ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

9_61704

তুমি আসবে ব’লে , হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে ব’লে , হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস , বস্তি উজাড় হলো । রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র ।
তুমি আসবে ব’লে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম ।

তুমি আসবে ব’লে , হে স্বাধীনতা
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতা-মাতার  লাশের ওপর।

(শামসুর রাহমান )
এটাই ছিল স্বাধীনতার প্রথম সিঁড়ি অতিক্রম করা। ভয়াল পঁচিশের  রাত। হানাদারেরা ভেবেছিল রাতের অন্ধকারে  ঘুমন্ত নগরবাসির উপর হামলা চালিয়ে একই সাথেগ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে রাতারাতি কব্জা করে ফেলতে পারবে এদেশের স্বাধিকারআদায়ে ব্রতী সাত কোটি জনগণকে। তাদের এই দিবাস্বপ্ন কতোটা অলীক ছিল অচিরেই তার প্রমাণ পেয়েছে তারা। এদেশের মানুষ কোন কিছুতেই ভয় পায়নি। বরং সেদিনেরসেই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের রক্তের সমুদ্রের উপর দাঁড়িয়ে আরো বলবান-গতিশীল হয়েছেতাদের স্বাধীনতার স্পৃহা। সেদিনই এদেশের নির্যাতিত মানুষ  সম্পূর্ণরূপেঐক্যবদ্ধ  হয়েছে এক বজ্রকঠিন শপথ নিয়ে– এই হানাদারদের সাথে আর নয় । এদেরএদেশ থেকে তাড়াতে হবে চিরদিনের জন্য।

হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আচমকা  ২৫শে মার্চের মাঝরাতে ‘ অপারেশন সার্চলাইট ‘ নামদিয়ে সারাদেশ জুড়ে শুরু করে একটি গণহত্যা অভিযান । সারাদেশ জুড়ে এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হলেও ঢাকা নগরী ছিল তাদের মূল  লক্ষ্যস্থল ।ঢাকা শহরে তাদের প্রধানতম টার্গেট ছিল দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  রোকেয়া হল ( ছাত্রীবাস) , জগন্নাথ হল ,ইকবাল হল সহ বিভিন্ন ছাত্রাবাস, ভাষাআন্দোলনের গর্বিত প্রতীক শহীদ মিনার, রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ি , পিলখানার ইপিআর সদরদপ্তর ,এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো । ট্যাঙ্কের ঘড়ঘড় শব্দ আরকামানের মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের শব্দে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জেগে উঠে ঘুমন্তনগরবাসি।ওইদিনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ , বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক , পুলিশ এবং ইপি আর সদস্য প্রাণ হারায় ঘাতকবাহিনীর হাতে ।

৭০ এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে  প্রধানমন্ত্রী  নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।কিন্তু তাঁর হাতে ক্ষমতাহস্তান্তরের সময়ে তৎকালীন  ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকেরা শুরু করেনানা  টালবাহানা। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসন হতে ১৬৭ টি আসনেজয়লাভ করেন এবং ৩১৩আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান, যা তাঁর দল আওয়ামী লীগকেসরকারগঠনের অধিকার প্রদান করে।কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের  জুলফিকার আলী ভুট্টো ,, যে কিনা  নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। সে বঙ্গবন্ধুরপ্রধানমন্ত্রীত্বে  আপত্তি করে। সে প্রস্তাব করে  বঙ্গবন্ধু শুধু পূর্বপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন আর ভুট্টো নিজে হবে পশ্চিম পাকিস্তানেরপ্রধানমন্ত্রী।এটা ছিল একটা অভিনব এবং অন্যায্য প্রস্তাব।এটা ছিল আসলেইয়াহিয়া -ভূট্টোর একটা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা। পূর্ব পাকিস্তানীদের হাতেসরকারের সর্বময় কর্তৃত্ব থাকবে এটা তারা কিছুতেই মেনে নিতেপারেনি।ফলশ্রুতিতে বিক্ষুদ্ধ হলো এদেশের মানুষ । বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়াদিয়ে শুরু হলো দুর্বার আন্দোলন।আমাদের ন্যায্য অধিকার আমাদের দিতেই হবে –বদ্ধপরিকর দেশবাসি। ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবার কথা থাকলেও হঠাৎকরেই  ইয়াহিয়া স্থগিত  করে দিলেন সেই অধিবেশন। বিক্ষোভে ফেটে পড়লো জনতা।একদিকে জনতার বিক্ষোভ , হরতাল;অন্যদিকে একের পর এক কারফিউ জারি করে জনতার  স্বাধিকার আন্দোলনকে  নস্যাৎ করে দেবার চেষ্টারত সামরিক বাহিনী।

