ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ভূমিকাঃ
ফেসবুক, ব্লগ, কিংবা বিভিন্ন টিভি টকশোতে একটি অদ্ভুত প্রোপাগান্ডা ইদানীং জামাতী ইসলামী নেতা, কর্মী ও ব্লগারদের মাধ্যমে খুব বেশী মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে। সেটি হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্তন আমীর ও বিশিষ্ট রাজাকার গোলাম আজমের ব্যাপারে নাকি বাংলাদেশের হাইকোর্ট ১৯৯৩ সালেই বলে দিয়েছে যে গোলাম আজম একাত্তরে কোনো স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলো না এবং এর কোনো প্রমাণই নাকি হাইকোর্ট পায় নি। হাইকোর্টকে সংযুক্ত করে উপরের কথাগুলো মূলত জামাতের এখন একটি বড় অস্ত্র হিসেবে বিভিন্ন ব্লগ, ফেসবুক, জামাতের পত্রিকা। ইউটিউব, টুইটার এবং আরো নানান ধরনের প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। এই প্রোপাগান্ডাটি এক দিক থেকে আতংকের, অন্য দিক থেকে বিষ্ময়ের আর বিরক্তির।

আতংকের এই কারনে যে, একটি মিথ্যে ঘটনা খুবই চমৎকার করে সাজিয়ে, গুছিয়ে মানুষের সামনে প্রকাশ করে যুদ্ধাপরাধের বিচারকালীন সময়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং এই ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না দেখে। বিষ্ময়কর এই কারনে যে, এই প্রোপাগান্ডা চালানোর সময় জামাতের নেতা কর্মীরা কি একবারও ভেবে দেখেনি যে এই প্রোপাগান্ডাটি অচিরেই মানুষের সামনে ধরা খেয়ে যাবে এবং এই অতি চরম আকারের এই মিথ্যাচার জানতে পেরে সেই বিভ্রান্ত মানুষসহ কোটি জনতা তাদের ধিক্কার দিবে? আর বিরিক্তিকর হচ্ছে এই কারনে যে, কয়দিন পর পর জামাতের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা যতসব হাস্যকর প্রোপাগান্ডা বাজারে ছাড়ে আর তারা এই বিশ্বাস নিয়ে বসে থাকে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বুঝি এরি মধ্যে দিয়ে বন্ধ হয়ে গেলো, এর এইসব হাস্যকর প্রোপাগান্ডা দেখে আমার মত তৃতীয় শ্রেণীর একজন আইনের ছাত্রও লজ্জায় মুখ লুকায় আর স্বাভাবিক ভাবেই আইনের এই পরিমান ভুল ব্যখ্যা দেখে বিরক্ত হয়।

