ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 

কিছুক্ষণ চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। তারপর বুঝার চেষ্টা করলাম। গুগল এখন এমন এক সেবা নিয়ে এসেছে যা আগে আমাজন ও অ্যাপেল করলেও তাদের চাইতে যেন ভালবাসা বেশী।

স্ক্যান এন্ড ম্যাচ সার্ভিস সেবা যেটা গুগল মিউজিকের; এখন তার নাম বদলে রাখা হয়েছে গুগল প্লে। আগে গুগল মিউজিকে গান রাখা যেত কিন্তু ম্যাচিং অপশন ছিল না – এখন তা যোগ করা হয়েছে গত মঙ্গলবারে। তার আগে অন্যদের কাহিনী একটু বলি।

অ্যাপেল আইটিউনসের এমনই এক সুবিধা আছে, যেটা আপনার পিসিতে যদি মিউজিক লাইব্রেরী থাকে (আইটিউনস, উইন্যাম্প, বা উইন্ডোজ মিডিয়া প্লেয়ার এর) তা স্ক্যান করে তাদের অর্থাৎ অ্যাপেলের মিউজিক লাইব্রেরী থেকে ম্যাচ করে আপনার কালেকশন গানগুলা দিয়ে একটা ইউজার লাইব্রেরী করে রাখবে, যেখানে আপনার কোন গান আপলোড করার ক্যাচাল নাই, (তাই এমপি৩ না ওয়েভ এর বড় না ছোট ফাইল এটার গ্যাঞ্জাম নাই), যখন তখন গান ডাউনলোড করতে পারবেন, তারা ২৫৬ কেবিপিএস স্ট্রিম মানের গান দেবে, যে কোন জায়গায় বসে মোবাইলে, ল্যাপি বা পিসিতে গান শোনা যাবে। সার্চ অপশন তো আছেই গান খুঁজে বের করার আর খালি আইটিউনস ইনস্টল করবেন । প্রায় ২৫ হাজার গান রাখা যাবে; কিন্তু এটার জন্য ২৪.৯৯ ডলার বছরে গুনতে হবে আপনার পকেট থেকে।

একই কাহিনী আমাজনের, তাদেরও নিজস্ব প্লেয়ার আছে ক্লাউড, এটা ইনস্টল করতে হবে। তারাও একই নিয়ম এবং একই ডলার নেয় কিন্তু সুবিধা হল – প্রথম ২৫০টা গানের জন্য কোন চার্জ নাই আর ২ লাখ ৫০ হাজার গান রাখা যাবে যা আইটিউনসের চেয়ে ১০গুণ বেশী।

কিন্তু গুগল প্লে!!! সম্পুর্ণ ফ্রি! ফ্রি! ফ্রি! কি এবার আপনার কলিজাতে সাউন্ড করল? গুগলে ২০ হাজার গান স্টোর করা যাবে। আরো মজার কাহিনী হল গুগলের স্ট্রিম মান হল ৩২০ কেবিপিএস যা অন্যদের তুলণায় অনেক বেশী মান সম্পন্ন। গুগলের কাজের ধারা হল, তারা আপনার পিসির হার্ড ড্রাইভটা বা ডিভাইসের মেমোরী কার্ডটা পুরো স্ক্যান করে দেখবে তাতে গান আছে কিনা (আসলে আমার যা মনে হয়, এমপি থ্রী, ওয়েভ বা এই জাতীয় মিউজিক ফাইল খুঁজবে), তারপর গুগলের মিউজিক লাইব্রেরীর সাথে ম্যাচ করে দেখবে তাদের কি আছে কি নাই আর আপনার কি আছে কি নাই। এবার তাদের থাকলে তা দিয়ে তৈরী করে দেবে মিউজিক লাইব্রেরী কিন্তু না থাকলে তাহলে তারা আপনার পিসি থেকে আপলোড করতে চাইবে (ইচ্ছা-অনিচ্ছা অপশন থাকবে হয়ত)। তাহলে আপনার নিজস্ব কম্পোজটাও গুগলের সম্পত্তি হয়ে যেতেও পারে। নতুন এলবাম কেনার সুযোগও থাকছে আমাজন ও আইটিউনসের মত। এই আপলোড করার বাড়তি সুবিধাটা আইটিউনসের ও আমাজনের নাই। তাদের লাইব্রেরীর সাথে ম্যাচ না করলে তারা ওটা আপলোড করার সুবিধা দেয় না।

এবার প্রশ্ন হল, যেখানে আইটিউনস ও আমাজন ডলার নেয় সেখানে গুগলের কোন টাকা-পয়সার দরকার না হবার কারণ কি? গুগল কি তাহলে এতই উদার? আসলে তা না – গুগলও ডলার নেবে এবং তা ২৪.৯৯ ডলার বাৎসরিক করে; তবে বছর শেষে গুগল – যারা মিউজিক বানায় বা যারা প্রোডাকশন কোম্পানি – তাদের নামে চেক কেটে তাদের বাসার দরজায় উপস্থিত হবে। কিন্তু যদি ইউজারের এমনি গান যা আর কারো কাছে নাই- এমনকি গুগলের কাছেও না, তাহলে তা আপলোড করে ইউজার লকার নামে স্টোর করে রেখে দেবে। মানে ওটা থেকে আয় হবে না, কিন্তু ইউজারের সুবিধায় করা আর কি।

মার্কেট রিসার্চ গ্রুপ এনপিডি একটা জরীপ চালিয়ে দেখেছে, যে অন লাইন মিউজিক বিক্রির ক্ষেত্রে অ্যাপেল আইটিউনস ৬৪%। আমাজন ১৬%, গুগল এসে ৫% আর অন্যান্য কোম্পানি সব মিলিয়ে বাকী ১৫%। কিন্তু গুগল এসেই কোন কম দামে ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ব্রুনো মারস এর ‘লকড আউট অফ হ্যাভেন’ গানটির এলবাম তারা আইটিউনসের মত ১০.৪৯ ডলার রেখেছে, যেখানে আমাজন রাখে ১০.৯৯ ডলার।

এত সুবিধা দেখে এক্ষুণী ব্যবহার করতে ইচ্ছে হচ্ছে তাই না? তবে আমাদের দেশকে সবুর করতে হবে। কারণ এটা আপাতত আমেরিকার জন্য এবং ইউরোপেও হয়ত চালু হয়েছে।

কিন্তু এটা চালু হতে না হতে অনেকেই অনেক কথা বলা শুরু করেছেন। গুগল আরেক কোম্পানির আইডিয়া চুরি মারে – এই রকম কথা অনেকেই বলে ফেলেছে। তবে অনেকেই এটা আপত্তিকর ও রিস্কি মনে করছে গুগলের হার্ড ডিস্ক স্ক্যান করা, যেটা অন্যরা মিউজিক প্লেয়ারের মিউজিক লাইব্রেরীকে ফলো করে। আর মিউজিক যারা বানান বা যারা এলবাম ব্যবসা করেন তারাও বা কতদিন আরেক জনের জন্য খরচ করার ইচ্ছে রাখবেন। বিশেষ করে আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজের যা অবস্থা তাতে কি আমাদের দেশের গানগুলো শোনানোর জন্য কে খরচ করবে?- যেখানে সিডি বিক্রি নিয়ে শিল্পী প্রোডিউসার কোম্পানি হতাশ, স্পনসরের অভাব, ভাল গান নেই, গান থাকলে মিডিয়াতে প্রচার নেই, তার উপর আমাদের যেসব ভাল ভাল গান (আব্দুল হাদী, ফেরদৌসী রহমান প্রমুখ এর বলা যায়) এগুলো যদি ফ্রি তে অন লাইনে চলে আসে তাহলে কি শিল্পী ও শিল্পী পরিবার রয়ালটি হারায় না?

আমার মনে হয়, গুগলের সাথে যারা চুক্তিবদ্ধ হবে তাদের জন্যই গুগল চেক কেটে বিল ধরাবে, বাংলা গানের প্রচারের জন্য আমরাও আবদার করব, কিন্তু গুগল এর ইউজার লকারে যে গানটি আপলোড হল তা কি সার্চের আওতায় পড়বে না। হয়ত এখন না, কিন্তু যদি আপনার বন্ধু আপনার গানটি অনলাইনে শেয়ার করতে চান আপনি কি দেবেন না? এই দেয়া নেয়ার অপশনটি চালু হলে (বা চালু আছে কিনা জানা নাই) তাহলে আর থাকল কি? দেখা গেল, হয়ত গানটির মালিক আপনি না – অন্য কেউ, অন্য কোন কোম্পানি যে গুগলের সাথে চুক্তি করে নি, তার ইন্টেলেকচুয়্যাল পণ্যটা কি পাইরেটেড হয় না? তাহলে পাইরেসি আইন করে লোক হাসানোর মানে কি?

যাই হোক এই মায়ান ক্যালেন্ডারের অন্তিম লগ্নে একটা সুন্দর খবর হল গুগলের এই সুবিধাটা। হয়ত এমনও দিন আসবে যেদিন কোন প্রোডাকশন কোম্পানির কাছে শিল্পীরা যাবে না সিডি বের করার মত হয়রানির শিকার হতে; ঘরে বসে চমৎকার সুর করে গান বানিয়ে আপলোড করবে, আর যতবার বাজানো হবে আর যতবার ডাউনলোড হবে ততবার রয়ালটির টাকা জমা পড়বে ওই শিল্পীর ব্যাংক একাউন্টে, একটা শিল্পীর বেঁচে থাকা নিশ্চিত হবে। এই পেমেন্টস শিল্পীকে করতে পারে গুগল, আর গুগল অ্যাড বা এডসেন্স এর নামে হাতিয়ে নেবে ইয়ামাহা, নোকিয়া, ওয়ালমার্ট বা আমাদের দেশী কোম্পানি স্কোয়ার, গ্রামীণফোন, ওয়াল্টনের টাকা। তাতে যে শিল্পী তার অবদান স্বীকৃতি পাবে, আর শ্রোতা বিনামুল্যে শুনতেও পারবে (আসলে শ্রোতা বিনামুল্যে শুনে না, তাকেও নেট প্রোভাইডার কে পে করতে হয়; কিন্তু হায়!! ব্লু টুথের উপর কোন ট্যক্স নেই)।

কিন্তু শুধু গুগল কেন? এগিয়ে আসতে পারে ইয়াহু, ফেসবুক, অ্যাপেল, অথবা আমাদের দেশী কোন কোম্পানি (জি-সিরিজ, একুশে টিভি, রবি, বিডিনিউজ২৪.কম ইত্যাদি), যার নিজস্ব সাইটে গান আপলোডের জন্য থাকবে এই রকম শিল্পীকে পে করার সুবিধা। গুছিয়ে করতে জানলে আইডিয়াটা মন্দটা। আয় হায়!! বিনামুল্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইডিয়া দিয়া দিলাম, কেউ কাজে লাগাইলে তো আমারে মনেও রাখবে না।

তথ্যঃ এনবিসি, এপি, নিউজ ইয়াহু, প্লে গুগল, ও অ্যাপেল ইনসাইডার।
https://www.facebook.com/pages/wOwi/133782376650198?ref=hl