ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

প্রারম্ভিক কথা

বাংলাদেশ প্রশাসন সার্ভিসের সদস্যগণ দাপ্তরিক প্রয়োজনেই প্রতিনিয়ত নানা দিবস পালন করে থাকেন। জাতীয়, আন্তর্জাতিক দিবসসহ নানান দিবস। বিশেষত যারা মাঠ প্রশাসনে কাজ করেন তাদেরকে প্রতিনিয়ত দিবস পালনে শ্রম ও মেধা খরচ করতে হয়। অথচ তাদের সার্ভিস সম্পৃক্ত নিজস্ব কোন দিবস নেই। একটা দিবস সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন শুরু হয়েছে, পাবলিক সার্ভিস দিবস (সিভিল সার্ভিস) নয়। এই দিবসের মূল বিষয় হচ্ছে- জনগণকে সেবা প্রদান। কিন্তু যারা সেবা প্রদান করেন, তাদের জন্য নয়। অথচ এ দেশ বিনির্মাণে প্রশাসনের রয়েছে গৌরবদীপ্ত অবদান।

ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস হয়ে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান, তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে বিসিএস প্রশাসন তথা বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এই সার্ভিসের কর্মকর্তাদের রয়েছে অসামান্য অবদান। তাদের অনেকেই দেশমাতৃকার জন্য জীবনদান করে বয়ে এনেছেন এদেশের স্বাধীনতা। প্রবাসী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে তারা তাদের মেধা ও শ্রম ব্যবহার করে তরান্বিত করেছেন এ দেশের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পর থেকেই পলিসি প্রনয়ন ও বাস্তবায়নে এই সার্ভিসের সদস্যগণ নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। যার ফলে আমাদের পক্ষে এমডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। আমরা নেতৃত্ব দিতে পেরেছি এসডিজি প্রণয়নে। বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে সামিল হওয়ার। তাই এই সার্ভিসের সদস্যদের অবদানের স্বীকৃতির জন্য, তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। একটি সুনির্দিষ্ট দিবস।

এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রফেশনালস’ ডে (Administrative Professionals’ Day)

এটি সেক্রেটারি’স ডে (Secretary’s Day) বা এডমিন ডে (Admin Day) নামেও পরিচিত। এপ্রিলের শেষ বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশে পালিত হয়। এই দিবস পালনের মাধ্যমে সচিব, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ অন্যান্য প্রশাসনিক পদের কর্মীদের কর্মের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

happy_admin_pro_day

.

ইতিহাস:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রেক্ষিতে এই দিবস উদযাপন শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মূলত মার্কিন অর্থনীতিতে প্রশাসনিক সদস্যদের (Administrative Personnel) অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ এই দিবস পালন শুরু হয়। প্রশাসনিক সদস্যদের অবদানের স্বীকৃতির জন্য ১৯৪২ সালে National Secretaries Association নামে একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনটির পৃষ্ঠপোষকতায় মার্কিন সেক্রেটারি অব কমার্স চার্লস ডব্লিউ সইয়্যার ১৯৫২ সালের ১ থেকে ৭ জুনকে ন্যাশনাল সেক্রেটারি উইক এবং ৪ জুনকে সেক্রেটারি দিবস ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে দিবসটি জুন থেকে এপ্রিলের শেষ বুধবার স্থানান্তরিত হয় এবং এর নামকরণ হয় Administrative Professionals’ Day.

দিবস উদযাপন:

দিবসটি উদযাপনের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বিশেষত কার্ড, ফুল, চকলেট নানা রকম শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হয়। তবে সবগুলো দেশে একই সময় এবং তারিখে এ দিবস উদযাপিত হয় না।

★ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, হংকং, মালেশিয়াতে উদযাপিত হয় এপ্রিলের শেষ বুধবার।
★ নিউজিল্যান্ডে এপ্রিলের তৃতীয় বুধবার
★ নেদারল্যান্ডসে এপ্রিলের তৃতীয় মঙ্গলবার
★ অস্ট্রেলিয়ায় মে মাসের প্রথম শুক্রবার
★ সাউথ আফ্রিকায় সেপ্টেম্বরের প্রথম বুধবার
★ আয়ারল্যান্ডে সাম্প্রতিক সময়ে Niamh O’Connor এর সম্মানে ২৭ এপ্রিলে উদযাপন শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে উদযাপন:

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রশাসনের কর্মীদের জন্য বাংলাদেশে কোন নির্দিষ্ট দিবস নেই। যদিও এদেশে সশস্ত্র বাহিনী দিবসসহ নানা পেশাগত দিবস রয়েছে। তবে দিবসটি উদযাপনের ক্ষেত্রে আমরা একটি আন্তর্জাতিক দিবসের অপ্রাসঙ্গিক অনুকরণ করতে চাই না। যেহেতু সারা পৃথিবীতেই উক্ত দিবসের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই তাই বাংলাদেশে উদযাপন বা তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের সদস্যদের কোন কৃতিত্বপূর্ণ বা ঐতিহাসিক দিনকে গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। এই প্রেক্ষিতে আমি বাংলাদেশে এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রফেশন্যালস’ ডে হিসেবে এই সার্ভিসের সূর্যসন্তান, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত, রাঙ্গামাটি মহকুমা প্রশাসক শহীদ এম. আবদুল আলী স্যারের শাহাদত দিবস ২৭ এপ্রিলকে এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রফেশন্যালস’ ডে (Administrative Professionals’ Day) হিসেবে পালনের প্রস্তাব করছি।

কে এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এম. আবদুল আলী?