পিছু ফিরে দেখাঃ

আপনারা সকলেই জেনে থাকবেন যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আজমের ঘৃণ্য ভূমিকার কথা। যারা এখনও জানেন না, তারা এই লিঙ্কে গিয়ে গোলাম আজমের সকল কৃতকর্মের কথা জেনে নিতে পারবেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা যখন বাংলাদেশের মাটিতে গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ সহ আরো নানাবিধ অপরাধ সংগঠিত করে তখন এই গোলাম আজম ছিলো মূলত পাকিস্তানী হানাদারদের একজন সহযোগী এবং এদেশীয় দালালদের প্রধান। ১৬ ই ডিসেম্বর যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ৯০ হাজার সৈন্য সহ আমাদের কাছে আত্নসমর্পণ করে ঠিক তার ২৪ দিন আগে অর্থ্যাৎ ২২ শে নভেম্বর গোলাম আজম লাহোরে জামাতে ইসলামীর সেন্ট্রাল কমিটির সভাতে যোগ দেয়ার নাম করে মূলত বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যায়। কেননা ধূর্ত গোলাম বুঝতে পেরেছিলো যে তাদের পেয়ারা পাকিস্তানী বাহিনী ও গোলামের রাজাকার, আলবদর, আল শামস, শান্তি কমিটির পতন সুনিশ্চিত। ১৯৭১ সালের সেই যে ২২ শে নভেম্বর গোলাম আজম বাংলাদেশ থেকে পালালো এবং এরপর গোলাম আযম পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত,লন্ডন সহ বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানী পাসপোর্ট ব্যাবহার করে যাতায়াত করতে থাকে ও বসবাস করে বিভিন্ন মেয়াদ পর্যন্ত এবং ক্রমাগত চালাতে থাকে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারনা। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারী যে দালাল আইনটি বাংলাদেশে পাশ হয় এবং এই আইনটির মাধ্যমে যেসব দালালদের গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছিলো তার ১১ নাম্বারেই ছিলো গোলাম আজমের নাম।এই নোটিশ অনুযায়ী ২২ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ পর্যন্ত যারা দালাল আইনের ট্রাইবুনালে হাজির হতে ব্যার্থ হয়েছিলো তাদেরকে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ নাগরিকত্ব্ব আদেশের ৩ ধারা অনুযায়ী ১৯৭৩ সালের ১৮ই এপ্রিল একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ৩৯ জনের নাগরিকত্ব্ব বাতিল করে দেয়া হয়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলো গোলাম আজম। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫-ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তার পরিবারের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর ক্ষমতার পট পরিবর্তিত হয়, পরিবর্তিত হয় বাংলাদেশের রাজনীতি। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া ১৯৭৬ সালের ১৭ জানুয়ারী নাগরিকত্ব ফেরত দেবার একটি প্রেসনোট জারি করে যার সুযোগ নিতে চায় গোলাম আজম। এই প্রেসনোটের সুযোগ নিয়ে গোলাম আজম ২০ শে মে ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত নাগরিকত্বের জন্য কয়েকটি আবেদন করে এবং তা প্রত্যাখাত হয়। ১৯৭৮ সালের মার্চে তার আরেকটি নাগরিকত্বের আবেদন বাতিল হয় কিন্তু গোলাম আজম বাংলাদেশে আসবার ভিসা পায় ১৯৭৮ সালে ১১ জুলাই অসুস্থ মাকে দেখতে আসবার কথা বলে, যদিও সেটি সাময়িক ভাবে ৩ মাসের ভিসা দেয়ার মাধ্যমে।ওই একই বছর তার ভিসা দুইবার রিনিউ করা হয়। ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে গোলাম তার নাগরিকত্ব্ব দেয়ার জন্য পুনরায় আবেদন করে এবং পাকিস্তানী পাসপোর্ট সারেন্ডার করে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

১৯৮০ সালের ২৭ শে মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদকে জানায় যে গোলামের নাগরিকত্ব দেয়া হবে কি হবে না, এটির সিদ্ধান্ত এখনো বিবেচনাধিন রয়েছে।পরবর্তীতে ৩০ শে এপ্রিল ১৯৮১ সালে গোলাম ওথ অফ এলিজিয়েন্স জমা দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং পুরো ব্যাপারটি বিবেচনাধীন থাকে। এইদিকে গোলাম আজম নির্বাচিত হয় জামায়াত ইসলামীর আমীর হিসেবে, অথচ পুরো ব্যাপারটাই ছিলো আইন বহির্ভূত। কেননা যেহেতু ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত গোলাম পাকিস্তানী নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত ছিলো, সেহেতু সে কোনোভাবেই আইন মোতাবেক একটি দলের প্রধান হতে পারে না যা আমাদের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের সরাসরি লংঘন। এই নিয়ে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আন্দোলোনে ফেটে পড়ে এবং সরকার ১৯৯২ সালের ২৩শে মার্চ গোলামকে শো-কজ নোটিস পাঠায় গোলামকে এটি জানিয়ে যে, কেন ১৮ ই এপ্রিল ১৯৭৩ এর গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী গোলামকে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেয়া হবে না। এই শো-কজের পর পরই ২৪ শে মার্চ ১৯৯২ সালে প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে তৎকালীন বি এন পি গোলামকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়। এবং তার পর-পরই দাবী ওঠে গোলাম আজমের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের, যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে গঠিত হয় গোলাম আজমের বিরুদ্ধে গণআদালত যেখানে গোলাম আজমের ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয়। এদিকে এই গণ আদালত গঠন করার প্রতিশোধ হিসেবে বি এন পি সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয় যা ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে আজও বিবেচিত হয়।

