ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আপনারা জানেন যে বর্তমানে বাংলাদেশে শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে জামাত, বি এন পি এবং তাদের দোসর বিভিন্ন রকম করে, বিভিন্ন উপায়ে জান-প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করবার চেষ্টা করছেন যে বাংলাদেশে শুরু হওয়া এই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল অসাড় এবং আন্তর্জাতিক না। এটা নাকি একটা প্রহসন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত, ইত্যাদি ইত্যাদি… আমি এইসব নানাবিধ প্রশ্নের আইনী উত্তর দেয়া শুরু করেছি সম্প্রতি। বিশেষ করে জামাতের বৃটিশ আইনজীবি স্টিভেন কে কিউ সি’র সকল প্রোপাগান্ডার উত্তর দেয়াই আমার মূল লক্ষ্য। ১ম পর্ব , ২য় , ৩য় পর্বের পর আজ লিখলাম ৪র্থ পর্ব।

আল জাজিরা টিভি, বিভিন্ন পত্রিকা, তার নিজের ওয়েব সাইট, ম্যাগাজিন, জার্নালে কি বলে বেড়াচ্ছেন স্টিভেন?? তিনি বলছেন-

১) এই আইনে দেশের প্রচলিত ফৌজদারী আইন উপেক্ষা করা হয়েছে । কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে আর তাকে জামিন দেয়া হবে না । এমন বিধান রয়েছে এই আইনে ।

উত্তরঃ
প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই একটি তথ্য জানিয়ে দেই। সেটি হচ্ছে, এই আইনে জামিনের প্রভিশন নেই বলে প্রচার করে বেড়াচ্ছে জামাতের ও বি এন পি’র লবিস্ট। অথচ এই আইনে যুদ্ধাপরাধ অভিযোগে আটক প্রাক্তন বি এন পি মন্ত্রী আব্দুল আলীমকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দিয়েছে ট্রাইবুনাল।

এই প্রশ্নের উত্তরে শুরুতেই বলে নেয়া ভালো যে অজামিনযোগ্য আইনের প্রভিশন বাংলাদেশে নতুন নয় । কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এর সেকশন ৪(১)(খ) এ বলা আছে,

“bail in non-bailable offence is the discretion of the courts, not the right of the accused.”

উপরের উদাহরণটুকু দেবার পর মূলত আর কোনো কথাই বলা প্রয়োজন পড়ে না । তারপরেও যুক্তি উপ্সথাপন করতে ও সকল মিথ্যা প্রোপাগান্ডার উত্তর যখন দিতে বসেছি তখন কিছু কথা বলতেই হয় । শুরুতেই বলে নেয়া ভালো যে , ১৯৭৩ এর আইনে খুব স্পষ্টাক্ষরে বলা রয়েছে ২৩ ধারায়- ( যা সংবিধান অনুযায়ী প্রণীত)-

“The provisions of the Criminal Procedure Code,1898 (v of 1898) and the Evidence Act, 1872 (1 of 1872), shall not apply in any proceedings under this Act.”

প্রথমতঃ

Criminalকোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ অনুযায়ী কোনোভাবেই ICTA-i1973 এর যুদ্ধাপরাধ এইন পরিচালিত হয় না সুতরাং ফৌজদারী আদালতের উদাহরণ বার বার টেনে আনা এক ধরনের গর্দভ গিরি ছাড়া আর কিছুই নয় । আমি যদিও প্রথমে সে আর পি সি’র ই উদাহরণ ই দিয়েছি, বাট সেটা এসেছে এই কারনেই যে, জামিন দেয়া আর না দেয়ার ব্যাপারে আমাদের ফৌজদারী আইনের প্র্যাক্টিস গুলোকে বার বার সামনে আনা হচ্ছে। সে কারনেই, ওদের উদাহরণ ওদের দিকেই ছুঁড়ে দিলাম।

দ্বিতীয়তঃ

উপরের আমি রেফারেন্স সহ বলেছি যে , কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ এর সেকশন ৪(১)(খ) এ বলা আছে,

non-bailable offence is the discretion of the courts, not the right of the accused.”

তাহলে মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে , সাধারন ফৌজদারী আদালতেও অজামিনযোগ্য প্রভিশন রয়েছে এবং জামিনের পুরো ব্যাপারটাই নির্ভর করে জাজের উপর । এটি একিউসড এর অধিকার নয় । অথচ স্টিভেন এমন করে চিৎকার করছেন , যেন শুধু ICTA- আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩ এই শুধু জামিনের ব্যাবস্থা রাখা হয় নি । সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করবার যত পথ আছে , তিনি সবগুলো পথই যেন বেছে নিয়েছেন । অথচ , আইনের অপব্যখ্যার শাস্তি তার ভালই জানার কথা ।

এই অজামিনযোগ্য প্রভিশনের ব্যাপারে ২০০২ সালে দুইটি রিপোর্ট বাংলাদেশ আইন কমিশন উপস্থাপন করেন

“A complete report by the law commisiion on the problems relating to bails” এবং “Report on proposal for enhancement of punishment of…” শীর্ষক শিরোনামে । যেখানে আইন কমিশন সরকারকে প্রোপোজাল দিচ্ছে যে নতুন করে কোন কোন অপরাধের ক্ষেত্রে অজামিনযোগ্য প্রভিশন করা যায় । এই বিষয়ক একটি মামলার রায় ।

এখন একটা ব্যখ্যা দেয়া প্রয়োজন যে , কেন ICTA-আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) ১৯৭৩ আইনে জামিনের ব্যাবস্থা নেই । এটি খুব সাধারণ যে , যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং যে অপরাধে অভিযোগ রয়েছে সেখানে পুরো ব্যাপারটাই নাজুক । এই অপরাধীরা ছাড়া পেলে সাক্ষীদের ক্ষতি হতে পারে , তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, বিভিন্ন রকমের সাক্ষ্য নষ্ট করে ফেলা হতে পারে । আন্তর্জাতিক কিছু যুদ্ধাপরাধী আইন আমরা যদি বিশ্লেষন করি তাহলে দেখতে পাই-

জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবাধানে অনুষ্ঠিত সিয়েরা লিওনের ট্রায়ালের RULE-65 এ বলা আছে- ( যেই আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক আইন বলে স্টিভেন মুখে ফেনা তুলে ফেলেন)

“A) once detained an accused shall not be granted bail except upon an order of a judge or Trial Chamber”

“B) Bail may be ordered by a judge or a Trial Chamber after hearing the State to which the accused seeks to be released and only if it is satisfied that the accused will appear for trial and, if released, will not pose a danger to any victim,witness or other persons”

অথচ দেখুন, এই সিয়েরা লিওনের ট্রাইবুনাল কিন্তু জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানেই হয়েছে। কিন্তু এখানে জামিনের কোনো প্রভিশনই রাখা হয়নি। অথচ উদাহরন দেবার সময় স্টিভেন সন্তর্পণে এই বিষয়টি এড়িয়ে যায়। উঁচু গলায় শুধু বাংলাদেশে এসেই এই ধরনের সাধারন প্র্যাক্টিস গুলোকে অমানবিক এবং অসাংবিধানিক বলে প্রচার করে সব জায়গায়। অথচ আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাগুলোর উদাহরণ না দিয়েই এরা চালাতে থাকে এদের ইচ্ছেমতন কথার ফুলঝুড়ি।

আবার, কানাডার যুদ্ধাপরাধীর আইনে bail এর ব্যাপারে কোনো প্রভিশনই নেই। যেমনটি আমরা দেখতে পাইনা নুরেম বার্গ , ইসরাইল কিংবা টোকিও ট্রায়ালে ।

-

উপরে আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় , ১৯৭৩ সালের আইনে যে অ-জামিনযোগ্য প্রভিশন রাখা হয়েছে তা একদম সঠিক ও সুষ্ঠূ বিচারের ক্ষেত্রে অপরিহার্য্য।

২) এ ট্রাইব্যুনালের গঠন, সদস্যদের নিয়োগ কোন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। আবার ২৪নং ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের কোন আদেশ, রায়, দন্ড কোন আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না । শুধু বিচার শেষে ২১ ধারার বিধান বলে দন্ড হয়ে গেলে আপীল করা যাবে।

উত্তরঃ

যেই আন্তর্জাতিক মানের কচ-কচানি গত কয়েকটি মাস ধরেই স্টিভেন যে পরিমান মিথ্যাচার করছেন সেই স্টিভেনই আন্তর্জাতিক ট্রায়াল গুলো ভালোভাবে পড়ে আসেননি, এটি দূর্ভাগ্যজনক। যাই হোক , আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল গুলো দেখার আগে আমরা আমাদের দেশীয় অবস্থান টুকু দেখে নেই-

বাংলাদেশের ক্রিমিনাল কোর্ট এবং প্রসিডিউরে কোনো ভাবেই এমন কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি যেখানে ট্রাইবুনালের গঠন কিংবা চেয়ারম্যানের নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করা যায় । আমাদের আইনে বলা রয়েছে যদি , ফেয়ার কিংবা নিরপেক্ষ ট্রায়াল হবে না এই ধরনের আশংকা থেকে থাকে তবে , ট্রায়ালকে অন্য কোর্টে ট্রান্সফার করা যাবে । কিন্তু ট্রায়ালের গঠন কিংবা চেয়ারম্যানের নিয়োগ কে চ্যালেঞ্জ করা আমাদের সাধারণ ফৌজদারি বিধানেও নেই ।

এখন যদি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের দিকে চোখ ফেরাই তবে দেখতে পাই যে ,

Nuremberg charter,
Charter of the International Military Tribunal for the Far East 1946,
Statute of the International Criminal Tribunal for Former Yagoslavia, 1993;,
Statute of the International Criminal Tribunal for Rwanda,1994-

কোনোখানেই এমন কোনো প্রভিশন নেই যেখানে ট্রাইবুনালের গঠনতন্ত্র চ্যালেঞ্জ করবার প্রভিশন রয়েছে । এমনকিtatute,r রোম স্ট্যাটিউট ১৯৯৮, এও এই ধরনের প্রভিশন বাদী বা বিবাদী কোনো পক্ষের জন্যই নেই ।

আর তাছাড়া ১৯৭৩ সালের আইনে বলা হয়েছে যে , ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান ট্রাইবুনালের ফাংশন সঠিক ভাবে চলার জন্য যে কোনো প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিবেন যদি কোনো পক্ষের কাছ থেকে প্রশ্ন কিংবা সন্দেহ উত্থাপিত হয় । এর কিছু উদাহরণ তো আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখতেই পেলাম। ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান নিরপেক্ষ নন কেননা তিনি কোনো এক কালে বেসরকারী ও সামাজিক আন্দোলনের মত একটি কর্মসূচি “গন তদন্ত কমিশন” এর সদস্য ছিলেন এবং সেক্ষেত্রে তার নিরপেক্ষতা নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন তোলা হয়। দায়ের হয় রিট আবেদন। পরবর্তীতে নানাবিধ ঘটনা, ব্যাখ্যা শেষে রায় প্রদান করা হয় যেখানে জাস্টিস নিজামুল হক নাসিম ন্যায় বিচারের স্বার্থে এবং ট্রাইবুনালকে আরো স্বচ্চতা প্রদানের জন্য তার ঐতিহাসিক রায়টি প্রদান করেন যেখানে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সাঈদীর রিট পিটিশান টি খারিজ করা হয়।

আর তাছাড়া , গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এই ক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় যে, এই চ্যালেঞ্জ করবার ক্ষমতা কোনো পক্ষেরই নেই । না আছে প্রসিকিউশনের না আছে ডিফেন্সের। সুতরাং প্রসিকিউশন আলাদা করে কোনো সুযোগ বা সুবিধা পাচ্ছে, এমন বলবার কোনো অবকাশই নেই।

উপরের আলোচনা পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে , দেশে কিংবা আন্তর্জাতিক সব প্রখ্যাত ট্রায়ালেই ট্রায়ালের গঠনকে চ্যালেঞ্জ করবার কোনো বিধান নেই এবং এর কোনো নজির নেই । সুতরাং এই মতের আলোকে দেশের অন্যান্য ট্রাইবুনাল বা আইন বাদ দিয়ে স্টিভেনের শুধু এই আইনের দিকে অঙ্গুলি তাক করাটা সন্দেহের ও উদ্দেশ্যমূলক বলে ধারনা হয় ।

উপরের আইনী আলোচনা, উদাহরণের প্রেক্ষিতে ব্যারিস্টার স্টিভেনের বলা বক্তব্য সম্পূর্ন ভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

চলবে…