ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

ziaur-rahman

আজ সেই ৭ নভেম্বর, যেদিন ১৯৭১ এর  যুদ্ধলব্ধ  স্বাধীন-সার্বভৌম-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আবার দীর্ঘদিনের জন্য  চলে গিয়েছিল একনায়কতন্ত্রের  কালো থাবার ভিতরে ।

১৯৭৫ সাল  বাংলাদেশের  ইতিহাসে  চিরকালই  এক   হিংস্র-ভয়াবহ- বিভ্রান্ত  সময়ের   ডায়েরি হয়ে  বেঁচে  থাকবে।  বিবেচিত   হবে  এক  চরম লজ্জা ও দুঃসময়ের  বছর রূপে। স্বাধীন  সার্বভৌম বাংলাদেশে এই  সময়ে  একের পর এক ঘটে গেছে চূড়ান্ত  বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো, যা ছিল একই সাথে দুঃখ এবং লজ্জাজনক। স্বাধীনতা  লাভের  পরেই এই সব ভয়ংকর ঘটনা, ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে একটি স্বাধীন জাতির মেরুদণ্ড । বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের প্রমাণ  করেছে একটা নির্বোধ, অবিবেচক , ক্ষমতালোভি জাতি হিসেবে।  যারা ক্ষমতার লোভে বারবার নিজেদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পিছপা হয়নি। তোয়াক্কা করেনি কোন ন্যায়-নীতির। এই সময়ে একের পরে এক ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রম  রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। দেশের  রাজনৈতিক  কাঠামোয়  এই পরিবর্তনকে  সাধুবাদ  জানানোর  কোন অবকাশ নেই।  যে মূলমন্ত্রের  উপর  নির্ভর  করে লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বাধীন ভূ-খণ্ডের জন্ম হয়েছিল, সেই মূলমন্ত্র বা নীতির সাথে, পরিবর্তিত এই পটভূমিকার কাঠামোগত  আর কোন সাদৃশ্যই  রইলনা।

১৯৪৭ সালে যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা নির্ধারণ করে  ভারত ভাগ হয়েছিল, পাকিস্থান নামের এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সেই দ্বিজাতি তত্ত্ব যে এদেশের মানুষের কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনি তা অচিরেই প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। এই তথাকথিত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট  পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্থানের মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছিল নানা রকম  অসংগতি আর অসন্তোষের। ফলশ্রুতিতে পূর্ব পাকিস্থানের বিলুপ্তি ঘটলো, জন্ম  হলো বাংলাদেশ নামক নতুন আরেকটি দেশের ।

যে পাকিস্থানি নীতিমালার সাথে সৃষ্ট দ্বন্ধ থেকে বাংলাদেশের জন্ম,  এদেশের মানুষ ঘৃণা ভরে যে নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করেছিল ,৭৫ পরবর্তিকালে বাংলাদেশ আবার ফিরে গেল সেই পাকিস্থানি রাষ্ট্রনীতির কাঠামোয়। আবার সেই সামরিক সরকার, সেই একনায়কতন্ত্রে গণতন্ত্র পরিণত হলো হাস্যকর এক প্রহসনে। ফিরে এলো স্বাধীনতা যুদ্ধের খলনায়কেরা । যারা একের পর এক গণহত্যা, নারী ধর্ষণের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিল, তারা বিজয়গৌরবে ফিরে এলো  রাজনৈতিক অঙ্গনে । তাদের  অনেককেই মাল্যভূষিত করা  হলো  মন্ত্রীত্বের  সম্মানিত আসন দিয়ে। পদদলিত হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, লক্ষ  শহীদের রক্তের কাছে প্রতিশ্রুত আমাদের দায়বদ্ধতা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭৫এর ইতিহাস একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এক সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের ইতিহাস। ১৫ই আগস্ট সপরিবারে জাতির জনকের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পরে সংঘবদ্ধ খুনীচক্র ৩রা নভেম্বর জেলের ভিতরেই হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চার স্তম্ভ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার নেতা -তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আ.হ.ম কামরুজ্জামান এবং মনসুর আলীকে। এই হত্যাকাণ্ডে মীরজাফর মোশতাক আহমদের প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছিল ।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরে দেশের আপামর জনগণ যখন হতবিহবল এবং শোকগ্রস্থ, তখন ৩ নভেম্বরের এই ঘটনা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। কিন্তু এই মারাত্মক সব ঘটনাপ্রবাহের প্রকৃত খবর থেকে জনতা ছিল অনেক দূরে । কেন কী ঘটছে , জনতা কিছুই জানতে পারছিল না। ঢাকার বাইরের লোকজনতো দূরের কথা স্বয়ং ঢাকাবাসীও কোথায় কি হচ্ছে জানতে পারেনি। বিদেশী সাংবাদিকদের তখন বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়নি । ৩ নভেম্বরের এই জেলহত্যার ঘটনাটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত, দুই মাস আগেই ঘাতক সেনা অফিসাররা এবং তাদের সহযোগিরা এই পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছিল যে, যদি কোন ক্যূ হয় তাদের বিরুদ্ধে তাহলে সর্বাগ্রে জেলবন্দি এই চার নেতাকে হত্যা করা হবে।

