ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বাঙালি জাতিকে একটি দেশ, একটি মানচিত্র দেয়ার ক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিসংবাদিত ও অনস্বীকার্য। একজন শেখ মুজিবের জন্ম না হলে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমাদের আরো কতদিন লাগত, তার উত্তর কেউ জানে কি? তিনি ছিলেন এমন একজন অনন্য, অতুলনীয় রাজনৈতিক নেতা, যাঁর একটি উদাত্ত আহ্বানে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল গোটা জাতি—ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—একাত্তরের সাতই মার্চের এই আবেগময়, বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর কি জাতি কখনো ভুলে যেতে পারবে!

কিন্তু আবেগ দিয়ে রাজনীতি করা গেলেও দেশ চালানো যায় না। দেশ শাসনের জন্য প্রয়োজন যুক্তি, বিচারবুদ্ধি ও প্রজ্ঞা—যার প্রয়োগ শেখ মুজিব তাঁর পাঁচ বছরের শাসনামলে দেখাতে পেরেছিলেন, এমনটি ইতিহাস সমর্থন করে না। বরং ইতিহাস তাঁকে একজন দুর্বল, সদা-পর-পরামর্শে-চালিত ও প্রায় ব্যর্থ একজন প্রশাসক হিসেবেই চিহ্নিত করবে। তাঁর আশেপাশে সদা-বিরাজমান সুবিধাবাদী, তস্কর, লুটেরা কিংবা কুচক্রীদের তিনি চিনতে পারেননি, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেননি—এ ব্যর্থতা একান্তই তাঁর। অন্যের কানকথা কিংবা দুষ্ট পরামর্শে প্রণোদিত হয়ে তাজউদ্দিনের মত ত্যাগী মানুষদের দূরে ঠেলে দেয়ার দায়ও তাঁরই। জাতীয় রক্ষী বাহিনী নামে একটি নৃশংস ‘গেস্টাপো’ বাহিনী সৃষ্টি ও তাদের অপরিসীম অত্যাচারের কথাও খুব সহজে আমরা বিস্মৃত হতে পারব কি? আর রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অর্থনীতি যখন প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম, তখন একদলীয়, স্বৈরতান্ত্রিক বাকশালী শাসনব্যবস্থা চালু করা আর যা-ই হোক কোন বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় বহন করে না। বিশ্বের ইতিহাসে জাতির জনকের এরকম স্ববিরোধী, বিপরীতমুখী কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়টি নেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাই ‘দেবতা’ থেকে প্রায় ‘দানবে’ পরিণত হওয়া একজন মানুষের নাম।

এদেশে যারা আওয়ামী লীগ করে, তাদের কাছে শেখ মুজিব সর্বক্ষেত্রেই দেবতুল্য, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি—তাঁর কোন ভুলই কখনো তাদের চোখে ধরা পড়েনা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে শেখ মুজিব মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। তারা আরো বলেন, বাকশাল ছিল একটি সাময়িক ব্যবস্থা—সময় পেলে তিনি ঠিকই দেশকে ‘সোনার বাংলা’ বানিয়ে ফেলতেন এবং আবার গণতন্ত্রে ফিরে যেতেন। তিনি আরো সময় পেলে কী কী করতেন, তা নিয়ে অনেক আলোচনা, অনেক অনুমান করা হয়েছে, হচ্ছে এবং হতে থাকবে। কিন্তু তার মধ্যে কোন্‌টা সত্যি হত এবং তিনি সফল হতেন নাকি আরো ব্যর্থ হতেন—তা নিশ্চিত করে আজ কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। তিনি আবার ‘দেবতা’ হতেন নাকি ‘প্রায় দানব’ থেকে ‘পুরো দানব’ হয়ে যেতেন—তা কে জানে! তবে নিজেকে দেশের আজীবন রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা আর যা-ই হোক বাকশালের সাময়িকতা কিংবা শেখ মুজিবের আবার ‘দেবতা’ হওয়ার পক্ষে যায় না।

আর সাড়ে তিন বছর কি খুব কম সময়? তাছাড়া ‘মর্নিং শো’জ দ্য ডে‘—শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে কি এই চিরন্তন সত্যটি একদম উড়িয়ে দেয়া যায়?

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী শেখ মুজিব আর স্বাধীনতা-পরবর্তী শেখ মুজিবের মধ্যে ফারাক তাই প্রায় আকাশ-পাতাল। তবে তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং পঁচাত্তরে খুনী ডালিম-ফারুক-রশীদরা শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে জাতির সাথে প্রকারান্তরে বিশ্বাসঘাতকতাই করেছে। কারণ তিনি জাতির জনক হয়েও দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা আজীবনের জন্য পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে যেসব জনবিরোধী, অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, এ কারণে দেশের জনগণ হয়ত এমনিতেই পরবর্তী দু’এক বছরের মধ্যে তাঁকে ক্ষমতা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামাত। নিজের কর্মফলের কারণেই তিনি হয়ত ‘জাতির জনক‘ থেকে ‘জাতির ঘাতকে‘ পরিণত হতেন এবং সেটাই হতো ইতিহাসের স্বাভাবিক, অমোঘ, অলঙ্ঘনীয় পরিণতি। কারণ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা—বিশ্ব-ইতিহাসে এমন নজির নেই। কিন্তু ঘাতক ডালিম-ফারুক-রশিদরা ইতিহাসকে এবং জাতিকে সে সুযোগ দেয়নি। তাদের অপরাধ তাই অমার্জনীয়।