ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

গতকাল ছিলো ১০ জুলাই। কোন বিখ্যাত দিন কি? আমরা অনেকেই জানি না। ১৯২৫ সালের এই দিনে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর ডেটনে একটি মামলার শুনানি শুরু হয়, যেটিকে পরবর্তীতে “শতাব্দীর অন্যতম সেরা মামলা” হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটিই আমেরিকার প্রথম মামলা, যেটা সরাসরি রেডিওতে সম্প্রচার করা হয়। মামলাটির একটি পোশাকি নাম আছে “টেনেসি অঙ্গরাজ্য বনাম জন থমাস স্কোপস”, যদিও “স্কোপস বানর শুনানি” নামেই এটি বেশি পরিচিত।

কেন বিখ্যাত এই মামলাটি? আমিই বা কেনো হঠাৎ করে ভিনদেশী এই মামলাটি নিয়ে উঠে পড়ে লাগলাম, যতই গতকালকের দিনে এই মামলার শুনানি শুরু হোক!

(১)

১৮৫৮ সালের ১লা জুলাই প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তাঁর ছেলেকে কবর দেন। ঐদিনই তিনি বিবর্তনবাদ থিওরিটির ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে ১৮৫৯ সালে “The origin of species” প্রকাশিত হয়। ডারউইন এর ভূমিকাতে লিখেছিলেন, “the view which most naturalists entertain, and which I formerly entertained — namely, that each species has been independently created — is erroneous.”


চার্লস ডারউইন

১৮৭১ সালে ডারউইন তাঁর দ্বিতীয় বই “The Descent of Man” প্রকাশ করেন। এই বইতে মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে সরাসরি বিতর্ক করেন। তিনি বলেন, “man is descended from a hairy, tailed quadruped, probably arboreal in its habits, and an inhabitant of the Old World.”

১৯১৪ সালে জর্জ উইলিয়াম হান্টার “A civic biology” নামে একটি বই লিখেন, যা পরবর্তীতে, বিশেষ করে ১৯২৫ সালের দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের স্কুলগুলোতে বায়োলজির পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়। বিবর্তনবাদের চ্যাপ্টারে হান্টার তাঁর “A civic biology”- বইতে লিখেন, “”the belief that simple forms of life on the earth slowly and gradually gave rise to those more complex and that thus ultimately the most complex forms came into existence.”

(২)

উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান, সাবেক কংগ্রেস সদস্য এবং প্রাক্তন সেক্রেটারি অফ স্টেট। তিনি ডেমোক্রেট পার্টি থেকে তিনবার প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী ছিলেন। ১৯২১ সালের দিকে বিবর্তনবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে তিনি এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান। ব্রায়ান তাঁর বক্তৃতাগুলোতে, বিশেষ করে “ডারউইনবাদের ভয়াবহতা” (The menace of Darwinism) এবং “বাইবেল এবং এর শত্রু” (The Bibles and its Enemies) শিরোনামে দুইটি ভাষণে বলেন, “It is better to trust in the Rock of Ages, than to know the age of the rocks; it is better for one to know that he is close to the Heavenly Father, than to know how far the stars in the heavens are apart.”

১৯২৪ সালে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান টেনেসির রাজধানী ন্যাশভিলে এক লেকচার প্রদান করেন “Is The Bible True?” নামে। তাঁর এই বক্তৃতা কপি করে টেনেসি আইনসভার সদস্যদের মধ্যে বিলি করা হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন জন ওয়াশিংটন বাটলার।

২১শে জানুয়ারি, ১৯২৫ সালে বাটলারের উদ্যোগেই টেনেসি আইনসভায় এক প্রস্তাব আনা হয়, যেখানে নিম্নোক্ত ধরণের শিক্ষা প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়, “any theory that denies the story of the Divine Creation of man as taught in the Bible, and to teach instead that man has descended from a lower order of animals.” এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতেই সর্বপ্রথম আইন করে ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়।

(৩)