এদিকে গোলাম আজম গ্রেফতার হয়ে জেলে প্রেরিত হয় ১৯৯২ সালের ২৪ শে মার্চ এবং শুরু হয় তার নাগরিকত্বের মামলা। গোলামের এই নাগরিকত্বের মামলা প্রথমে যায় হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে। এখানে দুইজন বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রথম জন হলেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইসমাইল উদ্দিন সরকার এবং বিচারপতি জনাব বদরুল ইসলাম চৌধুরী। এদের দুইজনের মধ্যে বিচারপতি জনাব ইসমাইল গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ বহাল রাখেন এবং অন্য বিচারপতি জনাব বদরুল গোলামের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেবার পক্ষে রায় দেন ১৯৯৩ সালের ২২ শে এপ্রিল। রায় যেহেতু দুইজন বিচারপতির রায়ের ভিন্নতা ছিলো সুতরাং এই মামলা নিষ্পত্তি করবার জন্য সেটি চলে যায় হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চে, যেখানে বিচারপতি ছিলেন জনাব আনোয়ারুল হক চৌধুরী। বিচারপতি আনোয়ার, বিচারপতি বদরুলের রায়কে সমর্থন করে গোলামের নাগরিকত্বের পক্ষে রায় দেন এবং এই রায়ের বিপক্ষে আবেদনকারী সরকারী পক্ষ হাইকোর্টের এপিলেট ডিভিশানে যায়। চারজন বিচারপতির সমন্বয়ে গড়া এই বেঞ্চটিতে ছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান, এ টি এম আফজাল, মুস্তাফা কামাল, লতিফুর রহমান। এই চারজন বিচারপতি গোলামের নাগরিকত্বের পক্ষে দেয়া পূর্বতন হাইকোর্টের একক বেঞ্চের রায় (বিচারপতি আনোয়ারের রায়) বহাল রাখেন। এই রায়টি দেয়া হয় ১৯৯৪ সালের জুন মাসের ২২ তারিখে।

পাঠক এই মূহুর্তে এসে আপনাদের একটি কথা বলা খুব প্রয়োজন। সেটি হোলো-

উপরের সব রায় গুলোতে কেন গোলামের নাগরিকত্ব বহাল রাখা হোলো, কিভাবে হোলো, কি ছিলো দুই পক্ষের যুক্তি-তর্কে, কিংবা কি-ই বা ছিলো বিচারকদের ব্যখ্যা, জুরিস্প্রুডেন্স, কেইস ল’, এভিডেন্স, এসব আলোচনাতে আমি আজ যাবো না। কেননা এই ব্যাপারটি জানতে আপ্নারা হাইকোর্টের সেই রায়টি পড়লেই তা খুব সহজে জানতে পারবেন একদম বিস্তারিত আইনী ব্যখ্যা সহ। আমি শুধু এই লেখায় ফোকাস করব গোলামের নাগরিকত্ব মামলার প্রথম বেঞ্চের একটি রায়ের একটি বিশেষ অংশ নিয়ে যেখানে বিচারপতি ইসমাইল উদ্দিন সরকার একটি মন্তব্য করেছিলেন যা নিয়ে আজকে জামাত অত্যন্ত দুঃখজনক ভাবে মিথ্যে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে গত প্রায় দেড়যুগেরও বেশী সময় ধরে এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে এই প্রোপাগান্ডাটি চালিয়ে তারা বিভ্রান্ত করছে সাধারণ মানুষকে।

কি সেই প্রোপাগান্ডা? কেমন করে জন্ম নিলো এই মিথ্যে প্রোপাগান্ডাটি?:

বিচারপতি ইসমাইল উদ্দিন সরকার তার প্রদত্ত রায়ের প্যারা ১৪ তে বলেন-
[Professor Golam Azam v. Bangladesh (Mohammad Ismail Uddin Sarkar J); Dhaka Law Reports 46 (1993), p. 433.)]

প্রিয় পাঠক, উপরের স্ক্রীন শটটি লক্ষ্য করুন।এই স্ক্রীন শটটি হচ্ছে গোলামের নাগরিকত্ব মামলার প্রথম রায়ের একটি অংশ। এই রায়টি হচ্ছে গোলামের নাগরিকত্ব মামলা যখন প্রথমে হাইকোর্ট ডিভিশনে দ্বৈত বেঞ্চে গেলো তখনকার। রায়টি দিয়েছেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইসমাইল উদ্দিন সরকার এবং এই অংশ নিয়েই গোলামের সমর্থক তথা জামাতের কর্মী-ব্লগার-লেখক-আইনজীবিরা ইচ্ছেমত মিথ্যে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। এই স্ক্রীন শটটি দেখিয়েই ওরা বলে থাকে যে, হাইকোর্ট এর বিচারকরাই তাদের রায়ে বলে দিয়েছেন যে গোলাম যুদ্ধাপরাধী কিংবা মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধ করেনি। তারা গোলামের কোনো অপরাধের অস্তিত্ব খুঁজে পায় নি।

