ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ সমূহে অভিযুক্ত হয়ে যে ৮ জনের বিচার এখন ট্রাইবুনাল ১ ও ২-এ চলছে খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা চাই তাদের বিচার দ্রুত হোক। আমার ধারনা বেশীর ভাগ বাংলাদেশীই মনে করেন এদের নিয়ে আবার এত বিচার টিচার কি? গুলি করে মেরে ফেল্লেই হয়। আবার অনেকেই মনে করেন যে এইখানে আওয়ামী লীগ সরকারের একটা চাল রয়েছে। আওয়ামীলীগ এই বিচারকে ইচ্ছে করে দীর্ঘায়িত করে আমাদের সামনে মূলো ঝুলিয়ে রেখেছে এবং পরেরবারের সংসদ নির্বাচনে এই ইস্যুকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসতে চায়। এই দুইটি বিষয়ে এই টাইপ বক্তব্য যারা দেন তাদের ব্যাপারেই আমার আজকের এই লেখা।

প্রথমত, বিচার টিচার বাদ দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলাটার চিন্তা বাস্তব চিন্তা না এখনকার পরিস্থিতিতে। এটা এক ধরনের রোমান্টিসিজম এবং এইসব আজাইরা কথা এই সময়ে না বলাই ভালো। যেটা সরকার করতে পারবে না সেটা সরকারকে বারবার বলাটা এক ধরনের আহাম্মকি ছাড়া আর কিছু না। এই জামাতীরা আর বি এন পির এক্টিভিস্টরা এই বিচার শুরু করবার অনেক আগে থেকেই পুরো পৃথিবীতে এই বিচার নিয়ে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা সবখানেই জামাতী অর্থ বন্টিত হবার কারনে আন্তর্জাতিক ভাবে এই বিচার এখন সব দিক থেকেই খুবই সুক্ষ্ণভাবে পর্যালোচিত হচ্ছে। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন পত্রিকায় এই বিচারের বিরুদ্ধে লিখছে, বিভিন্ন টিভিতে এই বিচারের বিরুদ্ধে বলছে, বলাচ্ছে, অনেক জ্ঞান পাপীকে দিয়ে বই লিখাচ্ছে, এই আইনের বিরুদ্ধচারন করে আর্টিকেল লিখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বার কাউন্সিলকে অর্থের বিনিময়ে কনভিন্স করছে মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ খরচ করে সুতরাং সরকারের এমন কিছু করবার সুযোগ নেই যেখানে আমাদের এই মানবতাবিরোধী বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরী হয়। সুতরাং ধরে গুলি করে মেরা ফেলা হচ্ছে না কেন? কিসের বিচার এদের এগুলো আমরা যতই ইনফর্মালি বলি না কেন তা বাস্তবতায় সম্ভব না। আজ থেকে ২০ বছর আগে হলেও একটা কথা ছিলো, এইসব হারামজাদাদের ধরে ধরে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেল্লেই ল্যাটা চুকে যেত। যেহেতু এখন তারা আইনের কাঠগড়ায় সুতরাং অনেক কিছু চাইলেও তা আর সম্ভব না।