ফ্রেড রবিনসন’স ড্রাগস্টোর ষড়যন্ত্রঃ

টেনেসির ছোট্ট শহর ডেটনের একটি ফার্মেসী, নাম Fred Robinson’s Drugstore. জর্জ র্যা প্পালইয়া নামে ৩১ বছর বয়সের এক ব্যবসায়ী ১৯২৫ সালের ৫ই মে সন্ধ্যায় শহরের গণ্য মান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সেই ফার্মেসীতে একটি গোপন সভা ডাকলেন। তিনি সেখানে একটি পত্রিকা নিয়ে আসেন, যে পত্রিকায় একটি ঘোষণা ছিলো যে, কোনো ব্যক্তি যদি টেনেসির বাটলার আইনের বিরুদ্ধে লড়তে চান, তাহলে American Civil Liberties Union (ACLU) তাকে সাহায্য করবে। র্যা প্পালইয়া, যিনি কিনা আধুনিকসম্পন্ন ব্যক্তি, শহরের গন্যমান্য ব্যক্তিদের বোঝালেন এই ধরনের একটি বিতর্কিত মামলা যদি এই শহরে হয়, তাহলে ডেটনের নাম সারা আমেরিকায় ছড়িয়ে যাবে এবং মাত্র ১৮০০ জন অধিবাসীর শহর ডেটনের অর্থনৈতিক অবস্থারও অনেক উন্নতি হবে। ডেটন হাইস্কুলের সুপারিন্টেনডেন্ট ওয়াল্টার হোয়াইটও র্যা প্পালইয়ার সাথে একমত হলেন, এবং তিনি তাঁর স্কুলের ফুটবল কোচ ও পার্ট টাইম বায়োলজি শিক্ষক জন থমাস স্কোপকে সেই মিটিং-এ ডাকলেন।


জন থমাস স্কোপস

২৪ বছর বয়সী জন থমাস স্কোপস সেই সভাতে উপস্থিত হলেন। পরবর্তীতে স্কোপস এই সভার বিস্তারিত বর্ননা দেন।
র্যা প্পালইয়াঃ জন, আমরা বিতর্ক করছিলাম, এবং আমি বলছিলাম যে, কোনো ব্যক্তিই বিবর্তনবাদ না পড়িয়ে বায়োলজি পড়াতে পারবে না।
জন থমাস স্কোপসঃ ঠিক বলেছেন আপনি।
র্যা প্পালইয়া তখন রাজ্য অনুমোদিত বায়োলজির পাঠ্যবই A Civic Biology বইটি হাতে নিয়ে স্কোপসকে প্রশ্ন করেন, “তুমি কি এই বই থেকে বায়োলজি পড়িয়েছ?”
স্কোপসঃ বায়োলজির নিয়মিত শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় আমি একদিন ক্লাস নিয়েছিলাম, সেদিন আমি বিবর্তনবাদ পড়িয়েছিলাম।
র্যা প্পালইয়াঃ তাহলে তো তুমি রাজ্যের আইন ভঙ্গ করেছ! এখন তুমি কি এই অদ্ভুত আইনের বিরুদ্ধে লড়বে?
স্কোপসঃ তোমরা যদি কোর্টে প্রমাণ করতে পারো, আমি ক্লাসে A civic biology থেকে বিবর্তনবাদ পড়িয়েছি, তাহলে আমি মামলা লড়তে রাজি।
সঙ্গে সঙ্গে হাইস্কুলের সুপারিন্টেনডেন্ট ওয়াল্টার হোয়াইট বললেন, প্রত্যক্ষদর্শী জোগাড় করা কোনো সমস্যা হবে না।

৭ই মে, ১৯২৫ সালে জন থমাস স্কোপসকে হাইস্কুলের জীব বিজ্ঞানের ক্লাসে বিবর্তনবাদ পড়ানোর দায়ে পুলিশ গ্রেফতার করে।
এভাবেই শুরু হলো আমেরিকার ছোট্ট এক শহরে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলা।

(এখানে একটি মজার ব্যাপার আছে। বাটলার আইনটি করা হয়, যাতে বিবর্তনবাদ পড়ে তরুন সমাজ ইশ্বরে অবিশ্বাসী না হয়ে যায়। কিন্তু মামলাটি করা হয় Freedom of Religion এবং Freedom of Teaching- এর জন্য, অর্থাৎ বিবর্তনবাদ পড়ালেই আইন ভঙ্গ হবে, যে পড়াবে সে দোষী সাব্যস্ত হবে- এই অযৌক্তিক আইনটিকে সংবিধান বিরোধী ঘোষণা করার জন্য।)

(৪)

১২ই মে, ১৯২৫ সালে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান এই মামলার প্রসেকিউশনের পক্ষে লড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। অন্যদিকে প্রসেকিউশন পক্ষে ব্রায়ানের দায়িত্ব নেবার কথা শুনে প্রায় সত্তর বয়স্ক বিখ্যাত এটর্নী ক্লারেন্স ডারো, যিনি ১৮৯৬ সালের ডেমোক্রেট পার্টির প্রাইমারীতে ব্রায়ানের বিপক্ষে লড়েছিলেন, স্কোপসের পক্ষে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। ফলশ্রুতিতে র্যা প্পালইয়াসহ ডেটনের গন্য মান্য ব্যক্তিরা যা চেয়েছিলো, তাই হলো। দুই পক্ষে দুই মহারথীর উপস্থিতিতে পুরো আমেরিকাতে এই মামলার সাড়া পড়ে যায়। ছোট্ট ডেটন শহরে শুরু হয় সাজ সাজ রব। ডেটনের বড় রাস্তার ৬ টা ব্লক জুড়ে পথচারীদের জন্য দোকান তৈরী করা হয়, স্থাপিত করা হয় টুরিস্ট ক্যাম্প। WGN Radio দৈনিক ১০০০ ডলার খরচ করে মামলার শুনানি সরাসরি সম্প্রচারের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে- এর আগে যা কখনো হয় নি।

