ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বিচারের বাণী আর কাঁদে না, কারণ কেঁদে কোন লাভ নেই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে একজন ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরপর আর কোন কথা চলে না। আর কোন বিচার নেই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি বিপ্লবের হাতে নিহত নুরুল ইসলামের পরিবার পরিজনদের বিচারের আশায় আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাদের চোখের জল দেখারও কেউ নেই। প্রয়াত নুরুল ইসলামের শোকাহত সন্তানেরা তাই বুকে পাথর বেঁধে বড় হবে।

২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের তিন ছেলে বিপ্লব, লাবু ও টিপু তাদের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে নুরুল ইসলামের বাসায় যায়। তারা সেই বাড়ির প্রধান ফটক ও দরজা ভেংগে ভেতরে প্রবেশ করে। নুরুল ইসলাম প্রাণভয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলেন। সন্ত্রাসীরা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে। তিনি তাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চান। এরপর তারা তাঁকে চোখ বেঁধে অপহরণ করে মাইক্রোবাসে করে তাহেরের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাহেরের স্ত্রী নাজমা তাহেরের সামনেই বিপ্লব ও তার সহযোগীরা তাঁকে জবাই করে এবং ছেনি ও রামদা দিয়ে তাঁর লাশ টুকরা টুকরা করে। তারপর লাশের টুকরাগুলো বস্তায় ভরে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয় (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ জুলাই২২ জুলাই, ২০১১)। এ রকম একটি নৃশংস, বর্বর হত্যাকাণ্ডের মূল হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এ কোন্‌ নজির স্থাপন করলেন?

অবশ্য আইনের দিক থেকে রাষ্ট্রপতি পুরোপুরি সঠিক। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে এই ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকার প্রদান করা হয়েছে: “কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে কোন দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যে কোন দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।” সুতরাং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর অপরাধ মার্জনা ও দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা আইনগতভাবে বৈধ। কিন্তু কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় এর ‘অপব্যবহার’ কতটুকু গ্রহণযোগ্য? আমাদের নৈতিকতা ও বিবেকবোধের আলোকে এটি কতটুকু সমর্থনযোগ্য?

‘মহানুভব’ রাষ্ট্রপতি দলীয় বিবেচনায় এর আগেও দণ্ডিত অপরাধীকে ক্ষমা করেছেন। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে তিনি নাটোরের সাব্বির আহমেদ গামা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হিসেবে পরিচিত ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড একসঙ্গে মওকুফ করে তিনি অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছিলেন। অথচ উচ্চ আদালতে মামলাটির আপিল কার্যক্রম চলমান ছিল বিধায় আইনগতভাবেই তাদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ তখনও শেষ হয়ে যায়নি। এছাড়া তিনি এ বছর মার্চ মাসে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলার প্রধান আসামি স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবীব টিটুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মওকুফ করেন।

তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দণ্ড মওকুফের যে ঘটনাটি আইনগত ও নৈতিক, এ উভয় দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য ছিল, তা হচ্ছে বর্তমান সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগ নেত্রী সাজেদা চৌধুরীর পুত্র শাহদাব আকবর চৌধুরীর দণ্ড মওকুফ। চারটি দুর্নীতির মামলায় ১৮ বছরের সাজা ও পাঁচ কোটি টাকার জরিমানার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাহদাব রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দণ্ড মওকুফ হওয়ার আগ পর্যন্ত পলাতক ছিলেন। একজন ফেরারি আসামির আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা না করা পর্যন্ত কোন আইনি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ রাষ্ট্রপতি তাকেও ক্ষমা করেছেন এবং তার দণ্ড মওকুফ করেছেন। পুরোপুরি রাজনৈতিক বিবেচনায় করা এসব অপরাধ মার্জনা ও দণ্ড মওকুফের ঘটনা কি অপরাধীকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনে আরো উৎসাহিত করবে না?

বিএনপির তৎকালীন স্থানীয় নেতা প্রয়াত নুরুল ইসলামের হত্যাকারীকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করায় দলটি এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এ ধরণের প্রশ্ন উত্থাপনের নৈতিক অধিকার তাদের আদৌ আছে কি? কারণ তারাও বিগত শাসনামলে ফাঁসির আসামীকে ক্ষমা করার নিন্দনীয় নজির স্থাপন করে গেছে। বাইশ বছর ধরে পলাতক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সুইডেন প্রবাসী বিএনপি-কর্মী মহিউদ্দিন জিন্টুকে ২০০৫ সালের ১৩ জানুয়ারি তারিখে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই ভাবে না যে, একদিন না একদিন ক্ষমতা ছাড়তে হবে এবং এখন ইট মারলে ভবিষ্যতে পাটকেল খেতে হবে। বিএনপি আগে এক ইট মেরে এখন বিশ পাটকেল খাচ্ছে! সুতরাং এ ব্যাপারে কথা বলার কোন অধিকার তাদের নেই। বড়জোর পরেরবার ক্ষমতায় আসতে পারলে তারা আবার ‘ইট মারার’ সুযোগ পাবে এবং সুযোগ পেলে যে তখন তারা একশ ইট মারবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের পচে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো যখন আইনের শাসন নিয়ে বড় বড় কথা বলে তখন বড্ড হাসি পায়।

নিহত নুরুল ইসলামের স্ত্রী রাশিদা ইসলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, তিনি কি তাঁর স্ত্রী আইভি রহমানের হত্যাকারীদের ক্ষমা করবেন? মনে হয় না। সংসদীয় গণতন্ত্রে সমুদয় নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির প্রাণভিক্ষার আবেদনে সুপারিশকারী মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজের পিতার হত্যাকারীদের ক্ষমা করেননি। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতির প্রয়াত স্ত্রী আইভি রহমানের হত্যাকারীদের দণ্ড মওকুফের আবেদনে তিনি সুপারিশ করবেন এবং রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করবেন–এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

প্রয়াত নুরুল ইসলামের শোকাহত স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের চোখে জল নেই–আছে উদ্বেগ ও আশংকার ছায়া। সন্ত্রাসের ‘গডফাদার’ আবু তাহের ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে তারা নিজ শহর লক্ষ্মীপুর ছেড়ে বহুদিন ধরে ঢাকা শহরের জনারণ্যে ‘লুকিয়ে’ আছেন। তবুও খু্নি বিপ্লবের মাফ পেয়ে যাওয়ার খবরে তারা এখন বড়ই ভীত-সন্ত্রস্ত। নুরুল ইসলামের বড় মেয়েটি প্রতিবন্ধী। টাকার অভাবে তার চিকিৎসা হচ্ছে না। অভিভাবকহীন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও ন্যায়বিচার-বঞ্চিত এই পরিবারটি এখন মানসিকভাবেও চরম বিপর্যস্ত। মহামান্য রাষ্ট্রপতি হয়ত এসব খবর রাখেন না। ক্ষমাপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান এত এত ফাঁসির আসামির খবর রাখতে গিয়ে একটি হতভাগ্য পরিবারের খবর রাখার সময় কোথায় তাঁর!