এম. আবদুল আলী ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার মকসেদপুর থানার বালিয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (ইপিসিএস) এ যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি যোগদান করেন সাব-ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) তথা মহকুমা প্রশাসক হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গামাটি মহকুমায়। তিনি মহকুমার প্রধান হাকিমও ছিলেন।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর পরই রাঙ্গামাটিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। গড়ে উঠে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ নিয়মিত জেলা প্রশাসক এইচটি ইমাম ও মহাকুমা মাজিস্ট্রেট আবদুল আলীর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। আবদুল আলী এখানকার মুক্তিকামী ও সংগ্রামী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের জন্য যুদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। জেলা সদরের পুলিশ লাইন ও স্টেশন ক্লাবে ছাত্র, যুবক ও আপামর জনসাধারণের জন্য যুদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া তিনি রাঙ্গামাটিতে স্থাপিত উপ-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন। তার কাজ ছিল চট্টগ্রাম ও অগ্রবর্তী ঘাঁটির সাথে যোগাযোগ (ইমাম ২০১২, পৃষ্ঠা-২৬১)।

এম আবদুল আলী যুদ্ধের পূর্বাভাস পেয়েই রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের দায়িত্বরত অবাঙালি ইপিআর সদস্যদের ক্লোজ করেন। আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ইপিআর এর বাঙালি সদস্যদের নিজেই লঞ্চে করে রাঙ্গামাটি নিয়ে আসেন। ২৫ মার্চের পর জেলা প্রশাসক এইচটি ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ আব্দুস সামাদ, পুলিশ সুপার বজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ মুজিবনগরের উদ্দেশে ভারত চলে যান। এ সময় আবদুল আলী রাঙ্গামাটিতে অবস্থান করে এদের সঙ্গে নানা ভাবে যোগাযোগ রাখছিলেন। ১৪ এপ্রিল মহালছড়িতে অবস্থানরত মেজর জিয়া, মেজর মীর শওকত আলি, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন অলি আহম্মদের সাথে দেখা করে তাদের ভারত যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন।

অতঃপর তিনি অস্ত্র-সস্ত্র সহ মহালছড়ি থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশে রওনা দেন। “রাঙ্গামাটি মহকুমা সদরের এসডিও আবদুল আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দুটি স্পিডবোটে করে মহালছড়ি থেকে রাঙ্গামাটি আসেন। স্পিডবোটে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এস এম কালাম, আবদুল শুক্কুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, সামসুল হক মাস্টার এবং রাঙ্গামাটি হাইস্কুলের তদানীন্তন হেডমাস্টার রহমান আলীর ছেলে ইফতেখার।” (চাকমা ২০০৬, পৃষ্ঠা- ২৬)।

অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ১৬ এপ্রিল রাঙ্গামাটি ডিসি বাংলো ঘাটে এসে ভীড়তেই পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তিনি তার বড় ছেলে ইউসুফ হারুন সহ গ্রেফতার হন। বন্দী করার পর পাকিস্তানী সৈন্যরা জেলা প্রশাসক এইচটি ইমামসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চায়। কিন্তু আবদুল আলী সে বিষয়ে কোন তথ্য প্রকাশ করেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ, গোলাবারুদ কোথা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে, কোথায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, কারা কারা আছেন সে সব তথ্য জানার জন্য বার বার চাপ দিতে থাকে পাকিস্তানী সৈন্যরা। কিন্তু কোন তথ্যই দিতে চাইছিলেন না আবদুল আলী। বার বার চেষ্টা করেও যখন কোন প্রকার তথ্যই বের করতে পারছিলেন না তখন তার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। “পাকিস্তানী সেনারা অমানুষিক অত্যাচার করে আলীর উপর, আমার গতিবিধি এবং কার্যকলাপ জানার জন্য। শহীদ আবদুল আলী নিজের প্রাণ দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করেছেন।” (ইমাম ২০১২, পৃষ্ঠা-২৫৬)।

ইয়াসিন রানা সোহেল তার বইতে লেখেন-

“প্রথমে তাকে ইট ভাঙ্গার কাজ দেন পাকিস্তানী সৈন্যরা। এরপর তাকে দিয়ে কুলির কাজ করাতে থাকে। শ্রমিকদের মতই খাটাতো তাকে। ১২ দিনের বন্দী অবস্থায় তার প্রায় পুরো শরীরই ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছিলো। পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচারের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ইট দিয়ে তার দাঁতগুলো ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছিলো। তার হাতের নখগুলো উপরে ফেলা হয়েছিলো। এক পর্যায়ে পাকিস্তানী হায়েনারা আবদুল আলীর হাতের আঙ্গুলগুলো পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল (সোহেল ২০১৫, পৃষ্ঠা-১০)।

এই অমানুষিক নির্যাতনের আরও বর্ণনা আছে শরদিন্দু শেখর চাকমার বইতে-

“এর মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য আবদুল আলীকে রাঙ্গামাটিতে পুলিশ লাইনের এক ব্যারাকে আটক করে রেখে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্লেড দিয়ে আঁচড়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর সেসব জায়গায় লবণ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাকে একটি জিপের পেছনে বেঁধে টেনে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছিল।” (চাকমা ২০০৬,পৃ-২৭)।

১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল আবদুল আলীর মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে কেটে বস্তায় ভরে কাপ্তাই লেকে ফেলে দেওয়া হয়।

মহান স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার দেশমাতৃকার এই সূর্যসন্তানকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।

শেষ কথা

আশা করি ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রফেশন্যালস’ ডে (Administrative Professionals’ Day) পালন করা হবে। এজন্য আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। আমাদের অংশগ্রহণের ফলেই দিবসটি উদযাপন সম্ভব হবে। এজন্য বাংলাদেশ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশনের (বিএএসএ) সম্মানিত সভাপতি ও মহাসচিব মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এসেসিয়েশনের পক্ষ থেকে ২৭ এপ্রিল দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।