ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সম্প্রতি দশ ট্রাক অস্ত্র আটক মামলায় ১১ জনকে আসামী করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে সিআইডি (দৈনিক প্রথম আলো, ৩ জুন ২০১১)। ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল তারিখে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার (সিইউএফএল) জেটিতে এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ আটক করা হয়েছিল। সিআইডি’র তদন্তে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) জন্য চীন থেকে এসব সমরাস্ত্র আনা হয়েছিল। আর এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিল রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএআই ও ডিজিএফআই। সিআইডি’র অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ১১ আসামীর মধ্যে পাঁচজন হচ্ছেন এই দুই গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাব্যক্তি।

অন্যদেশের, বিশেষ করে প্রতিবেশি দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তা করা রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি প্রচলিত (কিন্তু অলিখিত) ডিফেন্সিভ স্ট্র্যাটেজি। আর এই স্ট্র্যাটেজির বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। আমেরিকার সিআইএ করেছে কিউবা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের বিরুদ্ধে; সোভিয়েত কেজিবি করেছে আমেরিকা ও তার মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে; ইজরায়েলি মোসাদ করেছে প্যালেস্টাইন ও অন্যান্য আরব দেশের বিরুদ্ধে; ভারতের ‘র’ করেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও অন্যান্য প্রতিবেশি দেশের বিরুদ্ধে; এবং একইভাবে পাকিস্তানের আইএসআই করেছে ভারতের বিরুদ্ধে। জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাবৃত্তির ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।

ভারতের কথাই ধরা যাক। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী সশস্ত্র, রক্তাক্ত গেরিলা যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের সংহতি ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী এই বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীকে আশ্রয়, প্রশ্রয়, প্রশিক্ষণ, রেশন, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-সহ অন্যান্য সরকারী সংস্থা (নিউইয়র্ক টাইম্‌স, ১১ জুন ১৯৮৯)। ‘র’-কর্তৃক শান্তিবাহিনীকে সক্রিয় সহায়তা প্রদানের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও গবেষক সুবীর ভৌমিক তাঁর একটি গবেষণাগ্রন্থে (ট্রাবল্‌ড পেরিফেরিঃ ক্রাইসিস অব ইণ্ডিয়া’স নর্থওয়েস্ট, সুবীর ভৌমিক, সেইজ পাবলিকেশন্‌স, নতুন দিল্লী, ২০০৯, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৯)।

ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ১৯৭৫ সাল থেকে ভারতের অভ্যন্তরে শান্তিবাহিনীর সংগঠন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ইন্ধিরা গান্ধীর কংগ্রেস দল হেরে গেলে জনতা দল ক্ষমতায় আসে এবং মোরারজী দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর শাসনামলে শান্তিবাহিনীর প্রতি সহায়তা প্রদান বন্ধ করার জন্য ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হলেও গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ তা অব্যাহত রাখে। ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি সম্পাদনের আগ পর্যন্ত ‘র’-এর প্রত্যক্ষ সহায়তা ও প্ররোচনায় শান্তি বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র, রক্তাক্ত সংঘাত চালিয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক যতই সৌহার্দ্যপূর্ণ হোক, শান্তিবাহিনীকে সক্রিয় সহায়তা প্রদানকারী ‘র’-এর সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কি তারা কোনদিন বিচারের মুখোমুখি করবে?

শুধু ভারত কেন, অন্য দেশের বিরুদ্ধে এসপিওনাজ-কাউন্টার এসপিওনাজ চালানোর জন্য নিজস্ব গোয়েন্দাদের ‘ঝুলিয়ে’ দেওয়ার নজির পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে কি? কিউবার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করার জন্য আমেরিকায় কোন সিআইএ এজেন্টের শাস্তি হওয়ার কথা কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে নাশকতা চালানোর জন্য ব্রিটেনের কোন এমআইসিক্স এজেন্টের নিজের দেশে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা শুনেছেন কখনো? পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-ও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্রশস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরণের সক্রিয় সহায়তা দেয়। কিন্তু পাকিস্তানে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, দেশটি কি কখনো এই ‘অপরাধে’ তার নিজস্ব আইএসআই গোয়েন্দাদের শাস্তি দেবে? সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আটককৃত দশ ট্রাক অস্ত্র যেহেতু চীন থেকে আনা হয়েছিল, ধারণা করা যায়, এই ঘটনার সাথে চীনের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা অন্য কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানও জড়িত ছিল। কিন্তু এই ঘটনার জন্য চীন কি তার গোয়েন্দাদের আদৌ দোষী সাব্যস্ত করেছে বা করবে? নিতান্তই অবাস্তব সম্ভাবনা! অথচ একই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার ‘অপরাধে’ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর গোয়েন্দাদের এখন ‘ডলা’ দেওয়া হচ্ছে।

এটি শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব! সেলুকাস!

***
আমার ব্লগ দেখুন