ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 
-

জামাতীদের এখন সবচাইতে প্রিয় ব্যাক্তি যে ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদের অধ্যাপক আসিফ নজরুল তা বিচার করবার জন্য খুব বেশী বুদ্ধিমান হবার প্রয়োজন নেই। ২৫ শে মার্চ ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইবুনাল শুরু হবার পর থেকে জামাতী ইসলামী এবং বি এন পি জোট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অপঃপ্রচার চালাতে শুরু করে। আসিফ নজরুল এই সব অপঃপ্রচারের একজন প্রধান দেশীয় পর্যায়ের মুখপাত্র হয়ে এখন আমাদের মাঝে বিরাজ করছেন। আসিফ কে নিয়ে কিছু বলবার আগে আগে জামাতী-বিম্পিদের অপঃপ্রচারের ব্যাপারে নীচের ছবিটি একটু দেখে নিতে পাঠকদের অনুরোধ করছি।

-

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে চলমান অপঃপ্রচার নিয়েই মূলত কয়েক পর্বের একটা লেখা লেখা যায়। কিন্তু আজকের এই লেখায় এত বিস্তারিত ব্যাপার আলোচনা না করে শুধু মাত্র দেশীয় দালাল আসিফ নজরুলএর মাধ্যমে চালানো অপঃপ্রচার নিয়েই আমার এই লেখা। সুতরাং আমি চেষ্টা করব আসিফ নজরুলের দিকেই ফোকাস করবার। এই দালালকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার কাছে মনে হোলো তাকে আসলে অন্যসব দিক থেকে পর্যালোচনা করার চাইতে সবচাইতে কার্যকরী দিক হচ্ছে একসময় এই ব্যাক্তিটি তার নিজের লেখা বইয়ে কি লিখেছিলেন বা বলতে চেয়েছিলেন। তাহলে পাঠকদের কাছে খুব পরিষ্কার হয়ে যাবে আসফ নজরুলের সাম্প্রতিক স্ট্যান্ড, কিংবা তার ভন্ডামী।
-

গত বছর দুয়েক ধরেই আসিফ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম যেমন টিভি, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে বলে বেড়াচ্ছেন যে-

১) যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে আইনে হচ্ছে (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১৯৭৩) সেই আইন আন্তর্জাতিক নয়, এটাতে অনেক ত্রুটি রয়েছে। এটা দিয়ে বিচার করলে তা হবে প্রহসন।

২) সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বর্তমান ধৃত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে

৩) গত ৩১ শে ডিসেম্বর বাংলাভিশনের “ফ্রন্ট লাইন” নামের একটি টকশো তে চলমান যুদ্ধাপরাধ নিয়ে এবং এই ট্রাইবুনালের বিচারক, আইনী প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একটি পর্যায়ে তিনি দাবী করে বসেন যে, রাজাকার দেইল্যা ওরফে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী যুদ্ধাপরাধী নয়।

৪) স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী তথা রাজাকার সম্রাট নিমামী খুব সৎ ছিলো, দুর্নীতি করেনি, ইত্যাদি… ইত্যাদি…

আসিফ নজরুলের এই স্ট্যান্ড আমাদের কাছে নতুন। কেননা ১৯৯২ সালে যে ব্যাক্তি শহীদ জননী জাহানার ইমামের নেতৃত্বে গণ আদালতের সকল কাজে সম্পৃক্ত থেকেছেন বলে যানা যায়, সেই একই ব্যাক্তি আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলাকালীন সময়ে ঝুপ করে রং পালটে ফেললেন কেন? এই ব্যাপারটা আমাকে এত ভাবিয়েছে যে, আমি আসলে কোনো কূল কিনারাই পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিলো, অর্থের কাছে, ক্ষমতার কাছে, বৈভবের কাছে কি মানুষ এত নোংরা ভাবে বিক্রি হয়ে যায়? কিংবা যেতে পারে? এও কি সম্ভব? আসিফের লেখা বই থেকেই আমরা জানতে পারি যে জাহানারা ইমাম তাকে কতটা বিশ্বাস করতেন। যে চিঠি কিংবা চিরকুট শহীদ জননী আসিফের কাছে দিয়েছেন কিংবা যেসব কল্পকাহিনী আসিফ তার বইতে উল্লেখ করেছে তার সারমর্ম বলে যে, আম্মা(জাহানারা ইমাম) আসিফের উপর একধরনের আস্থা রেখেছিলেন স্পষ্ট ভাবেই।

২০০৯ সালের একুশে বইমেলাতে আসিফ নজরুল ( যার প্রকৃত নাম মোঃ নজরুল ইসলাম) “অন্যপ্রকাশ” থেকে একটি বই প্রকাশ করে। বইটির নাম হচ্ছে, “ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারঃজাহানারা ইমামের চিঠি”।

যদিও বইটি মূলত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের বিচারের দাবীতে ১৯৯২ সালের গণ-আদালত ও গণ তদন্ত কমিশনের তথা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সমন্বয়ক কমিটির নানবিধ কার্যকলাপ ও সেসময়কার বিভিন্ন তথ্য ও কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে তারপরেও এই বইটি অনেকগুলো কারনে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই বইটিতে আসিফ অনেকগুলো ব্যাক্তিগত চিঠি প্রকাশ করেছে যেসব চিঠি আমাদের আম্মা (জাহানারা ইমাম) আসিফকে বিভিন্ন সময়ে চিরকুট আকারে কিংবা বিস্তারিত চিঠির আদলেই পাঠিয়েছিলেন। এই বইটি আসলে কোনো একটা বিশেষ কারনে খুব তাড়াহুড়ো করে প্রকাশ করা হয়েছে তা বইটি ৫ বার পাঠ করবার ফলে আমার মনে হয়েছে । এও মনে হয়েছে যে, এই বইটিতে সেই সময়কার গণ আদালতের ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আরো অনেক বর্ণনা আরো বিশদ ভাবে বলা যেতো। এই বইটি যিনি একবার পড়বেন আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে তিনি বইটি শেষ করে একটা কথাই বলবেন যে-

“ও আচ্ছা, তাহলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কর্মীরা তো কাজের বেলাতে ঠন ঠন ছিলো। আসলে আসিফ নজরুল ছাড়া আর বাকিরা কোনো কাজেরই নয়। তারা শুধু নিজেরা নিজেদের ভেতরই অস্থিরতা তৈরী করত”

এই বইটি একাধিক বার পাঠ করবার পর আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, এই বইটি আসিফের একটা চালের অংশ। গণ আদালতের এই সম্পৃক্ততার কথা বলে আসিফ কেবলই বুঝিয়েছে যে সে কতটা কর্মঠ ব্যাক্তি ছিলো এই আন্দোলনে। আর বাকিরা শুধু ঘাস মুখে নিয়ে জাবর কেটেছে এবং একজন আরেকজনের গুহ্যদ্বারে আঙুল চালিয়েছে। শুধু আসিফ নজরুল একজন পরিপূর্ণ “হনু” হয়ে বিরাট একজন দক্ষ মানুষের মতন নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন। আজকের এই লেখায় আমি সেই বিশ্লেষনেও যাবো না। এই প্রসঙ্গে একটি লেখা আমি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই লিখব। কিন্তু আজ আমি লিখব উপরে উল্লেখিত আসিফের বয়ানের পাল্টা বয়ান। যে পালটা বয়ান আসিফ তার নিজের বই “ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারঃজাহানারা ইমামের চিঠি” তে বলেছেন।

এই বইটির ভূমিকার ১৯ নাম্বার লাইনে আসিফ লিখেছে যে-

“এই প্রজন্মই নেতৃত্ব দিচ্ছে কিংবা সংগঠিত করছে এখনকার বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী বিরোধী আন্দোলন। তাঁর (জাহানারা ইমামের কথা বলছে) আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রণীত ১৯৭৩ সালের বিস্তৃত আইনটি নতুন করে আলোচিত হয়। এই বিচারের সুদৃড় আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে মানুষ সচেতন হয়”

এই প্যারাটির শেষ লাইনটি লক্ষ্য করুন। কি বলা হচ্ছে? আসিফ ১৯৭৩ এর আইনটির পক্ষে বলছেন। তিনি বলছেন যে, এই আইনটি সুদৃড় তথা এই আইনটির ভিত্তি খুবই মজবুত এবং এই আইনটি জাহানারা ইমামের কারনেই আবার লাইম লাইটে আসে।

এই বইয়ের ২৪ নাম্বার পৃষ্ঠায় আসিফ লিখেছে-

“গণ আদালতের বড় সাফল্য ছিলো, ১৯৭৩ সালের আইনটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। ২৬ টি ধারা সংবলিত এই আইনের শিরোনাম হচ্ছে “দা ইন্টার ন্যশনাল ক্রাইমস ট্রাইবুনাল এক্ট-১৯৭৩”। এই

এই আইন বর্ণিত অক্সিলারী ফোর্স (সহযোগী বাহিনী) হিসেবে রাজাকার আলবদর বাহিনীর সংগঠন, নেতা এবং সক্রিয় কর্মীদের যুদ্ধাপরাধ বিচার করার সুযোগ ছিলো। আইনটির ৬ নং ধারা অনুসারে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ট্রাইবুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যে- কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিলো। এখনও তা সম্ভব। সাক্ষ্য আইনের জটিল বিষয়গুলো এই ট্রাইবুনালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে এবং ১৯৭১ সালের পত্রপত্রিকায় ছাপানো ছবি এবং প্রতিবেদনে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহনীয় বলে ১৯৭৩ সালের আইনটি প্রয়োগ করে সহজেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি প্রদান করা সম্ভব”

একই পৃষ্ঠার ২য় প্যারাতে আসিফ লিখেছে যে,

“গণ আদালতের আন্দোলন করে আমরা সরকারকে সেই দায়িত্ব স্বরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম”

এই একই বইয়ের ৩৮ নাম্বার পাতায় একটি মিটিং এর লিখিত বক্তব্য দেয়া আছে।
এখানে জনাব খান সারোয়ার মুর্শিদ ও জনাব মেজবাহ সাহেবের গণ আদালত সঅম্পর্কিত উদ্বেগের জবাবে আসিফ বলেন ” ৭৩ এর আইনের ভিত্তিতে যদি করি তাহলে হবে”

এই বইয়ের ৫৪ পৃষ্ঠার ২য় ও ৩য় প্যারায় এই আইনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে আসিফ তার নিজের লেখা বিবৃতি লিখেন (যেটা তিনি পূর্বে ভোরের কাগজে ছেপেছিলেন)। তিনি

বলেন, “আমরা অবিলম্বে ১৯৭৩ সালের ইন্তারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইবুনাল এক্টের অধীনে ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যাকারীদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনের জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি। এই ত্রাইবুনাল গঠনের জন্য সরকারের একটি গেজেট নোটিফিকেশনি যথেষ্ঠ বলে আমরা মনে করি”।

অথচ এই আসিফ আজকে টিভিতে বলছে কিংবা কলামে লিখছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারী প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইনটির বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সেকশান, বিভিন্ন সেকশানের সাব সেকশান এবং সমগ্র বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এক ধরনের তীব্র সমালোচনা করে যাচ্ছেন এই আসিফ নজরুল। এমনতো নয় যে, ২০০৯ সালে তিনি এই আইনটি না বুঝেই কিংবা ১৯৯২ সালে এই আইনটি না বুঝেই তিনি এই আইনের পক্ষে বলেছিলেন। যেহেতু তিনি আইন বিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন এবং এই আইনের উপর পি এইচ ডি ডিগ্রীও নিয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে বুঝে ও জেনেই মন্তব্য করেছিলেন বলে যদি ধরে নেই, তবে আজ মাত্র ২ বছরের মাথায় আসিফ কেন এই একই আইনের সমালোচনা করছেন? কত টাকা পেলে এমন ভোল পালটে ফেলা যায়? সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে আই আসিফ-ই তার উক্ত বইয়ের শেষে নিজ উদ্যোগে ১৯৭৩ সালের আইনের বাংলা অনুবাদও করে ছেপেছে।

আসিফ তার উল্লেখিত বইটির ভূমিকার শেষ দুই প্যারা আগে লিখেছেন-

“এই বিচারের ন্যায্যতা, আইনগত ভিত্তি এবং এর অন্তর্নিহিত চেতনাকে বুঝতে হলে জাহানারা ইমামকে জানা প্রয়োজন। প্রয়োজন এই উপলব্ধিও যে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে চলবে না। এটা জাতির আত্নপরিচয় বিকশিত হওয়ার সংগ্রামের একটি অংশ”

উপরের উক্ত প্যারা থেকে একটি লাইন খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন-

“প্রয়োজন এই উপলব্ধিও যে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে চলবে না”

এখন এই লাইনটি মাথায় থাকতে থাকতে আসুন আমরা আসিফের বইটির ৩২ নাম্বার পাতায় চলে যাই। কি লেখা রয়েছে সেখানে? সেখানে লেখা রয়েছে যে-

“৯৩ এর ২৬ শে মার্চ গণ আদালতের এক বছর পূর্তি দিন কমিটির নতুন কর্মসূচি ঘোষনা করা হয়। এদিন সোহ্‌রোয়ার্দি উদ্যানে আয়োজিত গণ সমাবেশে পুলিশ বি ডি আর হামলা চালিয়ে পন্ড করে দেয়। জাহানারা ইমাম ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নতুন কর্মসূচির অংশ হিসেবে একাত্তরের ৮ জন ঘাতক দালালের কৃতকর্ম অনুসন্ধানের জন্য গণতদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষনা দেন। এই আটজন যুদ্ধাপরাধী ছিলোঃ আব্বাস আলী খান (বর্তমানে প্রয়াত), মতিউর রহমান নিজামী (জামায়াত নেতা), মোঃ কামারুজ্জামান (জামায়াত নেতা), আব্দুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী (জামায়াত নেতা), মোওলানা আব্দুল মান্নান (বর্তমানে প্রয়াত), আনোয়ার জাহিদ (বর্তমানে প্রয়াত) এবং আব্দুল কাদের মোল্লা (জামায়াত নেতা)

এই বইয়ের ৩৩ পৃষ্ঠায় আমরা জাহানারা ইমামের একটি চিরকুট এবং আসিফের নিজের কথায় জানতে পারি যে এই গনতদন্ত কমিশনের যে সেক্রেটারিয়েট হচ্ছে সেখানে আসিফ নজরুলের নাম ছিলো। এবং এই কমিশনের কাজে তার সর্বপোরি সংশ্লিষ্ঠতা ছিলো।

আসিফের বইয়ের ৩৭ পৃষ্ঠার প্রথম প্যারার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, এইসব সক,অপরাধীদের বিরুদ্ধে সকল অপরাধের তথ্য অল্প-বেশী তথ্য তারা সংগ্রহ করেছিলো এবং রিপোর্ট তৈরী হচ্ছিলো তার উপর ভিত্তি করেই যার মধ্যে সাঈদীর বিরুদ্ধে রিপোর্টও ছিলো।

এই একই বইয়ের ৩৮ পাতায় শাহরিয়ার কবিরের কথা কোট করে আসিফ লিখেছে যে,

“সাঈদীর ব্যাপারে হুমায়ুন আহমেদ এর মায়ের সাক্ষাৎকার নেয়া হবে”

সবশেষে এই গণ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয় উপরে উল্লেখিত ৮ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যার তদন্ত কাজে আসিফ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে সংশ্লিষ্ঠ ছিলো বলে আসিফ বার বার এই বইয়ে জানিয়েছে। বিশেষ করে ৪৯ পৃষ্ঠায় শেষ প্যারায় আসিফ আমাদের জানাচ্ছে যে এই রিপোর্টের আইনগত ভিত্তিটি মূলত সেই তৈরী করেছে।

এই বইয়ের ৫০ পাতার ২য় প্যারাতেই আমরা জানতে পারি যে, জাহানারা ইমামের তদারকি ও অনুপ্রেরণায় শেষ পর্যন্ত ৯৪ সালের ২৬ শে মার্চ সাঈদী সহ অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে লিখিত গণ তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট টি প্রকাশ করা হয়।

অথচ আজ এই আসিফ নজরুলই বলছে যে, সাঈদী একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ করেনি। যেই লোক নিজে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের আইনগত ভিত্তিটি লিখে দেয়, যেই লোক এই সাঈদীর বিরুদ্ধে কিভাবে অভিযোগ আনতে হবে বুদ্ধি দেয় সেই লোক আজ ১৭ বছর পর ঠিক তার কথার উল্টোটা করছে এবং সম্পূর্ণ উল্টোটা বলছে।

আরেকটা কথা আসিফ বলছে যে, বর্তমানে ধৃত যুদ্ধাপরাধের দায়ে আটক ব্যক্তিদের বিচার নাকি রাজনৈতিক প্রহসন মাত্র। অথচ তার সংশ্লিষ্ঠতার মাধ্যমে যেই ৮ জন যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে গণ তদন্ত কমিশন ১৯৯৪ সালে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছিলো সেই ৮ জনের সকল জীবিত ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধেই তো আজকে বিচার হচ্ছে। তাহলে কেন আজ আসিফ নজরুল “রাজনৈতিক প্রহসন” বলছেন? তার যদি এত কষ্ট, এত দুঃখ থেকেই থাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে, তবে সেদিন কেন আসিফ এই বিচারের বিপক্ষে না বলে পক্ষে লড়াই করবার ভান দেখিয়েছিলেন? তবে কি আসিফ নজরুল আজ এতটা বছর জামায়াতের ইনফরমার হিসেবে কাজ করেছিলেন? নাকি নিজেকে পরিচিত করবার অদম্য বাসনাই তাকে সে শক্তি যুগিয়েছিলো?

আসিফ তার বইয়ের ৫৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- (শেষ প্যারের আগের প্যারা)

“ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গন আন্দোলন অব্যাহত থাকলে এবং এর পক্ষে জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন অব্যাহত থাকলে এই প্রচারনা সীমিত হয়ে যাবে। উপযুক্ত কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মনোভাব অনুকূল করাও সম্ভব বর্তমান সরকারের পক্ষে”

আবার শেষ প্যারাতে লিখেছেন-

“ এই দৃড়তা (বিচারের) মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান কারী দল আওয়ামীলীগেরই থাকা উচিৎ’ ২০০৮ সালের নির্বাচলে স্বরণকালের বিশালতম সমর্থন পাবার পর এই দৃড়তা না দেখানোর আর কোনো যুক্তি নেই”

পাঠক উপরের উল্লেখিত দুইটি প্যারার থেকে আমরা বুঝতে পারি যে আসিফ ২০০৯ সালের প্রকাশিত এই বইয়ের মাধ্যমে বলতে চাইছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপতার কথা এবং আওয়ামীলীগ-ই যে এই বিচার করতে পারে তার স্পস্ট স্বীকারোক্তি।