৩রা নভেম্বর এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে খালেদ মোশাররফ যখন কর্তৃত্ব হাতে তুলে নিতে সফল হন এবং জিয়াউর রহমানকে বন্দি করেন, তখন বঙ্গবন্ধু-পরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে শোকার্ত-হতবিহবল জনগণ আশা করেছিল এবার বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু তা হয়নি। সফল অভ্যুত্থানের মাত্র চারদিনের মাথায় কর্নেল এ.টি.এম হায়দার বীর উত্তম, কর্নেল নাজমুল হুদা বীর বিক্রম সহ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আরো অসংখ্য বীর সেনানির সাথে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

কর্তৃত্ব হাতে পাওয়ার পরে কিন্তু খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেননি। বরং খুনীদের সাথে আপোষরফায় আসেন এবং খুনীদের নির্বিঘ্নে দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন। হয়ত তিনি নিজেও কী করা উচিত সে ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি অথবা সুষ্ঠু  কোন পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। সে সময়ে কেউই কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না । মনে হয়  খালেদ মোশাররফ নিজেকে এমন এক  ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে  জড়িয়ে ফেলেছিলেন যার সম্পর্কে তাঁর কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। কাজেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি ।

৫ এবং ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে খালেদ মোশাররফকে ভারতীয় দালাল রূপে চিহ্নিত করে হাজার হাজার লিফলেট বিতরন করা হয় ।  ৬ নভেম্বর মধ্যরাতেই শুরু হয় সিপাহি বিপ্লব এবং প্রাণ  দিতে হয় খালেদ মোশাররফ সহ অনেক সেনা অফিসারকে।  ওই সিপাহি বিদ্রোহ ছিল মূলত  অফিসারদের বিরুদ্ধে সিপাহিদের।  জিয়াউর রহমানকেও তাঁর নিজ বাড়িতে বন্দি করে রাখে সিপাহিরা ।

এরপর মঞ্চে আসেন কর্নেল তাহের। জিয়াউর রহমানকে বন্দি দশা থেকে মুক্ত করেন তিনি। যার চরম মূল্য দিতে হয়েছে তাকে বিচারের নামে প্রহসনে ফাঁসির দড়িতে জীবন দিয়ে। কথিত আছে- কাক কাকের মাংস খায়না। কিন্তু এখানে প্রমাণিত হলো মানুষ সামান্য কাকের চেয়েও নিকৃষ্ট। মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকের রক্তে অন্য মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকের হাত রঞ্জিত হয়েছে বারবার। এভাবেই স্বৈরশাসন নিশ্চিত হয়েছে। অসাধারণ ধূর্ততাকে কাজে লাগাতে পেরেছে যে, সেই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে।

৭ই নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডকে যারা সিপাহি-জনতার বিপ্লব বলে তারা ভুল বলে । এটা এই প্রজন্মের জনগণকে ধোঁকা দেবার একটা নোংরা অপচেষ্টা মাত্র। কারন ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর বন্দুকের নলের ভয়ে ভীত জনগণ কোন কথা বলার সাহস পায়নি। জনতার এখানে কোন ভূমিকা ছিলনা, সুযোগও ছিলনা।  এটা ছিল সম্পূর্ণই সামরিক বাহিনীর ব্যাপার । এখন বিএনপি এটাকে সিপাহী-জনতার বিপ্লব চিহ্নিত করে জিয়াউর রহমানকে  এর কৃতিত্বের অংশীদার রূপে প্রচার করে । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে জিয়া নিজেই ছিলেন সিপাহীদের হাতে একজন বন্দি । পরে  কর্নেল তাহেরের সাহায্যে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হন তিনি। এবং কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেন ক্ষমতা নিশ্চিত করার স্বার্থে ।

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রূপান্তরিত হয় সামরিক বাংলাদেশে । বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীচক্র বারবার এদেশের মানুষের কাছে  বঙ্গবন্ধুকে প্রচার করেছে  গণতন্ত্রের হত্যাকারীরূপে। কিন্তু  বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরেই এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় স্থায়ী একনায়কতন্ত্র। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পূর্ব পর্যন্ত সেই ধারাই চলেছে ।

’৭৫ এর পটপরিবর্তনের ফলে যে রাজনৈতিক –সামাজিক পশ্চাদপদতা শুরু হয়েছিল এর জের আজো চলছে, এবং আর কতকাল যে এই নেতিবাচক প্রভাব বহন করে যেতে হবে এদেশের জনগণকে তার আগাম কোন ভবিষ্যৎবাণী দেওয়া সম্ভব নয় কারো পক্ষেই।