ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তান সরকারের কাছে একাত্তরের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করেছে। এটি এককভাবে সরকারের দাবি নয়–বরং গোটা জাতিরই দাবি। পাকিস্তান এখনও সরকারীভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করেনি বা ইতিবাচক কোন সাড়া দেয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে যথাযথ কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচারণা আরও বেশি প্রয়োজন।

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা না করলেও অনেক সাধারণ পাকিস্তানি নাগরিক একাত্তরে দেশটির ঘৃণ্য, জঘন্য ভূমিকার জন্য লজ্জিত, অনুতপ্ত ও দুঃখিত (তবে দেশটিতে এর বিপরীত স্রোতের মানুষের সংখ্যাও কম নয়)। পাকিস্তানের অনেক নামকরা লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবী ব্যক্তি একাত্তরে গণহত্যার জন্য অনুশোচনা বোধ করে এবং এজন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান সরকারের ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে মনে করে। তাদের এই আত্মোপলব্ধিকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এই পাকিস্তানি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের ক্ষমাপ্রার্থনা কোনভাবেই দেশটির রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার দাবির বিপরীতে যথেষ্ট হতে পারেনা।

সর্বশেষ, গত ২৩ মার্চ ২০১১ তারিখে পাকিস্তানের একসময়ের বিশ্বনন্দিত ক্রিকেট-তারকা ও হাল-আমলের রাজনীতিক ইমরান খান একটি পাকিস্তানি টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রসারিত অনুষ্ঠানে “একাত্তরে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধের জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া উচিত” বলে মন্তব্য করেছেন (দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ মার্চ ২০১১)।

শুধু পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকই নয়, এমনকি পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য, যারা একাত্তরে বাঙালির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল এবং যুদ্ধাপরাধ করেছিল, তাদের অনেকেই এখন উপলব্ধি করে–একাত্তরে তারা বাঙালির বিরুদ্ধে অন্যায় করেছিল। এমনই একজন ব্যক্তি হচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল নাদির আলী, যে একাত্তরে পাকবাহিনীর নৃশংসতার জন্য অনুশোচনায় ভোগে। আমরা তাকে বলতে দেখি, “সেনাবাহিনীতে কেউ আলাদা পোশাক পরে না। আমরা সবাই অপরাধের ভাগীদার। আমরা (সবাই) হয়ত হত্যা করিনি। কিন্তু আমরা (সেই অপরাধের) সহযোগী ছিলাম এবং একই বাহিনীর অংশ ছিলাম” (In the Army, you wear no separate uniform. We all share the guilt. We may not have killed. But we connived and were part of the same force.)।

অথচ নাদির আলীদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামসরা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করার জন্য–পাক হানাদারদের যুদ্ধাপরাধে সক্রিয় সহযোগিতার জন্য–এবং হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ইত্যাদি অপরাধ করার জন্য বা সমর্থন করার জন্য কখনও অনুশোচনায় ভোগে না। আজ পর্যন্ত তারা জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। বরং মনে করে একাত্তরে তারা কোন অন্যায় করেনি। তাদের এই ধৃষ্টতা কি ক্ষমা করা যায়?

আরেক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেড. এ. খান উপলব্ধি করে, “ধর্ম ছাড়া আর কিছুতেই মিল ছিল না, পূর্ব পাকিস্তান প্রথম থেকেই আলাদা রাষ্ট্র হওয়া উচিত ছিল” (…there was nothing common except religion, East Pakistan should have been separate state from the beginning.)। তার মানে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একজন সদস্যও শেষ পর্যন্ত এই ধ্রুবসত্যটি স্বীকার করে নেয়–যে কিনা একাত্তরে বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অথচ তা স্বীকার করেনা এদেশের জ্ঞানপাপী, ধর্মব্যবসায়ী রাজাকাররা–যারা কেবল ধর্মের মিথ্যা দোহাই দিয়ে তথাকথিত ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের মাটির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল এবং ধর্মের নামে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটনে সক্রিয় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ করেছিল। শুধু ধর্মের ওপর ভিত্তি করেই যদি রাষ্ট্র গড়ে উঠত, তবে পৃথিবীর সব মুসলিম দেশ মিলে একটি রাষ্ট্র হত–ধর্ম বিকিয়ে খাওয়া এইসব পাপিষ্ঠ নরাধমদের এইটুকু বোধ আছে কি?

শুধু ইসলামের নামে মিথ্যা দোহাই দিয়ে নিরীহ বাঙালির বিরুদ্ধে পাকবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ চালানোর কথা স্বীকার করেছে সেই কর্ণেল নাদির আলীও: “যত বেশি সম্ভব ‘জারজ সন্তান’কে হত্যা করার জন্য আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে একজন হিন্দুও জীবিত না থাকে” (“Kill as many bastards as you can and make sure there is no Hindu left alive,” I was ordered.)।

অথচ পাকবাহিনীর এই আত্ম-স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধে সক্রিয় সহযোগিতা দেওয়ার কথা স্বীকার করেনা এদেশের সেই কুলাঙ্গার, কুসন্তানরা। সেই নরপশুদের কখনও সত্যোপলব্ধি হয়না। এটি কি মেনে নেওয়া যায়?

কর্ণেল নাদির আলি বলেছে, “ফজলুল কাদের চৌধুরী, মাওলানা ফরিদ আহমেদ এবং আরও অন্যান্য মুসলিম লীগ ও জামায়াত নেতাদের সাথে আমার প্রায়ই সাক্ষাত হত” (I frequently met Mr. Fazlul Qadir Chaudhry, Maulana Farid Ahmed and many other Muslim League and Jamaat leaders.)। কী উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ ও জামায়াত নেতারা পাক হানাদারদের সাথে বার বার দেখা করত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে কি?

এখানেই শেষ নয়, নাদির আরও বলেছে, “অধ্যাপক গোলাম আযম ও চৌধুরী রহমত এলাহীও ভারতীয় সীমান্তের ওপারে স্যাবোটাজ চালানোর জন্য স্বেচ্ছাসেবক যোগান দিতে আমার সাথে দেখা করতেন” (Prof. Ghulam Azam and Ch. Rehmat Elahi also used to meet me to provide me volunteers to carry out sabotage across the Indian Border.)।

অথচ গোলাম আযমরা পাক বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের সাথে তাদের সম্পৃক্ততার কথা সবসময় অস্বীকার করে এসেছে। এ ব্যাপারে রাজাকার-সম্রাটের অসংখ্য মিথ্যাচারের মধ্যে একটির নমুনা এখানে দিচ্ছি। গোলাম আযম তার আত্মজীবনী ‘জীবনে যা দেখলাম’ এর ৩য় খণ্ডে ‘ইয়াহ্‌ইয়া সরকারের রেযাকার বাহিনী গঠন’ শিরোনামের অংশে ৯৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছে, “তাদের (রাজাকারদের) হাতে কোন আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়নি। শুধু লাঠিই তাদের হাতিয়ার ছিলো। তাদেরকে প্রধানত পাহারা দেবার কাজেই ব্যবহার করা হতো।” এটি যে কতবড় মিথ্যাচার, তার প্রমাণ দেখুন ১৭ জুলাই ১৯৭১ এর দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভারে প্রকাশিত নীচের ছবিতে:

East Pakistan Razakar Ordinance-এর মাধ্যমে রাজাকার বাহিনী গঠনের আদেশ জারী হয় ১৯৭১ সালের জুন মাসে এবং উপরের ছবিটি ঠিক এর পরের (জুলাই) মাসের। তার মানে, প্রথম থেকেই অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। এই আগ্নেয়াস্ত্রের ‘সদ্ব্যবহার’ যে কেবল পাহারা দেওয়ার কাজে সীমাবদ্ধ ছিলনা, তার প্রমাণ পাই আমরা ওপরে নাদির আলীর বক্তব্য থেকে।

একইভাবে হানাদার-সম্রাট নরপিশাচ নিয়াজী তার ‘The Betrayal of East Pakistan’ বইতে রাজাকার-আলবদর-আল শামস্‌দের সব গোমর ফাঁস করেছে। বইটিতে এসব বাহিনীর সংগঠন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, বিশেষ অপারেশনাল কর্মকাণ্ড, ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। দলীয় জনবল যোগান দিয়ে এসব বাহিনীর প্রতিষ্ঠা এবং এদের কর্মকাণ্ডের পেছনে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও মুসলিম লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততা জেনারেল নিয়াজী তুলে ধরেছে। নিয়াজীর জন-সংযোগ কর্মকর্তা তদানীন্তন মেজর সিদ্দিক সালিকের লেখা ‘Witness to Surrender’ আত্মজীবনীতেও এদেশীয় ঘাতক-দালালদের কর্মকাণ্ড বিবৃত হয়েছে (Niazi’s Book Mocks Jamaat’s Claim, The Daily Star, 19 December 2007 and Pak Major’s Account Reveals Jamaat Role, The Daily Star, 28 October 2007)।

জামায়াতে ইসলামীর রাজাকার নেতারা সব সময় আস্ফালন করে বলে, বাংলাদেশে বা জামায়াতে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই–এসব তাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপন্থীদের অপপ্রচার। অথচ পাকিস্তানি হানাদাররাই তাদের যুদ্ধাপরাধ-সংশ্লিষ্টতার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিচ্ছে। শুধু কি তাই! ইরানি-বংশোদ্ভূত ইসলাম ও রাজনীতি বিষয়ক প্রখ্যাত গবেষক সৈয়দ ওয়ালি রেজা নাসর ১৯৯৪ সালে ‘The Vanguard of the Islamic Revolution: The Jama‘at-i Islami of Pakistan’ নামক গবেষণা-গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। বইটির নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই লেখা। অথচ এতেও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধ-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বিবৃত হয়েছে। নাসর লিখেছেন, “১৯৭১ সালের এপ্রিলে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল টিক্কা খানের সাথে বৈঠক শেষে পূর্ব পাকিস্তান (জামায়াতে ইসলামীর) আমীর গোলাম আযম ‘ইসলামের শত্রুদের’ বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিলেন” (After a meeting with General Tikka Khan, the head of the army in East Pakistan, in April 1971, Ghulam A’zam, the amir of East Pakistan, gave full support to the army’s actions against ‘enemies of Islam’.)। এখানে ‘ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে কি?

জামায়াত সব সময় বলে এসেছে, রাজাকার-আলবদর-আল শামস্‌ গঠন করেছে পাকবাহিনী–এতে জামায়াতের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। অথচ নাসর বলছেন, এসব বাহিনী, বিশেষ করে, আলবদর ও আলশামস্‌ গঠিত হয়েছিল মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে, জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ বা ‘ইসলামী জামিয়াত-ই-তুলাবাহ্‌ (IJT)-এর সদস্যদের নিয়ে। লেখকের নিজের ভাষায়: “With the help of the army, the IJT organized two paramilitary units, called al-Badr and al-Shams, to fight the Bengali guerrillas. Most of al-Badr consisted of IJT members, who also galvanized support for the operation among the Muhajir community settled in East Pakistan. Mutiul-Rahman Nizami, the IJT’s nazim-i ala (supreme head or organizer) at the time, organized al-Badr and al-Shams from Dhaka University.” আজকের ‘সাচ্চা ঈমানদার’, ‘বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লবের অগ্রদূত’ গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদ গংদের একাত্তরে ঘাতক-দালাল হিসেবে সরাসরি সম্পৃক্ততার স্বরূপ উন্মোচনে আর কী তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন?

নাসর তাঁর বইতে আরও লিখেছেন, “১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর চারজন সদস্যের প্রাদেশিক সামরিক সরকারে যোগদানের মাধ্যমে জামায়াত ও সেনাবাহিনীর জোট আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। দুই পক্ষই এই জোট থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ দেখে। সেনাবাহিনী তার ক্রমবর্ধমান নৃশংস কর্মকাণ্ডের ধর্মীয় বৈধতা পাবে আর জামায়াত পাবে খ্যাতি” (In September 1971 the alliance between the Jama‘at and the army was made official when four members of the Jama‘at-i Islami of East Pakistan joined the military government of the province. Both sides saw gains to be made from their alliance. The army would receive religious sanction for its increasingly brutal campaign, and the Jama‘at would gain prominence.)। লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ হত্যা আর মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠনের ধর্মীয় বৈধতা বা অনুমোদন দিয়েছিল জামায়াত–চিন্তা করা যায়!

জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী রাজাকার নেতারা এবং তাদের জ্ঞানপাপী অথবা ‘মগজ-ধোলাইকৃত’ অনুগামীরা সব সময় বলে থাকে, গোলাম আযম, নিজামী ও মুজাহিদরা একাত্তরে কাউকে খুন কিংবা ধর্ষণ করেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার কি নিজের হাতে কাউকে কখনও খুন করেছিল?

পাকিস্তানি কর্ণেল নাদির আলীর আত্মোপলব্ধির শেষ কথা ছিল, “ইতিহাস ক্ষমা করেনা!” (History does not forgive!)। তাই বলি, বাংলাদেশি ‘নাদির আলী’দের অপরাধ, ধৃষ্টতা, অনুতাপহীনতা ও মিথ্যাচারের কোন ক্ষমা নেই।

[লেখাটি অন্যান্য বাংলা ব্লগেও প্রকাশিত]

আমার ব্লগ দেখুন