ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

এই প্রবাস জীবনটা এমনিতেই ভয়াবহ রকমের কষ্টের। দেশ থেকে,পরিবার থেকে দূরে থাকা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনহীন এক ভয়াবহ নির্জন অরণ্যের মতন। এগুলো ছাড়াও আছে খুব সুক্ষ্ণ সুক্ষ্ণ বৈষম্য। কখনো ধরা যায়, কখনো যায় না। বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে একবার লন্ডন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলাম সুদীর্ঘ এক পথ পেরিয়ে। মাঝ পথে যাত্রা বিরতি ছিলো দক্ষিন কোরিয়ায়। আমি সেদিন বুঝেছিলাম প্রতিটি ইমিগ্রেশনে এই সবুজ পাসপোর্টটিকে ঠিক কোন নজরে দেখে পৃথিবীর মানুষ। গ্লানি আর লজ্জার গল্প, তাই বিস্তারিত না বলি। এমন অসংখ্য লজ্জার গল্প নিয়ে আমাদের প্রবাসের জীবন। সেসবের মাঝেও আমরা মাথা উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। বলি, “আমাদের দেশটা খুব সুন্দর। পারলে যেও আমাদের দেশে। সেখানের মানুষগুলো তোমাকে অনেক ভালোবাসবে”

দিন শেষের ক্লান্তি নিয়ে যখন ঘরে ফিরে টিভিতে শুনতে পাই বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতু খাতে চুক্তি বাতিল করেছে এবং ঋন দেবেনা বলে ঘোষনা দিয়েছে দূর্নীতির অভিযোগ তুলে, তখন নিজেকে বড় বেশী অসহায় লাগে। আমাদের জন্য তো এটি নতুন কিছু নয়। বঙ্গবন্ধু অনেক আগে বলেছিলেন “মানুষ পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি”, সুতরাং চোর-চোট্টার ব্যাপার নিয়ে আমাদের অনুধাবন অনেক আগের থেকেই। সেটি দিন, মাস, বছর পেরিয়ে এখনতো ক্লাসিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেটি আমি যেমন জানি, তেমনি আমার পূত্র দুইদিন পরেই জানবে কিংবা হয়তো জানে, খালি একবছর বয়স বলে মুখ ফুটে বলতে পারে না। চুরি আর দূর্নীতির পর আমাদের উপর আছে আবার ঋণের বোঝা। আমাদের দেশের জন্মের দিন থেকে আমরা যেই ঋন নেয়া শুরু করেছি আজ পর্যন্ত সেই ঋণ শোধ হয়নি বরং চক্র-বৃদ্ধি হারে তা বেড়েছেই কেবল। বাংলাদেশে একটি শিশু জন্মের সময় ১৬০ ডলারের ঋণের বোঝা নিয়ে জন্মায়। গত ৩০ শে জানুয়ারী ২০১২ তে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন-

“দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ওপর বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৬০ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১২ হাজার টাকা। মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান : ১৯৭২ সাল থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩১ বিলিয়ন ডলারই ঋণ”

(সূত্র)

বিশ্বব্যাংক যেই দূর্নীতির কথা তুলেছে সেটি নিয়ে এখন আর চিন্তিত নই আমি। কেন চিন্তিত নই আমি জানিনা। আমার মাথায় আর বুকে একটা হতাশাই বরং দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এখন। এত বড় একটা উন্নয়ন কাজ আমরা হারাতে বসেছি। দেশের যোগাযোগ ক্ষেত্রে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতো এই সেতুটি তৈরী হলে। কি এক অদ্ভুত কারনে কারো বিরুদ্ধেই আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমাদের জানা আছে, নিজের মায়ের গলায় আমাদের অনেক সন্তানেরা ছুরি ধরতে জানে, আবার তার চাইতেও বেশী সন্তানেরা জানে কি করে এই দেশকে কিংবা আমাদের মা’কে কি করে রক্ষা করতে হয়। সুতরাং হতাশার থেকে হয়ত আনন্দের মাধ্যমটাই বেশী, সে কারনেই হতাশ হলেও তা শুধু দীর্ঘশ্বাসের উপর দিয়েই যায়। খুব একটা দমাতে পারেনা আমাদের। প্রতিটা দেশেই তো আততায়ী থাকে। ধরে নিচ্ছি বিশ্বব্যাংকের তোলা দূর্নীতির অভিযোগের সেই সন্তানেরাই সেই আততায়ী, মায়ের নষ্ট হয়ে যাওয়া সন্তান।