অথচ আজ ২ বছর পর এই আসিফ তার বলা কথার ঠিক বিপরীত কাজগুলো নিজেই করে এই বিচারকে ব্যাহত করছে। আজ আসিফের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে বলা বক্তব্য জামাত ইংরেজী, বাংলা ও আরবি ভাষায় অনুদিত করে মধ্যপ্র্যাচ্য সহ সকল পশ্চিমা দেশ গুলোতে অপঃপ্রচার চালাচ্ছে এবং এই আসিফ নজরুলই বলছে যে, যুদ্ধাপরাধের বিচার আওয়ামীলীগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিনাশ সাধনেই করছে (যদিও বিচারের আওতাভুক্ত ৭ জনের ক্ষেত্রেই আসিফ নজরুল তদন্ত করে রিপোর্ট পেশ করেছিলো এবং সে তদন্তের আইনী রিপোর্ট লিখেছিলো এবং আওয়ামীলী-ই যে এই বিচার করতে পারে সেটিও বলেছিলো)

আসিফের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় আইরনি হচ্ছে যে এই আসিফ নজরুলই শেষ পর্যন্ত ওই গণ আদালতে গোলামের পক্ষের আইনজীবি নিয়োজিত হন। যদিও সেটি ছিলো একটা প্রতিকী এডভোকেসি যেহেতু আর কেউ রাজি হচ্ছিলো না, বাট নিয়তি কিন্তু তাকে টেনে সত্যই আজ রাজাকারদের মুখপাত্র বানিয়েছে।

উপরে উল্লেখিত আলোচনায় আসলে আমার ভূমিকা নেই। অপরাধী যেমন খুন করে তার চিহ্ন রেখে যায়, ঠিক তেমনি আজ আসিফ নজরুলও চিহ্ন রেখে গ্যাছে একটি বই লিখে। এক সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে আওয়াজ তোলা আসিফ আজ ঠিক সেই সব ব্যাক্তির পক্ষেই বলছে ঠিক যাদের বিরুদ্ধে এই ব্যাক্তিই তদন্ত করেছিলো, অপরাধের বিবরণ পেয়েছিলো, আইনি দিকও লিখেছিলো এই একই ব্যাক্তি।

মানুষ বদলে যায়। যেই ব্যাক্তিটি দরিদ্র ছিলো এক সময় সেই ব্যাক্তিটি অর্থ রোজগার করে তার দিন ফেরায়। সেও বদলে যায়। যে কিশোরটি একদিন বাবা হয়, সেও বদলায়। চিন্তায়, চেতনায়। যে রমনী শরীর বিক্রি করে রোজগার করে সংসারে অন্ন তুলে দেয় সেও এক সময় বদলায় পেশা। স্বাভাবিক জীবনের আশায়। তাকেও বদলানো বলা যতে পারে কিংবা যে কিশোরটি “আজ” পেরিয়ে কালকের দিনে পৌঁছে সেও পালটায় বয়ঃসন্ধিকাল উৎরে গিয়ে। অল্প অল্প করে। যে কিশোরীটি আজ পুতুল খেলে কিংবা বৌচি, সেও একদিন সন্তান ধারন করে মা বনে যায়, মা হয়ে পালটে যায় সেও। এমন ভাবে অনেক কিছুই পালটায়। পালটে আকাশ, পালটে ঘর, পালটে নেতা, পালটে সবুজ, পালটে গ্রাম, পালটে দীঘি, পালটে শহর, পালটে প্রেমিকা, পালটে প্রেমিক।

শুধু, আসিফ নজরুলদের এইসব ভূমিকাকে আমি পালটানো বলি না। আমি এইসব ভূমিকাকে আসলে একটি গিরগিটির সাময়িক রং বদলে যাওয়া বলি। এইসব গিরগিটিরা আমাদের সমাজে বেঁচে থাকে মানুষের রূপ নিয়ে, কোনো নিরীহ জননীর সন্তান রূপে আনাচে-কানাচে।

এরা কেবল ছোট থেকে দীর্ঘ হয়…দীর্ঘ হয়…আর সমাজের গ্লানি বাড়ায়…