ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আপনারা জানেন যে বর্তমানে বাংলাদেশে শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে জামাত, বি এন পি এবং তাদের দোসর বিভিন্ন রকম করে, বিভিন্ন উপায়ে জান-প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করবার চেষ্টা করছেন যে বাংলাদেশে শুরু হওয়া এই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল অসাড় এবং আন্তর্জাতিক না। এটা নাকি একটা প্রহসন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত, ইত্যাদি ইত্যাদি… আমি এইসব নানাবিধ প্রশ্নের আইনী উত্তর দেয়া শুরু করেছি সম্প্রতি। বিশেষ করে জামাতের বৃটিশ আইনজীবি স্টিভেন কে কিউ সি’র সকল প্রোপাগান্ডার উত্তর দেয়াই আমার মূল লক্ষ্য। ১ম পর্ব , ও ২য় পর্বের পর আজ লিখলাম ৩য় পর্ব।

আল জাজিরা টিভি, বিভিন্ন পত্রিকা, তার নিজের ওয়েব সাইট, ম্যাগাজিন, জার্নালে কি বলে বেড়াচ্ছেন স্টিভেন?? তিনি বলছেন-

কোনো ব্যাক্তিকে এমন কোনো আইন দ্বারা সাজা দেয়া যাবে না যা কি না ততকালীন সময়ে কোনো আইন দ্বারা ওই অপরাধকে চিহ্নিত করা হয় নি । দোষ প্রমাণের আগে অভিযুক্ত ব্যাক্তিকে দোষী বলা যাবে না ।

আইনী উত্তরঃ

স্টিভেন কে কি কিউ সি উপরের মন্তব্যটি করেছেন মূলত আমাদের সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদকে সামনে রেখে ।

যেখানে বলা আছে ,

অপরাধের দায়যুক্ত কার্যংঘটন কালে বলবত ছিলো, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যাতীত কোন ব্যাক্তিকে দোষী সাব্যাস্ত করা যাইবেনা এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবত আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা ভিন্ন দন্ড দেয়া যাইবে না।

পাঠকদের সহজে ব্যাপারটা বলি –

ধরা যাক , কেউ একজন তার দেশে চুরি করলো এবং চুরি যখন করলো তখন সেই দেশে চুরির জন্য কোনো আইন ছিলো না । এখন সংবিধানে বলা হচ্ছে যে,চুরির আইন আজকে বানিয়ে তা আইন বানাবার আগের চুরিকে শাস্তির আওতায় আনা যাবে না।

স্টিভেন কে কিউ সি’র এই সমালোচনাতে খুব স্পষ্ট হয়ে যায় মূলত, তিনি আসলে কি চান বা ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে উড়ে এসে তার এই ১৩ পাতার দীর্ঘ বিবৃতির পেছনের মূল মোটিভ । স্টিভেন যদি এত তাড়াহুড়া না করতেন এবং বাংলাদেশের সংবিধানটি আরেকটু ভালো করে পাঠ করতেন তবে বার বার তিনি এই গ্রস ভুলগুলো করতেন না । আমি আগেই বলেছি ১৯৭৩ সালের ১৫ ই জুলাই বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর কথা । এই সংবিধানের ৪৭(ক) অনুচ্ছেদে কি লেখা রয়েছে ?

উপরে একবার বিবৃত করা হলেও আসুন আরেকবার পড়ি-

৪৭(ক) তে বলা হয়েছে যে ,

reenshot১) যে ব্যাক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যাক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ , ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হইবে না। এই অনুচ্ছেদে খুব স্পষ্ট করে লেখা আছে যে , যাদের ক্ষেত্রে ৪৭(৩) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে প্রণীত আইনটি (৭৩ সালের অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন) প্রযোজ্য হয় , তাদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের ১ ও ৩ দফায় থাকা অধিকার সমূহ প্রযোজ্য হবে না।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ বহিশত্রু পাকিস্তানকে বিতাড়নে ব্যাস্ত ঠিক ওই সময়ে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ সঙ্ক্রান্ত কোনো আইন ছিলো না । তাই যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় নতুন করে আইন হলেও প্রথম দিকে ৪৭(ক) অনুচ্ছেদের অনুপস্থিতির কারনে যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের বাঁচাবার জন্য ঢাল পেয়ে বসে । কিন্তু ১৯৭৩ সালের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আর কোনো বাঁধাই থাকে না ।

এই সংশোধনী না এলেও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে কোনো বাঁধা থাকত না । কেননা এরি মধ্যে পৃথীবির আইন পরিমন্ডলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গ্যাছে একটি বিখ্যাত যুদ্ধাপরাধ মামলা। এডলফ আইক ম্যানের মামলা নামেই যেটি বিশ্বে পরিচিত।

(Adlof Eichmann V Attorney General of the Govt.of Israel, Supreme Court of Israel ILR36(1962)P.277)

-

আইকম্যানকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া নিয়ে সমগ্র পৃথিবীতে আলোচনা হয়। কেননা, আইকম্যানকে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করে নিয়ে আসে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। এই ট্রায়ালে বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বিবাদী পক্ষ থেকে যে অভিযোগটি বার বার করা হয় তা হলো , ইসরাইলের এই ট্রায়াল করার এখতিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অফ জেরুজালেমের নেই কেননা অপরাধ সংঘটনের সময় আইন তো দূরের কথা, ইসরাইল দেশটিই ছিলো না।

কিন্তু ইসরাইলের সুপ্রীম কোর্ট এই অভিযোগ প্রত্যখ্যান করে এবং বলে, আইকম্যান যে অপরাধ করেছেন তা সমগ্রবিশ্বের বিবেককেই নাড়া দিয়েছে এবং তা পুরো বিশ্বেই অপরাধ হি্সেবে বিবেচিত । এছাড়াও, ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধাপরাধ একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ যেখানে “UniversalJurisdictioইউনিভার্সেল জুরিসডিকশানn” কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে যাতে করে পৃথিবীর যে কোনো দেশই অন্য যে কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধী অংশগ্রহণকারী ব্যাক্তিকে শাস্তি প্রদান করতে পারে । এই ট্রায়াল আন্তর্জাতিক ভাবে অত্যন্ত সমালোচিত হলেও , পরবর্তীকালে এই ট্রায়ালটি-ই আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হলেও, সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে আন্তর্জাতিক ভাবে এই ট্রায়াল আজো উদাহরন হয়ে রয়েছে ।

আমরা এই সঙ্ক্রান্ত আরেকটি উদাহরণ দেখতে পাই ২৭ শে মার্চ ২০০৭ সালে কানাডাতে অনুষ্ঠিত মুনাইয়েঞ্জার মামলায় । এই মুনাইয়েঞ্জা রুয়ান্ডার হুতু গোত্রের এক ধনী ব্যাবসায়ীর সন্তান যে ১৯৯৪ সালে হুতু সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তুতসীদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চলাকালীন সময়ে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলো । ২০০৫ সালে কানাডাতে অবৈধ ভাবে থাকার সময় এই ব্যাক্তি আটক হয় এবং পরবর্তীতে কানাডার ডমেস্টিক যুদ্ধাপরাধ আইনে মুনাইয়েঞ্জার বিচার অনুষ্ঠিত হয় । এই বিচারের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা হয় যে , কানাডার আদালত কি রুয়ান্ডাতে সঙ্ঘটিত গণহত্যায় অভিযুক্ত কোনো ব্যাক্তির বিচারের এখতিয়ার রাখে কি না।

-

কিন্তু এই বিষয়ে যুক্তি তর্কের মূলত আর কোনো অবকাশই রইলো না যখন দেখা গেলো যে , কানাডার যুদ্ধাপরাধ আইন ২০০০ (যা ২৩ শে মার্চ আলোর মুখ দেখেছে) এ বলা হয়েছে যে-

The Act came into force on October 23, 2000.24 The Act is aimed at implementing the Rome Statute. Section 6(1) of the Act states:

“Every person who, either before or after the coming into force of this section, commits outside Canada

(a) genocide,
(b) a crime against humanity, or
(c) a war crime,

এছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এখানে দেওয়া বাঞ্ছনীয় বলে আমি মনে করি। ইয়াগোস্লোভিয়ায় যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয় তখন ডেনমার্ক, জার্মানী, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডেও তাদের নিজ নিজ আদালতে সেখানে আশ্রয় নেয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করে। এই ক্ষেত্রে , ডেনমার্কে “রেফিক সেরিকRefik” Saric একজন বসনিয়ান রিফিউজিকে গ্রেফতার করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে । এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে ,এই রেফিক সেরিক Refikricনিজে একজন বসনিয়ান মুসলিম হয়েও সার্বিয়ান বাহিনীকে সাহায্য করে বসনিয়ার মানুষদের উপর অত্যাচার চালাতে। আমাদের দেশে যেমন রাজাকাররা পাকিস্তানী বাহিনীকে আমাদের মানুষ মারতেই সাহায্য করেছে ঠিক তেমনি এই RefikSaricসার্ব মিলিটারীদের সাহায্য করেছে তার নিজের দেশের মানুষদের হত্যা করতে। পরবর্তীতে ডেনমার্ক আদালত জাতিসঙ্ঘের “Universalইউনিভার্সেল জুরিসডিকশানJurisdiction” ক্ষমতার আওতায় ১৯৯৪ সালে তার শাস্তি প্রদান করে ।

তার সম্পর্কে যা জানা যায় , তা নীচে দেয়া হলো

Refic Saric is the first person to serve a prison term in a European country (outside of former Yugoslavia) for war crimes committed during the conflict in Bosnia. In this case, the jurisdiction of Denmark was based on legal dispositions which sanctioned serious violations of the Geneva Conventions (Articles 129 and 130 of the 3rd Convention; articles 146 and 147 of the 4th Convention) in conjunction with Article 8 § 5 of the Danish Penal Code. Rafik Saric appealed the verdict by disputing the jurisdiction of the Danish courts on the basis that the counts on which he was charged were not sufficiently serious to come under the dispositions penalising serious violations of these Conventions. His appeal was nevertheless rejected .

উপরের উদাহরণ থেকে বোঝা গেলো যে যুদ্ধাপরাধ এমন একটি অপরাধ , কোনো এই ব্যাক্তি এই অপরাধে অভিযুক্ত হলে পৃথিবীর যেই দেশে গিয়েই এই অপরাধী আশ্রয় নিক না কেন , উক্ত দেশ ১৯৪৯ সালের “জেনোসাইড কনভেনশন ইউনিভার্সেল জুরিসডিকশান” Genocideniversalঅনুযায়ী উক্ত অভিযুক্তের বিচার করতে সক্ষম।

যাই হোক , যেহেতু আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট প্রভিশান রয়েছে এবং ৪৭(ক) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৫(১) এর মাধ্যমে উদ্ভুত সমস্যা অনেক আগেই দূরীভূত হয়েছে , সেক্ষেত্রে স্টিভেন কে কিউ সি’র কথা আর ধোপে টেকে না । ১৯৭৩ সালের সংবিধানের সংশোধনের পরেও কি করে এই ২০১০ সালে এসে তিনি এই জাতীয় মাতলামো করে বেড়ান তা বুঝতে কষ্ট হয় । যেই স্টিভেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শুধু ডিফেন্সের হয়েই এতটাকাল লড়েছেন , যিনি নিজেকে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবি বলে জাহির করতে চান , সেই স্টিভেন কে কিউ সি আজকে তার এই মন্তব্যের মাধ্যমেই আসলে নিজেকে প্রকাশ করলেন। মূলতঃ নিজেকে লুকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন।

স্টিভেন তার সমালোচনার পরের অংশে বলেছেন, দোষ প্রমানের আগে অভিযুক্ত ব্যাক্তিকে দোষী বলতে পারবে না । এই ধরনের উপদেশ বাণী এক ধরনের দৃষ্টতা । আইনের বেসিক একটি সুত্র যেভাবে আমাদের কে আদেশ ও নির্দেশের সুরে স্টিভেন কে কিউসি বার বার বলছেন , তাতে করে , স্টিভেনের ভব্যতার শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক জীব হিসেবে তার বিবেকবোধ প্রশ্নবিদ্ধ । ১৯৭৩ সালের কোথাও কি বলা রয়েছে যে , অভিযুক্ত ব্যাক্তি শুরুতেই কনভিক্টেড?

ICTAআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালস আইন ১৯৭৩ এর রুলস এবং প্রসিজিওরের চ্যাপ্টার ৬ ( সাক্ষ্য) এর ৫০ ধারায় বলা হয়েছে যে-

“The burden of proving the charges shall lie upon the prosecution”

মানে হচ্ছে , ট্রাইবুনালের আইনজীবিকেই প্রমাণ করতে হবে যে , অভিযুক্ত ব্যাক্তি দোষী । এবং এই অবস্থার প্ররিপ্রেক্ষিতেই খুব সহজে সেই বিখ্যাত কথাটি এখানে এসে যায়, যা হলো, “Thecusedsএকিউসড ইজ ইনোসেন্ট আনটিল প্রুভেন গিলটি” presumed toআইনের এই বিশাল অংশটি সুদৃঢ় থেকেছে ।

উপরের আইনী আলোচনা, উদাহরণের প্রেক্ষিতে ব্যারিস্টার স্টিভেনের বলা বক্তব্য সম্পূর্ন ভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

চলবে…