ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা–

–বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ কোটি মানুষের মুখের ভাষা।
–সর্বাধিক মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে বিশ্বে যার স্থান ষষ্ঠ।
–বিশ্বের দুটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ ও সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রভাষা।
–প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে যার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা।
–বিশ্বের একমাত্র ভাষা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় যার সম্মানে।
–বিশ্বের কয়েক হাজার ভাষার ভিড়ে মাত্র ২৫টি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভাষার অন্যতম।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে চীনা (ম্যান্ডারিন), স্পেনীয়, ইংরেজি, হিন্দি/উর্দু ও আরবির পরেই বাংলার স্থান। ১৬ কোটি বাঙালির মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা, দক্ষিণ আসাম, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বেশির ভাগ মানুষের মুখের ভাষাও বাংলা। নিচের মানচিত্রে লাল রংয়ে চিহ্নিত বাংলাভাষীদের নিজস্ব অঞ্চলটি দেখুন:

তবে বাংলা এখন শুধু বাংলাদেশের বা ভারতের কয়েকটি রাজ্যের মানুষের মুখের ভাষাই নয়, বরং বাংলাভাষীরা ছড়িয়ে গেছে সারা বিশ্বে। বিশ্বের যেসব দেশ বা অঞ্চলে বাঙালি সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছড়িয়ে আছে, তা দেখুন পরের মানচিত্রে:

বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জার্মানি, গণচীন, জাপান, ফিলিপাইন, ইরান, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেতার ও টেলিভিশনে প্রতিদিন বাংলাভাষার অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হচ্ছে। দেশে দেশে প্রকাশিত বাংলা সংবাদপত্রের সংখ্যাও কম নয়। আন্তর্জালে বাংলাভাষী সাইটের সংখ্যা এবং বাংলার ব্যবহারও এখন উল্লেখযোগ্য। আমাদের ভাষা-শহীদদের স্মরণে অনেক দেশেই শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে। বাংলাকে তাই আঞ্চলিক ভাষা বলে আর খাটো করার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পৃথিবীর আরেক প্রান্তে, প্রায় অজানা-অচেনা, কূটনৈতিক সম্পর্কহীন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ, সিয়েরা লিওন ২০০২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাকে তাদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। এই বিরল সম্মানটি বিশ্বে বাংলাভাষার একার!

আমরা অনেকেই হয়ত জানি না, বাংলাভাষার জন্য কেবল বাংলাদেশের মানুষই রক্ত দেয় নি–এই ভাষার দাবিতে ভারতের দক্ষিণ আসামের শিলচর শহরের ১১ জন বাঙালিও ১৯৬১ সালের ১৯ মে তারিখে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল। আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালিরা এই দিনটি ভাষা-শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে। তাই প্রাণের বিনিময়ে মর্যাদা অর্জনের বিরল গৌরবের অধিকারীও আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা। আর এজন্যই বাংলা ভাষার সম্মানে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গ-সংস্থা ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলিতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। এটি আমাদের খুব বড় একটি অর্জন এবং বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিরাট পদক্ষেপ। এবার দেখুন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০১১ উপলক্ষ্যে ইউনেস্কোর পোস্টার:

বর্তমানে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি: ইংরেজি, ফরাসি, স্পেনীয়, রুশ, চীনা ও আরবি। বিশ্বে ফরাসি কিংবা রুশ ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা বাংলাভাষীর সংখ্যার চেয়ে বেশি নয়। তাছাড়া আরবিভাষীর সংখ্যাও বাংলাভাষীর চেয়ে বেশি কিনা–এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। অথচ দেখুন, এই তিনটি ভাষা জাতিসংঘে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাকে তাই জাতিসংঘের সপ্তম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্তির দাবি তোলার সময় এসেছে।

এবার আসুন দেখে নিই, বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ পর্যন্ত কতটুকু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে:

৬ এপ্রিল ২০০৯: বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার আহবান জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহিত হয়। জাসদের সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদল সংসদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলাকে জাতিসঙ্ঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য আহবান জানান এবং এর সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।

২১ ডিসেম্বর ২০০৯: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য বাংলাদেশের দাবিকে সমর্থন করে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপনের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করে।

১১ জুন ২০১০: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিধানসভা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য জাতিসংঘকে আহবান জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১০: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য আবারও বিশ্বনেতাদের আহবান জানান।

এ ছাড়াও ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে বৃটিশ পার্লামেন্টে বাংলাভাষীদের এই দাবিকে সমর্থন করে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৃটিশ এম পি এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন এবং বৃটিশ সরকারকে এ ব্যাপারে জাতিসংঘে উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবি জানিয়েছেন।

এবার দেখি এই ব্যাপারে আমরা কী কী করতে পারি:

১। আমাদের দাবিটি আমরা ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারি।

২। আন্তর্জালের বিভিন্ন বাংলা ব্লগ ও ফোরামে জনমত গড়ে তুলতে পারি।

৩। দেশে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাভাষী খ্যাতনামা লেখক/বুদ্ধিজীবীদের এ বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লেখালেখি/বক্তব্য উপস্থাপনের আবেদন করতে পারি।

৪। দেশের ও দেশের বাইরের বাংলাভাষীদের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সভা, সেমিনার, মানব-বন্ধন, রোড-শো, স্মারকলিপি প্রদান, ইত্যাদি আয়োজন করতে পারি। এ কাজে বিশেষ করে প্রবাসী ব্লগারগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

৫। যে কোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে লবিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এ কাজের জন্য খ্যাতনামা লবিস্ট নিয়োগ করার জন্য দাবি জানাতে পারি।

৬। যেহেতু এ কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটিই সরকারের, সেহেতু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি জানাতে পারি।

বাংলাকে করো জাতিসংঘের ভাষা”–বিশ্ব-দরবারে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি বাঙালির কণ্ঠে উচ্চারিত হোক আমাদের এই প্রাণের দাবি।

————————————————————————————————
ফিচার ছবিঃ ব্লগার বিদ্যাসাগর এর ছবি এ্যালবাম থেকে সংগৃহিত