২য় কথা হচ্ছে বিচারের দীর্ঘসুত্রিতা নিয়ে। বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর এমন একটি দেশ যেই দেশ পৃথিবীর অনেক সভ্য দেশের থেকে অবকাঠামো কিংবা সুযোগ সুবিধার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থেকেও আজ থেকে প্রায় ৩৯ বছর আগে কৃত এইসব আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার করবার জন্য একটি আইন বানায় ১৯৭৩ সালেই। যা অনেক সভ্য দেশ সে সময় চিন্তাও করেনি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হোলো, আইন করা হয়েছে অনেক আগে অথচ এই আইন যাদের বেলায় প্রযোজ্য, মানে যেই মানবতাবিরোধী অপরাধী, যুদ্ধাপরাধী, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধকারী, গণহত্যাকারী তাদের বিচারই আমরা আজ এত বছর করতে পারিনি। অবশ্য সুখের কথা হোলো এখন আমরা এইসব ঘৃন্য ব্যাক্তিদের বিচার শুরু করেছি এবং বিচার চলছে। আপনারা শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন যে, নুরেম্বার্গের মিলিটারী ট্রাইবুনাল বাদে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে এইসকল আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগে ধৃত আটজনের বিরুদ্ধেই তদন্ত হয়েছে, তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দেয়া হয়েছে এবং অধিকাংশের ক্ষেত্রে চার্য গঠন করা হয়েছে খুবই দ্রুত সময়ের মধ্যে। সত্যকার অর্থে বলতে গেলে বলতে হয়,এই পর্যন্ত যতগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার হয়েছে পৃথিবীতে তাদের মধ্যে আমরা আসলে সত্যকার অর্থেই অনেক এগিয়ে রয়েছি সময়কালীন দ্রুততার দিক থেকে, প্রসিজিওরাল দিক থেকে এবং বিচারের মানের দিক থেকে। এবং এই সবগুলো দিক সুন্দরভাবে বজায় রেখে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে সুচারু ভাবেই।

তারপরেও এই বিচার নাকি ইচ্ছে করেই দীর্ঘায়িত করা হয়েছে এবং এই বিচার নাকি পরেরবার নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী মূলো হিসেবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই ব্যাপারে উত্তর দিতে গেলে আসলে আপনাদের কিছু উদাহরন দিয়েই পুরো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করতে হবে। বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থায় আওয়ামীকরন ও বি এন পি করনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় তখন সেই সরকার গন্ডায় গন্ডায় বিচারপতি নিয়োগ দেয় তাদের প্রাক্তন অনুসারীদের মুখ দেখে এই কথা সকলেই জানেন। এবারো আওয়ামীলীগ আমলে এই ব্যাপারটির ব্যাতিক্রম হয়নি তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ব্যাতিক্রম হয়েছে দুইটি যায়গায়। এক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা আর দ্বিতীয়টি এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারের ক্ষেত্রে। অনেকেই ২০০১ সালে হাসিনা সরকার ক্ষমতা ছাড়ার সময় বলেছিলেন, হাসিনা ইচ্ছে করেই বঙ্গবন্ধুর হত্যামামলাকে দীর্ঘায়িত করেছেন এবং পরেরবার নির্বাচনের জন্য মুলো ঝুলিয়ে রেখেছেন। সেই পুরোনো কাসুন্দি ও পুরোনো অভিযোগ। যারা এগুলো বলেন তারা মূলত আইন কানুন না জেনেই বলেন এবং ঢালাও মন্তব্য করতে হবে বলেই চট করে বলে ফেলেন। আসলে তাদের খুব একটা দোষও যে দিব তাও বোধকরি দেয়া যায় না। কেননা, সবাই যখন বিচার বিভাগের নোংরা দলীয়করন দেখে দেখে অভ্যস্থ তখন হঠাৎ করে কয়েকটি সেক্টর বা অংশ সত্বী-সাধ্বী হয়ে গেলে মানুষ সেই সত্বী ব্যাপারকেও নষ্টামী বলেই বিবেচনা করে। মোট কথা মানুষের বিশ্বাসটা আর থাকে না। সে কারনেই যখন বলি বঙ্গবন্ধুর বিচার আর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের নিউট্রালিটির কথা তখন বেশীর ভাগ মানুষই আমাকে আওয়ামীলীগের দালাল ভাবেন, আর যারা আমাকে ব্যাক্তিগত ভাবে চেনেন তারা এক ধরনের কনফিউশনে পড়ে যান এবং পুরো ব্যাপারটি নিয়ে এক ধরনের সন্দেহের মধ্যে ভাসতে থাকেন।

কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই সত্য যে, এই দুইটি বিচারই আসলে অত্যন্ত সচ্ছ ভাবে করতে চেয়েছে আওয়ামীলীগ সরকার। আমরা যারা এই বিচারের প্রতিটি দিকেরই খোঁজ খবর প্রায় প্রতিদিনই খুঁটিয়ে রাখছি এবং বিভিন্ন যায়গা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছি তারা সকলেই জানি যে এই বিচার আসলেই অত্যন্ত পক্ষপাতহীন ভাবেই সম্পাদিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামীলীগ পুরো ব্যাপারটাই ট্রাইবুনালের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন এবং আইনমন্ত্রীও কখনো এই ব্যাপারটিতে প্রভাব খাটান নি বলেই এই পর্যন্ত জানি। এই দুইটি বিচারের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ইতিমধ্যেই হয়েছে আর মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার বর্তমানে চলছে।

কেন এই দুইটি বিচার আওয়ামী লীগ সরকার স্বচ্ছ ভাবে করছে তার কার্যকরন আমি প্রথমে না বুঝলেও পরে এর কারন দুইটি আমার বোধগম্য হয়েছে খুব স্পষ্ট করেই। এর একটি প্রধান কারন হিসেবে বলা যেতে পারে আন্তর্জাতিক অব্জার্ভেশনের কথা। পৃথিবীর অনেক দেশই এই বিচার প্রক্রিয়া এবং বিচারের প্রতিটি দিক লক্ষ্য করছে। সুতরাং এই বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সঠিক হওয়াটা সে কারনেই বাংলাদেশের জন্য জরুরী। আর তাছাড়া সঠিক বিচারের মাধ্যমে এই ঘৃণ্য অপরাধীদের বিচার করতে পারলেই এই অপরাধী ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গ রা কখনোই এই বিচার নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না এবং এইসব ঘৃণ্য অপরাধীরা কখনোই আর মাথাচাড়া দিয়ে বাংলাদেশের বুকে দাঁড়াতে পারবে না।

সংক্ষেপে বলতে গেলে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে বলতে হয়, শেখ হাসিনা কোনোভাবেই চাননি যে তার বাবার হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে এত বছর পরে তাকে কেউ আঙুল উঁচিয়ে বলুক “ বাপের বিচার অবৈধ ভাবে করেছে হাসিনা কিংবা প্রভাব খাটাচ্ছে হাসিনা” এবং এই বিচারের সাথে খুব স্বাভাবিক ভাবেই হাসিনার আবেগ জড়িত ছিলো। ইচ্ছে করলেই এই বিচার হাসিনা সরকার ১৯৯৬ সালেই একটা স্পেশাল ট্রাইবুনাল বানিয়ে ২ থেকে ৬ মাসের মধ্যে করে ফেলতে পারতেন। এইটাই সম্ভবত বেশীরভাগ মানুষের চাওয়া ছিলো। আত্নস্বীকৃত খুনীদের প্রতি সারা বাংলাদেশের মানুষেরই ঘৃণা ছিলো আজন্ম। সুতরাং এই বিচার এক দিন কিংবা ৭ দিনে হচ্ছে এটা সম্ভবত কেউ মনেও রাখত না। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে এই বিচারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন আচরন করলো হাসিনার সরকার। যার প্রমাণ আমরা পাই এই বিচারের সব খুঁটি-নাটি তথ্য গুলো পর্যালোচনা করে। আপ্নারাও এই মামলার খুঁটিনাটি তথ্য গুলো জেনে নিতে পারেন নীচের উক্ত বইটি থেকে।
-

এই বইয়ে পুরো মামলার সব বিবরণ, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, জবানবন্দী, জেরা, পালটা জেরা, বিচারকের রায়, বক্তব্য সব কিছুই উল্লেখিত রয়েছে। আপনারা শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন যে, বঙ্গবন্ধু যে আসলে খুন হয়েছিলো, এটা প্রমাণ করতে আদালতের লেগেছিলো প্রায় ২ বছর। তার উপর আমাদের দেশের সাধারন ফৌজদারি আদালত। বছরের পর বছর লেগে যায় একটি মামলা নিষ্পত্তি করতে। সেখানে আসামী পক্ষ টিভিতে তাদের খুনের কথা স্বীকার করলেও তাদের সরাসরি ফাঁসি দেয়া যায় না। এটাই হচ্ছে আইনের ধারা, তার গতি।

প্রসিজিউরাল/পদ্ধতিগত এইসব ব্যাপারের কারনেই একটি হত্যা মামলা এভাবে বছরের পর বছর চলে যায়। এটা আমাদের ফৌজদারী আদালতের এত বছরের চলে আসা অব্যাবস্থাপনা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে এটি আসলে বিচার দীর্ঘায়িত করবারই আরেকটা প্রক্রিয়া। আইনের এই দীর্ঘায়িত হবার সুযোগ থাকার কারনেই বার বার আসামীরা এই সুযোগ নিচ্ছে এবং বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। তদন্ত, চার্জ শীট, সাক্ষী, পালটা সাক্ষী, জেরা, পালটা জেরা, আসামী পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকমের পিটিশান ইত্যাদি অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আর তার উপরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তো বাংলাদেশে মোটামুটি ২৪/৭ লেগেই আছে। আজকে হরতাল তো কালকে এই ছুটি, হ্যান ছুটি-ত্যান ছুটি, এই কারফিউ, তো এই বিক্ষোভ। সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এই জাঁতাকলে পড়ে এবং হাসিনা ক্ষমতায় থাকার পরেও সম্ভব হয়নি তাদের ১৯৯৬-২০০১ এর শাষনামলে এই বিচার সম্পন্ন করবার।

এবার আসা যাক বর্তমানে শুরু হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক ট্রাইবুনাল ও তার অবস্থান সম্পর্কে। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এলেও বিচার শুরু করতেই সময় লেগে যায় প্রায় ২০১০ সালের ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত। এই বিচার কোথায় হবে, মানে কোন স্থানে হবে এটি নির্ণয় করতেই সরকারের অনেকটা সময় চলে যায়। তারপর এই স্থানের কাঠামোগত উন্নয়ন, সংষ্কার সব কিছুরই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এছাড়াও এই আইন চালু করবার আগে প্রয়োজন পড়ে গেজেট নোটিফিকেশিনের, তারপর অন্যান্য কার্যক্রম। এর মধ্যে পুরো বিচারিক কার্যক্রমের এডমিনিস্ট্রেশন ঠিক ঠাক করা, তদন্ত দল গঠন করা, নিয়োগ দেয়া, প্রসিকিউটর নিয়োগ, বিচারক নিয়োগ, রুলস এন্ড প্রসিউজিওর দাঁড় করানো সব কিছু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কেননা ধর তক্তা মার পেরেক জাতীয় ব্যাপারটা হলে অবস্থা যা দাঁড়াবে তা হচ্ছে বিচার তো ঠিক মতো হবেই না বরং এই ব্যাপারে জনমত ঘাতকদের পক্ষে চলে যাবে। যদিও ঘাতকরা ১৯৭১ সালে খুন-ধর্ষন করবার সময় কোনো মানবতার ধার ধারেনি এবং এখন তারা যেই আন্তর্জাতিক মান, আন্তর্জাতিক মান বলে ঘ্যান ঘ্যান করছে সেটিও তারা এই ঘৃণ্য অপরাধের সময় মনে রাখেনি। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে, গুলি করে মেরেছে, ধর্ষন করে মেরেছে। তখন তাদের মানবতার কথা মনে আসেনি। আর এই ৪১বছর পর এসে আমাদের দেশেরই কিছু সন্তান(!) এদের বিচার যাতে “সুষ্ঠূ” হয় কিংবা “আন্তর্জাতিক” হয় সেই দাবী তুলেছে। হায় স্বদেশ!! হায় আমাদের স্মৃতি শক্তি!!!… কি আর করা। জনগনের জন্যই তো সরকার। আর অপরাধী যত বড় অপরাধই করুক না কেন, সরকার সে ধরনের অপরাধ অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে করতে পারেনা বলেই আজকে মানবতা-টানবতার বুলি আঊড়িয়ে বিচার চাচ্ছে ঘাতকের দল। সুতরাং সরকারও এই বিচার স্বচ্ছ করবার জন্য সব রকমের ব্যাবস্থা গ্রহন করেছে।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই ৪১ বছরে হয়ে যাওয়া এত বড় একটি অপরাধের বিচার সোজা কথা না। যারা অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলো তারা এই দেশের ক্ষমতার মসনদে জাঁকিয়ে বসেছে দল-বল খুলে। তাদের অর্থ-প্রতিপত্তি, শান-শওকত সবই হয়েছে। তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে এবং সবচাইতে বড় কথা ইসলাম ধর্ম নিয়ে ব্যাবসা করাটা বাংলাদেশের মত একটা দেশে তাদের জন্য খুব সোজা হয়েছে এবং বি এন পি’র কাঁধে ভর দিয়ে দুই দুইবার তারা ক্ষমতার সাধ পেয়েছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তারা মন্ত্রীত্বের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে পথ চলেছে। সুতরাং বললেই তাদের গ্রেফতার কিংবা পরের দিনই তাদের বিচার শুরু করে দেয়া যায় না। ভয়াবহ রকমের আন্তর্জাতিক প্রেশার, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের পক্ষে তদবির, আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে এইসব ঘৃন্য রাজাকারদের পক্ষে লেখালিখি, মিডিয়াতে তাদের বক্তব্য প্রচার, এসব সব কিছুই মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। আর তার চাইতে সবচাইতে বড় ভয়ংকর ও ভয়াবহ ব্যাপারটি হচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটা বৃহৎ রাজনৈতিক দল বি এন পি এই মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের খোলা মাঠে, সকলের সামনে সমর্থন দিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত দিচ্ছে। খালেদা জিয়া তো চট্রগ্রামের লালদীঘির ভাষনে বলেই দিয়েছে যে ধৃত অভিযুক্তরা কোনোভাবেই যুদ্ধাপরাধী না। তাদের যাতে ছেড়ে দেয়া হয়।

এর মধ্যে যেই আটজনকে ধরা হয়েছে আগেই বলেছি যে এই আটজনের ব্যাপারে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে, চার্জ গঠনের শুনানীর পরে অধিকাংশের ক্ষেত্রেই চার্জ গঠিত হয়েছে এবং সাক্ষ্য গ্রহন চলছে, আপনারা জেনে থাকবেন যে এরই মধ্যে সাঈদী, সাকার বিচার শুরু হয়ে তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণও চলছে। আর বাকীদের বিচার শুরু হবার তারিখ নির্দিষ্ট হয়েছে। এই জুন মাসের বিভিন্ন তারিখে এবং কারো কারো ক্ষেত্রে জুলাইয়ের বিভিন্ন তারিখে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহন শুরু হবে। লক্ষ্য করুন, যেই আটজনের বিরুদ্ধে বিচার এই মুহূর্তে চলছে তাদের বিচার করার প্রক্রিয়া গুলো কি? আসুন নীচের ছবি দেখে এক নজরে জেনে নেই-

-

এই ধৃত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন কিংবা তদন্তকারী দল সাক্ষী আনতে পারবে কিংবা এই ব্যাপারে একটা লিস্ট করতে পারবে অথবা সাক্ষী সাজেস্ট করতে পারবে। এটা হতে পারে সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে। এই সাক্ষীর সংখ্যা যদি প্রতি অভিযুক্তের ক্ষেত্রে ৫০ জন করেও হয় তাহলে প্রসিকিউশনের আনীত মোট সাক্ষী দাঁড়াচ্ছে কয়জন? ৮ গুনন ৫০= ৪০০ জন। এখন এই চারশ জন সাক্ষীকে জেরা করবে আসামী পক্ষের আইনজীবি (প্রসিকিউশনের আনীত সাক্ষীকে যখন ডিফেন্সের আইনজীবি জেরা করে কিংবা ডিফেন্সের আনীত সাক্ষীকে যখন প্রসিকিউশনের আইনজীবিরা জেরা করে তখন এই জেরা করন প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্রস এক্সামিনেশন), প্রতি সাক্ষীর ক্ষেত্রে যদি একদিন করেও সময় যায় জেরার কারনে তবে সময় লাগে ৪০০ দিন। এখন এই সময় কম বা বেশীও লাগতে পারে। আমি একটা আনুমানিক হিসাব দিয়েছি। যদিও বিচার আলাদা আলাদা নির্ধারিত দিনে ট্রাইবুনাল-১ ও ট্রাইবুনাল -২ এ সিমুল্টিউনিয়াসলি চলছে।

এদিকে ডিফেন্স গোলাম আজমের পক্ষে ২৯৩৯ জন সাক্ষীর একটি লিস্ট দিয়েছে এবং একই সাথে ১০টি সিডি, ছয় হাজার পৃষ্ঠার ১২ খণ্ডের নথিপত্র জমা দিয়েছে। সাক্ষীর তালিকায় ন্যাটোর সাবেক কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল জ্যাক ডেভারেল, আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদের প্রফেসর উইলিয়াম এ সাবাজের নামও রয়েছে। এর আগে সাকার আইনজীবি সাকার পক্ষে প্রায় ১১০০ জন সাক্ষীর একটি লিস্ট দিয়েছিলো। পুরো ব্যাপারটি অবজার্ভেশন করে যা বুঝা যাচ্ছে তা হোলো ICTA-1973 এর সুযোগ নিয়ে এবং বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থার সুযোগ নিয়ে আসামী পক্ষ খুবই সুক্ষ্ণ ভাবে চাল চালছে। এর আগেও সাকা যে সাক্ষীর লিস্ট দিয়েছিলো তাদের মধ্যে অনেক সাক্ষীই প্রকাশ্যে বলেছিলো যে তারা এই ব্যাপারে কিছুই জানেনা। গোলামের ব্যাপারেও কি হবে তা ভবিষ্যত-ই বলে দিবে। কিন্তু আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এই ট্রাইবুনালকে টেনে যতদূর লম্বা করা যায়, এটাই ডিফেন্স আইনজীবিদের মূল উদ্দেশ্য।

সরকার এই বিচার ব্যাবস্থায় উদাসীন, কিংবা চাইলেই কালকেই রায় দিয়ে দিতে পারেন, ঝুলিয়ে দিতে পারেন, রাজনৈতিক ভাবে পরবর্তীতে সফল হবার জন্য সরকার মানুষের সামনে মুলো ঝুলিয়ে রাখছেন, এই জাতীয় অভিযোগ যারা এতদিন ধরে করছেন তাদের বিনীত ভাবে ডিফেন্সের এই নতুন চালের দিকে নজর দিতে বলি। গোলামের পক্ষে ২৯৩৯, সাকার পক্ষে ১১০০, সাঈদীর পক্ষে প্রায় ২০০ এর উপর সাক্ষী, নিজামী, মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, আব্দুল আলীমের পক্ষে ধরেন গড়ে ১০০ জন করে সাক্ষী থাকলেও বাস্তবিক ভাবে আপ্নারাই হিসাব করেন কত সময় লাগে বিচার হতে? আগের হিসাবের মত করে এখানেও একটা আনুমানিক হিসাব করে ফেলুন। এই সাক্ষীদের আবার জেরা করবে প্রসিকিউশনের আইনজীবিরা। আবার প্রতি সাক্ষীকে কিছু সময়ের জন্য হলেও এক্সামিনেশন ইন চীফ করবে তাদের নিজ নিজ আইনজীবি। এখানেও সময় ব্যয় হবে। এর উপর আছে আসামীদের বিভিন্ন রকমের পিটিশান যেমন আজকে নিজামীর বাসা থেকে খাওয়া আনার পিটিশান তো কালকে গোলামের ঘর থেকে চাকর আনার পিটিশান, আজকে সাঈদীর জামিনের আবেদন তো কালকে কাদের মোল্লার লুঙ্গি আনার পিটিশান। এইসব পিটিশানের আবার ফর্মাল শুনানী হয়। সেখানে দুই পক্ষের যুক্তি তর্ক শোনা হয়। সেখানেও সময় লাগে।