পদ্মা সেতুটি হবেনা দেখে হয়ত বিরোধী দল বা সরকারকে পছন্দ করেন না এমন মানুষেরা আনন্দিত হয়েছেন। এটি আমার ব্যাক্তিগত ধারনা। আবার এমনও হতে পারে যে তারা প্রচন্ড কষ্ট পেয়েই সরকারের পিন্ডি চটকাচ্ছেন। সরকারের দোষ দেখিয়ে দিচ্ছেন পত্রিকায়, টিভিতে, কাগজে, কলমে, সভায়। দোষ চাপাক কিংবা না চাপাক, শেষ পর্যন্ত ক্ষতি যা হবার তা বাংলাদেশেরই হয়েছে এটা বলাটাই বাহুল্য। পদ্মা সেতু খাতে সরকার হিসেব করেছে যে এতে ২০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকার মত খরচ হবে যার মধ্যে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইডিবি চারটি সংস্থা প্রায় ১৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা দিবে। বাকি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যায়িত হবে বলেই পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সব ভেস্তে গেছে বলা চলে। ইতিমধ্যেই আপনারা যেনে থাকবেন যে সরকার এখন তার রাজনৈতিক ইগো কিংবা বিরোধী দলের মুখ বন্ধ করবার জন্য হন্যে হয়ে ঋণ দাতা খুঁজে যাচ্ছে।

দূর্নীতি হয়েছে কি হয়নি এটার থেকে সবচাইতে বেশী গায়ে লেগেছে বিশ্বব্যাংকের এমন আচরণে। কেন জানি নিজেকে খুব ছোট লাগে এসব শুনলে। সৌদি কিংবা মিডল ইস্টার্ন দেশে থাকেন এমন অনেক ভাইয়ের কাছে শুনেছি সেসব দেশে আমাদের বলা হয় “মিসকিন”, বাংলাতে যার অর্থ দাঁড়ায় “ভিক্ষুক”।

এইসব দেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বাংলাদেশ বলতেই বুঝায় গরীব একটা দেশ, যাদের দেশে প্রতি বছর বন্যা হয়, প্রাকৃতিক দূর্যোগ হয়, রাজনৈতিক হানা-হানি আর দূর্নীতির মচ্ছব লেগে থাকে। এইসব সব নেগেটিভ নিয়ামক গুলোকে জলাঞ্জলি দিয়ে, সব রাজনৈতিক বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে সরকার কি পারেন না পৃথিবীর সমগ্র বাংলাদেশী জনগণকে এই সেতুর জন্য সাহায্য চেয়ে একটা তহবিল গঠন করতে?

বাংলাদেশী নাগরিক দেশের বাইরে থাকে এমন সংখ্যা প্রায় এক কোটিরও বেশী। সরকার যদি আহবান করে আমি মোটামুটি নিশ্চিত পদ্মা সেতুর খাতে এই নাগরিকেরা দেশে টাকা পাঠাবে সরকারকে। একটু কল্পনা করি এইভাবে যে- প্রতি প্রবাসী যদি গড়ে দেশের এই বিশাল কাজের জন্য ৬৫ ডলার করে পাঠায়, দেশের সব বড় ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়া হয়, দেশের সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে টাকা চেয়ে একটা তহবিল গঠন করা হয় আর সহজ শর্তে যে কোনো একটা যায়গা থেকে ঋণ নেয়া হয় তবে কি এই সেতুর খরচটা উঠানো সম্ভব না?

