির দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। যা বৃটেনের জন্য অস্বস্তির বিষয়। বর্তমান ইইরোপের বেশিরভাগ দেশের নাগরিকদের পূর্বপুরুষ জর্মন বা জর্মন বংশোদ্ভূত। নর্ডিক অঞ্চলের ভাইকিং জনগোষ্ঠী বাদে। বর্তমান বৃটেনের যারা বাসিন্দা তারা মূলত তিনটি জর্মন উপজাতি এ্যাংলো, স্যাক্সন ও জুট (আমাদের সোনালি আঁশ পাট নয়) এর সংমিশ্রণ। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বৃটেনের আদিবাসি ছিল কেল্টিক জনগোষ্ঠী। যারা বর্তমান ওয়েলশ,স্কটিশদের পূর্বপুরুষ। ১০৬৬ সালে নরম্যানরা এ্যাংলো-স্যাক্সন বৃটেন দখল করে ফলে গড়ে উঠে বর্তমান ইংলিশ জনগোষ্ঠী।

কিন্তু ইইউ পরিত্যাগের পর গ্রেট বৃটেন কতটুকু গ্রেট থাকতে পারবে? সেটা নির্ভর করছে কেল্টিক ওয়েলস ও স্কটল্যান্ড কি করে তার উপর। তবে আশার শেষ নেই। গ্রেট বৃটেন এতো দ্রুত ভেঙ্গে যাবে সেটাও দুরাশা। কেন, বলছি।

যুদ্ধাহত আফগানিস্তান থেকে ভারতীয়দের জন্য অবশেষে বিমানের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে শর্ত দশকেজির বেশি মাল পরিবহন করা যাবে না। মুজতবা আলীর রাশান ডিকশোনারির পুরো ভলিউমের ওজনই বার কেজি। শ্যাম রাখি, না কুল রাখি অবস্থা! অবশেষে রফা হলো কোনরকমে একটা ব্যাগ গোছালেন তিনি। কিন্তু বাদ পড়ল তার টেনিস ব্যাট। লেখকের ভৃত্য আগা আবদুর রহমান না করা সত্বেও সেটা নিয়ে চললেন বিমানবন্দরে। দশকেজির বেশি হওয়ায় ওটা আর কোন ভাবেই নেওয়ার ব্যবস্থা করা গেল না। এমন সময় বৃটিশ রাষ্ট্রদূত আসলেন। শুনলেন যে এটা নির্দিষ্ট সিলিংএর অতিরিক্ত। বললেন, এ দুর্দিনে যিনি টেনিস ব্যাট নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি ভাল খেলোয়ারই হবেন। ব্যাটটি বিমানে তুলে দিতে বললেন। সারা জীবন বৃটিদের ঘৃণা করা সৈয়দ মুজতবা বললেন, এই উদারতাটুকু আছে বলেই পৃথিবীতে বৃটিশরা টিকে আছে, তা না হলে শকুনে তুলে নিতো তাদের। ঐ উদারতাই মনে হচ্ছে গ্রেট বৃটেনের টিকে থাকার শেষ ভরসা।