ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

প্রথমেই বলে নিচ্ছি, বাংলাদেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। দেশে বহু জ্ঞানী-গুণী, বিদ্বান-বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবেন। বরং আমাদের ব্যক্তি/গোষ্ঠী মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবাস্তব, অযৌক্তিক ও আজগুবি সব নামের ‘মাহাত্ম্য’ তুলে ধরাই এ লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য। লেখাটি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়, তবে কেউ পড়ে ‘নিজে নিজে’ দুঃখ পেলে আমি মন খারাপ করব না।

উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম…
বিভিন্ন দিকের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রেখে বিশ্ববিদ্যালয়-অলারা দেশ ও জাতিকে কী ‘দিক-নির্দেশনা’ দিচ্ছেন, তা হয়ত একমাত্র তারাই ভাল বলতে পারবেন। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে না চাওয়া/পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের কম্পাসের মত উত্তর-দক্ষিণ দিকের নিশানা দিতে প্রথম এগিয়ে আসে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। এর দেখাদেখি তাড়াতাড়ি পূর্ব-পশ্চিম দিক ‘দখল করল’ ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি। অন্যরাই বা কেন বসে থাকবে? সুতরাং দ্রুত গজিয়ে উঠল নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি–কয়টার কথা বলব!

প্রায় সবগুলো দিক দখল হয়ে যাওয়ার পর এখন বাকি আছে উপর (up) ও নিচের (down) দিক। তাই ভাবছি, ‘আপ ডাউন ইউনিভার্সিটি’ নামে শীঘ্রই একটা বিশ্ববিদ্যালয় খোলব। আমারটা কিন্তু অর্থহীন হবে না, কারণ সেখানে সমাজের উপর ও নিচ তলার সবাই পড়তে পারবে। সবাই দোয়া রাখবেন।

রাজা নেই, রানী নেই, রাজত্ব নেই…
তো তাতে কী হয়েছে! আমাদের রাজকীয় বিশ্ববিদ্যালয় (রয়্যাল ইউনিভার্সিটি) আছে, রাণীর বিশ্ববিদ্যালয় (কুইন্‌স ইউনিভার্সিটি) আছে এবং এমনকি সরাসরি রানীর নামেও বিশ্ববিদ্যালয় (ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি) আছে। ব্রিটিশ প্রভুদের নুন খেয়েছি, তাই এখনও তাদের গান তো গাইতেই হবে। কেউ অন্তত আমাদের নিমকহারাম বলতে পারবে না।

দেশ-মহাদেশ-বিশ্ব…
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। এই নামটি শুনেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ কি কোন ফেডারেল রাষ্ট্রের স্টেট বা অঙ্গরাজ্য? যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এরকম নামবিশিষ্ট সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেমন, লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশে কেন এমন নাম? নাকি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে স্টেট বলতে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় বোঝায়? তাহলে তো সেটিও ঠিক নয়। কারণ কিছু কিছু টার্ম বা শব্দ, যেমন, জাতীয়, রাষ্ট্রীয়, ন্যাশনাল, স্টেট, ইত্যাদি কেবলমাত্র প্রকৃত অর্থে জাতীয় ও সরকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যই সংরক্ষিত থাকা উচিত। মাত্র চার-পাঁচটি বিভাগ/অনুষদ ও দুই-আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রীবিশিষ্ট কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথে যদি স্টেট শব্দটি থাকে, তবে তা বিশেষ করে বিদেশিদের কাছে বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এরকম আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, নাম বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। ‘সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন’ ধরনের কোন ব্যাপার কিনা কে জানে!

অন্যরা অবশ্য তার চেয়েও এগিয়ে। কেবল দেশ নয়, বরং উপমহাদেশ, মহাদেশ, আন্তদেশ, এমনকি আন্তমহাদেশের নামেও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে (ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি)। আর নামের মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল বা আন্তর্জাতিক শব্দটি আছে অন্তত আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। যেভাবে জেলায়-উপজেলায়, এমনকি পাড়ায়-মহল্লায় ফ্ল্যাট এবং ‘শিক্ষক’ ভাড়া নিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয় ‘ক্যাম্পাস’ খুলছে, আন্তর্জাতিক তো দূরের কথা, এদের বড়জোর ‘আন্তজেলা’ বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়। চিন্তা করে পাই না, বিশ্বের প্রথম সারির নামীদামী কোন বিশ্ববিদ্যালয়েরই নামের সাথে আন্তর্জাতিক শব্দটি নেই কেন!

আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির নামের ‘স্ট্যামফোর্ড’ শব্দের মানে কী এবং কেনই বা বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এরকম নাম, কেউ বলতে পারেন? আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি বা পূর্ব বদ্বীপ বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ব বদ্বীপ না হয় বুঝলাম (আসলে বুঝি নাই!), কিন্তু পশ্চিম বদ্বীপটা তাহলে কোথায়? নাকি নাম যে কোন একটা রাখলেই হল? ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ প্রবাদটির যথার্থতা তুলে ধরতেই যেন অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি! এরপর ঢাকার কোন চিপাগলিতে দুই কক্ষের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মহাবিশ্বের নামে কোন ‘মহাবিশ্ববিদ্যালয়’ গজিয়ে উঠলেও অবাক হব না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম সব ইংরেজিতে কেন, তাও আমি বুঝতে পারি না। বাংলায় অর্থবোধক ও সুন্দর নামের সম্ভবত একমাত্র বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে গণ বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ কেউ হয়ত বলবেন, নাম দিয়া কাম কী, পড়ালেখা হলেই হল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তো মুদির দোকান নয় যে এর কোনরকম একটা নাম থাকলেই চলে। বরং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর নামকরণ যথার্থ হওয়া প্রয়োজন। যে কোন সুন্দর অর্থবোধক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নামই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে।

তা নাহলে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘খাইছি তোরে’ নামের মত ‘শিখাইয়া ছাড়মু’ নাম নিয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে উঠলেও তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

[লেখাটি অন্যান্য ব্লগেও প্রকাশিত]

আমার ব্লগ দেখুন