যদি পুরো প্রস্তাবটির সার সংক্ষেপ এভাবে দেখানো যায় যে-

১) সকল প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে সরকার সকল প্রবাসীদের কাছে অর্থ সাহায্য চাইতে পারেন। যেমন ন্যূন্যতম ৬৫ ডলার। যিনি মিলিয়ন ডলার সাহায্য করবেন তার নামে একটা পিলার বা সেতুর একটা সিগনিফিকেন্ট কিছুর নামকরণ করা হবে এই ধরনের একটি সম্মানী প্রস্তাব এবং সেতুর টোল থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ দিবেন এই জাতীয় চুক্তি করতে পারেন।

২) দেশের অভ্যন্তরের সকল ধনী ব্যববসায়ীদের প্রতি অর্থ সাহায্য চেয়ে ঘোষনা দিতে পারেন।

৩) দেশের সকল সাধারন নাগরিক যে যার সাধ্য মত এই খাতে চাঁদা দিতে পারেন। যে কোনো পরিমাণ।

৪) সরকারী নিজ কোষাগার হতে এমনিতেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে, এই ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা খাত থেকে অর্থ কিছুটা কেটে এই খাতে বাড়াতে পারে।

৫) সকল রাজনৈতিক দল একটা নির্দিষ্ট পরিমানে চাঁদা দিতে পারেন

৬) সকল বাণিজ্যিক ব্যাংক একটা নির্দিষ্ট পরিমানে চাঁদা দিতে পারেন বা বিনিয়োগ করতে পারেন।

উপরের সকল প্রস্তাব সিম্পলি একজন সাধারণ নাগরিকের প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করুন দয়া করে। এক্সপার্ট অপিনিয়ন হয়ত ভিন্ন হতে পারে এবং তা আরো পরিপূর্ণ হবে। আমরা নিজেরাই কি সব রাজনীতিটীতি ভুলে এই সেতুটা দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারি না? সবাই নিশ্চই বুঝতে পারছেন বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থার একটা বড় মাইলফলক হিসেবে এই সেতুটার কতটুকু প্রয়োজন? আমার এই পোস্টটা সরকারী কোনো নীতি নির্ধারকের চোখে পড়বে কি না আমি জানিনা। তবে আমি সাহস করে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করলাম। কারো চোখে পড়লে এটি বিবেচনা করবার কিংবা একবার ভাববার অনুরোধটুকু অন্তত করতে চাই।

এতসব কিছুর পরেও আমি আমার দেশের সরকারের প্রতি আরো একবার বিশ্বাস রাখতে চাই। আমাদের এই রক্ত-ঘামের অর্থ হয়ত এই এক্টিবারের জন্য কেউ আত্নসাৎ করে পকেটে পুরবে না এই কথাটিও না হয় দেশের জন্য আমরা বিশ্বাস করব। আমাদের এই রক্তের অর্থ থেকে বেরিয়ে আসা অশ্রু ধারা আর দেশের জন্য এই বাঁধ না মানা ভালোবাসা যদি হাত ধরাধরি করে এই সেতুটিকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে তবে সকল কষ্ট ছাপিয়ে লাল-সবুজ পতাকাটা ধরে আরো একবার কাঁদতে পারব আমরা। আর কত ঋণ নেব আমরা? ভিক্ষুকের মতন দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় আর মান-সম্মান সব কিছু ধুয়ে ফেলে ওদের কাছেই যাই আবার ভিক্ষার থলি নিয়ে। এরা আমাদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে ইচ্ছেমতন শর্ত জুড়ে দিবে, তাদের মন মতন সুদের পরিমান জুড়ে দিবে, নতুন নতুন দাবীর দোকান খুলে বসবে। এটা আর কতকাল মানব আমরা? দেশকে অপমান করা কি ব্যাক্তি সত্বারও অপমানিত হওয়া না? আমার মাকে অপমান করবার মতই না?

আমরা সবাই মিলে পদ্মা সেতুকে দাঁড় করিয়ে দিতে চাই। পদ্মার বুক চিরে পুরো বাংলাদেশের রক্ত আর ঘাম মিলে মিশে একাকার হয়ে যাক। পদ্মার ঢেউ জানুক তার বুক দিয়ে শুধু হাহাকার না, অসীম, অনন্ত ভালোবাসাও বয়ে চলে নিরন্তর।

বাংলাদেশ সরকার কি দয়া করে এই ব্যাপারটি ভেবে দেখবেন? প্লিজ?

***
ফিচার ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত