ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

দয়াল কৃষ্ণ চাকমার সাথে আমার সাক্ষাৎ আকস্মিকভাবে। অন্তত আমার দিক থেকে। তার সাথে দেখা হওয়ার পূর্বে আমি তার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। রাঙ্গামাটি জেলা সদর হতে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতিসৌধ নৌপথে প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কাপ্তাই লেক বিধৌত বুড়িঘাটে, যা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর উপজেলার অন্তর্গত।

জাতীয় দিবসসমূহে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা প্রশাসন দেশ মাতৃকার এই সূর্য সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে থাকে। বিশেষত স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদযাপনের সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের মাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে পুস্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করা হয়ে থাকে। এর বাইরেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মহান বীরের জন্ম দিবস ও শহীদ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। সাধারণত জেলা প্রশাসনের একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের একজন প্রতিনিধি এই শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকেন। জাতীয় দিবসসমূহ উদযাপনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে রেজুলেশন গ্রহণ করা হয়ে থাকে তাতে রাঙ্গামাটির সাথে সম্পর্কিত দুজন মহান বীরের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের বিষয়টি প্রতিবারই অন্তর্ভূক্ত থাকে। একজনের কথা ইতোমধ্যেই বলেছি। আরেকজন হচ্ছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এম. আবদুল আলী। রাঙ্গামাটির প্রাক্তন মহাকুমা প্রশাসক, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার অপরাধে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। দেশমাতৃকার এই সূর্য সন্তানকে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মরনোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়েছে।

২০১৪ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে প্রথমবারের মতো আমার সৌভাগ্য হয়েছিল বুড়িঘাটে যাওয়ার। সঙ্গে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আলী। সৈয়দ আলী প্রাক্তন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য। বুড়িঘাটের সেই বিখ্যাত যুদ্ধে তিনিও অংশগ্রহণ করেছিলেন, যে যুদ্ধে অমিত বীরত্ব প্রদর্শন করে শহীদ হোন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ। কাপ্তাই লেকের নীলজল কেঁটে যেতে যেতে আমার কথা হয় সৈয়দ আলীর সাথে। তিনি তার স্মৃতির ঝাপি যেন খুলে দেন। কিভাবে বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ তার নিজের জীবন বাজি রেখে সহযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন সেই ইতিহাস আমাকে শোনান।
উন্নয়ন বোর্ড ঘাট থেকে আমরা স্পিডবোটে রওনা দিয়েছিলাম প্রত্যুষে। সূর্য তখন উঠি উঠি করছে কেবল। কাপ্তাই লেক আর চারপাশের মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকা পাহাড় এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়, দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগকারী এই মহান বীরদের প্রতি। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের মাজার কাপ্তাই লেকের মাঝে একটা ছোট্ট দ্বীপের (Fringe Land) উপর। চারপাশে কাপ্তাই লেক দিয়ে বেষ্টিত এ সমাধী সৌধে আসার একমাত্র উপায় নৌযান। চাররপাশে আরো ছোট ছোট দ্বীপ আছে তবে জায়গাটা জনমানবশূণ্য।

বহুদূর থেকে স্মৃতিসৌধের উচু স্তম্ভটি দৃষ্টি গোচর হয় আমাদের। ক্রমশ স্মৃতিসৌধটি স্পষ্ট হতে থাকে আমার চোখে। কিন্তু আমি অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেই ভূমিতে এই সকালে আমরাই প্রথম নয়। সাদা পাঞ্জাবী পড়া এক পৌঢ় ভদ্রলোক দাড়িয়ে। মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আলী জানান, ইনি দয়াল কৃষ্ণ চাকমা। ইনিই বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফকে কবর দিয়েছিলেন। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমি দয়ালবাবুর সাথে আলাপ শুরু করি। সহজ সরল একজন সাধারণ মানুষ। বয়সের ভারে ন্যূজ। স্মতি সৌধের মূল কাঠামোর পেছনের দিকে বাঁশ ঝারের সবুজ সুনিবিড় ছায়ায় আমরা বসি। কাপ্তাই লেকের নীল জলে সকালের সোনালী সূর্য ঝিলিক দিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি আমাকে সেই স্মৃতি বর্ণনা করেন। সাথে তার এক ছেলে ছিলেন, মাঝে মধ্যে বাবার কথায় দু একটা পয়েন্ট যোগ করেন।