এত হিসাবের পর আপনাদের মাথায় ঢুকে যেতে পারে এমন যে, ওরে বাবা!!! তাহলে বিচার হতে কয় বছর লাগবে? এইভাবে হতাশ না হয়ে আসেন নিজেরাই একটু ক্যালকুলেশন করে নেই। এইটা মনে রাখবেন যে, সবার বিচারই আলাদা আলাদা নির্ধারিত সময়ে হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন না যে, নিজামীর বিচার শেষ হলে কাদের মোল্লা বা মুজাহিদের বিচার শুরু হবে। সাঈদীর টা শেষ হলে সাকারটা শুরু হবে। আমাদের দুইটা ট্রাইবুনালে (ট্রাইবুনাল-১ ও ২) বিভিন্ন তারিখে, ভিন্ন সময়ে বিচার চলছে। অধৈর্য্য হবার আগে দয়া করা বাস্তববাদী হোন। ফেসবুকে কিংবা পত্রিকার পাতায় সরকারকে কিংবা ট্রাইবুনালকে পিন্ডি চটকানো খুব সোজা। কিন্তু বাস্তব সেই প্রিজাম্পশন থেকে অনেক আলাদা। এদের এই সুক্ষ্ণ চাল আপনারা অনেকেই চোখে দেখেন না। ব্যাপারটা অত্যন্ত দুঃখের ও কষ্টের। যেসব হাজার হাজার সাক্ষীদের নাম ডিফেন্স লইয়াররা জোরে-শোরে প্রকাশ করছেন এবং বলছেন, আমাদের উচিৎ সেদিকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আমাদের ট্রাইবুনাল এই ব্যাপারে খুব ভালো করেই ওয়াকিবহাল। বিচারকে বাঁধাগ্রস্থ করবার সামান্য চেষ্টাও যাতে বরদাশত করা না হয়, বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার এইটাই প্রত্যাশা ও অনুরোধ।

আমি খুব ভালো করে জানি সবার মনে একটাই আতংক যে, বি এন পি-জামাত ক্ষমতায় আসলে এই চলমান বিচার বন্ধ হয়ে যেতে পারে যদি না আওয়ামীলীগ আমলেই এই বিচার শেষ না হয়। যারা এই জাতীয় কথা ভাবছেন তারা কি এটা ভেবে দেখেছেন যে এক সরকারের আমলেই এই বিচার শেষ করতে হবে এমন মাথার দিব্যি না দিয়ে, কোনো সরকারই যেন এই বিচার বন্ধ না করে এবং এই বিচার চালিয়ে যায় এই ব্যাপারে আমরা প্রতিরোধ এবং আমাদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলি। আর যদি এই বিচার বন্ধ হবার সম্ভাবনা কোনো দলকে কেন্দ্র করে গড়েই ওঠে, তৈরী-ই হয় তবে সেই দলকে আমরা সবাই মিলে বর্জন করব এইটাই বরং আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। এই বিচার প্রক্রিয়া শুধু ট্রাইবুনাল চালাবে, সরকার মনিটর করবে, ব্যাপারটা তা না। এই বিচার পুরো বাংলাদেশী জনসাধারণের প্রাণের দাবী এবং আমরাও এই বিচারের মধ্য দিয়ে একটি প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকে গেছি। কারন হত্যা করা হয়েছে আমাদের ৩০ লক্ষ স্বজনদের। আমাদেরই মা-বাবা-ভাই-বোনকে। আপনারা সবাই দয়া করে এই ট্রাইবুনালের বিপক্ষে যে কোনো বিরূপ প্রচারণা আপনাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে রুখে দিন এবং মানুষকে সত্য জানতে সাহায্য করুন।