আসুন দেখি কি বলা হচ্ছে এই ছবিটিতে-

এখানে প্রথম ভাগ যেটি হলুদ সীমানায় আবদ্ধ এবং ২য় ভাগ, যেটি লাল সীমানায় আবদ্ধ করা হয়েছে সেখানে বলা হচ্ছে যে গোলামের যেই ছবি টিক্কা আর ইয়াহিয়ার সাথে দেয়া হয়েছে তাতে করা এটি বোঝায় না যে গোলাম একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকার, আলবদর, আল-শামস ও আলবদর বাহিনীর সাথে মিলে মিশে কোনো গণহত্যায় অংশ নিয়েছিলো শুধু মাত্র ইয়াহিয়া আর টিক্কার সাথে গোলামের দহরম-মহরম ছাড়া।

এবার পাঠক লক্ষ্য করুন ছবির গোলাপী সীমানায় আবদ্ধ অংশটিতে যেখানে বিচারক ইসমাইল বলছেন যে তারা এই মামলায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের কৃত অপরাধের সাথে গোলামের “সরাসরি” কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন কিছু খুঁজে পায় নি। পাঠক এখানে “সরাসরি” শব্দটি মনে রাখুন এবং এও মনে রাখুন যে বিচারক কিন্তু রাজাকার-আলবদর, আল শামস রা যে অপরাধ করেছে এটি স্বীকার করেছেন এবং তার রায়ের ওই উদ্দিষ্ট অংশে বলেছেন।

এবার আসুন উল্লেখিত রায়ের শেষ অংশে যেটি সবুজ সীমানায় নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখানে বিচারপতি ইসমাইল অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন যে উল্লেখিত যেসব রিপোর্ট সরকারপক্ষ দিয়েছেন তা এই মামলায় একেবারেই বিচার্য নয় এবং এই মামলায় এটি কোনো কাজেই আসবে না। মূলত এই অংশটি ও তার ব্যখ্যাই হচ্ছে আজকে জামাতের এই প্রোপাগান্ডার সঠিক জবাব।

মাননীয় বিচারপতি ইসমাইল উদ্দিন সরকারের রায়ের ব্যখ্যাঃ

পাঠকদের আবারো মনে করিয়ে দেই যে, এই বিচারপতি-ই কিন্তু একমাত্র বিচারপতি ছিলেন গোলামের নাগরিকত্ব মামলায়, যিনি গোলামের নাগরিকত্ব্ব বাতিলের রায় দিয়েছিলেন। তাঁরই রায়ের একটি অংশ নিয়ে আজকে জামাতীদের এই নোংরা প্রোপাগান্ডা আসলেই আমাদের মনে ঘৃণার উদ্রেক ঘটায়। আমি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝাই।

ধরা যাক, আমার একটি জমি নিয়ে মামলা চলছে। আমার প্রতিপক্ষের নাম হচ্ছে ধরেন জামাল সাহেব। একটি জমি আমরা দুইজনই দাবী করছি। এখন বিচারপতিদের সামনে যখন মামলাটির যুক্তি-তর্ক কিংবা শুনানী হচ্ছে তখন জামাল সাহেব বললেন, “এই জমি আমার। আমি ১৯৮০ সালে জমিটি কিনেছি।জনাব নিঝুম আমার জমিটি দখল করে নিয়েছেন অবৈধ ভাবে। জনাব নিঝুম ১৯৬০ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করেছিলো। সে অংকে পেয়েছে ১০, এই দেখুন প্রমাণ হিসেবে ৫টি ছবি যেখানে তিনি বিভিন্ন ক্লাসে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছেন”

কোর্ট তখন কি করবে? এটি বুঝতে একজন আইনজীবি হবারও প্রয়োজন নেই আপনার কিংবা আপনাকে এরজন্য একজন আইনের ছাত্রও হতে হবে না। সিম্পলি কমন সেন্স দিয়ে ভাবুন তো!খুব স্বাভাবিক ভাবেই কোর্ট বলবে যে, “নিঝুম সাহেব যে ১৯৬০ সালে অংকে ১০ পেয়েছেন এমন প্রমাণ আমরা পাইনি এবং এই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি হয়ত তার পড়ালেখায় দূর্বলতা বা ক্লাসের পারফরম্যান্স প্রমাণ করে কিন্তু তাই বলে যে তিনি অংকে ১০ পেয়েছেন তা সরাসরি প্রমাণ করে না এবং এই মামলা অংক বা ভূগোল প্রমাণ করবার জন্য নয়। এই মামলা জমি সংক্রান্ত এবং এই জমির সাথে সম্পর্কিত প্রমাণ ও কথাই এখানে মামলা নিষ্পত্তিতে সহায়তা করবে”

এখন ধরেন এই মামলার ১০ বছর পর আমি একটি ইউনিভার্সিটির অংকের প্রফেসর হলাম। (পাঠক মনে করুন ১৯৬০ সালের অংক পরীক্ষায় আমি আসলেই ১০ পেয়ে ফেল করেছিলাম) এখন যেই ইউনিভার্সিটিতে আমি অংকের প্রফেসর সেখানে আমার ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হোলো এবং বলা হোলো যে আমি আমার রেজাল্ট মিথ্যে করে বানিয়ে এখানে শিক্ষক হিসেবে ঢুকেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করলো, আমার জন্য যথাযথ আইনে বিচারের ব্যাবস্থা করলো। আমি এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে জামাল সাহেবের সাথে আমার জমি-জমার মামলার রায়ের ঐ অংশটি সবাইকে দেখালাম। এখন, মামলার রায়ের ওই নির্দিষ্ট অংশটি দেখিয়ে আমি কি এটা বলতে পারি যে, আমার বিরুদ্ধে এখন যে তদন্ত আপনারা করছেন তা একটি প্রহসন, ১০ বছর আগের কোর্টের রায়েই তো বলে দেয়া হয়েছে যে আমি অংকে ১০ পাইনি। আমি ফেল করিনি। তাহলে এখন আবার কিসের তদন্ত? কিসের বিচার?

ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে গোলাম আজমের নাগরিকত্ব মামলার ক্ষেত্রে। সরকার মামলা দিয়েছিলো বাংলাদেশ নাগরিক আদেশ-১৯৭২ এর ধারা ৩ এর মাধ্যমে, কোনোভাবেই এই মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১৯৭৩ কিংবা গোলাম আজমের যুদ্ধকালীন অপরাধের ঘটনা প্রমাণ করবার জন্য নয়। এই মামলায় শুধুমাত্র সেসব যুক্তি-তর্ক কিংবা প্রমাণ অথবা কথা-বার্তা গ্রহণ করা হবে যেগুলোর গোলামের নাগরিকত্ব ইস্যুর সাথে সম্পর্কিত হবে। যেহেতু নাগরিকত্ব মামলার ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ, মানবতা বিরোধী অপরাধ তথা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোলাম আজমের ভূমিকার কথা বিচারকের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে সেহেতু বিচারপতি তার উপরের কথাগুলো বলেছেন। এবং তিনি পরবর্তীতে শুধুমাত্র গোলাম আজমের নাগরিকত্বের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে পর্যালোচনা করে নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ দিয়েছিলেন।

উপরের আমার দেয়া উদাহরণ আপনাদের কাছে আরো বেশী করে স্পষ্ট হবে আরো কয়েকটি ব্যাপার লক্ষ্য করলে। আগেই বলেছি গোলামের মামলা শেষ পর্যন্ত নানান রায়ের পর হাইকোর্টের এপিলেট ডিভিশানে গিয়ে পৌঁছে। আসুন দেখি সেখানে বিচারপতিরা কি বলেছেন-

এপিলেট ডিভিশানের বিচারপতি হাবিবুর রহমান এই মামলার রায় দিতে গিয়ে প্যারা নাম্বার ২৭-এ বলেন-

27. The questions whether by his conduct the respondent disqualified himself to be a citizen of Bangladesh or whether he renounced his citizenship of Bangladesh or whether he continued to be a citizen of Pakistan, implying he had already been a citizen of Pakistan are totally irrelevant under Article 3. If the purpose was to deter the persons mentioned in the notification from making anti-Bangladesh propaganda then that was not covered by Article 3. The only question that can be decided under Article 3 whether a person is qualified to be deemed to be a citizen of Bangladesh.

এর পরে কি আর কোনো ধরনের, কোনো রকমের কিংবা কোনো প্রকারের অস্পষ্টতা থাকতে পারে না থাকা উচিৎ? এখানে বিচারপতি হাবিবুর রহমান অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে গোলাম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে থাকলেও তা এই মামলায় উদ্দিষ্ট ধারা ৩ এর সাথে কোনো রকমেরই সম্পর্কিত নয়। পাঠক, আপনারা জেনে রাখুন, এই মামলাতে যদি গোলামের সমস্ত অপরাধ জলজ্যান্ত ভিডিও নিয়ে এসেও কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের প্রমাণ নিয়ে এসেও বিচারপতিদের সামনে তুলে ধরা হোতো তবে বিচারপতিরা তা একেবারেই আমলে নিতেন না। কেননা মামলাটি গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বহাল থাকা/ না থাকা নিয়ে। গোলামের ১৯৭১ সালে কৃত অপরাধ নিয়ে নয়।আপনার যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইসমাইল উদ্দিন সরকার কিন্তু বলেছেন যে উপস্থাপিত ছবি ও ডকুমেন্টস গুলো গোলামের অপরাধের “সরাসরি” সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে না। মানে তিনি এও বুঝাতে চেয়েছেন যে ইন্ডাইরেক্ট যোগাযোগ থাকতে পারে। এর মানে, তিনি পুরো ব্যাপারে আসলে কোনো সিদ্ধান্তেই আসেননি। এর থেকেও প্রমাণিত হয় যে বিচারপতি ইসমাইল কোনোভাবেই গোলামের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপঃকর্মের ব্যাপারে কোনো রায়ই দেন নি।

বিচারপতি হাবিবুর তার রায়ের শেষ দিকে প্যারা নাম্বার ৬৫ তে আবারো স্পষ্ট করে বলেন-

65. In considering a matter before it the Court will only consider whether the aggrieved person has got the legal entitlement to the relief claimed. Any consideration of his political antecedents having no bearing on the questions of law involved in the matter will be irrelevant.

শুধু বিচারপতি হাবিবুর রহমানই নন। এই রায়ে বিচারপতি এ টি এম আফজাল কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন যা এই লেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। বিচারপতি আফজাল তার রায়ের ৮০ নাম্বার প্যারায় বলেন যে –

The only question at issue therefore is: Did the Government exercise its power legally and in terms of Article 3 as would make the notification immune from the doctrine of ultra vires?

A point of law cannot be matched by alleging political mis‑demeanour. That is sheer perversity.

আবার প্যারা ৮১ তে তিনি আরো স্পষ্ট ভাবে বলেন-

81. The impugned order, inter alia, refers to conduct and, as noticed above, the Government’s affidavit is mainly based on the respondent’s political conduct during the liberation struggle and after. There is complete unanimity on all hands that the political conduct of the respondent was wholly irrelevant for deciding the question under Article 3 of President’s Order No. 149 of 1972. There is no power under Article 3 for denuding a person of his citizenship for the offence of collaboration with the Pakistan Occupation Army. Indeed there is nothing in President’s Order No. 149 of 1972 which authorised the Government on the date of the impugned notification to disqualify a citizen on the ground of collaboration with the Pakistan Occupation Army. President’s Order No. 149 of 1972 was never intended to punish an alleged collaborator of the said Army by stripping him of his citizenship.

এছাড়াও বিচারপতি মোস্তফা কামাল কয়েকটি গুরুত্ব পূর্ণ কথা বলেছেন তার রায়ের ১২৫ নাম্বার প্যারায়। যেখানে তিনি বলেছেন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে যে-

The argument of the learned Attorney-­General is long on emotion and short on law.

First,
his commentaries on the criminal aspects of the political antecedents of the respondent were never tested in a court of law.

Secondly,
even if the allegations are correct, our citizenship law does not deny citizenship to those who opposed the creation of Bangladesh and even killed freedom fighters and were engaged in murder, rape, etc. Our law has followed the Pakistan law in this respect. There were many Muslims (and Hindus as well) who opposed the creation of Pakistan and even voted against Joining Pakistan in the plebiscites held in the North Western Frontier Province and in Sylhet. Yet the Pakistan Citizenship Law did not deny them citizenship. They were deemed to be citizens of Pakistan if they had permanent residence in the territory of Pakistan and did not leave the same. Bangladesh also followed the same principle. The history of citizenship legislation, detailed earlier, bears ample testimony to that. In Bangladesh, collaborators and Razak’ars were prosecuted under the Collaborators Order, President’s Order No. 8 of 1972, but they were not denied the citizenship of Bangladesh.

মানে হচ্ছে, গোলামের ১৯৭১ সালের কৃত অপরাধ কখনোই কোর্টে প্রমাণিত হয় নি এবং যদি হতোও তাহলেও তা তার নাগরিকত্বের সাথে সম্পর্কিত হোতো না কেননা এতে করে হাজার হাজার রাজাকারের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যেতো। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা খুবই প্রয়োজন যে, উপরের প্যারায় বিচারপতি মোস্তফা কামাল তার মন্তব্যটি করবার পর পরই এর সাথে বিচারপতি ইসমাইল উদ্দিন সরকারের রায়ের সেই অংশটি ( যেটি নিয়ে জামাত মিথ্যাচার করে, উপরে তা ইতিমধ্যে একবার দিয়েছি বলে এখানে আর দিলাম না) আবারও উদ্ধৃত করেন। কিন্তু তিনি এই ব্যাপারটা আমাদের অত্যন্ত পরিষ্কার করে জানান যে, এই মামলা টি গোলামের নাগরিকত্বের সুতরাং এখানে গোলামের ১৯৭১ সালের কর্মকান্ডের ব্যাপারটি তিনি যুক্তি তর্কে স্থান দিতে চান না।

এইসব আলোচনার প্রেক্ষিতে একটি কথা খুব পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, গোলামের নাগরিকত্ব মামলা আর গোলামের যুদ্ধাপরাধের কিংবা মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলা দুইটি ভিন্ন জিনিস। গোলামের নাগরিকত্ব মামলাতে যেহেতু আবেদনকারী নাগরিকত্ব কেন দেয়া হবে না এই সম্পর্কিত বিভিন্ন যুক্তির পাশাপাশি গোলামের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের কথাও এনেছিলেন ও তা ভুল ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন সুতরাং সেই হিসেবেই ও আইনের প্রশ্নে বিচারপতিরা ওই সব ক্ষেত্রে মন্তব্য করেছেন। এবং সেটি যে এই মূল মামলার সাথে সম্পর্কিত নয় বলে বিচারকরা বলেছেন তা তো আপনারা উপরের রায়ের উদ্ধৃত অংশ থেকে দেখলেনই। যেখানে বিচারপতিরা শুধু আইন নিয়ে ও প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়েই কথা বলতে বলেছেন এবং গোলামের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা যেহেতু সেটি ছিলোনা তাই এই ব্যাপারে তারা কোনো রায় কিংবা বক্তব্যও দেননি।

অথচ জামায়াতে ইসলামের মূর্খ নেতা, ব্লগার ও পাতি লেখকেরা চারিদিকে মাইক দিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে ১৯৯৪ সালের নাগরিকত্ব মামলার রায়েই নাকি গোলামকে ১৯৭১ সালে তার কৃত অপরাধের ব্যাপারে কোর্ট তাকে সম্পূর্ণভাবে ফেরেশতা বলে রায় দিয়েছেন। অথচ আইনকে মানুষের সামনে ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করে, ভুল ভাবে রায়ের ব্যখ্যা করে জামাত একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে। তারা সাধারণ মানুষকে তাদের মিথ্যে কথা দিয়ে বোকা বানাচ্ছে এবং চেষ্টা করছে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায় করতে। জামাত এতই একটি ভন্ডের দল যারা জলজ্যান্ত রায়কে সামনে রেখে সেই রায়কে মিথ্যে করে পরিবেশন করছে, ঠিক তারা যেমনটি করে পবিত্র কোরান শরীফ নিয়ে।

আশা করি এই লেখার মাধ্যমে জামাতের এই বিষয়ে নোংরা ও মিথ্যে প্রোপাগান্ডার সমাপ্তি হবে এবং বাঙালীকে হাইকোর্ট দেখানো বন্ধ হবে।

এই বিষয়ক আরেকটি লেখা লিখেছেন ইন্টারন্যাশ্নাল ক্রাইম স্ট্র্যাটেজি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও কর্মী, আইনজীবি জনাব রায়হান রশীদ