কোন কাজেই বের হয়েছিলেন যুবক দয়াল কৃষ্ণ। বুড়িঘাটের যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝে পড়ে যান আকস্মিকভাবেই। ভয়ে গাছে উঠে লুকিয়ে থাকেন তিনি। জীবন বাঁচাতে আর কোন পথ তার সামনে খোলা ছিলো না।অসম অস্ত্রধারী দুই পক্ষের যুদ্ধ।বাঙালি যোদ্ধাদের প্রতিরোধে পাকিস্তানি বাহিনীর দুটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোট নদীতেই ধ্বংস হয়ে যায়। আহত-নিহত হয় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। একপর্যায়ে অতিরিক্ত পাকিস্তানি সেনা এলে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটতে বলে একাই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন আব্দুর রউফ, যাতে সঙ্গীরা নিরাপদ দুরত্বে সরে যেতে পারেন। হঠাৎ বিকট শব্দে মর্টারের কয়েকটি শেল আঘাত হানে আবদুর রউফের ওপর। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনি। পাকিস্তানি বাহিনী ফিরে গেলে গাছ থেকে নামেন তিনি। চোখের সামনে এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধার রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে মনটা কেঁদে ওঠে তাঁর। পরম যত্নে সেই অচেনা মুক্তিযোদ্ধা যুবকের লাশ কবরে সমাহিত করেন। ভয়াবহ বিভীষিকা থেকে বাঁচতে তিনি সাথে সাথেই সরে যেতে পারতেন কিন্তু কেন তা করলেন না? সে পশ্নের জবাব যেন নিজ মনেই দেন, ‘কোন মায়ের সন্তানই তো হবে। আহা, শেয়াল কুকুরে টানাটানি করবে’। তিনি কেবল কবর দিলেন না, বহু বছর ধরে আগলে রাখলেন সে কবর, পরম মমতায়।

এরপরে অবশ্য ভিন্ন ইতিহাস। ১৯৯৭ সালে সরকারি উদ্যোগে শুরু হয় সব বীরশ্রেষ্ঠদের কবর খুঁজে বের করার কাজ। ঘটনার ২৬ বছর পর ১৯৯৭ সালে দয়াল কৃষ্ণ চাকমার মাধ্যমেই এই কবরটির সন্ধান পায় তৎকালীন সরকার। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত দয়াল জানতেন না, কবরের মানুষটির পরিচয়। শুধু জানতেন, লোকটি একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

দয়াল কৃষ্ণ চাকমার সাথে এর পরেও আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে। বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতিসৌধেই। যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রটোকলে সেখানে গিয়েছি তাকে দেখেছি, দাড়িয়ে আছেন একইভাবে। একটা ফাইল হাতে। তাতে নানা কাগজপত্র, পত্রিকার কাটিং। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের মাতা তাকে নিজের আরেকজন সন্তান মনে করতেন, একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি, সেই সাক্ষাৎকারের কাটিং ও আছে তাতে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অবাক হতেন, তার সাথে কথা বলতেন। কাগজপত্র দেখতেন।

রাষ্ট্রের কাছে খু্ব বেশি চাওয়া নেই এ মানুষটার, কেবল চান একটু স্বীকৃতি। তার অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শেষ বয়সে তার চাওয়া, সরকার যেন স্বীকৃতি দেয় তাকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে।

সে চাওয়া তো খুব বেশি চাওয়া নয়।