অবশেষে জুলাই মাসের ১০ তারিখে, অর্থাৎ আজকের দিনে এই সাড়া জাগানো মামলার শুনানি শুরু হয়।

(৫)

এই মামলার বিচারক ছিলেন জন টি রাউলস্টন। তিনি ছিলেন একজন রক্ষনশীল খৃষ্টান। খুব দ্রুত ১২ জন জুরী নির্বাচন করা হয়, যাদের মধ্যে দশ জনই ছিলেন কৃষক বা ১১ জনই নিয়মিতভাবে চার্চে যেতেন।

১৩ই জুলাই ক্লারেন্স ডারো বাটলার আইনলে অসাংবিধানিক প্রমাণ করার জন্য তাঁর বক্তৃতা শুরু করেন। তিনি বলেন, এই আইন Ferrdom of Religion বিরোধী। তিনি আরো বলেন, “we find today as brazen and as bold an attempt to destroy learning as was ever made in the Middle Ages.” প্রসেকিউশনের পক্ষ থেকে স্কুলের সুপারিন্টেনডেন্ট ও সাতজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা সাক্ষ্য দেয় যে, জন থমাস স্কোপ ক্লাসে বিবর্তনবাদ পড়িয়েছেন। ডিফেন্সের পক্ষ থেকে প্রাণীবিজ্ঞানী মেইনার্ড মেটক্যাফের সাক্ষ্য নেওয়া হয়, যিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক সমাজে বিবর্তনবাদ সাদরে গ্রহনযোগ্য একটি থিওরি। শুনানিকালে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান দাবি করেন, “if evolution wins, Christianity goes.” প্রতুত্তরে ডারো বলেন, “Scopes isn’t on trial; civilization is on trial.” ডারোর যুক্তি-তর্কে মুগ্ধ হয়ে প্রেস ছিলো ডারোর প্রতি সহানুভুতিশীল।


স্কোপস ট্রায়ালের সময় কোর্টে ব্রায়ান এবং ডারো

কিন্তু ২১শে জুলাই, ১৯২৫ সালে জুরীরা জন থমাস স্কোপসকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং বিচারক রাউলস্টন স্কোপসকে ১০০ ডলার জরিমানা করেন, যে টাকাটা ব্রায়ান (অবাক কান্ড, তাই না?) এবং American Civil Liberties Union (ACLU)- উভয়েই পরিশোধ করতে চেয়েছিলো।


শিম্পাজী জো মেন্ডি, শুনানির সময় ডেটনে উপস্থিত আরো অনেক শিম্পাঞ্জির মধ্যে একটি। সেজন্য এই মামলাকে স্কোপস বানর মামলাও বলা হতো।

(৬)

১৯২৭ সালের ১৫ই জানুয়ারি, মামলার আপিলের রায়ে টেনেসির সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা দেয়, বাটলার আইন সাংবিধানিক, কিন্তু টেকনিক্যালি স্কোপস নির্দোষ। সুপ্রিম কোর্ট এই মামলা আর না চালাতে নির্দেশ দিয়ে বলে, “nothing is to be gained by prolonging the life of this bizarre case.”

এই মামলার ৪৩ বছর পর ১৯৬৮ সালে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের বিবর্তনবাদ পড়ানো নিষিদ্ধ নিয়ে একটি আইন বাতিল করে। এরপরে, ১৯৭৩ সালে টেনেসিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাজ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়, জেনেসিসের সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে সমান গুরুত্বসহকারে অন্যান্য বিবর্তনবাদের থিওরি পড়ানো হবে, যদিও দুই বছর পর ফেডারেল আপীল কোর্ট এই ঘোষণাকে অসাংবিধানিক হিসেবে রায় দেয়।

আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে বিবর্তনবাদ কিভাবে পড়ানো হবে তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। এই মুহূর্তে কমপক্ষে ১৬ টি রাজ্যের আইন প্রণেতারা এটা নিয়ে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করছে। সেই তুলনায় আমরা বাংলাদেশীরা অনেক ভালো আছি। আমরা বরং বায়োলজির পাঠ্যবইয়ে ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিয়ে পড়ি, কিন্তু কোরানে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব জানি না!

(এই পোষ্টটি বিস্তারিত পড়তে চাইলে স্কোপস বানর মামলাঃ বিবর্তনবাদ বনাম ধর্ম (বাইবেল) – এ দেখুন।)