৭ই মার্চ  রেসকোর্সের ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু  জনতার উদ্দেশ্যে তাঁর সেই ঐতিহাসিক  ভাষন দিলেন। ২৩ মার্চ পালিত হলো প্রতিরোধ দিবস। পুরো মার্চ মাস জুড়েই চলতে থাকলো এই টানাপোড়েন ।বঙ্গবন্ধু   আলোচনার জন্যপ্রেসিডেনট ভবনে যাচ্ছেন আর ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছেন আলোচনার কোন সমাধানহচ্ছেনা ।আসলে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া গং    সত্যিকারের কোন সুষ্ঠু সমাধানেরজন্য আলোচনা  চালিয়ে যাচ্ছিলোনা । এটা ছিল কালক্ষেপণ মাত্র ।এই সুযোগে তারাপশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল পরিমানে অস্ত্রশস্ত্র এবং সাদা পোষাকে সামরিকবাহিনীর সদস্যদের এনে জড়ো করছিল নিরীহ জনগণের নিধনযজ্ঞে ব্যাবহারের জন্য ।

২৫ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে ইয়াহিয়া গোপনে পাকিস্তানে চলে যায় কাউকে কিছু নাজানিয়েই।এটা ছিল হানাদার সেনাদের জন্য একটা সবুজ সংকেত। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই রাতেই তারা একযুগে ঝাপিয়ে পড়ে নিরীহ জনগণের উপর।এশিয়া টাইমসের ভাষ্য থেকে জানা যায়, সামরিক বাহিনীর বড় বড় অফিসারদের নিয়ে বৈঠকে ইয়াহিয়া খান নির্দেশ দেয়, “তিরিশ লক্ষ বাঙ্গালিকে হত্যা কর, তখন দেখবে তারা আমাদের হাত চেটে খাবে।”

রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত  মানুষের উপর নির্দয়- নৃশংস আক্রমনের সাথে সাথে তারা  বাংলালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে তাঁর বাসভবন  থেকে । কিন্তু প্রেপ্তার হবার অব্যবহিতপূর্বেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতারঘোষণা লিখে যান।২৫শে মার্চ রাত ১২টার পর (অর্থাৎ, ২৬শে মার্চের প্রথমপ্রহরে) তিনিবাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিততৎকালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে করে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়।২৬মার্চ ঘোষণাটি চট্টগ্রামের কালুরঘাট  বেতার কেন্দ্র ভথেকে সম্প্রচার করাহয়। এটাই ছিল স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার । এজন্যই ২৬মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে গন্য করা হয়।পরদিন জিয়াউর রহমান আবার একইবেতারকেন্দ্র থেকে ঘোষণাপত্রটি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পাঠ করেন।

সেদিন  সেই ভয়াল ২৫ মার্চের কালোরাতে দেশবাসি স্তম্ভিত বিস্ময়ে দেখেছিল একটাদেশের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী ট্যাঙ্কের মতো ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কিভাবেআক্রমন করেছিল নিরীহ জনগণকে , এই দেশেরই সর্বোচ্চ   কর্তৃপক্ষের নির্দেশে।যেকোন দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যয় নির্বাহ করা হয় জনগণেরটাকায়।পূর্ব পাকিস্তানে ছিল সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের বাস । কাজেই প্রতিরক্ষাখাতে ব্যয়ের সিংহভাগই  এদেশের মানুষের ছিল। জনতার টাকায় লালিতপালিতসেনাবাহিনী যখন সেই জনতা নিধনে ঝাপিয়ে পড়ে , এর থেকে বড় ধৃষ্টতা, অন্যায় আরকি হতে পারে !

এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের খবর যাতে বিশ্ববাসী জানতেনা পারে সেজন্য ২৫ মার্চের আগেই সব বিদেশী সাংবাদিককে দেশ থেকে বের করেদেওয়া হয়েছিল।কিন্তু অকুতোভয় সাংবাদিক ‘ সাইমন ড্রিং ‘  জীবনের  ঝুঁকি নিয়েলুকিয়ে থেকে যান এবং ২৫শে মার্চের নৃশংস ঘটনাকে  ” ওয়াশিংটন পোস্টে “রমাধ্যমে  বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। জগন্নাথ হল এবং অন্যান্য ছাত্রহলগুলোতে পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞের চিত্রভিডিওটেপে ধারণ করেন তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অবইন্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনলজি (বর্তমান বুয়েট এর) এর প্রফেসর নূরুলউলা।জগন্নাথ হল ছিল হিন্দু ছাত্রদের একমাত্র আবাসিক ছাত্রাবাস।এই জগন্নাথহলকে পূরোপুরি গুড়িয়ে  দেওয়া হয়।এই ছাত্রাবাসের ভিতরেই  সেদিন নিহত হয়েছিল৬০০/৭০০ ছাত্র।

এই আক্রমনের পরেই  জনগণ স্থির করেনিয়েছিল তাদের ইতিকর্তব্য।পাকিহায়েনাদের বিরুদ্ধে  শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতেদৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল তারা। এত  শক্তিশালি একটা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রবলতে সেদিন ছিল শুধু এক অদম্য মনোবল আর স্বদেশের জন্য প্রয়োজনে জীবনবিসর্জন দেবার অবিচল সাহস এবং নিষ্ঠা ।আস্তে আস্তে সংগঠিত হয়েছে তারা ।তাদের সাথে যোগ দিয়েছে  বিভিন্ন প্রতিরক্ষাবাহিনীর বাংগালী সদস্যারা ।গেরিলা পদ্ধতিতে একের পর এক আক্রমনে বিপর্যস্ত করেছে শত্রুশিবির।

আত্মত্যাগেরএই মহতী উদ্যোগ-উদ্দীপনা  বৃথা যায়নি। আজ আমরা যে একটি স্বাধীন বাংলাদেশেরপতাকার নীচে সমবেত হয়ে আছি –তা কেবল সম্ভব হয়েছে লাখো মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে।নিজের জীবন দিয়ে, কেউবা আজীবন পঙ্গুত্বকে মেনে নিয়েএবং  যারা সুস্থ -সবল অবস্থায় ফিরে এসেছে তারাওতো জীবন পণ করেই গিয়েছিলস্বাধীনতার এই যুদ্ধে।নিজের নিজের জীবন বাজী রেখে তাঁরা আমাদের জন্য অর্জনকরেছে একটি স্বাধীন ভূখন্ড — একটি লালসবুজের পতাকা।আজ আমরা গর্ব ভরেউচ্চারণ করতে পারি আমাদের দেশের নাম —- বাংলাদেশ।

জানি আজো আমরাআমাদের কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি ।আমাদের চলার পথে নানা প্রতিকূলতাআজো আমাদের স্বাধীনতার সুফল পরিপূর্ণ করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে  ।দেশি বিদেশি চক্রান্তে আমাদের উন্নয়নের ধারা বিঘ্নিত হচ্ছে বারবার ।কিন্তুতারপরেও আমাদের এই পথ চলা সীমাহীন স্বপ্নের পথ ধরে।জানি আমরা একদিন বিশ্বেরদরবারে ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো।মেধায়-প্রজ্ঞায়, সমৃদ্ধিতে।

কিন্তু আমাদের এই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে যে অশুভ তৎপরতা , তাকে আমাদের রোধ করতেই হবে যে কোন মূল্যে। এই অশুভ শক্তিকে প্রতিরোধ করতেহলে  আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ।যে কোন বড় অর্জনের জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই।