ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমাদের আত্মপরিচয় খোঁজার আগে জাতিসত্তা, জাতীয়তা, জাতীয়তাবাদনাগরিকত্ব সম্পর্কে ধারণালাভ করা দরকার।

জাতিসত্তা (ethnicity) হচ্ছে জাতি বা গোষ্ঠীগত পরিচয়, জাতীয়তা নয়। এটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের সীমানা দ্বারা সীমাবদ্ধও নয়। একাধিক জাতিসত্তার মানুষ যেমন একই রাষ্ট্রে বসবাস করে থাকে, একই জাতিসত্তার মানুষ তেমনি একাধিক রাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকতে পারে। ঢাকা, লন্ডন, নিউইয়র্ক কিংবা দুনিয়ার অন্য যে কোন স্থানে বসবাসকারী বাঙালিদের জাতিসত্তাগত পরিচয় তাই এক ও অভিন্ন। বিশ্বে কুর্দী কিংবা তামিলদের মত নিজস্ব জাতি রাষ্ট্রবিহীন অনেক জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা আছে, কিন্তু সার্বভৌম জাতীয়তা নেই।

জাতীয়তা (nationality) হচ্ছে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়, জাতিসত্তা নয়। এটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং বলা যায়, রাষ্ট্রই জাতীয়তা নির্ধারণ করে। সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিবাসীদের একক রাষ্ট্রীয় পরিচিতির ক্ষেত্রে তাই আন্তর্জাতিকভাবে পাসপোর্ট, ভিসা, জাতীয়তা-সনদ, পরিচয়পত্র, ইত্যদিতে ‘জাতীয়তা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় এবং সেটি জাতিসত্তা নয়, বরং নাগরিকত্ব বোঝায়। ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলোর দৃষ্টান্ত এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ভারতে বহু জাতিসত্তার মানুষের বসবাস হলেও তাদের সবার রাষ্ট্রীয় পরিচয় বা জাতীয়তা হচ্ছে ভারতীয়।

একইভাবে জাতিসত্তার দিক থেকে প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ জাতি বলে কিছু নেই, আছে ব্রিটিশ নাগরিক। কারণ যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রটি ইংরেজ, স্কটিশ, ওয়েলশ ও আইরিশ জাতির আবাসস্থল। সম্মিলিত, একক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে তাদের পৃথক জাতিসত্তার কোন প্রয়োগ নেই এবং তা বাস্তবসম্মতও নয়। তাই তাদের পাসপোর্টে জাতীয়তা হিসেবে লেখা থাকে ব্রিটিশ নাগরিক।

আর অভিবাসীদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতিসত্তা ও বহুধা সংস্কৃতিতে বিভক্ত অধিবাসীদের যতই আমেরিকান জাতি বলা হোক না কেন, এটি মূলত তাদের রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় মাত্র। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেশটির আদি বাসিন্দা রেড ইন্ডিয়ানদের ১৯২৪ সালের আগে নাগরিকত্বের অধিকারই ছিল না।

অন্যদিকে আরব দেশগুলোর অধিবাসীরা সবাই ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার দিক থেকে আরব হলেও দেশভেদে তাদের সবার জাতীয়তা আলাদা। একই আরব জাতিসত্তার হওয়া সত্বেও একীভূত নিখিল আরব জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গত শতকে গামাল আবদেল নাসেরদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তাই ২২টি আরব দেশের অধিবাসীদের জাতিসত্তা এক, কিন্তু জাতীয়তা ভিন্ন। তাদের কেউ মিশরীয়, কেউ কুয়েতী, আবার কেউ সিরীয়, ইত্যাদি।

তবে কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে জাতিসত্তা ও জাতীয়তা একই অর্থ বহন করে। বিশেষ করে, কোন কোন সার্বভৌম অস্তিত্বহীন জাতি (যেমন, স্পেনের অন্তর্ভুক্ত ক্যাটালোনীয়, আন্দালুসীয়, বাস্কসহ বিভিন্ন জাতি) কিংবা ফেডারেল রাষ্ট্রের (যেমন, রাশিয়ার) অন্তর্ভূক্ত ভিন্ন ভিন্ন জাতিসমূহের স্বতন্ত্র পরিচিতির ক্ষেত্রে জাতীয়তা ধারণাটির ব্যবহার হতে দেখা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে জাতীয়তা তাদের নামমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়, সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় পরিচয় নয়। তাদের সবার একক রাষ্ট্রীয় পরিচিতির জন্য তাই নাগরিকত্ব শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা কাঠামো পরিবর্তনের সাথে সাথে এর অধিবাসীদের জাতীয়তা বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু তাদের জাতিসত্তা কখনও পরিবর্তিত হয় না। ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলে আমাদের জাতিসত্তা যেমন বাঙালি ছিল, তেমনি বাংলাদেশ আমলেও আমরা বাঙালিই আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। কিন্তু আমাদের জাতীয়তা বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছে বার বার।

নাগরিকত্ব (citizenship) হচ্ছে আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত রাষ্ট্র ও ব্যক্তির পারস্পরিক রাজনৈতিক সম্পর্ক। নাগরিকত্বের মাধ্যমে একদিকে যেমন ব্যক্তি তার রাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু অধিকার লাভ করে, অন্যদিকে তেমনি তার ওপর রাষ্ট্রের প্রতি নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব বর্তায়। নাগরিকত্বের সাথে জাতীয়তার মূল পার্থক্য হচ্ছে, জাতীয়তা থাকলেই বা রাষ্ট্রের সদস্য হলেই সব ক্ষেত্রে বিভিন্ন নাগরিক অধিকার, যেমন, ভোটাধিকার অর্জিত হয় না। তবে সাধারণভাবে জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।

জাতীয়তাবাদ (nationalism) হচ্ছে কোন জাতির জোরালো জাতীয়তাবোধ, যা তাদের স্বাধিকার বা স্বায়ত্বশাসন অর্জনে, এমনকি নিজেদের জন্য স্বাধীন, সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র গঠনে ঐক্যবদ্ধ করে। উনিশ ও বিশ শতকে বিভিন্ন জাতির মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষের ফলে বড় বড় সাম্রাজ্য ও উপনিবেশ ভেংগে বহু জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়। জাতীয়তাবাদ ধারণাটি একদিকে যেমন একটি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিসত্তাবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে (জাতিসত্তাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বা ethnic nationalism), অন্যদিকে তেমনি একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিবাসীদের রাষ্ট্রভিত্তিক সম্মিলিত মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে (উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ বা liberal nationalism)। যে কোন ধরণের জাতীয়তাবাদই অন্য জাতি কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন জাতি কিংবা রাষ্ট্রের প্রাধান্য এবং এমনকি আগ্রাসন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করে থাকে।

এখন বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিত এবং জাতীয় পরিচয় নির্ধারণে এদের ভূমিকা সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মূল ভিত্তি ও চেতনা ছিল জাতিসত্তাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীটি নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্খা থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের এ লড়াই শুরু হয়েছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের আগে অসহযোগ আন্দোলনের সময় পূর্ব বাংলা জুড়ে ধ্বনিত হয়েছিল, “বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।” বাংলাদেশি নামে কোন জাতি কিংবা জাতীয়তাবাদের কথা তখন শোনা যায়নি।

তবে স্বাধীনতার পর অন্তত দেশের নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রয়োগে তদানীন্তন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ঘোষিত হয়েছিল, “বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালী বলিয়া পরিচিত হইবেন”। এটি ছিল বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর পৃথক অস্তিত্বকে অস্বীকার করার সমান। এমনকি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লার্মা তদানীন্তন গণপরিষদে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করলে বঙ্গবন্ধু তাদের বাঙালি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে।

অথচ প্রথম থেকেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীর পৃথক অস্তিত্বকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল। তা হয়নি বলেই তারা পরবর্তীতে স্বাধিকারের দাবিতে সশস্ত্র ও সহিংস পন্থা বেছে নেয়। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সংগঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠী সামগ্রিকভাবে অংশগ্রহণ করেনি। তারা হয়ত ভেবেছিল, এ সংগ্রাম বাঙালির এবং এটি সফল হলে বাঙালিরা একটি স্বাধীন দেশ পাবে, কিন্তু তারা বাঙালিদের পরাধীনই থেকে যাবে। বাহাত্তরের সংবিধান কি সে সাক্ষ্যই দেয় না?

বাংলাদেশের সকল অধিবাসীর একক রাষ্ট্রীয় পরিচয় তথা বাঙালি নাগরিকত্ব নিয়ে তাই গোড়া থেকেই একটা সংশয় ছিল। এ ক্ষেত্রে মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাঙালি নাগরিকত্বের কথা বলা হলেও তখন বাংলাদেশি পাসপোর্টে জাতীয়তার স্থলে নাগরিকত্ব উল্লেখে বাঙালি লেখা থাকত না–বরং লেখা থাকত সিটিজেন অব বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের নাগরিক। তার মানে, সংবিধানে ঘোষিত হলেও বাঙালি নাগরিকত্ব বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়নি। তাছাড়া রাষ্ট্রের অধিবাসীরা জাতীয়তাবাদে বাঙালি হলে নাগরিকত্ব বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়েও তাদের বাঙালিই হতে হবে–এমন কোন কথা আছে কি? তাছাড়া কোন বিদেশি ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অর্জন করলে সংবিধান অনুসারে তিনি কীভাবে ‘বাঙালি’ নাগরিক হতেন?

জাতীয়তাবাদ যে কখনো কখনো সাম্প্রদায়িকতায়ও রূপ নিতে পারে, ব্রুট মেজরিটির জোরে ভিন্ন জাতিসত্তার সংখ্যালঘু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের বাঙালি বানানোর প্রচেষ্টা সেটিই প্রমাণ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করা হলে তা যদি সাম্প্রদায়িকতা হয়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা কিংবা জাতীয়তা সংখ্যালঘুর ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হলে তা কেন সাম্প্রদায়িকতা হবে না? যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসন থেকে সংখ্যালঘুর সাংবিধানিক রক্ষাকবচ নিশ্চিত করা, সেখানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি কি উল্টো রাষ্ট্র কর্তৃক সবলের পক্ষাবলম্বন নয়? সুতরাং জাতিসত্তাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে সেই রাষ্ট্রের সব জাতিগোষ্ঠীর সমবিকাশে তা ইতিবাচক না-ও হতে পারে। আধুনিক বিশ্বে কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাই এ ধরণের অসার্বজনীন জাতীয়তাবাদের উপযোগিতা কমে আসছে।

এরপর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমানবলে বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয় ‘বাংলাদেশী’ নির্ধারণ করেন। একই সাথে তিনি সংবিধান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অপসারণ করেন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে স্বপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। জেনারেল জিয়া বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হলেও একসময় তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদেই বিশ্বাস করতেন। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদানীন্তন উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম ‘একটি জাতির জন্ম’ নামে একটি নিবন্ধের শুরুতেই লিখেছিলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মিঃ জিন্নাহ যে দিন ঘোষণা করলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, আমার মতে ঠিক সেদিনই বাঙালী হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ। জন্ম হয়েছিল বাঙালী জাতির।”

তাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ভুল তত্ত্ব নয়। বরং এটি একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ হতে পারত। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, মূল্যবোধ, জাতিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইত্যাদি নানা বিষয়ে আজকের বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটির অধিবাসীরা একদিকে যেমন তাদের ভারতীয় বাঙালি ‘জাতভাই’দের থেকে স্বতন্ত্র, অন্যদিকে তেমনি তাদের আরবি-ফারসি-উর্দুভাষী ‘ধর্মভাই’দের থেকেও আলাদা। সুতরাং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সব অধিবাসীর সমবিকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ একটি কার্যকরী অনুঘটক হতে পারত। আধুনিক রাষ্ট্রে উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদই সব জাতিগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে। আর তাই বিশ্ব-ইতিহাসে একক জাতিসত্তাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ থেকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদে উত্তরণের দৃষ্টান্তও কম নেই।

কিন্তু জেনারেল জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিঃসন্দেহে সংকীর্ন ও ত্রুটিযুক্ত। প্রথমত, দেশের সব নাগরিককে বাংলাদেশি আখ্যা দেওয়া হলেও এতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীসমূহের আলাদা সাংবিধানিক স্বীকৃতির কথা বলা হয়নি, বরং তাদের পৃথক জাতিসত্তা ও অস্তিত্বের বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদেও একটি সাম্প্রদায়িক উপাদান রয়েছে, সেটি হল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োগ। তাই অনেকে বলেন, এর সাথে মিল রয়েছে ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের, যা আমরা একাত্তরেই পরিত্যাগ করেছি। সুতরাং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ উভয়ই ভিন্নভাবে সাম্প্রদায়িকতা-দোষে দুষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান বাংলাদেশে এ দুটো জাতীয়তাবাদই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একদেশদর্শী তত্ত্ব বা ধারণা, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্ত করে রেখেছে।

সম্প্রতি আপিল বিভাগ বাংলাদেশের নাগরিকদের ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তা বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় সমুন্নত রেখে রায় দিয়েছে। উচ্চ আদালত বলেছে, বাঙালি হিসেবে পরিচিতির নির্দেশ দেওয়া হলে নাগরিকত্ব নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকরা দেশের বাইরে বিভিন্ন জটিলতা ও সমস্যায় পড়বে এবং বাংলাদেশি জাতীয়তা উল্লেখিত পাসপোর্টসহ এ সংক্রান্ত সব সরকারি কাগজপত্র পরিবর্তন করার জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে বিধায় জনস্বার্থে এ রায় দেওয়া হয়েছে। যে দেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে নাম পরিবর্তনের অপরাজনীতি চর্চায় হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা নস্যি, সে দেশে জাতীয়তা পরিবর্তনের মত একটি মৌলিক বিষয়ে অন্তত অর্থ ব্যয়ের যুক্তিটি ঠিক ধোপে টেকে না।

অন্যদিকে উচ্চ আদালতের উক্ত রায়ের ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদও বহাল হয়েছে। বলা যায়, এ রায় হল আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তা, এ দুয়ের মধ্যে এক ধরণের আইনি সমঝোতা। তবে উচ্চ আদালত বলেছে, জাতীয়তাবাদ বিষয়টি রাজনৈতিক বিধায় এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাঙালি আমাদের জাতিসত্তাগত পরিচয় আর বাংলাদেশি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়। দেশের বাইরে আমাদের বাংলাদেশি পরিচয় ব্যবহার করার পক্ষে জোরালো কিছু যুক্তিও রয়েছে। আগেই বলেছি, রাষ্ট্রের অধিবাসীদের পরিচিতির ক্ষেত্রে জাতিসত্তা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পরিচয় বা জাতীয়তাই আগে আসে। এ ক্ষেত্রে আবারও অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের উদাহরণ টানা যেতে পারে। একজন ভারতীয় বাঙালি দেশের বাইরে তার কোন্‌ পরিচয়টি আগে দেয়? নিশ্চয়ই ‘ভারতীয়’ পরিচয়, জাতিসত্তাগত ‘বাঙালি’ পরিচয় নয়। একইভাবে দেশের বাইরে একজন যুক্তরাজ্যবাসী ইংরেজের প্রথম পরিচয় হচ্ছে ‘ব্রিটিশ’ এবং একজন মিশরীয় আরবের প্রথম পরিচয় হচ্ছে ‘মিশরীয়’। সুতরাং বাংলাদেশের অধিবাসী একজন বাঙালি বা চাকমার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত ‘বাংলাদেশি’–বাঙালি বা চাকমা নয়।

তাছাড়া বাংলাদেশি পরিচয়ের মধ্যেই রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির নাম, প্রতিনিধিত্ব ও সার্বভৌমত্ব নিহিত রয়েছে। সারা দুনিয়ার কাছে ডঃ ইউনূস নোবেল বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশি, কোনভাবেই প্রথম বাঙালি নন। এক্ষেত্রে তাঁর বাংলাদেশি পরিচয় একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং সেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীসহ সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। এসব কারণে আমাদের বাংলাদেশি পরিচয়টিই বেশি যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তবসম্মত।

উপসংহারে বলা যায়, আমরা একই সাথে বাঙালি ও বাংলাদেশি। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীসমূহ বাদে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী জাতিসত্তার দিক থেকে বাঙালি এবং এ পরিচয় অপরিবর্তনীয়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীসহ এদেশের সব অধিবাসীর রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পরিচয় হচ্ছে বাংলাদেশি। দেশের বাসিন্দা সব বাঙালিই বাংলাদেশি, কিন্তু বাংলাদেশিরা সবাই বাঙালি নয়। আর বর্তমান রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় সাধারণত রাষ্ট্রের পরিচয়েই অধিবাসীদের জাতীয়তার পরিচিতি। তাই বিশ্বসভায় আমাদের প্রথম ও প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত, আমরা বাংলাদেশি।

***
[লেখাটি অন্যান্য ব্লগেও প্রকাশিত]

আমার ব্লগ দেখুন